coronavirus লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
coronavirus লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২২

খারিজি হতে সাবধান!


'ইয়া আইয়্যুহাল্লাযীনা আ-মানু লা-তাকরাবুস্ সালা-তা ওয়া আনতুম সুকারা' -(হে মুমিনগণ, তোমরা সালাতের ধারেকাছেও যেয়ো না, নেশাগ্রস্থ অবস্থায়) এ আয়াতের প্রথম অংশ- 'লা-তাকরাবুস্  সালাতা' বলে এবং শেষের অংশ 'ওয়া আনতুম সুকারা' হাইড করে অর্থাৎ  আয়াতের আংশিক অর্থ বলে আংশিক গোপন রেখে বিভ্রান্ত করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল বিশিষ্ট বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন, যার ফলে শেষ পর্যন্ত তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। 'কুল ইন্নামা আনা বাশারুম মিছ্'লুকুম (বলুন, আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ) বলে যারা আয়াতের পরের অংশ 'ইউহা ইলাইইয়া' গোপন রাখার চেষ্টা করে বা পবিত্র কুর'আনুল কারীমে 'দিনাজপুর' বা 'কুমিল্লা' আছে বলে অপব্যাখ্যা করে, তারা কি সেই একই অপরাধে অপরাধী নয়?

ওহাবী-খারেজীরাই তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে 'কুফর'-এর ফতওয়া দিয়েছিল এবং জোড়ালো অবস্থান নিয়েছিল; তারা যে সেই একই অপরাধ করে যাচ্ছে, তা কি তারা একবারের জন্যও ভেবে দেখেছে? তসলিমা নাসরিনকে দেশছাড়া করা সহজ ছিল, কারণ সে একজন নারী এবং বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি, সংঘবদ্ধ ওহাবী-খারিজীরা যে অনবরত সেই একই অপরাধ করে যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ফতওয়া দেবে কে বা তাদেরকে দেশছাড়া করবে কে?? 

'Indeed, those who conceal Allah’s revelations in the Book, and purchase for them a miserable profit,- they swallow into themselves naught but Fire; Allah will not address them on the Day of Resurrection. Nor purify them: Grievous will be their penalty.' -(Surah Al-Baqarah : 174) 'নিশ্চয় যারা গোপন করে আল্লাহর কিতাব হতে যা নাযিল করেছেন তা এবং এর বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে, তারা তাদের নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই ভক্ষন করে না। আর কেয়ামতের দিন আল্লাহ্‌ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।' 

আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা বলেন, যে ব্যক্তি ধন-সম্পদের লোভে শরিয়তের হুকুম-আহকাম পরিবর্তিত করে এবং তার বিনিময়ে যে হারাম ধন-সম্পদ গ্রহণ করে, তা যেন সে নিজের পেটে জাহান্নামের আগুন ভরে; কারণ, এ কাজের পরিণতি ভয়াবহ। তাফসীরে কিতাবে উল্লেখ আছে- আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যারা তা গোপন করে ও তার বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করে, তার বিনিময়ে তারা কেবল আগুন দিয়ে আপন পেট পূর্ণ করে; শেষ বিচারের দিন আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদেরকে (পাপ-পঙ্কিলতা থেকে) পবিত্রও করবেন না; আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

তাছাড়াও সুরা বাকারা'র ৪১ নম্বর আায়াত- 'আর আমি যা নাযিল করেছি তোমরা তাতে ঈমান আন; এটা তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যতা প্রমাণকারী। আর তোমরাই এর প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না এবং আমার আয়াতসমূহের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করো না। আর তোমরা শুধু আমারই তাকওয়া অবলম্বন কর।' আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার আয়াতসমূহের বিনিময়ে মূল্য গ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ হলো, মানুষের মর্জি ও স্বার্থের বিনিময়ে আয়াতসমূহের মর্ম বিকৃত বা ভুলভাবে প্রকাশ করে বা তা গোপন রেখে টাকা-পয়সা, অর্থ-সম্পদ গ্রহণ করা; এ কাজটি সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। بِه (ওঁর) সর্বনাম দ্বারা কুর'আনকে বুঝানো হয়েছে অথবা মুহাম্মদ (সাঃ)-কে; আর উভয় মতই সঠিক। কেননা, দু'টিই আপোসে এক ও অবিচ্ছেদ্য। যে পবিত্র কুর'আনের সাথে কুফরী করল, সে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সাথেও কুফরী করল; আর যে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সাথে কুফরী করল, সে  পবিত্র কুর'আনের সাথেও কুফরী করল। -(ইবনে কাসীর)। 

'আমার আয়াতের বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করো না' এর অর্থ এই নয় যে, বেশী মূল্য পেলে ইলাহী বিধানের বিনিময়ে তা গ্রহণ করো; বরং অর্থ হলো- ইলাহী বিধানসমূহের মোকাবেলায় পার্থিব স্বার্থকে কোন প্রকার গুরুত্ব দিও না। আল্লাহর বিধানসমূহের মূল্য এত বেশী যে, দুনিয়ার বিষয়-সম্পদ এর মোকাবেলায় তা খুবই তুচ্ছ, কিছুই না। উক্ত আয়াতে বানী-ইসরাঈলকে সম্বোধন করা হলেও এই নির্দেশ কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানুষের জন্য। যে ব্যক্তি সত্যকে বাতিল, বাতিলকে প্রতিষ্ঠা অথবা জ্ঞানকে গোপন করার কাজে জড়িত হবে এবং কেবল পার্থিব স্বার্থের খাতিরে সত্য-প্রতিষ্ঠা করা থেকে বিরত থাকবে বা ত্যাগ করবে, সেও এই ধমকের অন্তর্ভুক্ত। -(ফাতহুল ক্বাদীর)

ওহাবী খারিজীদের খাসলত এমন- স্বার্থে টান লাগলেই তারা বেঁকে বসে! যেমন- তাদের দীক্ষাগুরু নিজামুদ্দিন মারকাজের বর্তমান মুরুব্বি মাওলানা সা'দ কান্ধলবী বলেছিলেন, 'মাদরাসা মসজিদের বেতন বেশ্যার উপার্জনের চেয়েও খারাপ; যারা কুরআন শরীফ শিখিয়ে বেতন গ্রহণ করে, তাদের বেতন বেশ্যার উপার্জনের চেয়েও খারাপ; যে ইমাম এবং শিক্ষক বেতন গ্রহণ করেন, বেশ্যারা তাদের আগে জান্নাতে যাবে; কাওমী-খারেজি মাদরাসা গুলোতে জাকাত না দেয়া হোক, ওখানে জাকাত দিলে জাকাত আদায় হবে না; পারিশ্রমিক নিয়ে দ্বীন শেখানো দ্বীন বিক্রির নামান্তর, ব্যভিচারকারী নারীও কুরআনুল কারীম শিখিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণকারীর আগে জান্নাতে যাবে৷' 

সত্য অপ্রিয় বলে বিবেচিত হলেও সত্যই সুন্দর আর সত্যই চিরন্তন। কিন্তু সত্য যখন স্বার্থপরদের স্বার্থের বিপক্ষে চলে যায় তখন তা আর তাদের ভাল লাগে না- 'গরম ভাতে বিড়াল অসন্তুষ্ট, হক কথায় স্বার্থপর রুষ্ট'- সবাই সা'দ সাবের পিছন ছেড়েছে; আজও বিরোধ চলছে। 

ওহাবী-খারিজীরা এমনই! রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর শা'ন-মান সম্পর্কিত পবিত্র কুর'আনুল কারীমের আয়াতের আংশিক বলে তারা সমাজে ফেতনা ছড়ায়, মানুষের ঈমান নষ্ট করে; এ তো জঘন্য পাপ, অপরাধ। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত-কে তারা মোটেও ভয় পায় না; তাদের বুক একটুও কাঁপে না। পবিত্র কুর'আনুল কারীম নিয়ে তাদের এ জঘন্য  প্রতারণা সাধারণ মানুষ কমই বুঝে বা মোটেও বুঝে না; তাই বুকের কষ্টটা অনুভব করতে পারে না। এমন জঘন্য অপরাধ তারা করে শুধুমাত্র কিছু দুনিয়াবি স্বার্থের প্রত্যাশায়, বিশাল দলীয় সুবিধার জন্য; হযরত হুসাইন (রা:)-কে শহীদ করা দলও কিন্তু অনেক বিশাল ছিল। তারা কখনো ভাল হয় না, ভাল থাকে না, অবস্থান স্থায়ী করতে পারে না; কারণ, তাদের উপর আল্লাহর লা'নত। 

ছলচাতুরী ও চাটুকারিতা খারিজিদের চরম এক অপকৌশল, এ'সব করে তারা আসলে তাদের  নিজেদেরকেই ধ্বংস করে এবং করেছে, করছে; একটু খেয়াল করলেই যে কেউ তা বুঝতে পারবেন— আস্তে আস্তে তাদের চেহারার নূর নষ্ট হয়ে যায়, ভাইরাল বক্তা সুপার ফ্লপ হয়ে যায়। মনে রাখবেন, রাসুলপাকের (সা:) সাথে বিদ্বেষ রেখে বেশিদিন টিকে থাকা যায় না; আল্লাহ ছাড় দেন, ছেড়ে দেন না।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
১৮ নভেম্বর, ২০২২.

মঙ্গলবার, ৮ নভেম্বর, ২০২২

ভূতের দেশের ভূতুড়ে শিক্ষা!


ক্লাশে শিক্ষক এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, ”তোমার সামনে এক বাক্সে ‘টাকা’ অন্য বাক্সে ‘জ্ঞান’ রাখা হলো, তুমি কোনটা নেবে?"
ছাত্রের ঝটপট উত্তর: ”টাকা!”
শিক্ষক : ”দুর বোকা! আমি হলে ‘জ্ঞান’ নিতাম।”
ছাত্র : ”যার যেটার অভাব!”
ছাত্র-শিক্ষকের উপরোক্ত আলাপচারিতা থেকে এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান – শিক্ষকদের আসলেই জ্ঞানের বড় অভাব; একজন শিক্ষক হিসেবে অবলীলায় আমি তা স্বীকারও করে নিচ্ছি।

ইদানিং গল্পছলে আমার স্ত্রী উপরোক্ত ছাত্র-শিক্ষক কথোপকথন মাঝেমধ্যেই আমাকে শোনান। কেন শোনান তা বেশিরভাগ সময়ই তেমন একটা ভাল বুঝে উঠতে পারি না। তবে এতোটুকো বুঝি – বাস্তব জীবনের জটিল হিসাব-নিকাশ হয়তো আমি ঠিকমত তেমন মিলাতে পারিনি (অনেকে মনে করেন সমাজের সাথে আমি তাল মিলাতে পারি না, আসলে আমি মোটেও তা চাই না)। এসব ব্যাপার নিয়ে কোনদিনই কোন ধরনের আফসোস বা অভিযোগ কোনটাই আমার ছিল না, আজও নেই; বরং মনে হয় অনেকের চেয়ে আমি অধম বেশ ভাল আছি, সুখে শান্তিতে আছি। 

ছোটবেলা থেকে এমন সব ব্যাপারগুলো আমার কাছে তেমন একটা বোধগম্য হতো না বা পাত্তা পেতো না, তাই অনেকেই আমাকে বোকা ভাবতো, আজও মনে হয় তাই ভাবে। আমার মতে – কিছুটা বোকা থাকাটা তেমন বড় দোষের কিছু নয়, বরং কখনো কখনো বেশ ভাল মনে হয়। এতে অসুবিধার চেয়ে সুবিধা অনেক বেশি। বোকা ভেবে সবায় চালাকি করে, আর তা দেখে বুঝে ভালই শেখা যায়; সর্বক্ষেত্রে সমস্যাও অনেকটা কমে যায়। অযাচিত ভুল করে বসলেও খুব বেশি একটা খেসারত গুনতে হয় না, বোকা বলে সহজেই ক্ষমা পাওয়া যায়; চালাকরা যা মোটেও পায় না। বরঞ্চ বোকারাই সমাজ সংসারে বেশ সুখে থাকতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আজকাল অর্থের মাপকাঠিতে সবকিছুর পরিমাপ করা হয়; বুদ্ধিমান বা বোকার পার্থক্যও নির্ধারিত হয় অর্থ দিয়ে। সেই হিসেবে নিঃসন্দেহে শিক্ষকরা এদেশে সবচেয়ে বড় বোকা! কতইবা তাঁরা বেতন পায়? – অর্থের তুলাদণ্ডে মেপে জ্ঞানের পরিমাপ যাচাই? – এ শুধু বোকামিই নয়, বরং এর চেয়েও অনেক বড় কিছু। প্রকৃতপক্ষে একজন শিক্ষক সব সময়ই নিজ জ্ঞানের স্বল্পতা অনুভব করে থাকেন, এই স্বল্পতা থেকে জন্ম নেয়া প্রচন্ড অভাব আকাঙ্ক্ষা তাঁদেরকে জ্ঞানপিপাসু করে তোলে। একজন প্রকৃত শিক্ষকের জ্ঞানতৃষ্ণা কখনো মিটে না, এ অভাব সবসময় লেগেই থামে।

ইমামে আজম আবু হানিফা (রঃ) অত্যন্ত উঁচু স্তরের উঁচু মানের একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন, এতে তৎকালীন বা বর্তমান সময়েও কারো কোন দ্বিমত বা সন্দেহের অবকাশ নেই। সর্বকালের সর্বযুগের পৃথিবীশ্রেষ্ট একশ মনিষীর মাঝে তিনি একজন। সর্ব গুণে-জ্ঞানে গুণান্বিত এই মহান শিক্ষক একবার ক্লাশে এক ছাত্রের প্রশ্নের উত্তর তৎক্ষণাৎ দিতে পারেননি। ছাত্রের প্রশ্ন ছিল – কি করে বুঝা যাবে কুকুর কখন বালেগ হয়? ইমাম সাহেব এর সঠিক উত্তর জানতেন না। তাই বিমর্ষ বদনে গভীরভাবে চিন্তা করতে থাকেন, বাড়ি ফিরেও ভাবনার জগতে সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুজতে থাকেন; নিজ কন্যার চোখ তা এড়ায়নি। বাবাকে বিমর্ষ বদনে ভাবতে দেখে জিজ্ঞেস করতেই ছাত্রের প্রশ্নটি জানতে পারেন। প্রশ্নটি শুনেই মেয়ে খুব সহজভাবে বাবাকে বলেন, ”পাশে যে মুচি আছেন তিনি অনেকগুলো কুকুর পালেন, তাকে জিজ্ঞাস করলেই এর সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে, এটা নিয়ে অতো চিন্তার কিছু নেই।"

বিকেলবেলা ইমাম সাহেব হাটতে হাটতে সেই মুচির বাড়ি গেলেন। তাঁকে দেখে মুচি তো অবাক! দেশের স্বনামধন্য শিক্ষক তার মতো একজন ক্ষুদে মুচির বাড়িতে ছুটে এসেছেন, ব্যাপার কি? বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করতেই মুচি প্রশ্নটি জানতে পারে এবং মুচকি হেসে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীলভাবে জবাব দেয় – ”একটি কুকুর যখন পা তুলে পস্রাব করে তখনই বুঝা যায় ওটা বালেগ হয়েছে।" 
কথিত আছে ইমামে আজম সেই মুচিকেও শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর হৃদয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছিলেন। তাঁর মহান জীবনী থেকে জানা যায় চার হাজারেরও অধিক শিক্ষক থেকে তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। শিক্ষকদের তিনি এতোটাই শ্রদ্ধা সম্মান করতেন যে – বেয়াদবির ভয়ে এক সময় কোথাও তিনি পা ছড়িয়ে বসতেন না, সবসময় পা জড়সড় করে গুটিয়ে রাখতেন। কারন – তাঁর বাড়ির পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ সবদিকেই শিক্ষকদের বসবাস ছিল; যদি কখনো পা কোন শিক্ষকমুখী হয়ে যায়!

ইমামে আজম একদিন রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছিলেন। এমন সময় আটদশ বছরের ছোট্ট একটি বাচ্চা হাতে দুধের বাটি নিয়ে বিপরীত দিক থেকে দৌঁড়ে আসছিল। ইমামে আজম বাচ্চাটিকে দেখে বলেন, "বাবা! আস্তে দৌঁড়াও, হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে ক্ষতি হবে।”
বাচ্চাটি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো, ”হুজুর! আপনি আস্তে চলেন।”
ইমাম সাহেব বাচ্চাটির কথায় স্তম্ভিত হয়ে যান। ভাবেন ছোট্ট বাচ্চার আঁতে হয়তো আঘাত লেগেছে, সে হয়তো ইমাম সাহেবের কথা বুঝতে ভুল করেছে। তাই তিনি পুনরায় বললেন, ”বাবা! আমি বয়োবৃদ্ধ মুরুব্বি মানুষ, তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য কিছু বলিনি। তুমি হোঁচট খেয়ে পরে গেলে হয়তো দুধের বাটি পরে যাবে, ক্ষতি হবে; তাই আস্তে চলতে বলেছি।"
ইমাম সাহেবের কথাগুলো শুনে বাচ্চাটি বলে উঠে, ”হুজুর! আমি আপনাকে আস্তে চলতে বলছি কারণ, আমি হোঁচট খেলে হয়তো অল্প কিছু দুধ পরে যাবে, অল্প ক্ষতি হবে, এতে কারো কিছু আসবে যাবে না; কিন্তু আপনি হোঁচট খেলে অর্থাৎ আপনার কলম হোঁচট খেলে, সারা মুসলিম জাহান হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পরবে; বিশাল ক্ষতি হবে। তাই আমি আপনাকে আস্তে চলতে বলেছি।”
সেই ছোট্ট বাচ্চাটির সেইদিনের সেই কথাগুলো ইমামে আজম আবু হানিফা (রঃ) এর পরবর্তী জীবনের পাথেয় ছিল।

মহানবী (সাঃ) বলেছেন – ”দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত তোমরা জ্ঞানান্বেষণ কর।" দশজন অশিক্ষিত অজ্ঞানীর চাইতেও একজন শিক্ষিত জ্ঞানী উত্তম বলে তিনি স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। শিক্ষা ও জ্ঞান সম্পর্কিত বিষয়বস্তু নিয়ে পবিত্র কালাম পাক ও সহি হাদিস গ্রন্থগুলোতে ব্যাপক আলোকপাত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানান্বেষণ একটি অত্যন্ত ব্যাপক ও বিশাল জিনিস। এর কোন স্থান কাল পাত্র নেই, নেই কোন সীমাবদ্ধতা। জীবনের প্রতিটি ক্ষণে প্রতিটি স্তরে সবার কাছ থেকেই শিক্ষা নেয়া যায়। এই মৌলিক বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়ার বা দেখার মত কোন সুযোগ কারোই নেই। জ্ঞান অন্বেষণকে প্রতিটি ধর্মগ্রন্থই অগ্রাধিকার দিয়েছে। ধর্ম অবিশ্বাসীরাও কখনো জ্ঞানের ব্যাপারে কোনরুপ দ্বিমত পোষণ করেনি বা বিরোধীতা করে না। যুগে যুগে জ্ঞানান্বেষণ ও জ্ঞানার্জনকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে পৃথিবীর সভ্য অসভ্য সর্বশ্রেণীর মানুষজন। 

জ্ঞানের প্রদীপ্ত শিখা চীর প্রজ্বলিত, এ শিখা চির অম্লান অমলিন। এই স্বচ্ছ স্পষ্ট বিষয়টি এদেশে আজকাল সবার কাছে কেমন যেন গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে কেউই এখন আর তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না, জ্ঞানের চর্চাও কেউ করতে চায় না। জ্ঞানার্জন জ্ঞানচর্চা যেন খুবই ফালতু একটা বিষয়, সময়ের অপচয়। অর্থই যেন বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্খিত একমাত্র বস্তু। বিশেষ করে আমাদের পরিবর্তিত সামাজিক ব্যবস্থা এতোটাই উঁচ্চবিলাসী হয়েছে যেখানে সব কিছুই অর্থের পরিমাপে বিবেচনা করা হয়। এই অশুভ নেক্কারজনক প্রবণতা দিনদিন বেড়েই চলছে। বিশ্বায়নের সুফলের চাইতে কুফল বর্তমান সমাজব্যবস্থাকে বেশি প্রভাবিত করছে; দিনদিন পাল্টে যাচ্ছে আমাদের স্বভাবচরিত্রও। আমূল পরিবর্তন ঘটছে সামাজিক অবকাঠামো ও পারিবারিক বন্ধনগুলোর। সমাজবিজ্ঞানীরা এসব নিয়ে কিছু ভাবেন বলে মনে হয় না। নিশ্চয় এ দায় তাঁরা কিছুতেই এড়াতে পারবেন না?

