সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২০

ধর্ষণ!


ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেই ধর্ষক সব চুপসে যাবে, আমি মোটেও তা মনে করি না। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে অনুমোদন পেয়েছে জেনে খুশি হয়েছি, কিন্তু দেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি বা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার যে বাজে অবস্থা তা চিন্তা করে শংকিতও হচ্ছি; মোটেও ভরসা পাচ্ছি না। এ থেকে বিচারব্যবস্থা কি আদপে বেরুতে পারবে? বিচার প্রক্রিয়ার গ্যারাকলে পড়ে কোন ধর্ষিতা আবার বারংবার ধর্ষিত হবে না তো? যে গাছের গোড়ায় পচন, সে গাছের আগায় পানি দিয়ে কি লাভ হবে? 

যে জাতির বেশিরভাগ মানুষের বোধ-বুদ্ধি বলতে গেলে লোপ পেয়েছে, সে জাতির সামনে এসব কাগুজে আইন পাশের খবরের কোন মাহাত্ম্য আছে কি? তাছাড়া বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে চলমান বিদ্যমান, সমাজব্যবস্থাকে যা প্রায় গ্রাস করে ফেলেছে, সেখানে শুধুমাত্র আইন পাশ করে কোন লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না; বরং আইনের প্রয়োগের জন্য কঠিন  আইন করা উচিত, করতে হবে। ভাবতেও কষ্ট লাগে— লাইন না থাকলে এখনো এদেশে আইনের ধারেকাছেও যাওয়া যায় না বা পাওয়া যায় না! আইনের প্রয়োগ অপপ্রয়োগ সব যেন দূর্বলের জন্য! হাই/হ্যালো  বা অনৈতিক  অর্থনৈতিক সুবিধার মাঝে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে সবকিছু। আমরা তো এমন ছিলাম না, কেন এমন হলাম? অন্যের দোষ খুব বেশি চোখে পড়ে আমাদের,  নিজের দোষ মোটেও চোখে পড়ে না। পুরো সমাজব্যবস্থায়ই ধস নেমেছে, দেশের বিচারব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে সে তো অনেক আগেই, অথবা শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। এমতাবস্থায় শুধুমাত্র আইন সংশোধন করে বা সাজা বাড়িয়ে কি লাভ?   

যে মানুষের মগজে পচন ধরে সে মানুষকে বাঁচানো কঠিন, আর যে সমাজের রন্ধ্রে পচন ধরে সে জাতির কপালে অন্ধকার অমানিশা। সমাজের প্রতিটি স্তর যেভাবে নষ্ট হয়েছে শুধুমাত্র আইন করে কি ধ্বংস ঠেকানো বা রোধ করা সম্ভব?  কাগুজে  আইন যতই করা হউক না কেন, তা কার্যকরী না হলে তাতে জাতির কোনই কল্যাণ হবে না, এবং যতদিন না মানুষের বিবেক জাগ্রত হবে ততদিন কিছুতেই কিচ্ছু হবে না। তাছাড়া আইন যখন নিজস্ব গতি হারিয়ে প্রভাবশালীদের হাই/হ্যালো বা বিত্তবানদের অর্থের বৃত্তে আবদ্ধ  হয়ে পড়েছে, সে সমাজে সাধারণ জনগণ কি আশা করতে পারে বা পারবে? তা তাদের কোন কল্যাণেই আসবে না। সমাজের প্রতিটি সাধারণ মানুষ আজ জিম্মি, অসহায়। হাতেগোনা কিছু অমানুষের কাছে আমরা প্রায় সবায় জিম্মি, সেইসব কিছু দুষ্কৃতিকারীর কাছেই আমরা যেন সব কিছু তুলে দিয়ে বসে ঝিমাচ্ছি। আর তারা নির্ভয়ে ও নির্ভাবনায় তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। 

স্পর্শকাতর কিছু ঘটনায় হয়তো আমরা সোস্যাল মিডিয়ায় কখনো চিল্লাচিল্লি করি, করছি  লিখছি কেউ কেউ! সেই প্রতিবাদ আন্দোলন বা আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষিতে যদিওবা কোন অপরাধীর বিরুদ্ধে সরকার সক্রিয় হয়, কিছু করে, এক সময় দেখা যায় আইনের মারপ্যাঁচে ফলাফল শূন্য; রায় বিলম্বিত হওয়ার কারণে ভিকটিম নিশ্চুপ হয়ে যায়, আর সেই সুযোগ নেয় ধর্ষক। তাছাড়াও আরও কিছু বাজে সংস্কৃতি এর পেছনে কাজ করে— একশ্রেণির লোকের আইনি ব্যবসাকে চাঙ্গা করার প্রক্রিয়ায় বিচারকার্য দীর্ঘ হতে থাকে, সরকারেরও চেষ্টা থাকে জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর; জন্ম হয় নতুন ধর্ষকের! এভাবেই জন্ম নিচ্ছে নতুন ধর্ষক। 

আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়া, প্রচারমাধ্যম ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে যে ছকে বেঁধে রাখা হয়েছে সেই ছকের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ ঢুকে গেছে অদ্ভুত সব অমানবিকতার চর্চা এবং তা আমরাই করছি। প্রতিটি ছক চলছে এখন অদ্ভুত এক পুঁজিবাদী আর বস্তুবাদী কায়দায়। আর এ'সকল সকল মিডিয়ায়ই নারী হলো আনন্দ-বিনোদনের এক মোহনীয় পণ্যবস্তু! ফলে নারীরা কখনো  নিজেকে উচ্চতর সত্তা ভাবতেও পারছে না। সবখানে এমনভাবে নারীকে চিত্রায়িত করা হচ্ছে— যেন নারীর কাজই হলো নিজেকে রূপসজ্জায় সজ্জিত রাখা বা করা! আর পুরুষ হবে সেই সাজসজ্জার ভোক্তা! এভাবে মিডিয়া আজ নারী ও পুরুষ উভয়কে মোহাচ্ছন্নতার জালে আবদ্ধ করে ফেলেছে এবং রাখছে। আর এ ধরনের মিডিয়াকেই দেয়া হচ্ছে অপার স্বাধীনতা। বহুজাতিক কোম্পানির পুঁজিবাদী বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো চাঙ্গা রাখতে এরূপ নিম্নমানের স্বাধীনতাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধতা দেয়া হচ্ছে এবং তাদের মদদও যোগানো হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রায় সবার হাতে আজ চলে এসেছে স্মার্টফোন। যে তিনবেলা খাবার জোগাড় করতে পারে না তার হাতেও আছে একটি স্মার্টফোন। এই স্মার্টফোনের মধ্যে কি রক্ষিত আছে তা আমরা কেউ ভাবি না! রক্ষিত আছে নেশাদ্রব্যের মতো অদ্ভুত সব বিনোদনসামগ্রী। এসব বিনোদন সামগ্রীই প্রতিটি মুহূর্তে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা প্রত্যেককে ইন্দ্রিয় লালসায় উন্মত্ত করে তুলছে। একটি স্মার্টফোন যত সহজে একজন মানুষকে উত্তেজিত করে তুলতে পারে, এমনটি আর কোন যন্ত্র করতে পারে কিনা আমার সন্দেহ। ফলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সব দুয়ার আজ বন্ধ হওয়ার পথে বা হয়ে গেছে। মাদকের ব্যাপারে আইনি বাধা থাকলেও স্মার্টফোনের ব্যাপারে কোন আইনি বাধাই নেই। অথচ স্মার্টফোন যে ভয়ংকর মাদকতা ছড়াচ্ছে, তা ভাবারও অতীত। এর পরিণতি কত ভয়ানক ও ভয়াবহ তা হয়তো অনেকে কল্পনাও আনতে পারে না। শুধুমাত্র স্মার্টফোনের মেসেঞ্জারে প্রতিদিন যে পরিমাণ ইভ টিজিং হয়, তা কেউ হিসাব রেখেছে কি? ভুক্তভোগীমাত্রই তা জানেন ও বোঝেন। আমার মনে হয় শুধুমাত্র ফেসবুক মেসেঞ্জারে যে ইভ টিজিং প্রতিক্ষণে হয়, তা-ই অন্য সব মাধ্যমকে হার মানায়!