কৈশোরে খুব গাছ বাইতে পারতাম। আমাদের বাড়ির সবচেয়ে বড় নারকেল গাছটিতে কেউই উঠতে সাহস করতো না; একেতো বিশাল তার উপর বাড়ির ছোটবড় প্রায় সবার ধারনা ছিল ঐ গাছে ভূত বসবাস করে! তাই ঐ গাছের নারকেল কখনো পারা হতো না, এমনিতে যদি নিচে পরতো তা নিয়ে সবার মাঝে কাড়াকাড়ি লেগে যেত; কারন ঐ গাছের নারকেল খুব মিষ্টি ছিল। সেই বয়সেও কেন জানি ভুতের ব্যাপারটা আমার কাছে মোটেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হতো না। তাই অনায়াসে আমি সেই বিশাল ভূতের গাছে উঠে বসে তৃপ্তি সহকারে নারকেল খেতাম আর দুনিয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করতাম। সত্য হলো – তখন কখনো আমি আসল ভুতের সাক্ষাত পাইনি।

আমাদের কবরস্থানের টেকে বেশকিছু তালগাছ ছিল। সবাই বলতো – ঐগুলো ভুতের বাড়িঘর, ভুতেরা তালগাছের আগডালে বসবাস করে। তাই ঐ সব গাছের আশপাশ দিয়েও কেউ হাটতো না। গাছে তাল পেকে নিচে ঝরে পরলেও তা কুড়িয়ে আনার লোকের অভাব ছিল। ভরদুপুর বা ভরসন্ধায় অনেকেই ঐ গাছগুলো থেকে বাঁশির সুর বাতাসে ভেসে আসতে শুনতো। আওয়াজ শুনে সবারই ধারনা হতো – প্রেমিক ভুত মনের আনন্দে সুর তুলেছে, কেউ পাশদিয়ে গেলেই তাকে খপ করে ধরবে, ঘাড় মটকাবে!

আগাগোড়াই আমি খুব কৌতুহলী একজন মানুষ, সেই বয়সে কৌতুহল আরো একটু বেশিই ছিল। একবার আষাঢ়ি (কঁচি তাল) খাওয়ার খুব ইচ্চা হওয়াতে বাড়ির মুরুব্বিদের নিষেধ উপেক্ষা করে চুপিচুপি আমরা ক’জন মিলে লম্বা বরাকবাঁশ জোগাড় করে তা এক তালগাছে লাগালাম, গাছে উঠার দায়িত্ব আমার কাঁধেই বর্তালো। ইতিপূর্বে বাঁশ বেয়ে অন্য তালগাছে অনেকবার উঠেছি, সব ধরনের গাছে উঠারই বেশ ভাল অভিজ্ঞতা আমার ছিল। কিন্তু ঐ দিন ঐ গাছে উঠতে বুকটা কেমন যেন টিপটিপ করছিল, তা সত্ত্বেও উঠে পড়লাম। তালগাছের ডাগগা বেশ পাস, ওখানে বসে থাকতে বেশ মজা লাগে; শুধু করাতের মত ধারগুলো কেঁটে একটু ভোঁতা করে নিলেই হয়। গাছে উঠতেই হটাৎ বুকটা মোচর দিয়ে উঠলো! হালকা মধুর এক ধরনের বাঁশির মিষ্টি সুর কানে ভেসে আসতে লাগলো, নিচে থাকতে যা মোটেও শুনিনি। তবে কি ভুত আমার ঘাড় মটকাতে আসছে?

দপাদপ কয়েকটা আষাঢ়ির বাঁদা নিচে ফেলে দিয়ে তালগাছের মগডালে বসে শব্দের দিকে মনোযোগ দিলাম। মনে হলো শব্দটা যে করছে সে বেশি দুরে নয়। কেন যেন হটাৎ আমার মনে হলো এই শব্দ কোন ভূতটুতের না। আস্তে আস্তে ডাগগা টপকাতে টপকাতে গভীরভাবে লক্ষ্য করতে থাকলাম – শব্দটা কোথা থেকে আসছে? কিছুক্ষণের মাধ্যেই উৎস আবিষ্কার করতে সক্ষম হলাম; কঁচি তালপাতা ও বাতাস মিলে প্রেমের এই মধুর সুর তুলেছে। বাতাস এসে তালের কঁচি পাতায় আঘাত করছে, কঁচিপাতার কম্পন সুর শলাকায় রুপ নিচ্ছে। এই হলো তালগাছের ভূত!

ছোটকালে শুনতাম হিজল গাছে ‘পেত্নী’ থাকে। ‘পেত্নী’ দেখার জন্য প্রায়ই ভরদুপুর বা তিনসন্ধ্যায় খাল পাড়ের হিজল গাছগুলো চষে বেড়াতাম; কিন্তু কোনদিনও পেত্নীর সাক্ষাত পাইনি। বাস্তবে ভুতপেত বলতে কিছু আছে কিনা আমার জানা নেই। তবে, গল্পের ভুত যে মানুষের ঘাড় মটকিয়েছে এমন অনেক ভুতপেতের সাক্ষাত গল্প উপন্যাসে পড়েছি। ইদানিং বুঝতেছি – তালগাছের সেই ভূত হিজল গাছের সেই পেত্নী সত্যি বাস্তবে আবির্ভূত হয়েছে। যে ভুতপেত আমাদের দেশ ও জাতির প্রতিটি মানুষের কাঁধে চেপে বসেছে, কখন যে কার ঘাড় মটকিয়ে দেয় তা বলা মুশকিল। বনের বাঘের কবলে পরলে হয়তো ভাগ্যজোড়ে প্রাণ বাঁচলে বাঁচতেও পারে, কিন্তু মনের বাঘে ধরলে প্রাণ বাঁচানো বড়ই কঠিন।

সরকার বাহাদুর এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভুতপেতের মত যে সব তামাসা করছেন তা নিয়ে শংকিত না হয়ে পারছি না। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের বাস্তব ভূতপেত্নীরা যে ভাবে প্রতিনিয়ত সুর তুলছে তা শুনে পুরো দেশবাসী এক ভ্রান্তবিলাসে মেতে উঠেছে। এর মূলে অবশ্য কাজ করছে আমাদের অশিক্ষা কুশিক্ষা ও অজ্ঞতা। পরিপূর্ণ পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই ‘উঠ ছেরি তোর বিয়া!' স্টাইলে বর্তমান সরকার তড়িগড়ি ১০০% শিক্ষিত জাতি গঠনের এক উঁচ্চবিলাসী মহা পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছে, মেতে উঠেছে এক মহাযজ্ঞে; যা দেশ ও জাতির জন্য ভয়াবহ অশনিসংকেত  ভিন্ন অন্য কিছু নয়। যেনতেন ভাবে পাশ করিয়ে শুধুমাত্র সার্টিফিকেট ধরিয়ে দেয়ার মাঝ দিয়ে জাতীয় বা ব্যক্তিগতভাবে এদেশের কেউ লাভবান হবে কিনা তা আমার মোটেও বোধগম্য হচ্ছে না। 

বরং এতে বর্তমান প্রজন্মও অনেকটা জটিলতার মধ্যে পরে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। রেজাল্ট দেখে পড়া নাপড়া বা মেধাবী মেধাহীনের পার্থক্য মোটেও করা যায় না। না পড়েও কি করে এতো ভাল ফলাফল করেছে সেই ঘোর অনেকেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না। পর্যায়ক্রমিক এই ধরনের পরীক্ষা বিপর্যয়ের শিকার হয়ে এদেশের বর্তমান ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবক উভয়েই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জ্ঞান বিবর্জিত সার্টিফিকেটধারী এ সমাজে যতই বাড়ুক না কেন, এতে কারো কোন লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না; জাতির লাভের তো প্রশ্নই উঠে না। বিবেকের দহনে দগ্ধ হয়ে আজকের ভাল ফলাফল করা ছেলেমেয়েদেরও দেখা যাচ্ছে হতাশার অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ হলে আমরা সবায় ত্রাণ নিয়ে দূর্গত এলাকায় যাই, এ দেশের ছাত্রছাত্রীদের এই মহা বিপর্যয়ে আমাদের কি করা উচিৎ? শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের অজ্ঞাত ভূতপেত গুলোকেই বা কি করে তাড়ানো যায়? – নয়তো এ জাতির ঘাড় মেরুদণ্ড একদিন তারা ঠিকই ভেঙে দেবে।

মৌলিক শিক্ষা বিষয়ক বিষয়বস্তু নিয়ে প্রতিনিয়ত অনেক লেখালেখিই হয় হচ্ছে, প্রকাশিতও হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে এই সবের প্রতি সাধারণ মানুষজনের আগ্রহ একেবারে নেই বললেই চলে। বাহ্যিক চাকচিক্যে ভরপুর চটুল বিষয় সাধারণের কাছে যতটা আকর্ষিত হয় ব্যাপকতা পায়, মৌলিক বিষয়বস্তু সম্পর্কিত লেখাগুলো ততোটাই অবহেলিত হয়। মৌলিক লেখা অবহেলিত হওয়ার পিছনে যুক্তিযুক্ত অনেক কারণও আছে। প্রথমত এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার যা তা অবস্থা। সরকারের কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত সবখানেই এক জটিল পরিস্থিতি। তোষামোদি তেলামী দিয়ে আর যাই হউক শিক্ষায় উন্নতি হয় না।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ঠ মানুষজন প্রত্যেকে যেন এক একটা উদ্ভট প্রাণী হয়ে গেছে! বোধ-বুদ্ধি-বিবেচনা কিছুই যেন তাদের নেই। হবেইনা বা কেন? যে দেশে স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী অবলিলায় মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারে, সত্যবাদী স্পষ্টবাদীকে হুমকি ধমকি দিয়ে মুখ বদ্ধ করাতে চায়; সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তো মুখ থুবড়ে পরবেই! যে দেশের শিক্ষা মন্ত্রনালয় ১০০% পাশ ছাত্রছাত্রী দেখার চিন্তায় বিভোর হয়ে তৃপ্তির ডেকুর তুলতে চায়; সে দেশে এমন তো হবেই! বেতনের জন্য যে দেশের শিক্ষকদের আন্দোলনে যেতে হয়; সেদেশে এমন শিক্ষিত তো প্রতিনিয়ত জন্ম নিতেই থাকবে! জ্ঞানীর চাইতে অজ্ঞানীর দাম্ভিকতা প্রকোপ রুপ ধারণ করবেই! নয়তো অমর বাণী যে মিথ্যা হয়ে যাবে! – ”তোমরা যখন সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ থেকে বিরত থাকবে, তখন মুর্খরা তোমাদের ঘাড়ে চেপে বসবে।” – এরাই প্রকৃত সত্যভূত!

লেখাটি যখন লেখছি তখন এদেশের সুন্নি আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। সংবাদটি শোনা মাত্রই চমকে উঠলাম। এদেশের তথাকথিত আলেম সমাজ এ কোন নিঃসংশ নিষ্টুর খেলায় মেতেছে? মত ও পথের অমিল হলেই একজনকে এ পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে? এই নিঃসংশ হত্যাকান্ডের গৃণা জানানোর ভাষা আমি হারিয়ে ফেলেছি। এদেশের ইসলামের বর্তমান এই নাজুক পরিস্থিতিতে শত ভ্রান্ত মতবাদের ভিড়ে প্রকৃত সত্য সন্ধানী উপস্থাপক হিসেবে ইতোমধ্যে মাওলানা ফারুকী বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। ভ্রান্তমতবালম্বীরা কখনো সত্যের মুখামুখি হতে চায় না, সত্যকে তারা ভয় পায়। তাই রাতের অন্ধকারে সত্যিকার ফারুকীদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়। 

ন্যায়ের ধর্ম সত্যের ধর্ম ইসলাম কখনো কোন মানুষ হত্যাকে সমর্থন করে না; হউক সে ভিন জাতি বা ধর্মের। যারা নতুন মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য এই সব নিষ্টুর নিকৃষ্ট কাজগুলো করছে, তারা কখনো মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের উম্মত হতে পারে না। "হে মহান রাব্বুল আ’লামিন! তুমি বেবুঝদের বুঝ দান করো। মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে উত্তম প্রতিদান দান করো।”

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
২৬ আগস্ট, ২০১৪.

বুধবার, ২৪ জুন, ২০২০

আক্রান্ত কোটি পার হতে যাচ্ছে!

ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারের লকডাউন গতকাল মঙ্গলবার চৌদ্দদিন পূর্ণ হলো, তা আরও সাত দিন বাড়িয়ে ২১ দিন করা হয়েছে; মানে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত ঘোষণা বহাল থাকবে। কিন্তু কাজের কাজ কি এবং কতটা হয়েছে বা হচ্ছে? গত ২৩ দিন আগে ১ জুন সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক সভায় করোনাভাইরাস পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকাকে লাল, হলুদ, সবুজ জোনে ভাগ করা হয়েছিল বলে জেনেছিলাম; 'অন্যরকম' এলাকা ভিত্তিক লকডাউন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতায় কি দেখা গেল? ঢাকার আর কোথাও লকডাউন নেই!

অবশ্য ঢাকার বাইরে ১৮টি জেলায় ছোট ছোট দেড় শ'রও বেশি এলাকা রেডজোন করে লকডাউন চলছে, ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে; যদিও লকডাউন সেই আগের মতোই ঢিলেঢালাভাবেই পালিত হচ্ছে! অথচ সংক্রমণ অনেক বেশি থাকার পরও ঢাকায় লকডাউন নিয়ে হেলাফেলা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় কারিগরি দল প্রাথমিকভাবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীন মোট ৪৫টি এলাকাকে রেডজোন হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ কার্যকরী লকডাউনের ঘোষণা দিবে বলেছিল। কিন্তু বাস্তবতায় কিছুই করা হয়নি হচ্ছে না। সব কিছু কেমন যেন সেই আগের মতোই লেজেগোবরে অবস্থায় উপনীত হচ্ছে।

এদিকে দেশে হুহু করে বাড়ছে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা; গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ৩৭ জন, এ নিয়ে মোট ১ হাজার ৫৮২ জনের মৃত্যু হলো। একই সময়ে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে আরও ৩ হাজার ৪৬২ জনের দেহে; ফলে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ জনে। দেশে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে ৮৪ হাজার হয়েছে, তার সাথে পাল্লা দিয়েই হয়তো বাড়ছে কোভিড-১৯-তে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা! পত্রপত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী মনে হচ্ছে না কোন কোটিপতি এই করোনার কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছেন বা পাবেন। দেশের সার্বিক করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে হয়তো কেউ-ই আর রক্ষা পাবেন না। 

কোভিড-১৯ ভয়ঙ্কর থাবা সারা বিশ্বকে তচনচ করে দিয়েছে এবং মেসাকার চালিয়েই যাচ্ছে বিগত ছয়মাস ধরে; বিশ্বের এমন কোন দেশ নেই এমন কোন জায়গা নেই যেখানে এই মরণ ভাইরাস মানুষকে সংক্রমিত করেনি। দিনদিন সংক্রমিতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে যে ভাবে বাড়ছে, তাতে আগামীতে এদেশে আমরা কেউ সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাবো কিনা জানিনা। এমনভাবে চলতে থাকলে এ সন্দেহ হয়তো বাস্তব রূপ নিতে খুব একটা বেশি সময় নেবে না! আমেরিকা, রাশিয়া, জার্মানি, জাপান, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন প্রথম বিশ্বের প্রথম সারির সব দেশগুলোই এই মহামারির কাছে অসহায়, বলা যায় কুপোকাত; এবং তা প্রমাণিত। 

সারা পৃথিবীতে এরই মধ্যে (২৩ জুন পর্যন্ত) এই মরণ ভাইরাস ৯৩.৫৯ লক্ষ মানুষকে সংক্রমিত করেছে এবং ৪.৭৯ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে। এখনো সংক্রমণের উর্ধগতি চলমান; এখনো প্রায় প্রতিদিন বিশ্বে দেরলাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। ২৪ জুন ২০২০ ওয়ার্ল্ডোমিটারের সকালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারাবিশ্বে কোভিড-১৯ পজিটিভ মানুষের সংখ্যা ৯৩.৫৯ লক্ষ পেরিয়েছে; নতুন করে আর ৬.৪১ লক্ষ যোগ হলেই সংখ্যাটি পৌঁছে যাবে ১ কোটিতে৷ খেয়াল করেছিলাম ১৫ থেকে ২০ জুন— ওই পাঁচ দিনের মধ্যে ৯ লক্ষ নতুন সংক্রমণের খবর এসেছিল; এই গতিতে সংক্রমণ চলতে থাকলে আগামী ২৬ বা ২৭ জুনের মধ্যেই বিশ্বে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াবে ১ কোটি।

আজকের হিসাব অনুযায়ী চীন, কাতার, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বাংলাদেশ ১৭ তম স্থান দখল করে নিয়েছে! বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমিতের সংখ্যা ১,১৯,১৮৯ এবং মৃতের সংখ্যা ১,৫৪৫। এ পর্যন্ত সারাবিশ্বে সংক্রমিত হয়েছে ২১৫টি দেশ এবং এর মধ্যে ১৮৫ টি দেশে কোভিড-১৯তে মৃত্যু হয়েছে; তার মধ্যে ইউরোপ মহাদেশে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেখানে প্রায় ১.৯০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে৷ ভুটান, ভিয়েতনামস উগান্ডা, মঙ্গোলিয়া, নামিবিয়া, লাওস, ফিজি, ম্যাকাও-সহ ২৭ টি দেশে আক্রান্ত ব্যক্তি থাকলেও আক্রান্ত হয়ে একজনেরও মৃত্যু খবর ওয়ার্ল্ডোমিটারে উঠেনি।

সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কোভিড-১৯ টেস্ট হয়েছে আমেরিকায়; সেখানকার ৩৩ কোটির উপর জনগণের মধ্যে টেস্ট করেছে ২.৯৫ কোটির উপরে। ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের জনগণ সারে ১৬ কোটির মধ্যে অদ্যাবধি টেস্ট হয়েছে ৬.৪৭ লক্ষ। সারা বিশ্বে কোভিড-১৯তে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার— ৬০ (প্রতি ১০ লক্ষ); ভারতে— ১০, বাংলাশে— ৯, এবং পাকিস্তানে— ১৬ ৷

ওয়ার্ল্ডোমিটারের কোভিট-১৯-র সার্বিক চিত্র পর্যালোচনায় একটি কথা আজ স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠছে— এশিয়ায় সংক্রমিতের সংখ্যা এখন তুলনামূলক বাড়ছে; বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে। সে সাথে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। বিগত কয়মাস ধরে চতুর্দিকে শুধু মন খারাপ হওয়ার মতো সংবাদই পেলাম এবং পাচ্ছি। আশেপাশের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন, কেউ কেউ আবার মৃত্যুবরণও করেছেন। কোভিড-১৯ উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করা মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়, বরং টেস্টে ধরা পড়া আক্রান্তের মৃত্যুর সংখ্যার বেশ কয়েকগুণ বেশি। সংক্রমণের উর্ধগতি থাকা অবস্থায় 'সীমিত পরিসর' নামের গোল্লাছুট টাইপ দায়সারা লকডাউন দিয়ে সারাদেশে কোভিড-১৯-র বরং বিস্তার ঘটানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের ব্রিফিং থেকে জানা যায়, পোনে দুই লক্ষ থেকে দুই লক্ষ মানুষ প্রায় প্রতিদিন ফোন করছেন তাদের কাছে! নিশ্চয় অসুবিধায় না পড়ে কেউ ওসব ফোন দেননি বা করেননি? যদি টেস্ট আরো বেশি করা তা হলে হয়তো বুঝা যেতো দেশের প্রকৃত অবস্থা আসলে কি?  হয়তো আরও অনেক অনেক বেশি আক্রান্তের খবর জানা যেতো; সাবধান হওয়া যেতো। 

যেহেতু সীমাবদ্ধতার দেয়াল অনেক উঁচু এবং অনেক বেশি তাই আভ্যন্তরীণ কোন বিষয়ই আমরা জানতে পারছি না; তাই বুঝাও যাচ্ছে না কোনকিছু। পথেঘাটে সবায় আমরা একসাথে চলছি কাজ করছি, বুঝতেও পারছি না কে আক্রান্ত আর কে আক্রান্ত নয়। প্রয়োজন/অপ্রয়োজনে আমাদের প্রত্যেককেই কমবেশি ঘরের বাইরে বের হতে হয় হচ্ছে। কিন্তু মনে সব সময় অযাচিত এক ভয় ও শঙ্কা কাজ করছে; না জানি কখন কে কোথা থেকে আক্রান্ত হই? কখন কে কোথা থেকে আক্রান্ত হয়ে ঘরে এই মরণ ভাইরাসকে নিয়ে আসবো তা কেউ জানি না। 

এরই মাঝে বিবিসি গতকাল একটি ভয়ঙ্কর ভীতিকর সংবাদ প্রচার করেছে— ল্যাবরেটরি এবং টেস্টিং কিটের ঘাটতি দেখা দেয়ায় নাকি করোনাভাইরাস পরীক্ষা সংকটের মুখে পড়েছে বাংলাদেশে। নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষার সাথে জড়িতদের অনেকে নাকি জানিয়েছেন, এখন নমুনা সংগ্রহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে এবং একেবারে প্রয়োজন ছাড়া পরীক্ষা করা হচ্ছে না! দেশে সংক্রমণের এই উচ্চহারের মুখে ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষার টার্গেটের কথা বলা হলেও এখন তা সীমাবদ্ধ থাকছে ১৬ বা ১৭ হাজারের মধ্যে! স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, কিট নয়, ল্যবরেটরির অভাবে পরীক্ষার ক্ষেত্রে জট লেগে যাচ্ছে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমন গা-ছাড়া দায়সারা কথাবার্তা আমরা লক্ষ্য করে আসছি সেই প্রথম থেকেই; রেড জোন, ইয়েলো জোন, গ্রীন জোন আরও কত কি করলো, কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না কোনটাই! আর কত মরলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সজাগ হবে? দেশের সব মানুষ আক্রান্ত হলে কি?? আমরা সাধারণ জনগণ, এসব বগিজগি বুঝি কম। আমরা বেশি বেশি টেস্ট করাতে চাই, নিশ্চিত হতে চাই; কিন্তু কিছুতেই নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। 

আবার কি আমরা আমাদের সেই আগের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবো? কবে হবে এ'সব দুশ্চিন্তার অবসান? কবে আসবে সেই সুদিন??  

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
২৪ জুন, ২০২০.

সোমবার, ২২ জুন, ২০২০

মৃত্যুকে ভয় নয়, জয় করুন:

তিলোত্তমা ঢাকা এখন প্রায় পুরোপুরি একটি মৃত্যুপুরী; চতুর্দিকে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীতে সয়লাব। তাই করোনায় আক্রান্তের ভয় আমাদের প্রত্যেককেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে; যে কেউ যে কোন মূহুর্তে নিজের অজান্তেই হয়তো আক্রান্ত হয়ে যেতে পারি! এতে ভাবনার কিছু নেই। আক্রান্ত হলেই যে মরে যাবো- এমনতো নয়? বিশ্বাস রাখুন— মৃত্যু তখনই হবে যখন উপরওয়ালার হুকুম হবে; এক সেকেন্ড আগেও নয় এক সেকেন্ড পারেও নয়। বরং আমি বলি কি— করোনা নিয়ে উদগ্রীব উৎকন্ঠিত বা আতংকিত না হয়ে বরং নিজেকে প্রস্তুত করুন পরকালের জন্য। মৃত্যুকে ভয় নয় জয় করার চেষ্টা ও পরিকল্পনা করুন; বেশি বেশি তওবা ইস্তেগফার করুন এবং নিরাপদে থাকুন, অন্য থেকে নিরাপদ দূরত্বে। 

মৃত্যু আসলে কি? –মৃত্যু হলো জাগতিক জীবনের পরিসমাপ্তি এবং পরবর্তী জীবনের সূচনা, আখিরাতের প্রবেশদ্বার হলো মৃত্যু। অন্যভাবে বললে বলতে হয়, মৃত্যু হচ্ছে জাগতিক দেহ হতে আত্মার পৃথকীকরন। আত্মা আমাদের দেহ ছেড়ে জাগতিক দুনিয়া হতে যখন আখিরাতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে তখন আর আমি আপনি মানুষ নামে বিবেচিত হবো না, হয়ে যাবো 'লাশ'। একজন মুসলিম হিসাবে আমাদের প্রত্যেকেরই স্মরণ রাখা উচিত— মৃত্যু হচ্ছে চলমান জীবন প্রক্রিয়ার একটি পরিবর্তনীয় অবস্থা মাত্র। সকল জীবিত প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে; এবং এটাই চিরন্তন সত্য। 

মালাকুল মউত যখন কোন ব্যক্তির রুহ বা আত্মা শরীর থেকে বের করে নিয়ে যান তখন তার সাথে আরও অন্যান্য অনেক ফেরশতারা থাকেন। মৃত ব্যক্তির জাগতিক জীবনাচারের ওপর ভিত্তি করে তার মৃত্যুর আয়োজন ঠিকঠাক করা হয়। সৎপথে চালিত মু'মিন ব্যক্তির জন্য ফেরেশতারা খুবই দয়ালু হন এবং কোমল আচরন করেন; তার মৃত্যু হয় অপেক্ষাকৃত কম কষ্টদায়ক। অপর দিকে অসত্‍ অবিশ্বাসী মোনাফেক ব্যক্তির প্রতি ফেরেশতারা খুবই কঠোর আচরন করেন; এবং তাদের মৃত্যু হয় অপরিসীম যন্ত্রনাদায়ক। মৃত ব্যক্তির শেষকৃত্য সম্পাদনের পর পরই তার নিকট মুনকার-নকীর নামের নীল চোখ এবং কালো গাত্রবর্ন বিশিষ্ট দু'জন প্রশ্নকারী ফেরেশতা আসেন। তাঁরা মৃত ব্যক্তির ঈমান পরীক্ষার জন্য তাকে প্রশ্ন করে থাকেন। সৎ বিশ্বাসী ব্যক্তি তাদের প্রশ্নের সঠিক উত্তর ঠিকই প্রদান করতে পারবে এবং তারা মৃত্যু পরবর্তী জীবনে শান্তিতে বসবাস করেতে থাকবে। কিন্ত অসৎ অবিশ্বাসী ব্যক্তি প্রশ্নের উত্তর কিছুতেই দিতে পারবে না; ফলে ফেরেশতারা তাদের জন্য কঠিন শাস্তির আয়োজন করবেন। 

মৃত্যুর পরবর্তী এই জীবনের শুরু হতে পুনরুত্থান কালীন সময় পর্যন্তকে বলা হয় 'বরযখ'। বরযখী জীবনটা কিন্তু নেহায়েত ছোট নয়, দুনিয়া তো মাত্র দু'দিনের! আত্মহত্যা, কিংবা হত্যা ইসলামে অত্যন্ত ঘৃনিত এবং নিষিদ্ধ কাজ; কবিরা গুনাহ বা বড় ধরনের অপরাধ হলো আত্মহত্যা। বাঘকে সামনে দেখলে নিশ্চিত আপনি পালাবেন? করোনা থেকে তবে কেন নয়?? বাঘের সামনে পড়ে পালাবার চেষ্টা না করা আত্মহত্যার সামিল। ঠিক করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদে না থাকার গোয়ার্তমি করাও আত্মহত্যার প্রচেষ্টা। তাই, ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। 

চুরি-ছ্যাচড়ামি এখন বন্ধ করুন। অনেক তো করেছেন, আর কত? খারাপ কাজ ছাড়ুন না এখন; তওবার সুযোগ আর না-ওতো পেতে পারেন? তাই, এখনই খাঁটি তওবা করুন। কম খান, বেশি বশি আমল করুন, গরীব দুঃখী মানুষকে সাহায্য করুন; মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে কৃত গুনাহর জন্য মাফ চান, কান্নাকাটি করুন। আজ একটি পবিত্র রজনী— শা'বান মাসের মধ্যরজনী; রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষায়- 'লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান'। নফল এবাদত নিয়ে খামাখা বিতর্ক না করে এই রাতটাকে আসুন না আমরা সবাই কাজে লাগাতে চেষ্টা করি; ঘরে ঘরে আল্লাহ-কে স্মরণ করি। দেখবেন, আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা আমাদের মাফ করে দিয়ে- ঠিকই হেফাজত করবেন।।  

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ 
৯ এপ্রিল, ২০২০.

অসনি সংকেত:

দুনিয়ার এই ক্রান্তিকালে যারা এখনো বেড়ানো নিয়ে মেতে আছেন তারা নিজেরাও হয়তো জানেন না আপনি কত বড় ক্ষতি করছেন বা করতে যাচ্ছেন দেশ ও জাতির, আপনার পরিবার পরিজনের। ছুটি পেয়ে আপনি হয়তো নিশ্চিন্তে এবাড়ি ওবাড়ি করছেন। কোন বাড়ি থেকে যে আপনি মরণব্যাধি করোনা জার্ম নিজ দেহে বহন করে নিয়ে আসবেন, তা বুঝতেই পারবেন না। সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তে ভাইরাসটি আজ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ ছিল পাইয়োনিয়ার করোনা ভিকটিম এরিয়া। সারা দেশে এখন আর আপনি কোন এলাকাকে বাদ দিতে পারবেন না, যে এলাকায় করোনা আক্রান্ত রোগী নেই।

গত সপ্তাহে ফোনে মা'য়ের সাথে আমার  রীতিমতো ঝগড়া হয়ে গেল! রাগ করে পুরো এক সপ্তাহ আমার ফোন ধরেনি, করেওনি! ঘটনা শুনলে হয়তো অপনি মনে করতে পারেন আমি একটা অমানবিক কাজ করেছি। একদিক দিয়ে চিন্তা করলে আমার নিজের কাছেও তাই মনে হয়। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় সঠিক সময়ে সঠিক কাজটিই আমি করেছিলাম বলে মনে হচ্ছে। নয়তো মা'য়ের অনেক বড় কোন ক্ষতি হয়তো হয়ে যেতে পারতো।

আমাদের ছোট খালা (বয়সে আমার অনেক ছোট) নারায়গঞ্জে বসবাস করে। আজ আম্মা আমাকে ফোন করে বললেন আমি যেন তার সাথে একটু যোগাযোগ করি, সে নাকি খুবই অসুস্থ। অথচ গত সপ্তাহে এই খালাকে নিয়েই মা'য়ের সাথে আমার তুমুল ঝগড়া! করোনার ছুটি(!) পেয়ে সে আমাদের আরেক খালার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। আম্মা ফোনে তাকে আমাদের বাড়িতে দাওয়াত করে। বোকা ছোট ভাই মেহমানদারির ব্যবস্থা করছিল! কথাটা শুনেই আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে! যথেষ্ট বয়স হয়েছে আম্মার, তাই তিনি হয়তো বে-বুঝ হয়ে পড়েছেন, ছোট ভাইয়ের তো ন্যুনতম জ্ঞান থাকার দরকার ছিল? এমনিতেই আম্মা একজন জন্মগত হাঁপানি রোগী। প্রতি শীতেই একবার তাঁকে হাসপাতালে নিতে হয়। এই শীতেও নিউমোনিয়া বাধিয়ে বসেছিলেন। ডিসেম্বর জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি তিনমাস রীতিমতো মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছেন। তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আমি ক্লান্ত। 

যে পরিমাণ ঔষধ আর ইঞ্জেকশন আম্মা'কে পুশ করা হয়েছে নতুন করে আবার ইনফ্লুয়েঞ্জা বা করোনাভাইরাস কোনভাবে যদি তার শরীরে ডুকে যায়, কিছুতেই আর চিকিৎসা করানো সম্ভব হবে না; ডাক্তার এ কথা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন। এই কথা ভেবে আম্মা'কে অনুরোধ করি, এমন  অবস্থায় খালাকে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতে নিষেধ করতে। তিনি বলতে পারেন নি, বলতে পারেনি ছোট ভাইও। অগত্যা আমিই ফোন করে তাকে নিষেধ করি। সে ক্ষেপে যায় এবং আমাকে একগাদা হাদিস শোনাতে থাকে! অগত্যা দিয়েছিলাম এক ঠাডা ধমক! আর এতেই আম্মা এক সপ্তাহ আমার সাথে কথা বলেননি।

আমাদের দেশের আথিতেয়তা দুনিয়া জোরা প্রসিদ্ধ। তাই বলে কি এমন সময়ে? চীন ইউরোপ আমেরিকায় মেসাকার চালিয়ে করোনা এখন এশিয়া চষে বেড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশ আগে থেকেই আমাদের হুশিয়ার করে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় পাওয়ার পরও আমরা সে মতো কাজ করতে পারিনি। বরং অবহেলা করেছি, পূর্ব প্রস্তুতি নেইনি বা নিতে পারিনি। দেরিতে হলেও সরকার ঠিকই তা বুঝতে পেরেছে, কিন্তু আমরা কিছুতেই বুঝতে পারিনি পারছি না। ১৯২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লু ভাইরাসের মেসাকার পৃথিবীর অসংখ্য মানুষকে মাটির নীচে পাঠিয়েছিল। ১৯১৮ সালের জানুয়ারী হতে ডিসেম্বর ১৯২০ অবধি এটি ৫০ কোটি মানুষের মাঝে ছড়িয়েছিল; যা সেই সময়ে বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ। আনুমানিক ১.৭ থেকে ৫ কোটি বা কোন কোন হিসাবে ১০ কোটির মত মানুষ এতে মারা গিয়েছিল। যা ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক একটি মহামারী। সেই ইতিহাস এ দেশের মানুষ জানে না বলেই হয়তো-বা এখনো তারা করোনাভাইরাস নিয়ে অতটা উদাসীন।

চীন থেকে শুরু, ইরান ইতালি হয়ে সারা পৃথিবীতে করোনা রীতিমতো মেসাকার চালিয়ে গেছে, যাচ্ছে। থেমে নেই তার করাল গ্রাস! প্রতিটি দেশের মেসাকারের দিকে লক্ষ্য করলে সহজেই বুঝতে পারা যায়, চতুর্থ ধাপে করোনা ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়। আমাদের দেশে এখনো করোনা চতুর্থ ধাপে পদার্পণ করেনি। ইতালিতে আক্রান্তের ইতিহাস লক্ষ্য করলে স্পষ্ট বুঝা যায় প্রথম আক্রান্তের ৪৫ দিন পর সেখানে চতুর্থ ধাপ অর্থাৎ মহামারি শুরু হয়; যা এখনো চলমান। স্পেনে মহামারি রূপ নেয় ৫০ দিন পর, যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫ দিন পর। আজ ১১ এপ্রিল, আমরা প্রথম আক্রান্ত হয়েছি ৮ মার্চ, ৩৩ দিন চলছে আমাদের দেশে করোনা অভিযাত্রার। আস্তে আস্তে প্রতিদিন এখনই যে হারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং সংখ্যা বাড়ছে, সামনের ১৫/১৭ দিন পর দেশের সার্বিক চিত্র কি হবে বা হতে পারে তা ভেবে এক অজানা আশংকায় আমার বুকটা কেপে উঠে।
 
কোনখানে কোন করোনা রোগী আবিষ্কৃত(!) হলে এখনো দেখতে পাচ্ছি- অদ্ভুত মানসিকতার কিছু লোক ছোট ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে ছুটে চলে সেই বাড়িটি দেখতে! প্রশাসনের অদ্ভুত আরেক চিন্তা, যেখানে করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায় সেখনটায়ই শুধু সাথে সাথে লকডাউন করা হয়! এটা কোন ধরনের উদ্ভট পরিকল্পনা তা আমার বুঝে আসে না। যার টেস্ট পজিটিভ হয়, সে তো আগেও সেই এলাকায়ই ছিল, ঘুরেও বেরিয়েছে, নয় কি? ধরা না পড়ার পূর্বে যদি সে অন্য পাঁচটি এলাকায় ভিজিট করে থেকে থাকে, তবে শুধুমাত্র আক্রান্তের বাড়িটি লক করে ফায়দাটা কি?? কে বা কারা এমন মোটা বুদ্ধি নিয়ে এই কাজ করে যাচ্ছেন তা আমি জানি না বুঝিও না! তবে এর ফল যে খারাপের দিকে যাচ্ছে তা খুব ভালো করেই টের পাওয়া যাচ্ছে। কেন জানি করোনা নিয়ে পুরো পরিকল্পনাটাই আমার কাছে কেমন ভুল ঠেকছে! এই ভুলের মাশুল না জানি জাতিকে চরমভাবে গুনতে হয়।
 
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অনুগ্রহপূর্বক এই মূহুর্তে এলাকাভিত্তিক লকডাউন না দিয়ে দেশে কারফিউ জারির আদেশ দিন। নয়তো কিছুতেই এই উন্নাসিক জাতিকে ঘরে পাঠানো সম্ভব হবে না, নিরাপদ দূরত্বেও রাখতে পারবেন না। কারণ আমরা শিক্ষিত হয়েছি সত্য, কিন্তু মানুষ হতে পারিনি।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
১১ এপ্রিল, ২০২০.

কোভিড-১৯ সংক্রমণ কি নিয়ন্ত্রণে?

করোনা আতঙ্কে বিশ্ব এখন স্থবির। এক প্রকার অবরুদ্ধ হয়ে আছে প্রায় সারা দুনিয়ার জনগণ। এই ভাইরাস নিয়ে কত কি আলোচনা, কত কি গবেষণা! একেকবার একেক রকম তথ্য আসছে আমাদের কাছে। এখন পর্যন্ত সারা দুনিয়ায় প্রাণ হারিয়েছে ১,০৮,৭৭০ জন এবং আক্রান্ত হয়েছে ১৭,৭৯,০৯৯ জন। ক্ষণে ক্ষণে বেড়েই চলেছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। 

কয়েকদিন আগে বলা হয়েছিল কৃত্রিমভাবে এ ভাইরাস তৈরি করা হয়েছে! তবে সেই গবেষণাকে ভুল দাবি করে নতুন আরেকটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে; যা করেছেন আমেরিকার স্ক্রিপস রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা। আর এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকার নেচার মেডিসিন পত্রিকায়। ওখানে নোভেল করোনা ভাইরাস সার্স-কো ভি-২ বা কোভিড-১৯ ও তার সম্পর্কীত সকল ভাইরাসগুলোর জিনের গঠন সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নোভেল করোনা ভাইরাস কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে বলে যে দাবি করেছিল কেউ কেউ, এ গবেষণায় তার কোনো প্রমাণ মেলেনি।

গবেষণাপত্রটির অন্যতম লেখক স্ক্রিপস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসেন বলেন, পরিচিত করোনা ভাইরাসের স্ট্রেইনগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি— সার্স-কো ভি-২ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে। গবেষকদের বক্তব্য, চীনা কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুত এ মহামারি শনাক্ত করেছেন। একজনের থেকে অন্যজনের শরীরে সংক্রমণের জেরেই কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটে। হাতে আসা এ সব তথ্য বিশ্লেষণ করেই সার্স-কো ভি-২ ভাইরাসের উৎপত্তি কীভাবে, তা জানতে পেরেছেন গবেষকদের এ দলটি। বিজ্ঞানীদের দাবি, স্বাভাবিক বিবর্তনের ফলেই এগুলো তৈরি হয়েছে; কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়নি।

চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস ক্রমেই মহামারি রূপ নিয়েছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ‌্যা। আক্রান্ত হতে বাদ নেই ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার কোন অঞ্চল। মূলত বিমানযাত্রীদের মাধ‌্যমে ছড়িয়েছে এই ভাইরাস। আতঙ্ক ছড়িয়েছে সারা বিশ্বে, সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত। ইজরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সন্দেহ করেছিল, রহস্যময় ‘নোভেল করোনা ভাইরাস’ চাষ হয়েছে  চীনের গোপন সামরিক গবেষণাগারে; মার্কিন পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট মোসাদের এ দাবিকে সমর্থনও করেছিল। শেষ পর্যন্ত নয়া গবেষণার ফল প্রকাশ্যে আসায় ফলে এসব গুজব-গজবসহ সকল জল্পনা-কল্পনা ও বিতর্কের আপাতত অবসান হলো। 

ভাইরাস সম্পর্কে আমার অভিমত— ভাইরাস হলো একপ্রকার অতিক্ষুদ্র জৈব কণা বা অনুজীব; যারা জীবিত কোষের ভিতরেই শুধুমাত্র বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এরা অতি-আণুবীক্ষণিক এবং অকোষীয়; ভাইরাস আসলে জীব হিসেবে বিবেচিত হবে কিনা, এ নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বিমত আছে। ভাইরাস মানুষ, পশু-পাখি ও উদ্ভিদের বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী। এমনকি, কিছু ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়ার মধ্যেও বংশবৃদ্ধি করে। ভাইরাস সাধারণত নিন্ম তাপমাত্রায় সারভাইভ করতে পারে। আমার ধারণা, এ জন্যই হয়তো দক্ষিণ এশিয়া ও অত্রদাঅঞ্চলে বর্তমান বিশ্বে ত্রাস সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাসের বিস্তার তুলনামূলকভাবে কম হবে, শীতপ্রধান দেশে যা ত্রাস সৃষ্টি করেছে; তা ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। এক সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১৪দিন বলতো; কিছু কিছু গবেষক বলতেন— এর স্থায়িত্ব ২৪দিন পর্যন্ত  হতে পারে; তা-ও ভুল। 

মানুষের মধ্যে যখন এই ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেয় তখন অনেক বেশি মানুষকে এ ভাইরাসে সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। করোনাভাইরাস নিয়ে প্রতিনিয়ত পত্রপত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে এবং পড়ছে। স্বাস্থ্য উপদেশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সরকারের পরিকল্পনা নিয়েও বিভ্রান্তিকর সব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। শুধুমাত্র ভাইরাল হওয়ার উদ্দেশ্যে একেকজন একেক রকম গল্প বানাচ্ছে এবং তা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করছে। এসব বিষয়ে বিভ্রান্ত হওয়া মোটেও ঠিক হবে না।   

যেহেতু করোনাভাইরাসের বিস্তার মানুষ বা অন্য কোন প্রাণী অর্থাৎ জীবন্ত বাহকের মাধ্যমে ঘটে। তাই এই বাহক থেকে বা যে বহন করছে তার থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করাটাই হলো নিজেকে সুস্থ রাখার মূলমন্ত্র। আপনি আমি কেউ-ই জানি না কে এই ভাইরাসের বাহক বা কে বহন করছে, তাই এই মূহুর্তে হোম কোয়ারানটাইনে থাকাটাই একমাত্র প্রতিষেধক। কিন্তু একজন মানুষ কতদিন আর ঘরে আবদ্ধ থাকতে পারে?