বেশিরভাগ ধর্মীয় বয়ানেও প্রাজ্ঞতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে; বক্তারা এমন সব বক্তব্য করে বা দেয় যেখানে ক্ষণে ক্ষণে থাকে অতি উত্তেজক কথাবার্তা। কেউ কেউ আবার এমনসব  বাচনভঙ্গি করে যা নারীর বিরুদ্ধে পুরুষকে উস্কে দেয়। যারা এসব করছে, তাদের মধ্যে সূক্ষ্মদর্শী বিশ্লেষণের বড়ই অভাব দেখা যায়; সস্তা জনপ্রিয়তা ও ভোগ তাদের একমাত্র কাম্য। এসব বয়ানে নারীদের যেভাবে হিজাবের ব্যাপারে উচ্চ সতর্ক হতে বলা হয়, সেভাবে পুরুষদের লক্ষ্য করে কখনো তাদেরকে তেমন একটা বলতে দেখি না। তাছাড়া নারীর বেপর্দাকে যেভাবে ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয়, সেভাবে পুরুষের বেপর্দাকে দায়ী করা হয় না। ধর্ষণের ক্ষেত্রে আক্রমণকারী যেহেতু পুরুষ, সেক্ষেত্রে কী করে পুরুষরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কীভাবে নারী ও পুরুষের নৈতিকতার চর্চা করতে হয়, এসব বিষয় নিয়ে তারা খুব একটা ভাবে না, বা এসব বিষয়ে তাদের পর্যাপ্ত জ্ঞানও নেই বলে মনে হয়।

তাছাড়া গ্লোবালাইজেশনের ছোঁয়ায় আধুনিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা কি? উত্তেজনাই যে শিক্ষার প্রথম পাঠ, নৈতিকতা গঠনের পরিমাপক। যেখানে  বহুবিধ সম্পর্ক, পরকীয়া আর ব্যভিচারকে বলতে গেলে সামাজিক বৈধতা দেয়া হয়! হটাৎ এক দিনে তো এসব ঘটছে না বা এমন অবস্থা হয়নি? মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানুষের মানসিক বিকাশ বিষয়ে একটি বৈপ্লবিক তত্ত্ব দিয়েছিলেন, আজকের দুনিয়ার মানুষ সেই তত্ত্ব অনুসরণ করেই চলছে। এ থেকেই এসব; এবং সমাজের এমনটা হয়েছে বলে আমি মনে করি। এই তত্ত্বে মানুষের মানসিক বিকাশকে কাম তথা যৌনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। 

ফ্রয়েডের মতে— মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ সর্বমোট পাঁচটি যৌন স্তরের মধ্যে দিয়ে সম্পূর্ণ হয়। এর যে কোনও একটিতে সমস্যা- বিশেষ করে অতৃপ্তি ঘটে গেলে মানুষের ব্যক্তিত্ব অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। শিশুকাল থেকে যে পাঁচটি মানসিক যৌন স্তরের মধ্য দিয়ে মানুষকে যেতে হয় সেগুলো হচ্ছে— মৌখিক অবস্থা (oral stage), পায়ু অবস্থা (anal stage), শিশ্ন অবস্থা (phallic stage),সুপ্তযৌন অবস্থা (latency stage), এবং উপস্থঃ অবস্থা (genital stage)।

ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের যৌন বাসনাগুলো যদি ভালভাবে পূর্ণ না হয়, তবে মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সেজন্য তিনি মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশের স্তরগুলোকে মনোযৌন বিকাশ নামকরণ করেছিলেন। ফ্রয়েড মনোযৌন বিকাশ তত্ত্ব দ্বারা প্রমাণ করেন যে, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির মতো শিশুদেরও যৌন অনুভূতি থাকে। শৈশবকালে নিজ দেহের যৌন-সংবেদী অঞ্চলগুলির সুখদায়ক অনুভূতি শিশুকে যৌন-তৃপ্তি দেয়। শৈশব যৌনতাকে ফ্রয়েড আত্ম-রতি (Auto-Erotism) বলে অভিহিত করেছিলেন।

বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় আজ আমরা সকলেই কমবেশি ফ্রয়েডীয় চিন্তা-চেতনার দাস হয়ে ধীরে ধীরে অনুগামীও হয়ে পড়েছি। আধুনিক শিক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তির অবাধ প্রসারে ফ্রয়েডীয় ধ্যান-ধারণার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। ফ্রয়েডীয় লিবিডো ধারণাকেই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাচ্ছে পুঁজিবাদী বিশ্বের সকল পুঁজিবাদী মিডিয়া। ফলে সকল মাধ্যমেই কামুকতার চর্চাকে আজ আত্মনিয়ন্ত্রণের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আর তাতে অভ্যস্ত করে তুলছে আমাদের সবাইকে। 

যৌবনের ধর্ম হলো এক অদ্ভুত অবদমন বা মানসিক অস্থিরতা অনুভব। আমারা কি পারছি বা কতটা পেরেছি আমাদের  সমাজে ফ্রয়েডীয় চিন্তার পরিপূর্ণ বিস্তার ঘটাতে? কত পার্সেন্ট বাবা-মা তার সন্তানের সাথে যৌবনের ধর্ম নিয়ে খোলামেলা আলাপ করতে পারে? বা কত পার্সেন্ট পোলাপানই-বা সুযোগ পায় কার্যকরী ফ্র‍য়েডীয় মতবাদ শিখার বা প্র‍য়োগের? তাই তো স্মার্টফোন মিডিয়ায় ডুবে থাকা নগ্নতার নিষিদ্ধ আকর্ষণে না-জানা না-চেনা নেশায় উন্মত্ত  হয়ে অনেকেই ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজে উদ্ভুদ্ধ হয়ে উঠে; তাই তো এর এতো বিস্তার এত প্রসার; যা আজ মহামারী রূপ নিয়েছে। আমি বলি কি— সমস্যাটা আসলে ধর্ষণের মধ্যে নয়, সমস্যাটা সমাজের; অনাঙ্ক্ষিতভাবে ফ্রয়েডীয় কালচারের প্রচার-প্রসার ও অপরিপক্ক অভ্যস্ততার। তাই, গোড়ায় হাত না দিয়ে আগা পরিস্কার করে কোন লাভ হবে না, চিন্তা করতে হবে মূল সমস্যার, নয়তো সমস্যা আরও প্রকট হবে এবং ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।

সময় এসেছে নতুনভাবে চিন্তা করার— নিজেকে পাল্টাবার, তবেই পাল্টাবে সমাজ; পাল্টাবে দেশ ও জাতি। তখন আর এদেশে কোন নারী ধর্ষিত হবে না, ধর্ষকের জন্য নতুন আইনও পাশ করতে হবে না।। 

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
১২ অক্টোবর, ২০২০.

শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২০

প্রোপাগাণ্ডার পরিসমাপ্তি কবে হবে?

মুক্তিযুদ্ধ ও তদপরবর্তী সময়, বিশেষ করে ৭৪/৭৫ নিয়ে এদেশের তরুণ প্রজন্মের একাংশের মাঝে এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণার জন্ম হয়েছে, যা করা হয়েছে অত্যন্ত কূটকৌশলে;  যা পড়ে জেনে আজকের তরুণতরুণীর অনেকে এরই মাঝে বিভ্রান্তির অতলে তলিয়ে গেছে। তাদের মনে এমনসব ভ্রান্ত ধারণা জন্ম নেয়ার পিছনের বহুবিদ কারণের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে - গুগোল সার্চে ঐ সময়কার সঠিক তথ্য সম্বলিত সামাজিক চিত্র বা ইতিহাস তুলে ধরে লেখালেখি তারা খুব কমই পেয়েছে, পায়; বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের পক্ষের লেখার চেয়ে বিরুদ্ধে লেখা  তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি পাওয়া যায়, পাচ্ছে এবং দেখেছে, পড়ছে। তারা যা বা যতোটুকোই লেখা পাচ্ছে বা দেখেছে তার প্রায় সবটাই ৭৫ পরবর্তীতে তৈরি করা স্বাধীনতাবিরোধীদের লেখা, তাদের হাতে গড়া এক ধরনের মিথ্যার পাণ্ডুলিপি; অথবা তৎকালীন সময়ে তৈরী করা এক ধরনের নেতিবাচক প্রচার-প্রচারণা, যা ছিল বেশিরভাগই প্রোপাগাণ্ডা। 

আজকের তরুণতরুণীরা অনেকটাই অনলাইন নির্ভর। তারা যা বা যতটুকো পড়ে তার সবটাই অনলাইনে পড়তে চায় জানতে চায়; পবিত্র কোর'আন পড়লেও তারা তা অনলাইনে পড়ে! গল্প ইতিহাস উপন্যাস কবিতা সাহিত্য সব সবকিছুই তারা অনলাইন থেকে পড়তে চায় জানতে চায়; এক কথায় দিনদিন তারা অনেকটাই অনলাইনের উপর নির্ভরশীল ও বিশ্বাসী হয়ে পড়ছে। তাই অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মিথ্যা ইতিহাস পড়ে পড়ে তা-ই তারা ধারণ করছে। অনেক চিন্তা করে আমি আবিষ্কার করেছি সেই সব মিথ্যা অপপ্রচার এখন অনেকেই বিশ্বাস করছে এবং তা নিয়ে মেতেও আছে। 

একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের যেসব ঘটনা অনলাইন জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার সবটাই প্রায় এক ধরণের মিথ্যা অপপ্রচার। ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ ও পূর্ববর্তী সময়গুলোকে তারা বলতে চায় বঙ্গবন্ধুর কুশাসনের ফসল। বলার কারণ, ওইসব একচেটিয়া একমুখী লেখালেখি। কখনো ওরা এর পিছনের গভীর ষড়যন্ত্রের কথা চিন্তাও করেনি; যা স্বাধীনতার পর থেকেই করা হয়েছে এবং চলে আসছে। অনেক খুঁজে আমি একটি জিনিস আবিষ্কার করেছি— এইসব লেখালেখি হয়তো স্বাধীনতাবিরোধীদের কারো না কারো, নয়তো তাদের পয়সায় বিক্রি হওয়া কোন বুদ্ধিব্যবসায়ীর মনগড়া সব পাণ্ডুলিপি। অনলাইনে এখনো মুক্তিযুদ্ধের অনেক নেতিবাচক বানানো গল্প বসে আছে বা ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। এইসব পড়ে পড়ে তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ প্রতিনিয়ত নতুনভাবে বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হচ্ছে এবং সেই সব বিভ্রান্তিতেই মেতে আছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বেকার প্রজন্ম আমরা যারা কালের স্বাক্ষী হয়ে আজও বেঁচে আছি নিশ্চয় এসব দেখে আমাদের কষ্ট হয়, কিন্তু কিছুই করার নেই; এই সব দেখারও যেন কেউ নেই। 