এই মুহূর্তে বিশ্বে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র এবং মৃত্যুতেও। এর পরই আছে ইউরোপের দেশ স্পেন, ইতালি ও জার্মানি। সংক্রমণের দিক দিয়ে শীর্ষে থাকলেও ইউরোপের অন্য দুই দেশের তুলনায় জার্মানিতে করোনায় প্রাণহানির সংখ্যা একেবারেই তলানিতে। কীভাবে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে প্রাণহানিতে লাগাম টানতে সক্ষম হলো জার্মানি?

ইউরোপের একাধিক দেশে করোনাভাইরাসের ভয়ঙ্কর থাবা অব্যাহত থাকলেও জার্মানিতে সংক্রমণ কমে আসছে। জার্মানিতে আজ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ১,২৫,৪৫২ এবং মৃতের সংখ্যা মাত্র ২,৮৭১। মৃতের সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ার কারণ হলো ওখানে গণহারে পরীক্ষা করা হচ্ছে। অন্যরা যখন লক্ষণ রয়েছে এমন লোকজনের পরীক্ষা করছে, তখন জার্মানিতে ব্যাপক পরিসরে তাদের করোনার পরীক্ষা চলছে।

বিশ্বে করোনা সংক্রমণের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় জার্মানির অবস্থান চতুর্থ। তারপরও দেশটিতে প্রাণহানির সংখ্যা এতো কম। দেশটির স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য অনেক দেশে পরীক্ষা না করানোর কারণে দ্রুত বিস্তার ঘটছে; যেটি জার্মানিতে হচ্ছে না। জার্মানিতে এখন পর্যন্ত ৯ লাখ ১৮ হাজার ৪৬০ জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে। যেখানে ইতালিতে এই সংখ্যা সাড়ে ছয় লাখের কিছু বেশি মাত্র; এছাড়া স্পেনে পরীক্ষা করা হয়েছে ৩ লাখ ৫৫ হাজার মাত্র। 

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী  আমাদের দেশে প্রতিদিনই করোনা সিম্পটমে অনেক রোগী মারা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তিও আছেন অনেকে। আবার ভর্তি থাকা অবস্থাতেই কেউ কেউ মারা যাচ্ছেন।  তাছাড়াও বাড়িতেও অনেকে মারা যাচ্ছেন। তথ্য গোপন করে তাদেরকে স্বাভাবিক নিয়মে দাফনও করা হচ্ছে বা খবর পেলে প্রশাসন দাফন করছে। এসব রোগীদের কি করোনা টেস্ট করা হচ্ছে?

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও ব্যাপকতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের দেশগুলোকে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে:—
 স্তর-১: নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো থেকে আগতদের মধ্যে কারও নমুনায় করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়া।
 স্তর-২: বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বা নির্দিষ্ট কোনো এলাকাতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া।
 স্তর-৩: নির্দিষ্ট এলাকা থেকে বৃহত্তর এলাকায় সামাজিক সংক্রমণ।
 স্তর-৪: মহামারী।

৮ মার্চ বাংলাদেশ প্রথম ঘোষণা করে, দেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তি আছে। ওই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সংক্রমণ পরিস্থিতির দ্বিতীয় স্তরে পৌঁছে। তখনকার সংক্রমিত ব্যক্তিরা ছিলেন বিদেশফেরত। ওই বিদেশফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে বেশ কিছু মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে এমন বলতে থাকে তখন আইইডিসিআর। কিন্তু রাজধানীর টোলারবাগের একটি সংক্রমণের ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, সংক্রমিত ব্যক্তির বিদেশ ভ্রমণ বা বিদেশফেরত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার কোন ইতিহাস তাঁর ছিল না। তখন থেকেই প্রশ্ন উঠে, সংক্রমণ কি তাহলে সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে?

এরই মধ্যে গত ৫ এপ্রিল সংক্রমণ তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করেছে বলে বক্তব্য দিয়েছেন আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা। তিনি বলেন— রাজধানীর টোলারবাগ ও বাসাবো, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর ও গাইবান্ধা, এই পাঁচটি এলাকায় গুচ্ছ আকারে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া জামালপুর, চট্টগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, কক্সবাজার, গাজীপুর, মৌলভীবাজার, নরসিংদী, রংপুর, শরীয়তপুর ও সিলেটেও সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে। এ থেকে অনেকেই মনে করেন, সংক্রমণ এখন ব্যপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সারা দেশে কত মানুষ আক্রান্ত, তার সঠিক হিসাব এখন কারো জানা নাই। কারণ, নমুনা পরীক্ষার পরিধি ও সংখ্যা এখনো খুবই কম।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম বলেন, সংক্রমণের যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে একে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বলতে আর বাধা নেই। তবে মীরজাদী সেব্রিনা বলেছেন, সংক্রমণ পরিস্থিতি চতুর্থ স্তরে কি না, তা কোভিড-১৯ বিষয়ক কারিগরি কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে আমাদের দেশের করোনাভাইরাস আক্রান্তের হিসাব-নিকাশ অনেকটা  মীরজাদী-র মিরাকলের ওপরই নির্ভরশীল।

৩ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি ঘোষণা দিয়েছিল— ইউরোপ-আমেরিকার পর নতুন মৃত্যুপুরী হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া। তারা তখন বলেছিলেন— প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে বিশ্বজুড়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। প্রাণহানিও অর্ধলক্ষ ছাড়িয়েছে। যাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার ইউরোপের দেশগুলো ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইউরোপ ও আমেরিকার পর দক্ষিণ এশিয়া নতুন মৃত্যুপুরী হতে যাচ্ছে। এ ঘোষণা আমরা কতটা আমলে নিয়েছি?

অনেকের মতো আমার মনেও এই মূহুর্তে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে— করোনাভাইরাস সংক্রমণের চেয়ে টেস্টে কি বাংলাদেশ পিছিয়ে? দেশে এখনো কেন রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা এতো কম হচ্ছে??

আজকের 'যুগান্তর'-এর একটি খবরের মূল শিরোনাম— করোনা উপসর্গ নিয়ে ১৭ জনের মৃত্যু। দেশের ১৪ জেলায় করোনা উপসর্গ নিয়ে ১৭ জন মারা গেছেন। এদের মধ্যে ফরিদপুরের মধুখালীতে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা এক ব্যক্তির সাহায্যে কেউ এগিয়ে না আসায় তার মৃত্যু হয়েছে। লাশ দাফনে বাধা দেয়া হয়েছে মানিকগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে হাসপাতালের সামনেই মারা গেল এক রোগী।
এছাড়া কুষ্টিয়া সদর ও দৌলতপুরে দু’জন, খুলনায় শিশু, ফেনীর পরশুরামে মাদ্রাসা ছাত্র, বরগুনার বামনায় একজন, ঢাকার ধামারাইয়ে দু’জন, নওগাঁর পত্নীতলায় নারী, লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে এক ব্যক্তি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নারী ও বৃদ্ধা, ভোলায় এক ব্যক্তি, গাজীপুরের শ্রীপুরে শ্রমিক ও নরায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এক বৃদ্ধা মারা গেছেন। 

সপ্তাহ ধরে লক্ষ্য করেছি প্রতিদিনের প্রতিটি  সংবাদপত্রে এমন মৃত্যুর সংবাদ থাকছেই; যারা করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করছেন। ওদের টেস্ট করা কি জরুরি নয়? সত্য সত্যই যদি তারা করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে মারা যেয়ে থাকেন, তবে যে কমিউনিটিতে তারা বসবাস করেছেন ওখানে নিশ্চয় অনেককেই সংক্রমিত? এমন কেইস গুলো যদি এখনই ভালো করে খতিয়ে দেখা না হয় তবে নিশ্চিত মৃত্যুর ঘনঘটা অতি সন্নিকটে। আর, শাক দিয়ে কখনো মাছ ঢাকা যান না, মহামারিও কখনো লুকানো যাবে না। তাই সময় থাকতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করুন; নয়তো মহাবিপদ।

রাতে লেখাটি যখন শুরু করি ঠিক সেই মূহুর্তে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি মাজেদের ফাঁসি কার্যকর হলো। আনন্দে বুকটা ভরে গেল। লাখ শুকরিয়া মহান রাব্বুল আ'লামীনের দরবারে। এমন করে সকল মিথ্যা ও পাপচার যেন আমাদের সমাজ থেকে একে একে দূর হয়। সকল অন্যায়ের যেন বিচার হয় এবং রায় কার্যকর হয়। 
হে রাব্বুল আ'লামীন! হে রাহমানুর রাহীম!! দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী, চক্রান্তকারী এবং সকল চোর চোট্টাদের এ থেকে তুমি সঠিক শিক্ষা দাও। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে আমাদের হেফাজত করো এবং সকল বালা মসিবত থেকে দেশটাকে রক্ষা করো।।   

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
১২ এপ্রিল, ২০২০.

করোনাভাইরাস ম্যানমেইড, না কি অতি প্রাকৃতিক?

বর্তমান দুনিয়া করোনাভাইরাস আতঙ্কে মুহ্যমান। ভাইরাসকে আমরা চিনি; তারা হলো এক প্রকার অতিক্ষুদ্র জৈব কণা বা অনুজীব। যারা জীবিত কোষের ভিতরেই বংশবৃদ্ধি করে থাকে। কিন্তু করোনা নামের এই ভাইরাস মুহ্যমান এক আতঙ্কের নাম। সারা বিশ্ব আজ এ নামে শঙ্কিত। এ নিয়ে জল্পনাকল্পনার শেষ নেই। কেউ বলছেন এটা মানুষের তৈরি পারমাণবিক অস্র, আবার কেউবা বলছেন প্রাকৃতিক দূর্যোগ, আবার কেউবা বলছেন আল্লাহর গজব। কিন্তু, কেউই এখনো পর্যন্ত  নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছে না এটা আসলে কি? তবে সে ঠিকই একাধারে মানুষ মেরে সাফ করে যাচ্ছে!

যুগে যুগে পৃথিবীতে বেশ কিছু অনুজীব আবিষ্কৃত হয়েছে, যার সবগুলোই ভাইরাস হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। যেগুলো মানুষকে প্রচণ্ড রকমের ক্ষতি করে গেছে যাচ্ছে। এসব ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মহামারী দেখা দেয় দিয়েছিল। এসব প্রাণঘাতী ভাইরাসের মধ্যে রয়েছে জিকা ভাইরাস, ইবোলা, হলুদ জ্বর, কুষ্ঠরোগ, কালাজ্বর, বসন্ত, কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ম্যালেরিয়া, প্লেগ, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, হাম ইত্যাদি ইত্যাদি; কোভিড-১৯-ও তেমনই একটি ভাইরাস। যে ভাইরাসটি বর্তমান দুনিয়ায় ত্রাস সৃষ্টিকারী  মহামারি।  

জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস অ্যাঢানম গেব্রেইসাস এ রোগটির নাম দিয়েছেন কোভিড-১৯;  যা 'করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯'-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এ ভাইরাসটি এখন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। গত প্রায় পাঁচ মাসে বিশ লাখেরও বেশি মানুষ এতে নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত হয়েছে, আর মারা গেছে এক লাখ ২৭ হাজারেরও বেশি। কিন্তু এর বাইরেও একটা হিসাব আছে এবং সেই হিসাবটা বেশ বড়!

কোন কোন গবেষণায় দেখা গেছে, এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পরও সামান্য কিছু উপসর্গ দেখা দেয় বা রোগীর শরীরে কোন লক্ষণই দেখা যায় না- এরকম মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ। করোনাভাইরাস সংক্রমণে সমগ্র বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর; গত সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।

করোনাভাইরাস মহামারিতে রূপ নিয়ে বিশ্ব মানবতাকে বিপন্ন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ভাইরাসটি এতো  ভয়ানক যে, ক্ষণে ক্ষণে সে তার রূপ পাল্টাচ্ছে! এ'টি আসলে কি? ইসলামের দৃষ্টিতে— মানুষ যখন আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত হয় তখন তাদের সরল সঠিক পথের সন্ধান দিতে এ ধরনের মহামারী দেখা দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘জহারাল ফাসাদু ফিল বাররি ওয়াল বাহরি বিমা কাসাবাত আইদিন্নাসি লিইউযীকাহুম বা-দাল্লাযী আমিলুলা আল্লাহুম ইয়ারজি'ঊন।’ অর্থাৎ—‘মানুষের কৃতকর্মের ফলে স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে; আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে। —(সূরা রূম : ৪১)।

বিগত দশক সারা বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা কি দেখতে পাই? জনগণ সব মিথ্যুক-ভণ্ড-ব্যভিচারী, শাসকরা সব দাম্ভিক-স্বৈরাচার-অত্যাচারী। সারা দুনিয়া আজ আধুনিকতার নামে অশ্লীলতা নগ্নতার জোয়ারে ভাসছে! সারে চৌদ্দশ বছর আগে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যখন কোনো সম্প্রদায়ের মাঝে অশ্লীলতার প্রসার ঘটে তখন তাদের মাঝে মহামারি এবং এমন দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যার নমুনা তারা পূর্বপুরুষদের মাঝে দেখেনি। —(ইবনে মাজাহ: ৪০১৯)। পৃথিবীর এমন একটি দেশ এখন কেউ কি খুঁজে পাবেন, যেখানে অশ্লীলতার বিস্তার ঘটেনি?

আমরা তো মুসলমান? নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, হজ্জ করি, যাকাত দেই, তবে কেন করোনা আসবে? গভীর ভাবে আত্মবিশ্লেষণ করে বলেন দেখি আমরা মোটেও মুসলমানের কাতারে পড়ি কি না? না না আমরা তো হারাম-হালাল বেছে চলি, মদ খাই না। আমরা যা ভক্ষণ করছি, তা কি সম্পূর্ণ হালাল? জেনেশুনে তো হারাম খাই না। ডাইরেক্ট ইনডাইরেক্ট সুদ খাচ্ছি। সুদ তো মদের চেয়েও জঘন্য। নামাজও পড়ি, আবার সুদও খাই! ঘুষও খাই অপাটে, আবার বছর বছর হজ্জও করি! একটু বয়স হতেই হেঁটে মসজিদে গিয়ে চেয়ারম্যান সাজি!

নামের আগে বড় বড় টাইটেল লাগিয়ে ওয়াজ করছি, আর হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলছি 'ইলিটারেট'! যার কল্যাণে মিষ্টি খাই, তাঁকেই চিনলাম না! আবু লাহাবের দুই হাত ধ্বংস করলেন কে? কেন?? পড়ি সবই, কিন্তু বুঝি না কিছুই! আবার ওয়াজের মঞ্চে বসে বড় বড় বয়ান দেই; এক বান্ডিল টাকার জন্য। লোকজনের হেদায়েতের জন্য বলেন তো দেখি কোন কাজটা করছি আমরা?

আবার আরেকজন মসজিদে ইমাম সাজি। মদখোর ঘুষখোরের তাবেদারী করি উঠতে বসতে! চাকুরির ভয়? ফজরের পর জপ করি— ইয়া রাজ্জাকু, ইয়া রাজ্জাকু; রিজিকের জন্য ধন্যা দেই সভাপতি/সেক্রেটারির দরবারে! মদখোর সুদখোর ঘুষখোরের টাকায় মসজিদ মাদ্রাসা বানাচ্ছি দেদারসে! কত বড় বেইমান কত বড় নাফরমান আমরা একবার ভেবে দেখেছেন কি?

আমরা সাধারণ মুসলমান, আমরা এমনিতেই পাড় পেয়ে যাবো! রাখেন মিঞা, রাখেন আপনার আঁতলামি! বাবা-মা আকিকা দিয়ে মুসলিম নাম রাখলেই মুসলমান হওয়া যায় না। মুসলমান হতে হলে আত্মসমর্পণ করতে হয় আল্লাহ-র কাছে। নামাজ কালামের বালাই নেই, আবার নিজেকে মুসলমান দাবী করছি! ইসলামের কোন কাজটা সঠিকভাবে করছি আমরা? 