হে আজকের তরুণ প্রজন্ম, তোমরা একটু ভাল করে ভেবে দেখো দেশ শাসন করার মতো কতোটা সময় পেয়েছিলেন জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান? দেশ গঠন করা বা গড়ার মতো কতটুকো সময় তিনি পেয়েছিলেন? যুদ্ধবিধ্যস্ত একটা দেশ ও জাতি ৩/৪ বছরে পুনর্গঠিত করা যায় কি করে বা তা কি করে সম্ভব? সময়ের আগেই তো বপন করা হয়ে গিয়েছিল গভীর এক ষড়যন্ত্রের বীজ, শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র। তারা খুব ভাল করেই জানতো বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে না পারলে তারা কোনদিনও এদেশে সুবিধা করতে পারবে না; তাই তিনিই তাদের প্রথম টার্গেট হন। যুদ্ধাপরাধীর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা শোনার পর দেশবিদেশে লুকিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে এবং কিছু অতিলোভী মুক্তিযুদ্ধাকেও তাদের দলভুক্ত করে নেয়। ১৫ আগস্ট ৭৫ তারা ষোলকলা পূর্ণ করে জাতিরজনককে হত্যার মাধ্যমে। 

এই তো, মনে হয় যেন সেই দিন; কত কঠিনই-না ছিল আমাদের সেই পথচলা। বিশেষ করে ৭০ এর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর পরবর্তী দিনগুলো। মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়গুলোকে বিতর্কিত করার দূরঅভিসন্ধি নিয়ে আজ যারা এর পিছনে কলকাঠি নাড়ছে তারাই সেইদিন গোপনে অথবা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল। আজ যেমন যুদ্ধাপরাধীর বিচার সময়ের দাবী, সেদিন স্বাধীনতাও ছিল সময়ের দাবী। 

১২ নভেম্বর ১৯৭০, উপকূলীয় এলাকায় ঘটে গিয়েছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং প্রলয়ঙ্করী এক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস; সমগ্র উপকূলবাসীর জন্য সেই দিনটি ছিল এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের দিন। দীর্ঘ ৪৫ বছর কেটে গেলেও স্বজনহারা মানুষ সেদিনের কথা আজও ভুলতে পারেনি। সেদিন পূর্ব পাকিস্থানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড হয়ে শুধু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসটি ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে গিয়েছিল, প্রায় সমগ্র দেশটাকে তচনচ করে ফেলেছিল। 

যতটুকো মনে পরে সেই দিনটি ছিল রোজার দিন। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিসহ সারাদিন সারাদেশে টানা বাতাস বইছিল। রাতে উপকূলের উপর দিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটারের উপর বেগে বয়ে যায় এক প্রচণ্ড শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস; শুধু রেখে যায় রাশিরাশি ধ্বংসযজ্ঞ। বহু মানুষ সেদিন তাদের প্রিয়জনের লাশও খুঁজে পায়নি। জলোচ্ছ্বাসের পর থেকে দেড় মাস পর্যন্ত স্বজনহারাদের কান্নায় উপকূলের আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে গিয়েছিল। গত ৪ দশকে পৃথিবীর এই অঞ্চলে যতক'টি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে তার সবক'টির চেয়ে ওই ঝড়টি ছিল সবচেয়ে বেশি হিংস্র ও মারাত্মক। 

৭০-এর 'হারিকেন'রূপী ওই ঝড়টি উপকূলীয় ভোলা, বরিশাল, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনাসহ দেশের প্রায় ১৮টি জেলাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি আজকের মতো এতোটা শক্তিশালী ছিল না, অনেকটা দুর্বল থাকায় উপকূলের অনেক মানুষই ঝড়ের পূর্বাভাস জানতে পারেনি শুনতে পায়নি। তাই হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল কল্পনাতীত। ঘূর্ণিঝড়ে জলোচ্ছ্বাস ছিল ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট। কেউ-বা গাছের ডালে কেউ-বা উঁচু ছাদে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে প্রাণে রক্ষা পেলেও ৩/৪ দিন তাদের অভুক্তই কাটাতে হয়েছিল।  

পরবর্তীতে জানা যায় ১২ নভেম্বর রাতের সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২২ কিলোমিটার বা ১৩৮ মাইল। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ, বাতাসে মানুষপঁচা গন্ধ। ৩ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হওয়াতে মৃতদেহগুলো দাফন করাও সম্ভব ছিল না। আর করবেই-বা কে? সে সময় দুর্গত অঞ্চলে পৌঁছানো এতো সহজ ছিল না। তদানীন্তন পাকিস্থান সরকার নুন্যতম খোঁজখবরটুকো পর্যন্ত নেয়নি। সেদিনের ঝড়ে কত মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল তার সঠিক হিসাব অদ্যাবধি জানা না গেলেও উপকূলীয় অঞ্চলের ৮৭% ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং তিন চার মাস পরেও ৫২.৪% মানুষ গৃহহীন অবস্থায় জীবন যাপন করেছিল। ধারণা করা হয় সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে লাখ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটেছিল। ঘটনার দুই দিন পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কর্তাব্যক্তিরা দুর্গত অঞ্চলের খোঁজ-খবর নিতে শুরু করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে কেন যেন তাও বন্ধ হয়ে যায় বা করে দেয়। বিদেশী সংবাদ কর্মীদেরও তখন দুর্গত অঞ্চল পরিদর্শনে যেতে দেয়া হয়নি, বরং তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। 

জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাসানীসহ তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের এ অঞ্চলের অনেকে অনেক কষ্ট করে তৎক্ষণাৎ উপদ্রুত এলাকায় দুর্গত মানুষের পাশে ছুটে গিয়েছিলেন, সার্বিক অবস্থা দেখে সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে শুধু কেঁদেছিলেন। সেদিন বঙ্গবন্ধু ও ভাসানী যে যার মতো করে সবাইকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ডাক দিয়েছিলেন। সেই সময়ের পাকিস্তানের শাসক ইয়াহিয়া খান একটি বারের জন্যও বাংলার স্বজনহারা মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়নি, এমনকি নুন্যতম খোঁজখবরটুকো পর্যন্ত নেননি। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ সেই ধ্বংসযজ্ঞের পূর্ণাঙ্গ দলিল অদ্যাবধি সুস্পষ্টভাবে কোথাও লিখা হয়নি বা প্রকাশিত হয়নি। 

৭০-এর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের রেষের মাঝেই শুরু হয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। অনেকে বলে বঙ্গবন্ধু সেদিন স্বাধীনতা চান নি, চেয়েছিলেন স্বায়ত্তশাসন। মিথ্যা কথা, ভুল ধারণা; সেদিন  পূর্বাঞ্চলের প্রতিটা মানুষের হৃদয়ের দাবী ও কামনা ছিল স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের নেতা ছিলেন, তিনি প্রতিটি মানুষের পার্লস খুব ভাল করেই বুঝতেন। পরিবেশ পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতা আমাদের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। যুদ্ধের ইতিহাস সবারই কমবেশি জানা থাকলেও, এর নিকট অতীত ও নিকট ভবিষ্যৎ অনেকের কাছে আজও অজানা; আর সেই সুযোগটাই গ্রহণ করেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা। নিজেদের ইচ্ছেমত লিখে তা তারা অনলাইনে ছেড়ে দিয়েছে এবং প্রজন্ম পরম্পরায় মিস গাইড করেছে করছে। 
দেশজুড়ে যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা বিরাজ করছিল তারই মাঝে যুদ্ধ শুরু হয়। নয় মাসের সেই ভয়াবহ সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সঠিক অনেক ইতিহাস ও পূর্ণাঙ্গ দলিল থাকলেও পরবর্তী সময় নিয়ে এদেশে একটা ঘোলাটে অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছিল, আর এর পিছনে যাদের হাত ছিল তারা হলো মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি। যারা পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছে স্বাধীনতার আগে ও পরে এবং এখনও করেই যাচ্ছে! 

নয় মাসের দুঃস্বপ্ন বিভীষিকাময় যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলো, পৃথিবীর মানচিত্রে  নতুন একটি দেশ স্থান পেলো, যার নাম— 'বাংলাদেশ'। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্যস্ততা; দুইয়ে মিলে অভাব অভিযোগের অন্ত ছিল না। চতুর্দিকে শুধু হাহাকার আর হাহাকার, অভাব আর অভাব, অভিযোগ আর অভিযোগ। চুরিডাকাতি লেগেই থাকতো। এরই মাঝে শুরু হলো দেশ পুনর্ঘটনের কাজ। অনেককেই আজ অনেক বড় বড় কথা বলতে শুনি; কিন্তু সেদিনের সেই সময়টা ছিল 'এক নেতার এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ'। বঙ্গবন্ধু সেদিন যা'ই বলতেন তা'ই সবায় মেনে নিত। বয়স কম হলেও সেদিন কেন যেন আমার বেশ  খটকা লেগেছিল, মনে হয়েছিল বঙ্গবন্ধু মারাত্মক একটা ভুল কাজ করেছেন— যুদ্ধাপরাধীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে; যদিও সেই সাধারণ ক্ষমা সকল যুদ্ধাপরাধীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। তথাপি আমার কাছে আজও মনে হয় সেদিনের সেই ঘোষণার জন্যই স্বাধীনতাবিরোধীরা এতোটা সাহস পেয়েছিল এবং সংঘবদ্ধ হয়ে পুনরায় ষড়যন্ত্র করতে পেড়েছিল। সেদিন যদি রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু সকল রাজাকার, আল-সামস, আল-বদরকে হত্যার নির্দেশ দিতেন তবে হয়তো এদেশে আর কোন দিনও তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতো না, দেশেও দ্বিবিভক্তির সৃষ্টি করতে পারতো না। 

আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দের বিষয় এটাই যে আমি নিজ চোখে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকর হতে দেখে যেতে পাড়লাম। মাননীয়া বঙ্গবন্ধু কন্যার এই দৃঢ়প্রত্যয় এ অসীম সাহসিকতার জন্য তাঁকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি ও চিরকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তিনি যুদ্ধাপরাধীর সেইদিনের ঝুলে থাকা বিচারের রায় আজ এতো বছর পর সম্পন্ন করে এক বিরল নজীর সৃষ্টি করে গেলেন। আমি নিশ্চিত— আগামী প্রজন্মের কাছে তিনি ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকবেন। আমি আরোও নিশ্চিত করে বলতে পারি সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হলে, তাদের সাজা কার্যকর হলে একটা সময় এদেশের মানুষ কিছুটা হলেও শান্তিতে থাকতে পারবে; নয়তো প্রজন্ম পরম্পরায় এর খেসারত গুনতেই হবে। 

৭৪ বলতে শুধুই অভাব আর হাহাকার যারা বুঝে তারা একবারও ভেবে দেখে না সে সময়ের প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি। সেই বছর ও তার আগের বছরের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়াবহ বন্যা ও খরা দেশটাকে সম্পূর্ণভাবে উলটপালট করে দিয়েছিল। বন্যার পর খরায় সেই বছর ক্ষেতে মোটেও ফসল ফলেনি, ঘরে ভাত ছিল না। তাই সেই সময় কবিরা কবিতায় লেখতো - 'ভাত দে হারামজাদা, নয়তো মানচিত্র খাবো'। দূর্ভিক্ষে চতুর্দিকে মানুষ মরছে; খড়ের অভাবে গোয়ালে গরু মরে পরে আছে, ঘাসের অভাবে ছাগল-ভেড়া; মাঠেঘাটে পরে থাকতো মরা গরু ছাগল ভেড়ার পাল, শকুন সে'সব নিয়ে টানাটানি করতো। 

না! এতো অভাব অভিযোগের পরও বঙ্গবন্ধুর সময়োচিত পদক্ষেপে তা মনন্তরে রূপ নিতে পারেনি। সেইদিনের সেই অভাবের জন্য একপক্ষ একচেটিয়া শাসনব্যবস্থাকে দায়ী করে আসছে; আমি কিন্তু তা মোটেও মনে করি না। আমার মতে সেই দূর্ভিক্ষটা হয়েছিল কিছুটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ও বাকীটা তৈরি করা হয়েছিল বা অনেকটা জন্ম দেওয়া হয়েছিলো ষড়যন্ত্র করে। 

কি করে? 

যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্যস্বাধীন একটা দেশে অভাব অভিযোগ থাকাটা খুবই সাধারণ ও স্বাভাবিক ব্যাপার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি জাপানীরাও খাদ্যের অভাবে লতা-পাতা মরাপঁচা সাপ-ব্যাঙ সব কিছু খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছে, জীবন রক্ষা করেছিল। আর আমরা কি করেছি? একদিকে যুদ্ধবিধস্ত দেশ তার উপর প্রতি বছর লেগে থাকা বন্যা ও খরায় একমাত্র উপার্জনক্ষম পণ্য পাটের উৎপাদন কমে যায়। তাই সোনালি আঁশ পাট রপ্তানিও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে জাসদ ও সর্বহারারা একের পর এক পাটের গুদামের পর গুদামে আগুন দিয়ে যায়! একদিকে বন্যা খরা অন্যদিকে পাট রপ্তানি থেমে যাওয়া। তাই সেদিন বঙ্গবন্ধু হাত পাততে বাধ্য হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিরোধীতা করা পরাশক্তি আমেরিকার কাছেও। খয়রাতি পিএল-৪৮০ কার্যক্রমের আওতায় দুইটি আমেরিকান জাহাজ খাদ্যশস্য বোঝাই করে ওয়াশিংটন থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনাও দিয়েছিল, তৈরি ছিল আরো দুইটি জাহাজ। এর মাঝেই ঢাকার মার্কিন দুতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে খবর গেলো, বাংলাদেশ কিউবার সঙ্গে পাটবিক্রির চুক্তি করেছে, দুইটি জাহাজে পাট বোঝাই করা হয়েছে। তথ্যটা একজন সচিব নিশ্চিত করেছিল। তিনি স্বশরীরে গিয়ে জাহাজের নাম ও পাটের পরিমাণসহ সমগ্র তথ্য মার্কিন দূতাবাসে জানিয়ে এসেছিলেন। 

যা হওয়ার তাই হলো, মাঝসাগরে ফেলে দেওয়া হলো বাংলাদেশের জন্য আনা দুই জাহাজ খাদ্যশস্য, বাকি দুই জাহাজ রওনা দিলো অন্য দিকে করাচির উদ্দেশ্যে। সেই যাত্রা বাংলাদেশ কিছুটা হলেও রক্ষা পেয়েছিলো শুধুমাত্র রাশিয়া ও ভারতের তড়িৎ সাহায্যের জন্য। কিন্তু ততদিনে দেশে প্রচুর মানুষের প্রাণ চলে গেছে, মরে গেছে অনেকে। তাদের নিয়ে শুরু হয়েছিল আবার নতুন এক ষড়যন্ত্র  রাজনীতির। ১৯৭১ সালে কনসার্ট ফর বাংলাদেশের পোস্টার থেকে ছবি নিয়ে সেটা চালানো হয়েছিল দূর্ভিক্ষের ছবি বলে। ওটা ধরিয়ে দেওয়ার পর এলো জাল পড়া বাসন্তী! বোবা বাসন্তীকে জাল পড়িয়ে ইত্তেফাকের আফতাব আহমেদ নতুন ছবি বানালো, সেই কুখ্যাত ছবিও একই ষড়যন্ত্র 'ষড়যন্ত্র-৭৪' এর অংশ ছিল; ছবি সুপারহিট! 'বাসন্তী' দেশবিদেশে ঝড় তুললো!

আফতাব আহমেদ এর মতো এমন কুলাঙ্গার আরো অনেক ছিল, যারা স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে গড়া নতুন নতুন কাহিনীর পরিচালক, যারা একের পর এক মিথ্যা কল্পকাহিনীর জন্ম দিতো; যা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলকে বিতর্কিত করা যায়। এ'সবের সবই ছিল মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল। 

অবশ্য পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত আমেরিকার কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশান এর ত্রৈমাসিক পত্রিকা 'ফরেন এ্যাফেরার্স' এর এক গবেষণামূলক নিবন্ধ থেকে সবই স্পষ্ট হয়ে যায়। সেখানে তারা বলেছিল— ৭৪ এর দুর্ভিক্ষের কারণগুলো আসলে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের আয়ত্তাধীন ছিল না। ওই নিবন্ধে এমা রথসচাইল্ড বিচিত্র সব আমেরিকান সরকারের দলিলপত্র দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন এবং স্পষ্ট বলেছিলেন— ৭৪ এর দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের প্রায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্যে দায়ী ছিল প্রকৃতপক্ষে মার্কিন সরকার। 

জিয়া, এরশাদ, খালেদাজিয়া ও জামাত প্রায় একই সুরে একই কায়দায় মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় নিয়ে এবং বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়ে বারংবার যতসব মিথ্যা কথা আওড়িয়ে গেছেন, অপপ্রচার চালিয়ে গেছেন এবং আজও যাচ্ছেন; যার পুরোটাই সম্পূর্ণভাবে অপপ্রচার এবং শুধুমাত্র একটা রাজনৈতিক অপকৌশল। ওইসব মিথ্যা অপপ্রচার শুনে শুনে আজ এদেশে একটা শ্রেণীই তৈরি হয়ে গেছে যারা প্রকৃত সত্যের ধারেকাছেও ঘেষতে চায় না, যায় না সত্য ইতিহাসের ধারেকাছেও। তারা সবায় মিথ্যাকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছে এবং তাই অন্তরে ধারণ করছে!

দেখতে দেখতে অনেক দিন অনেক বছর চলে গেল, দ্বিবিভক্ত এই জাতি এক কদম আগায় তো দুই কদম পিছায়। আর এ'সবের পিছনের কারণ সেই একই অপশক্তি স্বাধীনতাবিরোধী। আর কত? চোর সবসময়ই ছোটমনা থাকে, প্রকাশ্যে আসতে পারে না; আমরা ঐক্যবদ্ধ হলে তারা পিছু হটবেই। সময় এসেছে সত্য জানার, শুধরাবার এবং নিজ দেশটাকে ভালোবাসবার। 

৪৪তম বিজয় দিবসের ঊষালগ্নে আসুন আমরা সবায় মিলে শপথ করি, রাজাকার মুক্ত সুন্দর বাংলাদেশ গড়ি।। 

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
১৬ - ১২ - ২০১৫.

বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২০

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স:

স্যার, এই করোনায় চাকরিজীবী যেগুলি শয়তান.....তারা তো দেশের উন্নয়নের টাকা আত্মসাৎ করে করে কোটিপতি হয়ে গেলো.....মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটুখানি ঝাঁকি দিলেই লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বের হয়ে আসতো....যা দিয়ে বাংলাদেশ ১০০ বছর এগিয়ে যেতো.....যত করোনা তত আত্মসাৎ.... কিছু অজাতের হাতে অফিস আদালত জিম্মি হয়ে যাচ্ছে......যে কর্মকর্তা/কর্মচারী, তারাই আবার ঠিকাদার.....একই স্কুলের বেঞ্চের বিল কতবার যে উত্তোলন  হচ্ছে...... আমার চোখ কামড়ায়...... কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারিনা.....

কোন রাখঢাক না করে সরকারি অফিসে  চাকুরী করা আমার এক বোনের কিছু অসমাপ্ত কথা দিয়েই আজ লিখার সূচনা করলাম। নিশ্চয় এতটুকুতেই পুরো  বাংলাদেশের অফিস-আদালতের দুর্নীতির সার্বিক চিত্র সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।  শুধুই কি অফিস-আদালতে দুর্নীতি হয়? দুর্নীতি এখন কোথায় নেই, কোথায় হচ্ছে না? আমার তো মনে হয় আমাদের অস্থিমজ্জা সব সবকিছুই এখন দূর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। মাছওয়ালা মাছে ভেজাল করে মাছ বেচে শাক কিনে, শাকওয়ালা তার শাকে ভেজাল করে শাক বেচে চাল কেনে, চালওয়ালা চালে ভেজাল করে চাল বিক্রি করে ঔষধ কেনে, ঔষধওয়ালা ঔষধে ভেজাল করে ঔষধ বেচে জামা কিনে, জামাওয়ালা জামায় ভেজাল করে......... আসলে কে কাকে ঠকাচ্ছি আমরা? দিন শেষে সবাই ঠকছি! দুর্নীতি করছি সবাই, সবাই আমরা দুর্নীতিবাজ!  

দার্শনিক ধর্মতাত্ত্বিক নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোন আদর্শের নৈতিক বা আধ্যাত্মিক অসাধুতা বা বিচ্যুতি বা ব্যত্যয় মানেই দুর্নীতি। বৃহৎ পরিসরে বলতে গেলে বলতে হয়— ঘুষ প্রদান, সম্পত্তির আত্মসাৎ এবং সরকারি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার নাম দুর্নীতি। দুর্নীতি শব্দটি যখন বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন সাংস্কৃতিক অর্থে  'সমূলে বিনষ্ট হওয়াকে' নির্দেশ করে। এই শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪ –৩২২), তাঁর পরে মার্কাস টুলিয়াস সিসারো (খ্রীস্টপূর্ব ১০৬— ৪৩); সিসারো এর সাথে নীতিহীন আদানপ্রদান অর্থাৎ  ঘুষ এবং সৎ অভ্যাস ত্যাগ প্রত্যয়ের যোগ করেছিলেন। রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক মরিস  লিখেছেন, দুর্নীতি হলো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য  অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার। 

অর্থনীতিবিদ আই. সিনিয়র একে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছেন— দুর্নীতি এমন একটি কাজ যেখানে (১) গোপনে প্রদানের কারণে, (২) তৃতীয় কোনো পক্ষ সুবিধা পায়, (৩) যার ফলে তারা বিশেষ ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করে, যা (৪) দুর্নীতির সাথে যুক্ত পক্ষটি এবং তৃতীয় পক্ষ উভয়ই লাভবান হয়, (৫) এবং এই কাজে দুর্নীতিগ্রস্ত পক্ষটি থাকে কর্তৃপক্ষ। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কাফম্যান দুর্নীতির ধারণাটিকে আরো বিস্তৃত করেন 'আইনানুগ দুর্নীতি' শব্দদ্বয় যোগ করার মাধ্যমে যেখানে আইনকে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করা হয়, যাতে নিজেদের রক্ষা করার জন্য আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনের ক্ষমতা আইন প্রণেতার নিকট রক্ষিত থাকে।

ট্রান্সপারেন্সির এক জরিপে দেখা যায় যে, দুর্নীতিতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এ হিসাব করা হয় ১০০ পয়েন্ট এর ভিত্তিতে। যে দেশ যত দুর্নীতি মুক্ত সে দেশের তত পয়েন্ট। হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে, এদিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে সোমালিয়া; এ দেশের পয়েন্ট ১০০-তে মাত্র ১০। এরপর কয়েকটি দেশের পরে আছে সিরিয়া; এর পয়েন্ট মাত্র ১৩। এরপর ১৪ পয়েন্ট নিয়ে অবস্থান করছে লিবিয়া, সুদান ও ইয়েমেন; এরপর ইরাকের আছে ১৭, লেবাননের আছে ২৮। 

প্রথম আলোর তথ্যমতে, আরব বিশ্বের নয়টি দেশ ও ভূখণ্ডে (ফিলিস্তিন) গত বছর দুর্নীতির পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে মনে করে সেখানকার সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে গভীর সংকটে পড়া লেবানন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের  অবস্থা আরও বেশি খারাপ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতে, প্রায় ১১ হাজার অংশগ্রহণকারীর মতামতের ভিত্তিতে পাওয়া জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে যে, এ অঞ্চলের দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া অন্য দেশ ও ভূখণ্ড হলো আলজেরিয়া, মিসর, জর্ডান,  মরক্কো, ফিলিস্তিন, সুদান ও তিউনিসিয়া। অংশগ্রহণকারীদের ৬১ শতাংশ এসব দেশে গত বছর দুর্নীতি বেড়ে গেছে বলে তাদের ধারণা ব্যক্ত করেছেন। 

টিআই বলছে, 'আরব বসন্ত শুরুর পর প্রায় অর্ধদশক পেরিয়ে গেলেও বিশ্বব্যাপী আমাদের দুর্নীতির পরিমাপকে দেখা গেছে, সরকারি খাতের দুর্নীতি কমাতে বিভিন্ন সরকারের প্রচেষ্টা নিয়ে এখনো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে।' দুর্নীতিবিরোধী এ সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, আরব দেশগুলোর অধিকাংশ নাগরিক মনে করেন, সম্প্রতি এসব দেশে দুর্নীতি বেড়েছে। আবার অনেকে মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তা ও পার্লামেন্ট সদস্যরা ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে লেবাননের ৯২ শতাংশ, ইয়েমেনের ৮৪ শতাংশ, জর্ডানের ৭৫ শতাংশ মনে করছেন দেশগুলোতে দুর্নীতি বেড়েছে। 

বিপরীতে মিসরের ২৮ শতাংশ ও আলজেরিয়ার ২৬ শতাংশ মনে করেন তাঁদের দেশে দুর্নীতি বেড়েছে। জরিপে যাঁদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ ইয়েমেনি ও প্রায় অর্ধেক মিসরীয় বলেন, সরকারি সেবা পেতে তাঁদের ঘুষ দিতে হয়েছে। একই কথা বলেন তিউনিসিয়ার ৯ শতাংশ ও জর্ডানের ৪ শতাংশ সাক্ষাৎকার প্রদানকারী। জরিপ প্রতিবেদনের রচয়িতা কোরালাই প্রিং বলেন, তাঁরা লেবাননের দুর্নীতি পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ উদ্বিগ্ন। গভীর রাজনৈতিক বিভক্তির মধ্যে দেশটি ২০১৪ সালের মে থেকে কোনো প্রেসিডেন্ট ছাড়াই চলছে। কোরালাই আরও বলেন, বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে জনগণ যে শুধু দুর্নীতি রোধে সরকারি প্রচেষ্টাতেই তাঁদের প্রচণ্ড অসন্তোষ জানিয়েছেন তা-ই নয়, বরং সরকারি খাতজুড়ে দুর্নীতির উচ্চহারেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আমাদের দেশের কি অবস্থা? 

তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সচিবালয়ে গিয়ে প্রথমদিনই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন 'দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স'। মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে তিনি বেশকিছু নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সুশাসন খুবই জরুরি। সাথে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন কর্মকর্তাদের; এবং বলেছিলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, ফলে এখন আর দুর্নীতির প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবতায় ঘটেছে কি?

অবশ্য দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতিতে কঠোর অবস্থানে দেখা গেছে এক মাত্র এবং একজন মাত্র ব্যক্তিকে, আর তিনি হলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। দেরিতে  হলেও তাঁর নির্দেশনায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সর্বাত্মক অভিযান। আশার বিষয় হলো আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যত প্রভাবশালী আর ক্ষমতাসীনই হউক বা সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দলের যত ঘনিষ্ঠজনই হউন না কেন, ছাড় পাচ্ছে না কোনো অপরাধীই। হয়তো কারও ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নিতেও নারাজ সরকার। সরকারের এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সুশীল সমাজসহ সর্বমহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে হচ্ছে। আমরা আশান্বিত। 

সাম্প্রতিককালের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা-বিবৃতিগুলোতে আবারও সেই অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ গত ৯ জুলাই জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দুর্নীতিবাজ যে-ই হোক ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। কে কোন দলের তা বড় কথা নয়, দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িতদের আমরা ধরে যাচ্ছি, ধরে যাব।' এর আগের দিন সংসদে আরেক বক্তৃতায় করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে প্রতারণায় যুক্ত রিজেন্ট হাসপাতাল ও এর চেয়ারম্যান মো. সাহেদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ওই হাসপাতালের এই তথ্য আগে কেউ দেয়নি, জানাতে পারেনি। সরকারের পক্ষ থেকেই খুঁজে বের করেছি, ব্যবস্থা নিয়েছি।' 