মোল্লা-মুন্সি জ্ঞানী-অজ্ঞানী সাধারণ-অসাধারণ, কতজন বুকে হাত রেখে আমরা, বর্তমান দুনিয়ার মুসলমানরা কে বলতে পারবো যে আমি সঠিক?  আমরা সবাই অন্যের ভুল ঠিকই ধরি, কিন্তু নিজের ভুল মোটেও অন্বেষণ করি না। একান্ত নিবৃতে একবার চিন্তা করেন, নিশ্চয় বুঝে যাবেন আল্লাহ কেন এই ভয়াবহ করোনা নামের ভাইরাস পাঠিয়েছেন? এর ব্যাপারে আমি  নিশ্চিত করে বলতে পারি— এটা আল্লাহর সৈনিক; আমাদের পাপের প্রতিফল।

হযতর মুসা (আঃ) এর যুগে বনি ইসরাইলে একবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিল; কারণ, বৃষ্টি হয় না। জনসাধারণ মুসা (আঃ) এর কাছে গেল, এবং বৃষ্টির জন্য দোওয়া করতে অনুরোধ করলো। সবার অনুরোধে মুসা (আঃ) সত্তর হাজার বা ততোধিক লোক নিয়ে এক মরু প্রান্তরে উপস্থিত হয়ে দোয়া করলেন— "হে প্রভু! আমাদের উপর আপনার রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করুন; আপনার রহমত বিস্তৃত করুন; আপনার দয়া উন্মুক্ত করুন; দুগ্ধপোষ্য শিশুদের, তৃনভোজী পশুদের এবং রুকুকারী বয়োবৃদ্ধদের ওসিলায় আমাদের উপর রহম বর্ষণ করুন, করুণা করুন।"

এ দোয়ার পর আকাশের কঠোরতা, সূর্যের তীব্রতা আরো বেড়ে গেল! হযরত মুসা (আঃ) আবারও আল্লাহ-র দরবারে আর্জি পেশ করলেন— "হে দয়াময় প্রভু! যদি আপনার সুমহান দরবারে আমার মান মর্যাদা এতোই জীর্ন হয়ে থাকে, তবে উম্মি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর উসিলায় আমাদের উপর আপনার রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করুন।" 

তখন মুসা (আঃ)-এর কাছে ওহি এলো— "হে মুসা! আমার দরবারে তোমার মর্যাদা জীর্ন হয়নি, আমার কাছে তুমি মর্যাদাবান হিসেবেই অবস্থান করছো। তবে তোমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি উপস্থিত আছে, যে চল্লিশ বছর যাবত গোনাহ ও অবাধ্যতা করে আসছে। তুমি উপস্থিত লোকজনের মাঝে ঘোষণা দাও, যাতে সে লোকটি তোমাদের মধ্য থেকে বেরিয়ে যায়। তার কারণেই তোমাদেরকে আমার রহমতের বারিধারা থেকে বঞ্চিত রেখেছি।" 

হযতর মুসা (আঃ) নিবেদন করলেন— "হে করুনাময় প্রভু! আমি একজন দূর্বল বান্দা, আমার আওয়াজও দূর্বল, এই বিশাল সমাগমে কিভাবে আমার আওয়াজ উপস্থিত সবার কাছে পৌছাবে?" 
আল্লাহ উত্তর করলেন— "তোমার কাজ আওয়াজ দেয়া, আর আমার কাজ তা পৌঁছে দেয়া।" 

আল্লাহর নির্দেশে হযতর মুসা (আঃ) দাঁড়িয়ে এই বলে আওয়াজ তুললেন— "উপস্থিত লোকসকল! এখানে একজন এমন বান্দা আছে, যে দীর্ঘ চল্লিশ বছর যাবৎ মহান স্রষ্টার সংগে যুদ্ধে লিপ্ত! তুমি আমাদের মধ্য থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার কারণে আমরা সবাই রহমতের বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।" 

যার উদ্দেশ্যে এ ঘোষণা সে ভাবলো, যদি আমি এই দল থেকে বেরিয়ে যাই, তাহলে বনি ইসরাইলের সামনে আমি লজ্জিত ও অপমানিত হবো, আর যদি তাদের মাঝে অবস্থান করি তাহলে আমার কারণে সবাই রহমতের বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে। তাই সে তৎক্ষনাৎ তওবা করলো— "হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! হে দীন-দুনিয়ার মালিক! চল্লিশ বছর ধরে আপনার অবাধ্যতা করে আসছি, আর আপনিও আমাকে অবকাশ দিয়েছেন। আজ আপনার অনুগত হয়ে আপনার কাছে করুণা প্রার্থনা করছি। আমাকে মাফ করুন। আমাকে এতো লোকের মধ্যে অপমানিত করবেন না। হে আমার প্রভু! আমাকে মাফ করে দিন। আমার অনুগত হওয়াকে আপনি কবুল করুন, মন্জুর করুন।"  

তার কথা শেষ না হতেই আকাশে এক খন্ড মেঘ ভেসে উঠলো এবং মুসলধারে বৃষ্টি শুরু হলো! হঠাৎ বৃষ্টি বর্ষনের দৃশ্য দেখে হযতর মুসা (আঃ) আরজি করলেন, "হে আল্লাহ! কি কারণে আপনি আমাদের প্রতি এমন সদয় হলেন? আপনার রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করলেন? আপনার ঘোষণামতে আমাদের মধ্য থেকে তো কেউই বের হয়ে যায়নি?"
আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা জানালেন— "যার কারণে তোমাদেরকে বৃষ্টি বর্ষণ থেকে বঞ্চিত রেখেছিলাম, তার কারণেই আজ তোমাদের উপর এই রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করলাম।" 

হযতর মুসা (আঃ) অনুরোধ করলেন— "হে আল্লাহ! আপনার একান্ত সেই অনুগত বান্দাকে অন্তত একবার আমাকে দেখার সুযোগ করে দিন।"
আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা উত্তর করলেন— "হে মুসা! দীর্ঘ চল্লিশ বছর সে আমার নাফরমানী করেছে, অবাধ্যতা করেছে, অথচ আমি তাকে কোনদিন অপদস্ত ও অপমানিত করিনি; এখন সে আমার অনুগত ও বাধ্যগত হয়েছে; এখন তাকে আমি অপদস্ত ও অপমানিত করবো, এ কথা ভাবলে কি করে?" 

তওবার দরজা সবার জন্যই উন্মুক্ত। খাঁটি তওবা করুন। হারাম-হালাল বেছে চলুন। পিতা-মাতা আত্মীয়-স্বজন অধীনস্হ প্রতিবেশির হক প্রতিষ্ঠা করুন। অন্যকে ঠকানো বন্ধ করুন, সবার মঙ্গল কামনা করুন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ুন। রাত জেগে কান্নাকাটি করুন। নিশ্চয় মহান আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন মাফ করে দেবেন এবং বন্ধু করে নেবেন। আর বন্ধুর জন্য তিনি বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।' —(সূরা ইউনূস : ৬২)।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
১৭ এপ্রিল, ২০২০.

কোভেট-১৯ আসলেই কি মানব সৃষ্ট?


করোনাভাইরাস প্রতিরোধে এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারেননি কোন টিকা, নেই সুনির্দিষ্ট কোনো ঔষধ। ফলে থমকে যাওয়া বিশ্বে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সমানে মরছে মানুষ, মৃত্যুর মিছিল থামছে না, ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। তা কতদূর যাবে, এখনও অনিশ্চিত। এ মৃত্যুর মিছিল অপ্রতিরোধ্য। আর ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার জন্য বাঙ্গালি এ নিয়ে উল্টাপাল্টা লাইভ করে ভিডিও আপলোড দিচ্ছে; হায়রে বাঙ্গালী!! 

বিশ্বে ত্রাস সৃষ্টি করে চলছে কোভেট-১৯। সারা বিশ্বকে নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। যে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি করেছে, তার একটি হলো— স্বাস্থ্য সংকট, অন্যটি অর্থনৈতিক সংকট। পুরো বিশ্বকে বিধ্বস্থ পর্যদুস্ত করে দেয়ার জন্য উপরোক্ত যে কোন একটি সংকটই যথেষ্ট। অস্ট্রেলিয়া থেকে আফ্রিকা, সারা বিশ্বে এখন এমন আর কোন দেশ বা অঞ্চল খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে কেউ সংক্রমিত হয়নি। অথচ কিছু মানুষের এ তাল নেই! এখনো তারা ধান্দা করছে করোনা বিতর্ক করে বিখ্যাত হতে!
এমন অনেক লোকই ফেসবুকে এখন লাইভ করছে! কাজী শামীম আহসান নামের এক ভদ্রলোককে দেখছি এ করে হটাৎ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে। বিবেকহীন বে-বুঝরা  তার বক্তব্য শেয়ার করছে দেদারসে! তিন-চার সপ্তাহ আগে মেসেঞ্জারে কেউ একজন আমাকে তার বক্তব্য সম্বলিত একটি ভিডিও পাঠিয়েছিলেন। খুব মনোযোগ দিয়ে ভদ্রলোকের কথাগুলো শুনেছিলাম। কিন্তু তখন তেমন একটা পাত্তা দেইনি। 

মেসেঞ্জারে সাধারণত রাজনৈতিক গুজব, ধর্মীয় মিথ্যাচার বা নাস্তিকের বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা ও নানান প্রপাগাণ্ডা চালাচালি হয়। আমি গবেষণা করে দেখেছি, যারা এ কাজটি করে তাদের বেশিরভাগই এক ধরনের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, হীনমন্যতায় ভোগা মানুষ। এ মন্তব্যটি হয়তো অনেককেই আহত করতে পারে। কিন্তু বাস্তব সত্য বলতে আমি কখনো দ্বিধাবোধ করি না এবং কোন ধরনের বনিতাও আমার মাঝে নেই। একটু খেয়াল করলেই যে কেউ বুঝে যাবেন, যারা আত্মকেন্দ্রিক বেশিরভাগ  তারাই হরহামেশা মেসেঞ্জারে ডু মারে। আজেবাজে ফালতু ভিডিও বা নগ্ন ছবি, ধর্মীয় মিথ্যাচার, রাষ্ট্রীয় গুজব শেয়ার করাই তাদের কাজ! 

তাদের মানসিকতা আসলে অনেকটা বাদুড়ের মতো। বাদুড় যেমন সূর্য সহ্য করতে পারে না, আলোতে চোখে দেখে না, ওরাও ফেসবুকের নিউজফিড দেখে না, প্রকাশ্যে বের হতে পারে না! ওরা সাধারণত নিজেরা কোন পোস্ট দেয় না, তাই অন্যের পোস্ট তাদের চোখেও পড়ে না! অনবরত তারা আছে শুধু মেসেঞ্জারে অন্যকে বিরক্ত করার তালে! প্রতিদিনের মতো আজএ বেশ কয়েকটি উল্টাপাল্টা ভিডিও এসেছে আমার মেসেঞ্জারে। খেয়াল করে দেখলাম তিন-চারজন কাজী শামীম আহসান সাহেবের কয়েকটি ভিডিও শেয়ার করে প্রশ্ন করেছেন— ঘটনা কি সত্য? তাই আর চুপ থাকা গেল না। এ'সব বিভ্রান্তি নিয়ে কিছু লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।  

ফেসবুক আসলে এমন একটি মাধ্যম যেখানে ফেক নিউজ বা উদ্ভট বক্তব্য সম্বলিত লেখার খুব কদর। বেশিরভাগ মানুষ ওসবই খায়! কাজী শামীম আহসান সাহেব কি উদ্দেশ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-কে চ্যালেঞ্জ করে বসার বদান্যতা দেখাচ্ছেন অনবরত, তা আমার বুঝে আসে না। বাংলাদেশ সরকার ও সাধারণ মানুষকেও তিনি বেশ তাচ্ছিল্য করেই কথা বলছেন! যতটুকু জানতে পেরেছি তিনি এক্স‌প্লো‌র গ্রুপ অব কোম্পানীর চেয়ারম্যান ও ম্যা‌নে‌জিং ডাই‌রেক্টর। বর্তমানে বসবাস করেন কাতারে। ওখান থেকেই তিনি নিয়মিত লাইভে আসছেন এবং সবজান্তা ভাব দেখিয়ে করোনাভাইরাস মানব সৃষ্ট বলে সবার বিরুদ্ধে তীর্যক আক্রমণ করে কথা বলছেন। এমনসব উদ্ভট তথ্য উপাত্ত তিনি দাঁড় করছেন, যা শুনে যে কেউ আতঙ্কিত হয়ে যাবে। বাক স্বাধীনতা সবারই আছে, তারও আছে। কিন্তু সে স্বাধীনতা যখন অন্য মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তখন তা হয়ে যায় অপরাধ। তিনি বলছেন— করোনাভাইরাস মানব সৃষ্ট! 

তাছাড়া দেশ-বিদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও তিনি কথা বলেছেন। সব বিষয়গুলোই যে মিথ্যা তা কিন্তু নয়। তবে, করোনাভাইরাস যে কোনভাবেই মানব সৃষ্টি নয়, তার দু'একটি সাধারণত যুক্তি এখানে তুলে ধরছি। অবশ্যই মানব সৃষ্ট ভাইরাসের নির্ধারিত সময় বা ডিউরেশন অব টাইম থাকে, যে সময়ের মধ্যে তা বিস্তার লাভ করবে বা ছড়াবে এবং তা ছড়াবে বাতাসের মাধ্যমেই। মানব সৃষ্ট ভাইরাস ৯৯%-ই বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। এবং এটাও সত্য যে, মানব সৃষ্ট যে কোন ভাইরাসের একটা নির্ধারিত সময় থাকে, যে সময়ের মধ্যে ওটা ধ্বংস হয়ে যাবে।

আপনাদের কাছে কি মনে হয় কোভেট-১৯ বাতাসে ছড়াচ্ছে? যদি তাই হতো তাহলে এতোদিনে পৃথিবীর ৯০% মানুষ নিশ্চিত আক্রান্ত হয়ে যেতো। তাছাড়া আপনাদের কারো কি মনে হচ্ছে করোনাভাইরাসের শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে বা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে? আমার তো মনে হচ্ছে এ ভাইরাসটির শক্তি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং যে যত কথাই বলুক না কেন, এটি মোটেও মানব সৃষ্ট ভাইরাস নয়।

লক্ষ্যনীয়, ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট সকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী যখন জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর মানব সৃষ্ট 'লিটল বয়' নামের নিউক্লীয় বোমা ফেলে এবং এর তিন দিন পর নাগাসাকি শহরের ওপর 'ফ্যাট ম্যান' নামের আরেকটি নিউক্লীয় বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়, তখন অনুমান করা হয় ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই বোমা বিস্ফোরণের ফলে হিরোশিমাতে প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার লোক মারা যায়, নাগাসাকিতে প্রায় চুয়াত্তর হাজার লোক মারা যায়। এবং পরবর্তীতে এই দু শহরে বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় আরও দুই লক্ষ চৌদ্দ হাজার মানুষ। জাপানের আসাহি শিমবুন-এর করা হিসাব অনুযায়ী বোমার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগসমূহের ওপর হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য গণনায় ধরে হিরোশিমায় দুই লক্ষ সাইত্রিশ হাজার, এবং নাগাসাকিতে এক লক্ষ পয়ত্রিশ হাজার লোকের মৃত্যু ঘটে। এর সংক্রমণ সারা বিশ্বে ছড়িয়েছিল কি?

যারা করোনাভাইরাসকে মানব সৃষ্ট বলে দাবী করেন, তারা আসলে মহামারি বিশ্বাস করেন না। মহামারি বিশ্বাস না করে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে অস্বীকার করছেন। এটা অপরাধ, পাপ।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
১৮ এপ্রিল, ২০২০.

আলো আসবেই!


ঢাকা শহরে গাড়ির হর্ন নেই, কালো ধোঁয়া নেই, শব্দদূষণ নেই, ভাবা যায়? জনমানব শূন্য খাঁ-খাঁ চারপাশ। ফাঁকা রাস্তায় নেমে পড়েছে শালিক, কাক, চড়ুই। চতুর্দিকে শান্ত-নিবিড় পরিবেশ। মানুষের কোলাহল নেই, আছে কাকের কা কা আর চড়ুই শালিকের কিচিরমিচির। মনে হচ্ছে এ যেন দূষণমুক্ত এক নির্মল নগরী! করোনা আতঙ্কে মানুষ ঘরে বন্দী, আর প্রকৃতি তার বন্ধ দুয়ার খুলে দিয়েছে। শত অত্যাচার হতে মুক্ত হয়ে প্রকৃতি তার নিজেস্ব রঙ ঠিকই ছড়াতে শুরু করেছে।

এমন নীরব-নিস্তব্ধতায় চড়ুইয়ের চিঁ চিঁ, দোয়েলের শিস, কোকিলের কুহু, কাঠবিড়ালীর ছোটাছুটি, পাখির কিচিমিচির এসব শহরে দেখিনি বেশ কয়েক যুগ। মনেই হয় না এই সেই যান্ত্রিক নগরী ঢাকা! তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি, আথচ নেই কোনো ভ্যাপসা গরম! নির্মল বায়ু, ঝলমল রোদে প্রকৃতি যেন জেগে উঠেছে।

এ যান্ত্রিক শহরে এতো পাখপাখালির অবাধ বিচরণ কল্পনা করা যায়? সুবেহ-সাদিকের আগে এ নগরীতেও আজ কানে বাজে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। ঘুম ভাঙছে পাখির কিঁচিমিঁচির শব্দে। চিরচেনা সেই ঢাকা আজ নতুন রূপ ধারণ করেছে। করোনা আতঙ্কে আমরা ঘরবন্দি, আর প্রকৃতি উন্মুক্ত। এ সুযোগে পাল্লা দিয়ে কমছে দূষণের মাত্রা। নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছে প্রকৃতি।  

টিভি নিউজে দেখলাম বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে বাসা বেঁধেছে লাল কাঁকড়া, সাগর লতা, গাঙ কবুতর; রাজত্ব করছে সামুদ্রিক কাছিম, ডলফিন ও শামুক-ঝিনুক। পাল্টে গেছে বান্দরবনসহ অন্যান্য বনের চেহারাও। মানুষের আগ্রাসনে পাহাড় ও বনের পশু-পাখিরা বাঁচার পরিবেশ হারিয়ে ফেলেছিল। পাহাড়-বন আবার আগের রূপ ফিরে পেতে শুরু করেছে।

করোনা তুমি অনন্যা, বন্ধ করে দিয়েছো প্রকৃতির ওপর মানুষের সকল অনাচার। বন্ধ করেছো কলকারখানা, গাড়ির চাকা, জাহাজের ইঞ্জিন। কমিয়ে দিয়েছো জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানোর মহারত। থমকে দিয়েছো পার ক্যাপিটা-জিডিপি, আর পৃথিবীর সর্বস্ব দখলের অর্থনীতি। বাহ্ করোনা বাহ্! নাসার স্যাটেলাইট চিত্র থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারছি কিছুটা হলেও বিশ্বের শহরগুলো দূষণমূক্ত হচ্ছে। 

সভ্য মানুষের কাছ থেকে পৃথিবী তার দখল কেড়ে নিয়ে পুন জাগরিত হচ্ছে। পাখি, সমুদ্রের প্রাণী, বন্য প্রাণী ও গাছপালা শতাব্দীর ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছে। অতিষ্ঠ খাল-বিল নদী-নালা বন-বনানী আকাশ কিছুটা হলেও মুক্তি পেয়েছে। একটু একটু করে ধরণী তার অপূরণীয় ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মানুষের নিঃশ্বাস নিতে আর তেমন একটা কষ্ট হবে না। 

আলো আসবেই! আলোকে আসতেই হবে। আলো আসে; কোন ভাবেই তাকে থামানো যায় না, ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়! সূর্যের আলোর মতো আসুন আমরাও সবাই ছড়িয়ে দেই প্রত্যেকের মনের আলো; মানবতার বন্ধনে আবদ্ধ হই। একে অন্যকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেই।

বিষাক্ত এ পৃথিবী আবারও ফিরে পাক প্রাণচাঞ্চল্য। মেঘ কেটে রোদ উঠুক। আকাশ আরো বেশি নীল হউক। ভাল থাকুক আগামী প্রজন্মসহ পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী।। 

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
১৯ এপ্রিল, ২০২০.

করোনা বিশ্বে বাংলাদেশের তুলনামূলক অবস্থা:

অতি ক্ষুদ্র একটি অনুজীব মানুষকে একেবারে ঘরবন্দী করে ফেলেছে। এই বন্দিত্বের স্থায়িত্ব কত, কে জানে? -দীর্ঘও হতে পারে। সারা বিশ্বের সবকিছু স্থবির হয়ে পড়েছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয়, আভ্যন্তরীণ-আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বানিজ্য, এমনকি নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্কের মাঝেও স্থিতি এসেছে। আগামী দিন কেমন হবে, সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। অতো কিছু ভেবে এখন মন খারাপ করা যাবে না। বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, করোনা থেকে আগে বাঁচতে হবে, এবং অন্যকে বাঁচাতে হবে; বুঝতে হবে সার্বিক পরিস্থিতি, অন্যকেও বুঝাতে হবে। অভাব অভিযোগ জয় করার ব্রত নিতে হবে। 

হু হু করে বাড়ছে সংক্রমিতের সংখ্যা এবং এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা; ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যানুযায়ী বিশ্বে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা আজ তেইশ লাখ ছেড়ে গেছে এবং মৃতের সংখ্যা দের লাখ। এ থেকে কি সংক্রমণের প্রকৃত পরিসংখ্যান জানা বা বুঝার কোন উপায় আছে? 