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, করোনা সংকট শুরুর পর থেকে বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস মোকাবিলার পাশাপাশি কঠোরহস্তে তিনি অনিয়ম-দুর্নীতি দমনে জোর দিয়েছেন। তার নির্দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আগে থেকেই চলে আসা অভিযান নতুন মাত্রা পেল বলে মনে হচ্ছে। এরই মধ্যে মানব পাচারে অভিযুক্ত স্বতন্ত্র এমপি শহীদ ইসলাম পাপুলের কুয়েতে গ্রেপ্তার হওয়াসহ দেশের কয়েকটি স্থানে ত্রাণ বিতরণ নিয়ে দলের কয়েকজন নেতা ও জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

গত রোববার দুর্নীতির ফাইলের খোঁজে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই দিন দুর্নীতির অভিযোগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) তিন কর্মকর্তাকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অন্যদিকে অনুমতি ছাড়া করোনা ও অ্যান্টিবডি পরীক্ষার অভিযোগে গতকালই রাজধানীর সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির দুই কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। 

করোনাকালে এখন পর্যন্ত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত দুটি ঘটনা হচ্ছে করোনার সনদ জালিয়াতিসহ নানা প্রতারণায় জড়িত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম এবং জেকেজির প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরী ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা। সাহেদের বিরুদ্ধে করোনা পরীক্ষা ছাড়াই ছয় হাজার এবং আরিফ-সাবরিনা দম্পতির বিরুদ্ধে ১৫ হাজার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ ছিল। এ দুই প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে করোনা পরীক্ষার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেই এমন প্রতারণা চালিয়ে আসছিল। 

অভিযানকালে শুধু সাহেদ ও আরিফ-সাবরিনাই নন, তাদের অনেক সহযোগী গ্রেপ্তার হয়েছেন। বন্ধ হয়েছে অনিয়মে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের বিরুদ্ধে বেশকিছু মামলা করার পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব জব্দ ও অন্যান্য আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রতারক সাহেদ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য পরিচয় দিয়ে সরকার ও দলের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিল। মন্ত্রী ও নেতানেত্রীদের সঙ্গে ছবি তুলে অপব্যহারের মাধ্যমে প্রতারণার জাল বিস্তার করে আসছিল। 

অবৈধভাবে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক বনে যায় এই মহাপ্রতারক সাহেদ। আশাজাগানিয়া বিষয়টি হলো দলীয় পরিচিতি কিংবা এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে 'ঘনিষ্ঠতা'- কোনো কিছুতেই তার শেষরক্ষা হয়নি। সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ৯ দিন আত্মগোপনে থাকার পর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে সাতক্ষীরা সীমান্তে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। ঠিক তার মতোই নানা অসাধু উপায়ে অবৈধভাবে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছিল সাবরিনা-আরিফও; পরিশেষে তাদেরও শেষরক্ষা হয়নি।

এদিকে, করোনা পরীক্ষা, পিপিই ও কিট সরবরাহ নিয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া স্বাস্থ্য খাতের কয়েকজন হর্তাকর্তার বিরুদ্ধেও নানা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। করোনাকালে ত্রাণ তৎপরতায় যেসব জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাদেরও তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করে কঠোর বার্তা দিয়েছে সরকার। অনেকে গ্রেপ্তারও হয়েছে। এসব জনপ্রতিনিধির বেশিরভাগ ছিলেন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত।সংসদ সদস্য শহীদ ইসলাম পাপুলও মানব পাচারে অভিযুক্ত হয়ে কুয়েতে গ্রেপ্তারের ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। 

পাপুল ও তার স্ত্রী সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলামের অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অনুসন্ধান, ব্যাংক হিসাব এবং স্ত্রী-শ্যালিকাসহ অনেকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ওদের ব্যাপারে মাননীয়  প্রধানমন্ত্রী  নিজেই সংসদে বলেছেন, 'ওই সংসদ সদস্য (পাপলু) কুয়েতের নাগরিক কিনা, তা নিয়ে কুয়েতের সঙ্গে কথা বলছি। বিষয়টি দেখব। যদি এটা হয়, তাহলে তার ওই আসনটি (লক্ষ্মীপুর-২) খালি করে দিতে হবে। যেটা আইন আছে, সেটাই হবে। আর তার বিরুদ্ধে এখানেও তদন্ত চলছে।'

পাপুল-সাহেদ-সাবরিনা ছাড়াও অনিয়ম-দুর্নীতিতে যুক্ত আরও অনেকের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে হচ্ছে। তদবির-বাণিজ্যে যুক্ত হয়ে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক বনে যাওয়া পাপিয়া নামের এক যুব মহিলা লীগ নেত্রীকে গ্রেপ্তার ও জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে এমন কঠোর অবস্থানে আগে থেকেই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং মনে হচ্ছে একাই তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন; দেশের  বাকী আমরা সবায় তামাশা দেখছি। সারা বিশ্ব যখন করোনা নিয়ে উদ্বিগ্ন আর আমরা তখন উদ্বিগ্ন দুর্নীতি নামক বিষফোঁড়া নিয়ে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে, তা রোখা কি একা একজনের পক্ষে সম্ভব?  

দুর্নীতির বিষবৃক্ষটি এতটাই  মহিরুহ আকার ধারণ করেছে, যা বলা বাহুল্য।  এর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে, সমগ্র জাতির সমস্ত প্রক্রিয়ায়। দুর্নীতির ব্যাপকতা কতটা বেড়েছে তা করোনাকালে আমরা কিছুটা হলেও টের পেয়েছি, প্রকাশ হয়েছে বলে। বিশেষ করে  আমাদের স্বাস্থ্য খাত যে কতটা ভঙ্গুর এবং দুর্নীতিগ্রস্ত, তা স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। গত বছর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির ১১টি খাত চিহ্নিত করেছিল; যন্ত্রপাতি কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলিসহ আরও বিভিন্নভাবে এ মন্ত্রণালয়ে যেসব দুর্নীতি হয়ে থাকে সেসবের; কিন্তু তদন্ত  কার্যক্রম কেন থেমে ছিল? বুঝে আসে না। 

এদেশে অনেকেই জিরো টলারেন্স জিরো টলারেন্স বলে চিল্লায়, এই 'জিরো টলারেন্স' কি শুধুই কথার কথা? এর আগে আমরা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা শুনেছি, এখন যুক্ত হয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। সেই ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, মন্ত্রী-সচিবেরা সৎ হলে ৫০ শতাংশ দুর্নীতি কমে যাবে, কিন্তু এখন তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক এবং দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি  মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী; দিনশেষে তিনি কতটা কি করেছেন বা করতে পারলেন?! 

প্রধানমন্ত্রী হয়েই মাননীয় শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে দুর্নীতিগ্রস্তদের শোধরানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন; মনে করেছিলাম শুভসূচনা। দুর্নীতি উচ্ছেদের সংকল্পের পাশাপাশি তিনি স্বীকারও করেছিলেন— দুর্নীতি নিয়ে সমাজে অস্বস্তি রয়েছে। এবারের কথা তো আগেই বলেছি। তাঁদের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না বা কার্যকর হচ্ছে না কেন? বরং দিনেদিনে  দুর্নীতি কমার বদলে বহুগুণ বেড়েছে!    

এবারের মন্ত্রিসভার নতুন মন্ত্রীদের মুখে  প্রথমেই আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড় বড় নানা কথা শুনেছিলাম; স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক '১০০ দিনের কর্মসূচিতে' দুর্নীতিগ্রস্ত কাউকেই সরকার রেহাই দেবে না বলে মন্তব্য করেছিলেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী কোনো দুর্নীতি প্রশ্রয় না দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ভূমিতে দুর্নীতির ক্ষেত্রে 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণা করেই শুধু ক্ষান্ত হননি ভূমিমন্ত্রী, তিনি ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভূমি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হিসাব চেয়েছিলেন। ওনাদের কথার কোন বাস্তবতা কি আমরা দেখেছি, না-কি পেয়েছি??      

পরিকল্পনামন্ত্রী, অর্থ প্রতিমন্ত্রীও বলেছিলেন— এখন আর দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা কোনো ছাড় পাবে না, 'চরম শাস্তির' মুখোমুখি হতে হবে। রাজউকসহ গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে সব প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই 'সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত' করার ঘোষণা দিয়েছিলেন গণপূর্তমন্ত্রী। রেলমন্ত্রী এতটুকু অনিয়ম ছাড় না দেওয়ার কথা বলেছিলেন। পরিবেশমন্ত্রী, সমাজকল্যাণমন্ত্রীর মুখেও শোনা  গিয়েছিল একই সংকল্পের কথা। আর দুদকের চেয়ারম্যান সবাইকে টপকে বলেছিলেন— 'দুর্নীতির গন্ধ' পেলেই তিনি ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু  বাস্তবতায় ঘটেছে উল্টো! সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি আজ মহিরুহ; জাতির অভিশাপ হয়ে পুরো দেশকে গ্রাস করে ফেলেছে।      

শতাব্দীর শুরুতে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে টানা পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এতকাল পর ২০২০ সালে এসে আজ আবারও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা শুনতে হচ্ছে; আফসোস! তাহলে এত দিন আমরা তবে কোন নীতিতে চলেছি এবং কেন? কেন এখনো  পারিনা আমরা বুক ফুলিয়ে বাঁচতে?   আর একটি কথা— সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি আমাদের কী দিয়েছে? কিছু সাফল্য অবশ্যই আছে, কিন্তু তা-ই-বা কতটুকু? এবং কি-ই-বা  মূল্যে তা পেয়েছি?? 
না-কি আবারও সব কিছুই আগের মতো ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে যাবে???