আসল চিত্রটা মনে হয় মোটেও জানা বা বুঝা যাচ্ছে না। কারণ, বিশ্বে যত মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে এ দ্বারা তার মাত্র ছোট একটা অংশ শনাক্তের মাধ্যমে সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। কারো কোভিড-১৯ পজিটিভ ধরা পড়লেই শুধু সে সংক্রমিত হিসাবে নথিভুক্ত হচ্ছে; অন্যথায় নয়। শনাক্তকরণ পরীক্ষা কখন করা হয়? যখন আক্রান্ত ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে চিকিৎসা চায়। যাদের হালকা উপসর্গ দেখা দিচ্ছে বা যাদের ভেতরে জীবাণু আছে, কিন্তু কোন উপসর্গ দেখা দিচ্ছে না, তারা সংক্রমিতের তালিকায় উঠছে না। প্রতিদিন খবরের কাগজে এমন অনেক মৃত্যুর খবর উঠে আসে, যারা কোভিড-১৯ সিম্পটম নিয়ে মৃত্যুবরণ করে, করছে; তাদের হিসাব এখানে উঠছে কি?

আমাদের দেশের বাস্তবিক চিত্র কি তা আমরা কেউই জানিনা। তারপরও অতি ধার্মীক, অতি যুক্তিবাদী ও কিছু বেকুব টাইপ লোক লকডাউন মানছে না! করোনাকে তারা অতি সাধারণ রোগ হিসাবে তুচ্ছজ্ঞান করছে। এখনো অনেকেই বিনা প্রটেকশনে বিনা প্রয়োজনে বাহিরে বাতাস খেতে বের হচ্ছে, আড্ডাবাজী করছে! ডাব্লিউএইচও বারবার হুশিয়ারি দিচ্ছে সামাজিক দূরত্ব কড়াকড়ি করার জন্য; নয়তো করোনার ভয়াবহ বিস্তার ঘটতে পারে। সে হিসেবে সরকারও যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। তা সত্ত্বেও দেশের বেশিরভাগ মানুষের মোটেও বোধদয় হচ্ছে না!

করোনা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে এমন ভয়ানক হয়ে যাচ্ছে, কয়দিন পর হয়তো তা সরকারের আয়ত্তের একেবারে বাইরে চলে যাবে। প্রাথমিক অবস্থায় বিদেশফেরতরা যখন দেশে ঢুকতে শুরু করেছিল তখন যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেনি সরকার, সচেতনও হয়নি কেউ; সেটা ছিল প্রথম ভুল। দ্বিতীয় ভুল ছিল— লকডাউনের ছুটিকে ঈদের ছুটি মনে করা। তৃতীয় ভুল— গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারিদের ঢাকায় ফেরানো এবং পুনরায় গ্রামে পাঠানো। এতে করে করোনাভাইরাস প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বশেষ, ফরজে আইন যেখানে শিথিল সেখানে ফরজে কিফায়া নিয়ে গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যা হয়েছে, তাতে করে সামনে আমাদের কপালে কি অপেক্ষা করছে তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন!
  
এক সপ্তাহ পর বুঝা যাবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়। গতকাল আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে; তা হতে সময় নিয়েছে ৪০ দিন। ৮ মার্চ থেকে এক হাজার হতে সময় নিয়েছে ৩৬ দিন, আর পরের এক হাজার আক্রান্ত হয়েছে মাত্র চার দিনে। অন্যদিকে ১৮ মার্চ করোনায় আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, আর আজ নতুন ৭ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ৯১ জনের। আজ ১৯ এপ্রিল ৩১২ জন নতুন সংক্রমিত নিয়ে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ২৪৫৬ জনে।

ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যানুযায়ী ২ হাজার রোগী হতে ইতালিতে সময় লেগেছিলো ৩২ দিন; এটাই সবচেয়ে কম সময়। অপর দিকে একই পরিমাণ রোগী আক্রান্ত হতে স্পেনে সময় লেগেছিলো ৪১ দিন; যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে লেগেছিলো ৪৮ দিন। অন্যদিক দিয়ে বর্তমানে ভয়াবহ আকারে করোনা মহামারির সম্মুখীন যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার রোগী হতে সময় লেগেছে ৫৩ দিন। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পৃথিবীর উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পন্ন দেশগুলো যেভাবে হিমশিম খাচ্ছে, আমাদের অবস্থা কেমন হতে পারে তা চিন্তারও অতীত। 

করোনা মেসাকারে মৃতের সংখ্যা কেবল ইউরোপেই এক লক্ষ ছাড়লো; ইউরোপ মহাদেশই এখন পর্যন্ত এই মেসাকারে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মহাদেশ। ইতালিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে, এর পরেই রয়েছে স্পেন। ইতালিতে আক্রান্তের সংখ্যা ১,৭৮,৯৭২ জন এবং মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ২৩,৬৬০ জন; এছাড়া স্পেনে মারা গেছে ২০ হাজারের বেশি মানুষ, ফ্রান্সে মারা গেছে ১৯ হাজারের বেশি এবং ব্রিটেনে ১৬ হাজারে উপরে।  এ অবস্থায় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন— দেশে লকডাউনের মেয়াদ আরো বাড়াবেন। ওদিকে ফ্রান্সে করোনা সংক্রমণ আগের দিনের চেয়ে অনেক বেশি; ব্রিটেনে ২৪ ঘন্টায় নতুন সংক্রমণ ৫,৮৫০ এবং এ দেশটি এখন বিশ্বের পঞ্চম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। 

ভয়ংকর সংক্রামক এই ভাইরাসে এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে ২৩,৯৫,৬৩৬ জন আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছে ১,৬৪,৫৬৫ জন; প্রতি মুহূর্তে হু হু করে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।  এএফপির হিসাব অনুযায়ী মোট মৃত্যুর এক তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে; মৃত্যুর সংখ্যা ৪০,২৬৫।
মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে যে দেশের নাম সেটি হলো তুরস্ক। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮৬,৩০৬ জন, আর মৃত্যু হয়েছে ২,০১৭ জনের; যা মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে। গত ২৪ ঘণ্টায় তুরস্কে আরো ৩,৯৭৭ জন নতুন আক্রান্ত হয়েছে; মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জনের। 

ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যানুযায়ী করোনাভাইরাসের সর্বশেষ পরিসংখ্যান— তুরস্ক করোনা আক্রান্ত শীর্ষ দশ দেশের তালিকায় অষ্টম; তুরস্কের পরেই আছে ইরান। ইরানে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৮২,২১১ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৫,১১৮ জনের। তুরস্কে গত ১০ মার্চ প্রথম একজন করোনা রোগী শনাক্ত হন। এর প্রায় এক মাস পর অর্থাৎ ৮ এপ্রিল আক্রান্ত হয় ৪,১১৭ জন। 

আফ্রিকায় ৬ মাসে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের ধারণা, করোনা প্রাদুর্ভাবের পরবর্তী ভরকেন্দ্র হবে ওই অঞ্চলটি। এরই মধ্যে সেখানে ১৯ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, আর প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার। প্রাণঘাতী এ ভাইরাস আফ্রিকায় অন্তত তিন লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে এবং প্রায় তিন কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিবে বলে আশঙ্কা করছেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা।

বিশ্বব্যাপী করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, এর সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুও। গত এক সপ্তাহে বিশ্ব থেকে নাই হয়ে গেছে ৫০ হাজার মানুষ। তথ্য মতে— প্রথম মৃত্যুর পর ৫০ হাজার ছাড়তে সময় লেগেছে ৮২ দিন, আর এর পরের ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে সময় লেগেছে মাত্র ৮ দিন, এবং এর পরবর্তী ৫০ হাজার মারা গেছে মাত্র সাত দিনে! এখনো ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোতে  করোনা ভাইরাস বিভীষিকা ছড়িয়েই যাচ্ছে; এশিয়ায় তো সবে শুরু।    

দক্ষিণ এশিয়ায় করোনা আঘাত হানে ২৩ জানুয়ারি; প্রথম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় নেপালে, ২৬ জানুয়ারি শনাক্ত হয় শ্রীলঙ্কায়, ২৯ জানুয়ারি ভারতে, ২৩ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানে, ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানে, ৫ মার্চ ভুটানে, ৬ মার্চ মালদ্বীপে এবং সর্বশেষ ৮ মার্চ বাংলাদেশে। এরই মধ্যে অন্যান্য দেশকে পিছনে ফেলে বাংলাদেশ স্থান করে নিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয়তে; আক্রন্তের ক্রমানুসারে। আগে আছে শুধু ভারত ও পাকিস্তান।   

ইউরোপ আমেরিকার চেয়েও কত বেশি ধ্বংসাত্মক হতে যাচ্ছে করোনা আমাদের এ অঞ্চলে, তা এখন আর বুঝতে কারো বাকী নেই; একদিকে ঘনবসতি, অন্যদিকে অসচেতনতা। ভয় হচ্ছে, আমাদের দেশের দূর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ভঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থার জাঁতাকলে পড়ে না জানি রাস্তায় লাশের স্তুপ পড়ে। আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোর যে করুণ পরিস্থিতি এবং আইসিইউ সুযোগ সুবিধার যে বেহাল অবস্থা, ভাবতেই ভয় হয়! এ দেশে করোনা চিকিৎসার আশা করা দুরাশা। ইউরোপে যেখানে প্রতি ১০ লক্ষ রোগীর জন্য রয়েছে ৪ হাজার আইসিইউ, সেখানে আমাদের কি আছে??

ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় যা ঘটেছে এমতাবস্থায় দেশের সার্বিক করোনা পরিস্থিতি যে দিনদিন খারাপের দিকে যাবে তাতে আর কারো কোন সন্দেহ নেই। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকবে অভাব অভিযোগ। আমাদের মাঝে আছে একদিকে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়, অন্যদিকে জীবন ধারণের উপকরণের অপর্যাপ্ততার দুশ্চিন্তা; মানসিক অস্থিরতা চরম হওয়টাই স্বাভাবিক। তারপরও যে কোন পরিস্থিতি অবশ্যই সাহসিকতার সাথে মোকাবেলার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে।

ঘরে চাল কম? ডাল নেই? এক দিনের খাবার তিন দিন খেতে হবে। শরীরে জ্বর? ভয় না পেয়ে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। করোনা পজেটিভ? আল্লাহকে স্মরণে রেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ অনুযায়ী নির্ভয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। জীবন তো একটাই; যদি বাঁচি— যুদ্ধ করেই বাঁচবো।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
২০ এপ্রিল, ২০২০.

করোনাভাইরাস নিয়ে কিছু সোজা কথা:

দিন দিন করোনা আক্তান্তের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। আমাদের অসচেতনতাই এর একমাত্র কারণ। তাছাড়া, বিশাল জনসংখ্যার অতি ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশে এমন হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তারপরও যতটা পারি নিজের থেকে আমাদের নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করা উচিত এবং অন্যকেও সচেতন করা আমাদের কর্তব্য। 

এরই মধ্যে ৪২ লাখ রোগী যোগাযোগ করার পর ৩০ হাজারেরও কম পরীক্ষা এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে এবং এরই মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু, এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর যে ধরণের চিকিৎসা সুবিধার প্রয়োজন তার প্রচণ্ড অভাব আমাদের দেশে। তাই নিজ থেকে সতর্ক হওয়া এবং এ ভাইরাস থেকে দুরে থাকার চেষ্টা করা ছাড়া কোন উপায় নেই; বরং তা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। 

কোভিড-১৯ কি, কিভাবে ছড়ায়, এ থেকে নিজেকে কিভাবে সুরক্ষিত রাখা যায় এবং এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কি করা উচিত ইত্যাদি বিষয়ে এখনো আমরা অনেকেই অজ্ঞ। অললাইন অফলাইনে এ নিয়ে প্রচুর ভুল তথ্য ঘুরপাক খাচ্ছে, আছে অনেক গুজবও। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের বিভিন্ন আর্টিকেল ঘেটেঘুটে করোনাভাইরাস সম্বন্ধে সঠিক কিছু তথ্য আপনাদের সামনে আজ তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আশা করি এতে করে কিছুটা হলেও উপকৃত হবেন। আপনারা একজনও যদি এ থেকে কিছুটা হলেও উপকৃত হন, তবেই আমার শ্রম সার্থক হবে। 

নভেল করোনাভাইরাস আসলে কি? এ হলো করোনাভাইরাসের একটি নতুন প্রজাতি। এরই মধ্যে আমরা জেনে গেছি যে এ রোগটি প্রথম চীনের উহানে চিহ্নিত হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক সময় এ রোগটির নামকরণ করে— 'কোভিড-১৯'। করোনা থেকে ‘কো’, ভাইরাস থেকে ‘ভি’, ডিজিজ থেকে ‘ডি’ এবং ২০১৯ থেকে '১৯' নিয়ে এর সংক্ষিপ্ত নামকরণ করা হয় 'কোভিড-১৯'। আগে এর নাম ছিল 'নভেল করোনাভাইরাস’ বা ‘২০১৯-এনসিওভি’।

কোভিড-১৯ একটি নতুন ভাইরাস, যা অতীতের সার্স ভাইরাস ও সাধারণ সর্দি-জ্বর জাতীয় নানান ভাইরাসের পরিবারভুক্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে কোভিড-১৯-কে মহামারী হিসাবে উল্লেখ করেছে। এর অর্থ কি?কোভিড-১৯-কে মহামারী হিসাবে চিহ্নিত করার অর্থ এই নয় যে এই ভাইরাসের ভয়াবহতা বেড়েছে। মূলত এর ভৌগলিক বিস্তারের স্বীকৃতিস্বরূপ একে মহামারী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেহেতু সারা বিশ্ব লক হয়ে গেছে, অতএব সামনে হয়তো অভাব অভিযোগ থেকে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়া অস্বাভাবিক কোন চিন্তা নয়। তাই বিশ্বের সচেতন মানুষ মাত্রই সংকিত।

কোভিড-১৯ ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়? সংক্রমিত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্রের ফোঁটার (কাশি এবং হাঁচির মাধ্যমে তৈরী) সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে এবং এই ভাইরাস দ্বারা দূষিত অংশ স্পর্শ করার মাধ্যমে এটি সংক্রমিত হয়। কোভিড-১৯ ভাইরাস বেশ কয়েক ঘন্টা ভূপৃষ্ঠে বেঁচে থাকতে পারে, তবে সাধারণ জীবাণুনাশক এটিকে মেরে ফেলতে সক্ষম।

করোনাভাইরাসের লক্ষণগুলো কী? করোনভাইরাসের লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট। আরও মারাত্মক ক্ষেত্রে, এই সংক্রমণের ফলে নিউমোনিয়া বা শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধা হতে পারে। তবে, খুব কম ক্ষেত্রেই এই রোগ প্রাণঘাতী হয়। 
এসব লক্ষণগুলো ফ্লু (ইনফ্লুয়েঞ্জা) বা সাধারণ ঠান্ডা-জ্বর, যা কোভিড-১৯ এর চেয়ে অনেক বেশি সাধারণ। এ কারণেই কোনও ব্যক্তি কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখে নেয়া দরকার। এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, মূল প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো একই রকম। 

সংক্রমণের ঝুঁকি কীভাবে এড়িয়ে চলবেন?
• আপনার হাত ঘন ঘন অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান ও জল দিয়ে ধুয়ে নিন অথবা অ্যালকোহল আছে এমন স্যানিটাইজার ব্যবহার করে হাত পরিষ্কার করুন।
• কাশি এবং হাঁচি হলে নিজের নাক ও মুখ টিস্যু দিয়ে ঢাকুন এবং ব্যাবহৃত টিস্যু ফেলে দিন অথবা কনুই দিয়ে নাক ও মুখ ঢেকে নিন।
• অসুস্থ ব্যাক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে (১ মিটার বা ৩ ফুট) চলুন।
• বাড়িতে থাকুন এবং যদি অসুস্থ বোধ করেন নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে রাখুন।
• হাত পরিষ্কার না থাকলে চোখ, নাক অথবা মুখ একদম স্পর্শ করবেন না।

নিরাপদ দূরত্বে থাকুন, সুস্থ থাকুন।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
২১ এপ্রিল, ২০২০.

জীবনের চেয়ে জীবিকার গুরুত্ব কি বেশি?

জীবন বাঁচলেই তো জীবিকা, নয়তো কেন আমি কাজ করবো? আজ পহেলা মে; মহান মে দিবস। বিশ্বজুড়ে করোনা আতঙ্কের মাঝেই চলে এসেছে এবারের এই দিনটি। এবার নাকি সরকার প্রতিপাদ্য বিষয় করেছে— ‘শ্রমিক-মালিক ঐক্য গড়ি, সোনার বাংলা গড়ে তুলি’! মে দিবস আসে বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ দিবসের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু বিগত শোয়াশ বছরেও কি শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার পেয়েছে, না-কি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে? পারবে কি করে, একজন শ্রমিকই যখন আবার মালিক হয়ে যান, ভুলে যান অতীত, হয়ে যান শোষক!

করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে বার্লিন থেকে বান্দরবান তথা গোটা পৃথিবী যখন থমকে গেছে, সারা বিশ্বের শ্রমিকরা সবায় যখন লকডাউনে গৃহবন্দী, ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের দেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা জীবনকে বাজী রেখে জীবিকা ঠিক রাখার অভিপ্রায়ে কর্মক্ষেত্রে চলে আসছে হয়েছে এবং কারখানায় কর্মব্যস্ত। গাদাগাদি করে তারা কাজ করছে, বসবাসও করছে গিঞ্জি এলাকায় ঠাসাঠাসি করে। তাদের নেই ন্যুনতম কোন অধিকার! তবে কেন এবং কিসের জন্য এই মে দিবস?? 

অতি ক্ষুদ্র এই করোনা ভাইরাসের কাছে সারা বিশ্ব আজ কূপকাত! যত হম্বিতম্বিই করুক না কেন বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যন্ত এর কোন নিশ্চিত ঔষধই আবিষ্কার করতে পারেননি! কারণ হিসেবে তারা বলছেন, প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটি নাকি বারবার নিজের জিন বদলে উত্তোরত্তর ভয়াবহ হয়ে উঠেছে এবং উঠছে; এরই মধ্যে সে টিকে থাকার স্বার্থে ৩৮০ বার নিজের জিন বদলে ফেলেছে!

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কোভিড-১৯ এর এই জিন মিউটেশনই ভয়ের আসল কারণ। যার ফলে বিশ্বের সব বিজ্ঞানীদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সর্বসাধারণের মাঝেও। মাঝেমধ্যেই শোনা যাচ্ছে এবার এই ভাইরাসকে জব্দ করার ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে। কিন্তু ওসব প্রতিষেধক কতটা কাজের কাজ করতে পারবে তা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা আছেন বেজায় চিন্তায়। 

অথচ আমরা বাঙালিরা আছি মহা শান্তিতে! জীবনের চেয়ে জীবিকাকে প্রাধান্য দিয়ে খুলে দেয়া হয়েছে গার্মেন্টসগুলো, কর্মচঞ্চল হয়ে উঠতে শুরু করেছে শহর বন্দর। বলতে গেলে অনেকটা স্বাভাবিকের মতোই হয়ে গেছে ঢাকা শহরের পরিবেশ। করোনা বলে কিছু একটা আছে, মানুষের এ চিন্তাই যেন নেই! অথচ আজও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করেছে দেশে দেশে আরও কঠিনভাবে লকডাউন কার্যকর করতে। কে মানে কার কথা??