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
৫ অগাস্ট, ২০২০.

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২০

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত ঐশী বাণী:

হযরত নূহ (আঃ) ছিলেন হযরত আদম (আঃ)-এর অষ্টম অধস্তন প্রজন্ম। হাদিস ও তাফসীর থেকে জানা যায় - হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত আদম (আঃ)-এর মধ্যবর্তী যুগ ছিল প্রায় এক হাজার বছর, অর্থাৎ তাঁদের দুনিয়ায় আসার সময়ের ব্যবধান ছিল প্রায় এক হাজার বছর। ঐ সময়ের মাঝেখানে পৃথিবীতে এসেছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ নবী ও রাসুল; যাঁর কথা আমরা অনেকেই জানি না বা অনেকে আবার নামও শুনিনি। 

হযরত নূহ (আঃ)-এর সময়ে একবছর ব্যাপী মহাপ্লাবন এবং হযরত নুহ ( আঃ)-এর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা সম্বন্ধে কমবেশি আমাদের সমাজের সবার কিছুটা জানা আছে, আলেম সমাজ এই সব বিষয় নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা করেন, বিশেষ করে নুহ (আঃ)-এর সময়কার দীর্ঘ প্লাবন নিয়ে তাঁরা বেশ ব্যাপকভাবে আলোকপাত করেন। কিন্তু পবিত্র কুর'আনুল কারীমে বর্ণিত আরও  অনেক পয়গম্বর-কে নিয়ে তাঁরা তেমন কিছুই বলেন না, তাই ওনাদের কথা সবার কাছে অজ্ঞাতই থেকে যায়; তেমন একটা জানাও হয়ে উঠে না। আজ আমি তেমনই অজানা অচেনা একজন পয়গম্বরকে নিয়ে কিছু লিখার প্রত্যাশা রাখছি।  

গণিতবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষাকে আজকাল অনেক আলেমই অবজ্ঞা করেন, এমনকি এ'সবকে কুফরি শিক্ষা নাস্তিকদের শিক্ষা হিসেবে আখ্যায়িত করেন! না জেনে না বুঝে ব্যঙ্গ করে গণিতবিদ বা জ্যোতির্বিদদের নামে মিথ্যা ফতোয়া দিয়ে বসেন; এ'সব আসলে তাদের অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ। আজ আমি গণিত বিদ্যা কি করে পৃথিবীতে আবির্ভূত হলো তার ইতিহাস তুলে ধরে দু'চার কথা লিখতে চেষ্টা করবো। প্রত্যাশা করছি অন্ততঃ দু'চার জন হলেও এ লেখা পড়বেন এবং হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করবেন, তবেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা সার্থক হবে। আপনারা হয়তো অনেকেই হযরত ইদ্রিস (আঃ) এর নাম পর্যন্ত শোনেননি বা চিনেন না জানেন না। তাই গণিতের জন্মকথা বলার আগে পবিত্র কোর'আন ও হাদিসের আলোকে হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের কিছুটা তুলে ধরছি। 

সূরা মারইয়ামে উল্লেখ করা হয়েছে, "এই গ্রন্থে উল্লেখিত ইদ্রিসের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, সে ছিল সত্যবাদী নবী। আমি তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছি।" এই আয়াতের তাফসীর থেকে জানা যায়, এখানে ইদ্রিস (আঃ)-এর কথা বর্ণনা করা হয়েছে; তিনি ছিলেন একজন সত্য নবী এবং আল্লাহ তা'আলার একজন বিশিষ্ট বান্দা। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। 

হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত আছে মেরাজ গমনকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের সাথে হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর সাক্ষাত ঘটেছিল। এ নিয়ে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একটি অতি বিস্ময়কর হাদীস তুলে ধরেছেন - তিনি বলেন, ইবনে আব্বাস (রাঃ) কা'আব ( রাঃ)-কে "ওয়ারাফ'না মাকা-নান আলিয়্যা" - আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন, "আল্লাহ তা'আলা হযরত ইদ্রিস (আঃ)-কে ওহী করেন - 'আদম সন্তানের আমলের সমান তোমার একার আমল আমি প্রতিদিন উঠিয়ে থাকি। কাজেই আমি পছন্দ করি যে, তোমার আমল বৃদ্ধি পাক।' অতঃপর তাঁর নিকট একজন বন্ধু ফেরেশতা আগমন করলে তিনি তাঁর কাছে বলেন - 'আমার নিকট ওহী এসেছে; অতএব আপনি মৃত্যুর ফেরেশতাকে বলে দিন তিনি যেন একটু দেরি করে আমার জান কবজ করেন, যাতে আমার আমল বৃদ্ধি পায়।'" 

ঐ বন্ধু ফেরেশতা তখন তাঁকে নিজের পালকের উপর বসিয়ে নিয়ে আকাশে উঠে যান এবং চতুর্থ আসমানে গিয়ে মালাকুল মাউত ফেরেশতার সাক্ষাত পান। ঐ ফেরেশতা মালাকুল মাউত ফেরেশতাকে হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর ব্যাপারে সুপারিশ করলে মৃত্যুর ফেরেশতা বন্ধু ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করেন, "তিনি কোথায় আছেন?" 
উত্তরে বন্ধু ফেরেশতা বলেন, "এই তো তিনি আমার পালকের উপর বসে আছেন।" 

মৃত্যুর ফেরেশতা তখন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, "সুবহানাল্লাহ! আমাকে এখনই নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আমি যেন ইদ্রিস (আঃ) এর রুহ চতুর্থ আসমান থেকে কবয করি। কিন্তু আমি চিন্তা করছিলাম - ইদ্রিস (আঃ) তো আছেন জমিনে, চতুর্থ আসমান থেকে তাঁর রুহ কবয করবো কিভাবে?" 

অতঃপর তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত ইদ্রিস (আঃ) রুহ কবয করে নেন। উক্ত রেওয়াতটিই অন্য এক সনদে এভাবে এসেছে - হযরত ইদ্রিস (আঃ) বন্ধু ফেরেশতার মাধ্যমে মালাকুল মাউত ফেরেশতাকে জিজ্ঞাস করেছিলেন, "আমার হায়াত আর কত দিন বাকী আছে?" অন্য আর এক হাদিসে আছে তাঁর এই প্রশ্নের উত্তরে মালাকুল মাউত বলেছিলেন, "আমি লক্ষ্য করছি, চক্ষুর একটা পলক ফেলার সময় মাত্র বাকী আছে।" 
বন্ধু ফেরেশতা তাঁর পলকের নিচে তৎক্ষণাৎ তাকিয়ে দেখেন, হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জান এরই মধ্যে কবয করা হয়ে গেছে। 

হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন - হযরত ইদ্রিস (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, তিনি মৃত্যুবরণ করেননি, বরং তাঁকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর মতো জীবিত উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। আউফী (রঃ)-এর রিওয়াতের মাধ্যমে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে - হযরত ইদ্রিস (আঃ)-কে ষষ্ঠ আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল, আর সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। 

হযরত ইদ্রিস (আঃ) হযরত নূহ (আঃ)-এর পূর্ববতী নবী ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত নূহ (আঃ)-এর দাদা এবং হযরত হাবিল (আঃ)-এর বংশধর। মেরাজের হাদিসে বর্ণিত আছে হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর সাথে হযতর মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের সাক্ষাতের সময় তাঁকে তিনি উত্তম নবী ও উত্তম ভাই বলে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।  —[মূস্তাদরাক হাকীম] 

হযরত আদম (আঃ)-এর পর তিনিই সর্ব প্রথম পূর্ণাঙ্গ নবী ও রাসুল; যাঁর প্রতি আল্লাহ রাব্বুল তা'আলামিন ত্রিশটি সহীফা নাযিল করেন। হযরত ইদ্রিস (আঃ) সর্ব প্রথম মানব যাঁকে মু'জিযা হিসেবে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও অংকবিজ্ঞান দান করা হয়েছিল। —[বাহরে মুহীত] 

তিনিই প্রথম মানব যিনি কলমের দ্বারা লিখা ও কাপড় সেলাই আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর পূর্বে সাধারণতঃ মানুষ পোশাকের পরিবর্তে পশুর চামড়া বা গাছের পাতা বা ছাল ব্যবহার করতো। ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি সর্বপ্রথম তিনিই আবিষ্কার করেন এবং আস্ত্র-শস্ত্রের আবিষ্কারও তাঁর আমল থেকেই শুরু হয়। তিনিই অস্ত্র তৈরি করে তা দিয়ে কাবীল গোত্রের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন। 

সর্ব বিবেচনায় এখন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় যে, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত হলো আল্লাহর তরফ থেকে আসা ঐশী বাণী। এখন আপনারাই বলেন যারা গণিতবিদ বা জ্যোতির্বিদদেরকে নাস্তিক বলে উপহাস করেন তারা কোথায় কি অবস্থায় আছেন? তাদের জ্ঞানের গভীরতাই-বা কতটুকো? 