ল্যাটিন আমেরিকার ইকুয়েডরে সরকারিভাবে ঘোষণায় এসেছে এ পর্যন্ত ২৪,৯৩৪ জন মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৯০০ জন মারা গেছেন। অথচ সেখানকার চিকিৎসকদের বর্ণনায় উঠে এসেছে সম্পূর্ণ অন্য চিত্র। দ্য জাকার্তা পোস্ট-এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর অন্যতম কেন্দ্রস্থল গয়াকিলের একটি হাসপাতালের ভয়াবহ বর্ণনা। চিকিৎসকদের মতে সেখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ রোগীর লাশে ভরে গেছে হাসপাতালটির মর্গ। বাধ্য হয়েই লাশগুলো বাথরুমে স্তূপ করে রাখতে হচ্ছে। 

একজন চিকিৎসক বলেছেন, তারা বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বিছানা পুনরায় ব্যবহার করতে সেখানে থাকা লাশ জড়িয়ে রাখতে এবং সংরক্ষণে বাধ্য হয়েছেন। হাসপাতালটির একজন নার্স বলেন, তিনি যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, এর বিরূপ প্রভাব পেশাগত ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে তার ওপর পড়েছে। মার্চে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রত্যেক নার্সকে প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০ জন রোগীকে সেবা দিতে হতো। এরপর এত রোগী আসতে শুরু করল যে শুশ্রূষা করতে করতে তারাই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। করোনায় সংক্রমিত রোগীদের বেড খালি করতে অনেক রোগীকে অন্য কোথাও যেতে বলা হয়েছে, আবার অনেক রোগীকে বের করে দেয়া হয়েছে।

ওই নার্স আরও বলেন, পরিস্থিতি এমন যে মানুষ একা, দুঃখে, ব্যথায় চিৎকার করতে শুরু করলো, কেউ মলত্যাগ করলো, কেউ অক্সিজেন চেয়ে হট্টগোল শুরু করলো। পরিস্থিতি বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছিল। শুধু হাসপাতাল নয়, মর্গের অবস্থাও অবর্ণনীয় হয়ে উঠলো। মর্গের কর্মীরা আর মরদেহ নিতে আগ্রহী নন। তাই অনেক সময় মরদেহ মুড়িয়ে বাথরুমে স্তূপ করে রাখা হলো। মরদেহের সংখ্যা বেড়ে গেলে সেগুলো একসঙ্গে নিতে আসতো।

ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য মতে ইকুয়েডরে কোভিড-১৯ রোগে এ পর্যন্ত ২৪,৯৩৪ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৯০০ জন মারা গেছেন বলে প্রকাশিত; সেখানে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের শিকার হয়েছে গয়াকিল শহরটি। এছাড়া এপ্রিলের প্রথমার্ধে ইকুয়েডরের গায়াজ প্রদেশে মোট ৬ হাজার ৭০০ মানুষ মারা গেছেন, যা মাসিক গড়ের তিন গুণ বেশি। কিন্তু সরকার বলছে, সারা দেশে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে ৯০০ জন মারা গেছেন। 

ধারণা করা হচ্ছে, দেশটিতে করোনায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। সেদেশের  প্রেসিডেন্ট লেনিন মরেনোও এই পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি মনে করেন, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম দখানো হচ্ছে। গোয়াকিল হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, জরুরি ওয়ার্ডের করিডোরেও লাশ ভর্তি, কারণ মর্গে কোনো জায়গা নেই। ২০ থেকে ২৫ লাশ সরানোর জন্য এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
একজন চিকিৎসক বলেন, ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় গিয়ে তারা ঘুমাতে পারছেন না। পা ব্যথা হয়ে যায়, দুঃস্বপ্ন তাড়া করে। বাড়িতেও তাদের কঠোর আইসোলেশনে থাকতে হয়। পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ নেই। এটা তাদের মানসিক পরিস্থিতি আরো খারাপ করে তুলছে।

আজকে প্রকাশিত আমাদের দেশের একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার হেডলাইন, '৮৮১ স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত'! বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন-এর তথ্য মতে— ৩৯২ চিকিৎসকসহ ৮৮১ জন স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত; যা দেশে ঘোষিত মোট করোনায় আক্রান্তের প্রায় ১২ শতাংশ। অন্যদিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর অগুনিত সদস্য করোনায় আক্রান্ত, মৃত্যু সংবাদও কম নয়। যারা আমাদের ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধা তাদেরই যদি এই অবস্থা হয়, তবে দেশের সার্বিক চিত্র কি? বিধাতাই ভালো জানেন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে।

অনেকে বিশ্বাস করেন জীবনের চেয়ে জীবিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাদের উদ্দেশ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবারই বলে যাচ্ছে— 'স্বাস্থ্যই সত্য, স্বাস্থ্য রাজনৈতিক এজেন্ডার শীর্ষে থাকার যোগ্য। স্বাস্থ্যই অর্থনীতির চালিকাশক্তি। স্বাস্থ্য ছাড়া অর্থনীতি অচল, সেই সাথে নেই জাতীয় নিরাপত্তা।' আমাদের দেশ এই ব্যাপারে নজর দিচ্ছে বলে মোটেও মনে হয় না। দায়সারা গোছের একটা লকডাউন ঘোষণা করেই তারা দায়মুক্তির চিন্তা করছে।

নিঃসন্দেহে সরকারের হযবরল সীদ্ধান্ত দেশবাসীকে মৃত্যুঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে। বেশিবুঝা আধমরা বাঙালি জীবনের চেয়ে জীবিকার মূল্য বেশি দিতে গিয়ে অতীতেও যেমন মরেছে, এবারও মরবে! দেশের কর্তাব্যক্তিদের স্মরণ রাখা উচিত- কোন অবস্থাতেই জীবনের চেয়ে জীবিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। অতএব, সাধু সাবধান!!

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
১ মে, ২০২০.

সুরাইয়া নক্ষত্র নিয়ে বিভ্রান্তি:

আজ মেসেঞ্জার কলে আমরা বেশ কয়েকজন কথা বলছিলাম। হঠাৎ এক ছোট ভাই আমাকে একটি প্রশ্ন করে বসলেন, কত রমজানে যেন একটা তারা উঠবে? ওটা উঠলেই নাকি করোনা চলে যাবে?? ছোট ভাইটিকে তখন এ নিয়ে বিস্তারিত বলতে পারিনি। যেহেতু সে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডও, অতএব আজ এই বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার নিয়ে কিছু লিখতে চেষ্টা করবো, এমন ধারণা পোষণকারীদের মুণ্ডপাত ঘটানোর অভিপ্রায়ে। 

তারকা উঠবে আর করোনা বিদায় নেবে— বিষয়টি এমন নয়! না বুঝার কারণে অনেকেই আজ ঈমানহারা হয়ে যাচ্ছেন। আকাশের একটা তারা উঠবে, আর করোনা চলে যাবে, বিষয়টি এমন হলে হযরত ওমর (রাঃ) সেদিন হজরে আসওয়াদে চুম্বন করতে গিয়ে বলতেন না, 'তুমি আমার কাছে একটি পাথর বৈ অন্য কিছুই নও, আমি দেখেছি আল্লাহর হাবীব (সাঃ) তোমাকে চুমু খেয়েছেন, তাই আমিও খাচ্ছি!' 

আকাশের একটা  তারার  আরবি নাম সুরাইয়া; যেটার বাংলা নাম কৃত্তিকা, ইংরেজিতে বলা হয় Pleiades । মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের ভোরবেলায় এর উদয় হয়। এই তারকার উদয়ে মানুষের উপর থেকে রোগব্যাধি বিদায় নিয়ে চলে যেতে পারে বলে একটি হাদিসে আলোচিত হয়েছে। তাছাড়া এই তারকা নিয়ে অন্য আরেকটি হাদীসও আছে। যথাস্থানে  আমি হাদীস দুইটি তুলে ধরতে চেষ্টা করবো।

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, 'যখন সুরাইয়া উঠবে, তখন প্রতিটি শহরবাসী থেকে ব্যাধি উঠিয়ে নেয়া হবে।' এই ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলছেন, 'মহানবী (সাঃ) ব্যাধি চলে যাওয়ার আগে ফল বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।' বর্ণনাকারী বলেন, আমি ইবনে ওমর-এর কাছে জানতে চাই, কখন যাবে সেই ব্যাধি? তিনি বলেন, ঐ সুরাইয়া তারকা উদয়ের পর।'  এই হাদীসের সাথে বর্তমান করোনা মহামারীর কোন সম্পর্ক আছে বলে আমার মনে হয়নি। তাই হাদীসের বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনি।

দীর্ঘ হাদীসের খণ্ডিত একটি অংশ নিয়ে সুরাইয়া তারকার উদয় নিয়ে অপব্যাখ্যা করে আমাদের দেশের এক শ্রেণীর  আলেম-ওলামা এরই মধ্যে বেশ বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছেন। বিষয়টি বিস্তারিত বলার আগে প্রাসঙ্গিক একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া উচিত— ইসলাম মিথ্যা আশ্বাসের ধর্ম নয়। কোথাকার হাদীস কোথায় এনে মোল্লারা  সংযোগ করছে?? 

এর আগেও করোনাভাইরাস নিয়ে এদেশের তথাকথিত মোল্লাদের অনেক দম্ভোক্তি শুনেছি; মুসলমানের জন্য নাকি করোনা আসেনি!  আরও কত কি মিথ্যাচার! আপনাদের স্মরণ রাখা উচিত মিথ্যা দিয়ে সত্য ধর্ম প্রচার করা যায় না; ইসলাম প্রচারে মিথ্যা লাগে না। মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে শুধু শুধু কেন আপনারা এইভাবে  মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন? ঈমান নষ্ট করছেন?? মৃত্যুর ভয় কি আপনাদের মোটেও নেই?? তবে চাল চোর আর আপনার মধ্যে পার্থক্যটা থাকলো কি??

এই আপনারা বারবার হুজুর পাক (সাঃ)-এর নামে মিথ্যা ছড়িয়েছেন, এখনো ছড়াচ্ছেন! কেন?? আমি তো স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আপনাদের বদান্যতার জন্যই আজ দুনিয়া আজাব-গজবে ভরে গেছে। 

আপনাদের উদ্দেশ্যে আজ দু'এক কথা বলতেই হয়। একবার মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রঃ)-র দরবারে এক লোক এসে দর্শন শাস্ত্রের বেশ প্রশংসা শুরু করে। তার প্রশংসার ধরন এমন ছিল যে, যেখানে পূর্বের আলেম-ওলামাদের হেয় করা হয়। তার যুক্তি খণ্ডনে মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রঃ) ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-র মর্যাদাপূর্ণ বাণী তুলে ধরলেন। তাতে লোকটি মুখ বিকৃত করে বলে উঠলো, 'গাজ্জালী অযৌক্তিক কথা বলেছেন!'

ইমাম গাজ্জালী (রঃ) -র শা'নে এমন বেয়াদবীমূলক বাক্য শুনে তিনি রাগান্বিত হয়ে গেলেন। তৎক্ষনাৎ তিনি সেখান থেকে উঠে গেলেন এবং ধমক দিয়ে সেই লোকটিকে বললেন, 'যদি জ্ঞানীদের সংস্পর্শের আগ্রহ থাকে, তবে এরূপ বেয়াদবীমূলক বাক্য বলা থেকে নিজের মুখ বন্ধ রেখো।' আর আজকের তথাকথিত মোল্লারা ও অতি সাধারণ না জানা নামধারী  মুসলমানরাও বিখ্যাত সব আলেম-ওলামাদের নিয়ে কি যে বাজে বাজে মন্তব্য করে, সেসব শুনলে মাথা আর ঠিক রাখতে পারি না।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় সূরা জুমুআ নাযিল হয়। রাসূল (সাঃ) তিলাওয়াত করে যখন এই পর্যন্ত পৌঁছলেন, '…… তাদের থেকে পরবর্তীতে যখন কেউ মিলিত হবে', মজলিস থেকে কেউ প্রশ্ন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এখন পর্যন্ত আমাদের সাথে মিলিত হয়নি, পরে মিলিত হবে তারা কারা? রাসূলুল্লাহ  (সাঃ) নিরব থাকলেন। প্রশ্নকারী এভাবে আরো দুইবার অথবা তিনবার প্রশ্ন করলেন। অতঃপর রাসূল (সাঃ) সালমান ফারসী (রাঃ)-র কাঁধে হাত রেখে বললেন, 'যদি ঈমান সুরাইয়া তারকাতেও থাকে তবুও এদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি (পারস্যের বংশদ্ভূত) তা অর্জন করবে।' —( সহীহ্ বোখারী)

তাফসীরে মাযহারীতে কাযী ছানাউল্লাহ  পানিপথী (রঃ) সূরা জুমুআ-র উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেছেন মুজাদ্দিদে আলফে সানী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ইসলামকে পুন জাগরিত করেছেন। ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-কে অনেক মনীষীই পাঁচশ হিজরির মোজাদ্দিদ বলেছেন। আর মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রঃ)-কে বলা হয় ইসলামের নব্য জাগরণের পুরোধা। পূর্ববর্তী আলেমদের প্রতি পরবর্তী আলেমদের শ্রদ্ধা-ভক্তি কেমন ছিল তা উপরোক্ত ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেনি? না কি তা বুঝা যায় না? আজকের মোল্লারা একে অন্যের বিরুদ্ধে করে কি??

'ইত্তেহাফুস সা'দাত লিয যাবীদি' কিতাবে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। তাজুদ্দীন  আবদুল ওয়াহহাব বিন আলী সুবকী (রঃ) বলেন— এক ফকীহ আমাকে বললেন যে, এক ব্যক্তি ফিকহে শাফেয়ীর দরসে ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-কে গালমন্দ করলো, আমি এতে অনেক কষ্ট পেলাম। রাতে ব্যথিত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-র সাক্ষাৎ লাভ হলো। আমি সেই গালমন্দকারী ব্যক্তির কথা আলোচনা করতেই তিনি বললেন, 'চিন্তা করো না, সে আগামীকাল মারা যাবে।' 
সকালে যখন আমি দরসের হালকায় পৌঁছলাম, তখন হাসিখুশি অবস্থায় তাকে সেখানে দেখলাম। কিন্তু যখন সে সেখান থেকে বের হলো, ঘরে যাওয়ার সময় রাস্তায় বাহন থেকে পড়ে সে আহত হলো এবং সূর্যাস্তের পূর্বেই মারা গেলো।  

বুজুর্গানে দ্বীনদের সম্বন্ধে মিথ্যা বলা বা উপহাস করার প্রায়শ্চিত্ত দুনিয়া ও আখেরাত উভয় স্থানেই পেতে হয়। আজকের দিনের মোল্লাদের ও মুসলমানের হাল দেখে পাঁচশ হিজরির সেই বিখ্যাত সুফি ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-র কিতাবের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। 

তৎকালিন সময়ের তুস-এর একজন সুফি একবার মদিনা মনোওয়ারা সফরে যান। সেখানে গিয়ে তিনি মক্কা-মদিনার প্রধান মুফতীর সাথে সাক্ষাৎ প্রত্যাশা করলেন। কিন্তু তাঁর পোশাক-আশাকের দৈন্য দশা দেখে কেউ তেমন একটা পাত্তা দেয়নি। একাধারে কয়েকদিন সেই সুফি রওজামুবারক-এর রিয়াজুল জান্নাহ-য় পড়ে রইলেন। কখনো তাকে কেউ তেমন একটা খেতেও দেখেনি, ওখানটা ছেড়ে কোথাও যেতেও দেখেনি। বেশ কয়েকটা রাতদিন ওখানে পড়ে থাকার পর একদিন বের হলেন এবং প্রধান মুফতীর সাথে সাক্ষাত করতে গেলেন।

পূর্ব অনুমতি সাপেক্ষে যথা সময়ে সুফি উপস্থিত হলেন মুফতীর কুটিরে। দেখতে পেলেন, ইয়া বড় আলিশান এক চেয়ারে বসে আছেন মুফতী সাহেব। তাকে বাতাস করছে একজন, বিশাল এক পাখা নিয়ে! সুফি সালাম দিয়ে তার সম্মুখে উপস্থিত হতে মুফতী সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি জানতে চান আমার কাছে?' 
সুফি জবাব দিলেন, ' জনাব, আমি আপনার কাছ থেকে অজু শিখতে এসেছি।' 
মুফতী সাহেব বললেন, 'ঠিক আছে।' অতপর তিনি অন্য একটি চেয়ারে বসে অজুর পানি আনালেন দাস দিয়ে এবং দাস পানি ঢেলে দিল, মুফতী সাহেব অজু করে দেখালেন।

মুফতী সাহেব অজু শেষ করে সুফিকে অজু করার জন্য নির্দেশ দিলেন। সুফি অজু করতে গিয়ে হাত ধুইতে যেয়ে চারবার পানি খরচ করে ফেললেন। মানে তিনবারের জায়গায় চারবার হাত ধুইলেন। এতে করে মুফতী সাহেব ক্ষেপে গিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন এবং বললেন, ' আপনি অতিরিক্ত পানি খরচ করেছেন কেন?'

সুফি চুপ করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। অতপর জিজ্ঞেস করলেন,  'মুফতী সাহেব, হুজুর পাক (সাঃ)-এর প্রাসাদটি যেন কোন খানে? হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ)-র প্রাসাদ দুটো আমাকে একটু দেখাবেন কি?' 
মুফতী সাহেব রেগে উত্তর করলেন, 'ওনাদের কোন প্রাসাদ ছিল না, আপনি জানেন না?' 

সুফি ক্ষেপে গিয়ে বলতে থাকলেন, ঠিক বলেছেন, তবে আপনার মতো একজন অতি সাধারণের (মুফতীর) আজ এতো শানশওকত কেন? অজুতে আমি এক মুঠো পানি বেশি খরচ করেছি বলে আপনি আমাকে তিরস্কার করলেন, ফতোওয়া দিলেন; আর আপনি ও আপনারা যে তামাম ইসলামের চৌদ্দটা বাজিয়ে আলিশান বাড়িতে বসবাস করে দুনিয়ার সব প্রাচুর্য আর ভোগবিলাসে মত্ত  হয়েছেন, এতে কোন ফতোওয়া কাজ করে না?

আজকের মোল্লা-মৌলুভীর বেশিরভাগই তো ওই মুফতী সাহেবের সাগরেদ। তারা সত্যমিথ্যা বলে মুসলমানদের আজ শুধু ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানোর তালে থাকে! আর দলবাজি করে  মানুষকে বিপদে ফেলার পায়তারা করে! 

মুসলমান! আপনারা যতটা সময় বিভিন্নভাবে অযথা নষ্ট করেন, তার কিছুটা সময় কোর'আন হাদিস-কে দেন, জানার চেষ্টা করেন। নয়তো তারা আপনাদের মাথায় বেল রেখে তা ভেঙে আরও বেশি মজা খাবে! স্মরণ রাখবেন, ইসলামে দাখিল হতে হলে এবং আল্লাহ-কে পেতে চাইলে অবশ্যই পড়তে হবে, জানতে হবে; জ্ঞানার্জনের কোন বিকল্প নেই। জ্ঞানার্জন ইসলামে ফরজে আইন। প্রতিটি মুসলমানের জন্য যা ফরজ। 

করোনা বিপর্যয়ে যেসব মোল্লারা দিন তারিখ নির্দিষ্ট করে বলছেন, করোনা চলে যাবে; আল্লাহর দোহাই আপনারা আর ইসলামকে উপহাসকারীদের খোরাক বানাবেন না। বাস্তবতা দেখে কথা বলতে চেষ্টা করেন। আপনারা কেমন দ্বীনধার তা আপনাদের কার্যকলাপেই সুস্পষ্ট। অতএব আপনাদের কথা আল্লাহ শুনবেন না। আর আপনারা, যারা তাদের সাগরেদ সেজে বলছেন, 'তারকা উঠলেই করোনা চলে যাবে'; দোহাই আপনাদের, অফ যান! 

বরং নিজের ভুল স্বীকার করে বেশি বেশি তওবা ইস্তিগফার করেন; আল্লহর দিকে ফিরে আসতে চেষ্টা করেন। নিশ্চয় মহান রাব্বুল আ'লামীন মাফ করে দিবেন।।
 
মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
৩ মে, ২০২০.

কে নেবে এ মৃত্যুর দায়?

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক; একজন কাপড় ব্যবসায়ী। বয়োবৃদ্ধ মানুষ কয়দিন যাবত ঠান্ডা-জ্বরে ভুগছেন, সাথে কাশি। করোনা সিম্পটম নিয়ে গতকাল ছেলের সহায়তায় বিএসএমএমইউতে এসেছিলেন করোনা টেস্ট করাতে। দু'ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর বিকেলে তিনি জানতে পারেন, আজকের মতো করোনা টেস্টের নমুনা গ্রহণ শেষ; আগামীকাল আবার নেওয়া হবে। এ কথা শোনার কিছুটা সময় পরই মাথা ঘুরে পড়ে যান ওই বৃদ্ধ। তার ছেলের চিৎকারে অন্য মানুষজন ছুটে এসে দেখতে পান তিনি মারা গেছেন! 

আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের শরীরে করোনার উপসর্গ ছিল, তবে তিনি করোনায় মারা গেছেন কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ তার করোনা টেস্টই করা হয়নি। মৃত্যুর পর আজ (সোমবার) তার করোনা টেস্ট হবে! কি অুদ্ভত চিকিৎসা ব্যবস্থা আমাদের! 

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সংখ্যা নির্দেশকারী গ্রাফটি যখন কেবল ঊর্ধ্বমুখী, ঠিক সেই সময়েই বন্ধ থাকা কলকারখানা, দোকানপাট, অফিস-আদালত খুলে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে! দেশের আনাচে-কানাচে আব্দুর রাজ্জাকের মতো কত রোগী যে করোনা সিম্পটম নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে তার হিসাব কে রাখে? এ সংখ্যা যে নেহায়েত কম নয় তা এখন হলফ করে বলা যায়।

বিগত কয়দিন ধরে সংক্রমণের কাউন্ট ঊর্ধ্বগতি, উঠেই চলেছে। আর এদিকে দোকানপাট খোলার পায়তারা চলছে! মনে হচ্ছে দেশজুড়েই চলছে ঈদের আয়োজন! ঈদ জামাতেও হয়তো দেখা যাবে কাতারের মাঝ থেকে দু'চারজন আব্দুল রাজ্জাক মুখথুবড়ে পড়ে গেছেন! আশঙ্কাটা আমার অমূলক হলে খুবই খুশি হতাম, কিন্তু আজানা এক আতঙ্কে কে যেন বুকটা চেপে ধরেছে।  

প্রতিদিন কতজনকে টেস্ট করা হচ্ছে? তারমাঝেই সংক্রমণের সংখ্যা ৬০০-এর উপরে ৭০০ ছুঁইছুঁই। আর এই পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা শহরে আক্রান্তের সংখ্যাই বেশিরভাগ। আমরা ঢাকাবাসীরা যে একটা পারমাণবিক বোমার উপর দাঁড়িয়ে আছি তা বুঝতে এখন  আর বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার পড়ে না।

অনেক আগে থেকেই সর্বমহল থেকে হুশিয়ার করা হচ্ছে বাংলাদেশে মার্চ এবং এপ্রিল মাসে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে যে ব্যবস্থাগুলো নেয়া হয়েছিল, সেগুলোর একটি প্রভাব দেখা যাবে মে মাসে। মে মাসের প্রথম দিকে সংক্রমণের পিক (সর্বোচ্চ সংক্রমণের সংখ্যা) পাওয়া যাবে না, বরং এটি আরও প্রলম্বিত হবে। সবারই আশঙ্কা, মে মাসটি বাংলাদেশের জন্য 'ক্রিটিক্যাল' হতে পারে। এ দিকে কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। 

বিগত এক মাস ধরে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার, তাতো 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' টাইপ। বাঙালি লকডাউন বুঝতে চাইবে কেন? লেগডাউন দিয়ে ঘরে বসানোর দরকার ছিল। সরকার জেনেবুঝেও তা করেনি কেন আমার বুঝে আসে না। হেলায় খেলায় পুরো দেশটাকে যেদিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বা ঠেলে দেয়া হচ্ছে, সরকার কি তা সামাল দিতে পারবে?? 

কিছুতেই আমার বুঝে আসে না এতো সতর্ক করার পরও কেন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি, হচ্ছে না! তবে কি কোন একটা গোষ্ঠী চায় দেশে লক্ষ লক্ষ লাশ??

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
৪ মে, ২০২০.

শনিবার, ২০ জুন, ২০২০

রোম যখন পুড়ছিল নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল!

এই  মূহুর্তে  যতটুকু  মনে পড়ছে ৮ মার্চ  রবিবার প্রথম দেশে তিনজন করোনা  রোগী শনাক্ত হয়। তাদের  মধ্যে  দু'জন  ইতালি  ফেরত  পুরুষ  এবং  অন্যজন  নারী,  যিনি  ছিলেন দু'জনের কোন একজনের  আত্মীয়া।  সেই  থেকে  কত  কি  ভীতিকর  অবস্থার  মধ্য  দিয়ে  আমাদের ৬৭টি দিন অতিবাহিত  হলো;  এখনো  পর্যন্ত  নাকি করোনার ঊর্ধ্বগতির চূড়ান্ত সীমাই আসেনি! অদ্ভুত এক পরিস্থিতিতে  পড়ে  আছি।  দুঃখ  হয়- কেউ  বুঝে,  আবার  অনেকেই  বুঝে না বা বুঝতে চায় না। আমাদের  মাননীয়  প্রধানমন্ত্রীর  যথেষ্ট   সদিচ্ছা  থাকা  সত্ত্বেও সার্বিক করোনা পরিস্থিতি কেমন যেন    উলটপালট    হয়ে    গেল!    একে    একে   সবকিছুই   নিয়ন্ত্রণের   বাহিরে   চলে   যাচ্ছে। 

এতোটা দিন ধরে আমরা সাধারণরা যে কি পরিমাণ কষ্টে কালাতিপাত করছি, তা বুঝাবো কাকে? নিজের কষ্ট নিজের মাঝেই রাখি! কিন্তু, বিগত কয়দিন বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কেন যেন হটাৎ বেশ খটকায় পড়ে গেছি— তবে কি করোনা নিয়ে মিছেমিছি কোন প্রপাগাণ্ডা রটিয়েছে বা রটাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা?? বাংলাদেশের দিকে তাকাতেই আবার কেন জানি রোম সম্রাট সেই বাঁশিওয়ালা নিরো, আর লঙ্কার সেই হনুমান ও রাবণের কথা মনে পড়ে গেল! 

ছোটবেলা থেকে একটি প্রবাদ শুনে বড় হয়েছি— 'রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল!' বড় হয়ে এ নিয়ে অনেক গবেষণা করেছি; এ পর্যন্ত যা জেনেছি তা হলো, মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিরো রোমের সম্রাট হন। তিনি ক্ষমতায় আসেন ৫৪ খৃস্টাব্দের দিকে। সেই সময় রোমান সাম্রাজ্য খুবই বিস্তৃত ছিল; পশ্চিমে স্পেন, উত্তরে ব্রিটেন, আর পূর্বে ছিল সিরিয়া।

সম্রাট নিরোর শাসনকালের প্রথম পাঁচ বছরকে দেখা হয় রোমান জনগণের 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে। সিনেটের হাতে তিনি সকল ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। রোমের সেনাবাহিনীকে এক পাশে সরিয়ে রেখে, খেলাধুলার মতো নানান ধরনের প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ লোকজনের খুবই কাছে চলে যান তিনি এবং খুবই জনপ্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। কিন্তু এই অবস্থা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ভয়ঙ্কর সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতা তার এই সাফল্যকে অচিরেই ম্লান করে দেয়। ভয়ঙ্কর সব নিষ্ঠুরতা তার শাসনকালের বাকি পুরো সময়জুড়েই অব্যাহত থাকে। 

রোমান সম্রাট নিরো ইতিহাসের পাতায় সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং পাগলাটে শাসকদের একজন হিসেবে পরিচিত। বলা হয়, তিনি তার মাকে হত্যা করেছেন, হত্যা করেছেন তার সৎ ভাই ও স্ত্রীদেরও। খ্রিস্টানদের উপর চালিয়েছিলেন অকথ্য নির্যাতন  নিপীড়ন। ব্যক্তি জীবনে সম্রাট নিরো ছিলেন অত্যন্ত বেহিসেবি; বিশাল আকারের একটি প্রাসাদ নির্মাণ করতে গিয়ে তার পেছনে উড়িয়ে দেন অঢেল অর্থ। একই সাথে তিনি খেলাধুলারও আয়োজন করতেন; আয়োজন করতেন রথ দৌড় প্রতিযোগিতা। মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে অভিনয়ও করতেন তিনি এবং নিজেকে দাবি করতেন একজন শিল্পী হিসেবে। 

৬৪ খৃস্টাব্দে ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডে রোমের বেশিরভাগ এলাকা পুড়ে গিয়েছিল। গুজব আছে— নিরো নিজেই  নাকি ওই আগুনটা লাগিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, এও দাবী করা হয়— রোম নগরী যখন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল তখন তিনি নাকি বেহালা বাজাচ্ছিলেন! সেই থেকেই ইতিহাসে ছড়িয়ে পড়ে, রোম নগরী যখন আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছিল তখন সেদিকে নিরোর কোন ভ্রুক্ষেপই ছিল না; বরং সে সময় তিনি বাঁশি বাজাচ্ছিলেন!

নিরোর বয়স ৩০ হতেই তার বিরুদ্ধে বিরোধিতা চরমে পৌঁছে। সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে সেইসব সিনেটররাই তাকে 'জনগণের শত্রু' হিসেবে ঘোষণা করেছিল! এর অর্থ হলো- নিরোকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই তাকে হত্যা করা হবে! এরপর নিরো মফস্বলের মতো একটি জায়গায় পালিয়ে গিয়ে সেখানকার একটি ভিলাতে আশ্রয় নেন। রক্ষীরা যখন তার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন তিনি সেখানেই আত্মহত্যা করেন।

বলা হয়ে থাকে, মারা যাবার সময় তিনি 'কোয়ালিস আর্টিফেক্স পেরেও' বলে চিৎকার করছিলেন। এটা বলে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন তা আজও পৃথিবীতে স্পষ্ট নয়। কারণ এ কথার নানান অর্থ হয়; এক অর্থে— 'আমার মৃত্যুর সময়ে আমি কী দারুণ এক শিল্পী!', অথবা— 'আমার সাথে কী এক শিল্পীর মৃত্যু হচ্ছে!', অথবা— 'আমি একজন বণিকের মতো মারা যাচ্ছি।'
অর্থ যা-ই হউক না কেন, মৃত্যুর আগে এই শেষ উচ্চারণও তার সারা জীবনের মতোই নাটকীয়। 

রামায়ণে বর্ণিত হনুমান পবননন্দন হিসেবে হিন্দুদের নিকট অতি পূজনীয়। রামের দূত হিসেবে লঙ্কায় যাওয়ার পর হনুমানের লেজে আগুন ধরিয়ে দেয় রাবণ। আর সেই আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় গোটা লঙ্কা! তবে কখনও ভেবে দেখেছেন কি সেই অগ্নিকাণ্ডে হনুমান দগ্ধ হলো না কেন? কেনই-বা কোন কষ্টও সহ্য করতে হয়নি হনুমানকে??

আসলে এই লঙ্কা কাণ্ডের পিছনে রয়েছে অন্য আরেকটি গল্প। জানা যায়, হনুমান নয় আসলে দেবী পার্বতীই আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল লঙ্কায়! প্রাচীন গ্রন্থ থেকে এ কথাটি জানা যায়— একসময় দেবী পার্বতী চেয়েছিল একটি আলাদা বাড়িতে স্বামী-পুত্র নিয়ে সংসার করতে। সেই ইচ্ছে প্রকাশ করেন তিনি তার স্বামী শিবের কাছে। স্ত্রী’র ইচ্ছার কথা শুনে কুবেরকে নির্দেশ দেন শিব। কুবের সেই কথা মেনে একটি সোনার বাড়ি তৈরি করে দেয়। অপূর্ব সুন্দর সেই প্রাসাদ দেখতে ছুটে যান দেব-দেবীরা। শিবের ভক্ত রাবণও যায় ওই প্রাসাদ চাক্ষুষ করতে। গিয়ে দেখে, ত্রিভুবনে এর থেকে সুন্দর জিনিস আর কিছু হতে পারে না!

লোভ সামলাতে পারেনি রাবণ। সে শিবের কাছে ব্রাহ্মণের রূপ ধরে ওই প্রাসাদ ভিক্ষা হিসেবে চায়। ভক্তের অভিসন্ধি আগেই জানতে পেরেছিলেন শিব। তিনি আর দু’বার না ভেবে বাড়িটি দিয়ে দেন রাবণকে। আর একথা জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হন পার্বতী। তাঁর সাধের বাড়িতে অন্য কেউ থাকবে, এটা ভাবতে পারছিলেন না পার্বতী। তিনি স্বামীকে বলেন, অন্তত যেন ওই বাড়ি ভেঙে রাবণের জন্য অন্য একটা নতুন প্রাসাদ তৈরি করে দেওয়া হয়। 

কিন্তু শিব তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, ত্রেতাযুগে পুনরাবির্ভাব হলে তিনি নিজে হনুমান হয়ে আসবেন। রামের দূত হয়ে লঙ্কার দৈত্যদের নাশ করতে সাহায্য করবেন। আর তাঁর লেজেই থাকবেন পার্বতী। তখন রাবণকে শাস্তি দিতে পার্বতী যেন আগুন জ্বালায়; পার্বতী রাজি হন। আর সেই কারণেই হনুমানের লেজ কখনও ধ্বংস করা সম্ভব ছিল না। সেই কারণেই হনুমানের লেজের আগুনে লঙ্কাপুরী দগ্ধ হলেও তার কোনও ক্ষতি হয়নি আঘাত লাগেনি!

করোনাভাইরাস ক্রাইসিসকে সম্বল করে প্রথম থেকেই দেশে কিছু রাবণের সৃষ্টি হয়েছে, কিছু হনুমানেরও দেখা মিলেছে! আর অন্য যা কিছু হয়েছে বা ঘটেছে সেসব নেহায়েতই ছেলেখেলা! বর্তমানে যা ঘটছে তা তো রীতিমতো নাটক!! ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে প্রথম দফার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল, সম্ভবত এই সাধারণ ছুটি আবারও ৩০ মে পর্যন্ত বর্ধিত হবে। করোনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে একে একে বাড়ানো হয়েছে ছুটি, কিন্তু কাজের কাজটা হয়েছে কি??   

সারা বিশ্বে করোনা সংক্রমণ অব্যাহত; কবে এর প্রভাবমুক্ত হবে পৃথিবীর কেউ তা জানে না। তবে অবস্থা বিবেচনায় একটা সময় বিশ্বের অনেক দেশেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে, লকডাউন শিথিল করা হয়েছে; কিন্তু তা করোনা সংক্রমণের হট সময়ে কেউ করেনি। তুলনামূলক বিবেচনায় বাংলাদেশে সংক্রমণের হার বর্তমানে পর্যায়ক্রমিক ঊর্ধ্বগতির। বুধবার (১৩ মে) দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত অনলাইন স্বাস্থ্য বুলেটিন থেকে জানা যায়— গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ১,১৬২ জন; নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে  ৭,৯০০ জনের। অর্থাৎ- গড় হিসাবে পরীক্ষা করা প্রায় প্রতি ৭ জনে মধ্যে ১ জন করোনা সংক্রমিত।

প্রথম থেকেই লক্ষ্য করে আসছি সরকারের প্রতিটা সিদ্ধান্তই ক্ষণে ক্ষণে কেমন যেন এলোমেলো! করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি থাকা অবস্থায়ই একে একে মসজিদ মন্দির গীর্জাসহ সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হলো, ১০ মে থেকে শর্তসাপেক্ষে দোকানপাট খুলে দেয়া হলো, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি এবং কিছু অফিসও খুলে দেয়া হলো বেশ আগেই। প্রেক্ষিতে যা ঘটার তাই ঘটেছে, মানুষজন দিব্যি রাস্তায় চলাফেরা শুরু করে দিয়েছে। বলতে গেলে আরামসে রাস্তায় নেমে পড়েছে, দেদারসে ঈদ মার্কেটিং করছে! এসব দৃশ্য দেখলে মনে হয় না এদেশে কারো কোন অভাব-অভিযোগ আছে। 

হাজার হাজার কোটি টাকা কেন প্রনোদণা দেয়া হয়েছে? পরিতাপের বিষয় হলো, যারা এ প্রনোদণার ভাগিদার তারা ঢাকার রাস্তায় এখনই রীতিমতো ও নিয়মিত ট্রাফিক জ্যাম ফেলে দিয়েছে! একদিকে হু হু করে বাড়ছে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা, অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে চলছে তথাকথিত পয়সাওয়ালাদের বেলাল্লাপনা! করোনার কারণে সরকার একের পর এক সুযোগ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে জনগণকে। আগের গুলো অনেকটাই মিসইউজ হয়েছে, তা বাদই দিলাম। আজও সারা দেশের ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের জন্য আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী; যার জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১,২৫০ কোটি টাকা। 

এতো কিছু কেন করছেন তিনি বা কেন করা হচ্ছে? অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতি পূরণের সাহায্যার্থে? তবে কি সেই জনগণের উচিত নয় দেশের আইনকে মান্য করা? কিন্তু কি অদ্ভুত জনগণ আমরা, ছুটি ভোগ করছি, নানান সুবিধা নিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আইন মানছি না বেশিরভাগেই! এমনকি  লকডাউনের সাধারণ নিয়মকানুনগুলোও মানছি না! 

বিগত দুই মাস সার্বিকভাবে দেখেশুনে যা বুঝতে পেরেছি তাতে মনে হচ্ছে এদেশে করোনার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র একজন, একাই লড়াই করে যাচ্ছেন। আর তিনি হলেন আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী। অন্য কারো করোনা নিয়ে কোন মাথা ব্যথা বা দুশ্চিন্তা আছে কি না তা বুঝার কোন উপায় নেই! দিব্যি তারা ফ্যাশন শো করে বেড়াচ্ছে! অনেক ক্ষেত্রে চুরিচামারি আগের চেয়েও বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে! আবার সেই তারাই একে অন্যকে দোষারোপ করছে, বিরুদ্ধাচারণ করছে! কিন্তু, অনন্য একজন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই সার্বক্ষণিক কাজ করছেন পুরো দেশ ও জাতির জন্য। তিনিই প্রতিটি মূহুর্তে চেষ্টা করছেন, উপদেশ দিচ্ছেন মানুষকে; তাগিদ দিচ্ছেন ঘরে থাকতে।

কিন্তু বাঙালি বড় ত্যান্দোড়! নরম পেলে গতরে উঠতে এক সেকেন্ড সময় নেয় না। তাই তো দেশে লকডাউন কার্যকরী হয়নি; তারা মানছে না। লকডাউন বাদ দিয়ে যদি বিগত দিনের প্রথমেই লেগডাউন করা হতো, তবে হয়তো এরই মধ্যে করোনার গতি ক্রমডাউন হয়ে যেতো। এভাবে চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে হয়তো কঠিন কোন ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবেলা আমাদেরকে করতে হতে পারে। অবশ্য এসব বুঝার মতো সক্ষমতা এ জাতির খুব কম মানুষেরই আছে। তাছাড়া বাঙালির নিজ গায়ে আগুন না লাগলে কখনো তারা টের পায় না আগুন কি জিনিস? বরং অন্যের গায়ের আগুন নিয়ে এ জাতির চিরায়ত তামাশার স্বভাব! 

যাদের বোধ-বুদ্ধি আছে তারা করোনা পরিস্থিতিতে আগেও নিয়মনীতি মেনে ঘরে থেকেছে, এখনো থাকছে। কিন্তু এই সংখ্যা নেহায়েত হাতে গণা। অবশ্য তারা আছেন মহাবিপদে। তাদের সবার একই কথা— এই মূহুর্তে করোনাভাইরাসের লাগাম টেনে না ধরতে পারলে সামনে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে জাতিকে, তার শক্তি সাহস বা সামর্থ্য কোনটাই এ জাতির থাকবে কিনা সন্দেহ; মনে হয় না মোটেও থাকবে! 

তাই ভুল যা হওয়ার হয়ে গেছে, বাদ। এই মূহুর্ত থেকে সরকারের উচিত কড়াকড়ি লকডাউন আরোপ করার দিকে যাওয়া বা কারফিউ দেয়া। প্রয়োজনে আজ এবং এই মূহুর্ত থেকেই যে যেখানে যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায়ই ১৫/২০ দিনের জন্য পুরো জাতিকে কে স্থির করে দেয়া। নয়তো কিছুতেই করোনাভাইরাস সংক্রমণের লাগাম টানা যাবে না। ৬৪ জেলায় এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, আর এভাবে যদি চলতে থাকে তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি দেশের ৮০% মানুষ সংক্রমিত না হওয়া পর্যন্ত এই করোনা থামবে না।

যা করার এই মূহুর্তেই করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী; আপনার জন্য মাত্র একটি ঘোষণা। দেশবাসী এখনো শুধুমাত্র এবং একমাত্র আপনাকেই ভরসা করে। করোনাভাইরাস মহামারি যে মহাদূর্যোগ বয়ে আনছে তা চোখের সামনে প্রস্ফুটিত! তখন কিন্তু আর আফসোস করেও কোন লাভ হবে না। এ দেশের নিরো, রাবণ ও হনুমানরা কিন্তু বাঁশি হাতে, ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতে বা লেজে আগুন নিয়ে ঠিকই বসে আছে।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
১৪ মে, ২০২০.