বিখ্যাত মুসলিম মনীষী এবং একজন তা'বে তা'বেঈ মূসা আল খায়েরী যামী আজকের আধুনিক গণিত শাস্ত্র তথা বীজগণিতের জনক। এ ছাড়াও অনেক মুসলিম মনীষীই গণিতের বিভিন্ন শাখাকে উদ্ভাসিত করে গেছেন। জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিম মনীষীদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ আজকের আলেম সমাজ ফতোয়া দিয়ে বেড়াচ্ছেন বা বেড়ায় গণিত নাস্তিকদের বিদ্যা(!), জ্যোতির্বিদ্যা নাস্তিকদের বিদ্যা(!), বিজ্ঞান যারা পড়ে তারা নাস্তিক(!); অজ্ঞতাই আজকের মুসলিম সমাজের প্রথম এবং প্রধান প্রতিবন্ধকতা। অথচ এক সময় এই মুসলমানদের জ্ঞান প্রজ্ঞায়ই সাড়া পৃথিবী উদ্ভাসিত হতো এবং হয়েছে;  এক কথায় বললে বলা যায়— মুসলিমদের জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও গরিমার কাছে অন্যান্য জাতি-ধর্ম-গোষ্ঠীর জ্ঞান-গরিমা ছিল নস্যি। 

কিন্তু আজকের আলেমরা করছেন কি?  বেহেস্ত আর দোযখের বর্ণনা ছাড়া তাদের মুখে অন্য কোন কিছুই রোচে না। দুনিয়ায় বিচরণের নিয়ম কানুন এক সময় মুসলিম আলেমগণই শিক্ষা দিতেন, শিক্ষা দিতেন দুনিয়াই আখেরাতের চারণক্ষেত্র; দুনিয়ার বিখ্যাত সব বিদ্যাপীঠ মুসলিমদেরই হাতে গড়া। মুসলিম সমাজকে তথা সমগ্র দুনিয়াকে সুন্দর ও সঠিক পথের সন্ধান দিতেন মুসলিম আলেমগণই। 

পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ভুলে আজকের আলেমরা আছেন শুধু ফতোয়া আর ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের ধান্দা নিয়ে; নিজ স্বার্থ ও মতের এতটুকো ব্যত্যয় ঘটলেই অন্যের বিরুদ্ধে তারা ফতোয়া দিয়ে বসেন, এক আলেম অন্য আলেমকে নিয়ে যা-তা মন্তব্য করে বসেন; সাধারণের সাথে কি করেন সে কথা না হয় বাদই দিলাম। এইসব দেখেশুনে ওদের থেকে শিক্ষা নিয়ে মুসলিম আজ শতধা বিভক্ত, পুরো সমাজ তচনচ হয়ে গেছে। পৃথিবীর প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্রের দিকে তাকালে এই একই দৃশ্য গোচরীভূত হয়। 

মসজিদের নগরী হিসেবে ঢাকা পৃথিবী বিখ্যাত এবং সমগ্র বাংলাদেশেটাই মসজিদে ছেঁয়ে আছে ছেঁয়ে গেছে। যেখানেই যতটুকো অবৈধ জায়গা পাওয়া যায়, সেই জায়গাটুকোই দখল করে গড়ে তোলা হয় মসজিদ বা মাদ্রাসা। এক জঘন্য প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ কাজের; গড়ে তোলা হয় বিশাল বিশাল সব অট্টালিকা, আলিশান সব কাঠামো আর সৌখিন সব ইতালিয়ান আমেরিকান বা জাপানী ইহুদী খ্রিষ্টানদের উপঢৌকন দেয়া টাইলস দিয়ে মসজিদ সাজানোর কাজ। জায়গার সত্ত্ব উৎস বা অর্থ যোগান উৎসের চিন্তা করার কারো কোন বালাই নেই, এ'সব কোন কিছুই বিবেচনায় নেয়া হয় না বা বিবেচ্য বিষয় হিসেবে ধরা হয় না! 

দেশে আজ মসজিদের অভাব নেই, নেই মুসল্লিরও অভাব; আবার মসজিদে জুতা চোরেও অভাব নেই! মুসলিম সমাজ আজ এক ধরনের অন্ধত্ব ও জান্নাতি অহংবোধে এক মিথ্যা মরীচিকার পিছু ছুটছে; জান্নাত পাওয়ার আশায় কেউ-বা আবার জঘন্য পাপ মানুষ হত্যার কাজেও লিপ্ত হচ্ছে। চোগলখোরি, মোনাফেকি, পরশ্রীকাতরতা, চোরাকারবারি, সুদখোরি, ঘুষখোরি এই সব বদ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি এখন মুসলমাদের মাঝেই বেশি পরিলক্ষিত হয়। এসব করে জান্নাতের প্রত্যাশা অবান্তর নয় কি? হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-এর অমর একটি বাণী এই মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি- "প্রস্রাব দিয়ে কাপড় দৌত করে যেমন কাপড়ের পবিত্রতা আনয়ন করা যায় না, তদ্রূপ হারাম উপার্জিত পয়সা দিয়ে দানখয়রাতও ইহকাল ও পরকালের অকল্যাণ বৈ কল্যাণ বয়ে আনে না আনতে পারে না।" 

জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা আজকাল মুসলিম সমাজ থেকে যেন উঠেই গেছে; সন্দেহ প্রবনতা ও পরশ্রীকাতরতা থেকে জন্ম নেয়া হিংসা বিদ্বেষ আর খুনাখুনি আজ সমগ্র মুসলিম জাহানের  প্রতিটি সমাজের সামাজিক চিত্র; কোথাও শান্তি নেই। অথচ 'ইসলাম' বলতেই আমরা সবাই বুঝি 'শান্তি'; একজন মুসলিম হিসেবে অনেকে যথেষ্ট অহংবোধও করি(!)। কিন্তু, কোথায় শান্তি? 

আত্ম অহংকার করার মতো বা অহংবোধ করার মতো আমরা কিছু করি কি? শান্তি নেই ঘরে, শান্তি নেই বাইরে; শান্তি নেই আমাদের সমাজে, শান্তি নেই দেশজুড়ে; শান্তি নেই আরবে, শান্তি নেই পারস্যে; শান্তি নেই প্রাচ্য-পাশ্চাত্যে, শান্তি নেই কোথাও! তাহলে কবরে গিয়ে কি শান্তি পাবো? এমন মোনাফেকি করে?
সে শুধুই এক অবান্তর কল্পনা।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
২২-১-২০১৫.

শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২০

ঈদ মোবারক!

মানুষ তার স্বপ্ন নিয়েই বাঁচে, বেঁচে থাকে;  ভালো দিন আসবেই ইনশাআল্লাহ! সৃষ্টির শুরু থেকে সেই কত কি প্রতিকূলতা! প্রকৃতির সাথে যুুদ্ধ করেই মানুষ বেঁচে থেকেছে। মানব ইতিহাসের সেই শুরুতে মা হাওয়া (আঃ) ও আদম (আঃ) দীর্ঘ একটা সময় আলাদা থেকেছেন। নবী-রাসুল (আঃ)-গণ কত ত্যাগ স্বীকার করেছেন; হুজুর পাক (সাঃ)-এর ত্যাগের মহিমা আর নাইবা বললাম। সাহাবী (রাঃ)-গণ ত্যাগের এক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।  

এই উপমহাদেশের সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে অনেকে বছরের পর বছর কারাগারে কাটিয়েছেন; দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বছরের পর বছর তাঁরা কত কি দুঃখকষ্ট স্বীকার করেছেন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে আমাাদের কষ্ট তাঁদের কষ্টের তুলনায় কতটুকু? আমরা হয়তো একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে ঘরে বন্দী জীবনযাপন করছি, এই তো? 

হয়তো অচিরেই ভেকসিন আবিষ্কার হবে; মানুষের বিচ্ছিন্নতা ঘুচবে। আমরা আজ একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন, নির্বাসিত; এই বিচ্ছিন্নতা মানুষের জন্য খুবই বিপজ্জনক। প্রকৃতিতে মানুষই সবচেয়ে অরক্ষিত প্রাণী। বিভিন্ন প্রাণীর আত্মরক্ষার জন্য তাদের নানা রকমের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকে; কারও দাঁত, কারও নখ, কারও বিষ ইত্যাদি। কিন্তু মানুষের আত্মরক্ষার জন্য তেমন কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই। তাই প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষ সবচেয়ে অসহায়, সবচেয়ে অরক্ষিত প্রাণী। 

অরক্ষিত প্রাকৃতিক পরিবেশে এমনতর কঠিন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে মানুষ কী করে টিকে থাকলো? টিকে থাকতে পেরেছে— মানুষ মানুষকে সহযোগিতা করেছে বলে, মানুষ মানুষের জন্য দাঁড়ায় বলে। পরস্পর যুক্ত হলেই মানুষ বাঁচতে পারে; আর এভাবেই মানব জাতি নিজেদেরকে রক্ষা করে থাকে। মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পরস্পর নির্ভরশীলতা। মানুষ টিকে থাকে, টিকে থাকতে পারে মানুষেরই জন্য। আজকে সেই মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে; যা অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি। হয়তো আবারও মানুষ তার স্বভাবগত চরিত্রে ফিরে যাবে, সব কিছু ঠিক আগের মতো হয়ে যাবে।     

এতোকিছুর পরও আবারও শান্তি, সৌহার্দ্য আর আনন্দের বারতা নিয়ে বছর ঘুরে এলো খুশির ঈদ, পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। ঈদের এই খুশিতে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'য়ালা  আমাদের প্র‍ত্যেককে পূর্ণতা দান করুন, এই কামনা করছি৷ পবিত্র ঈদ-উল-আযহা সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধি৷ বছরের প্রতিটি দিন ঈদের দিনের ন্যায় আনন্দময় হোক। শুভ প্রত্যয় কামনান্তে— 'তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন)!
ঈদ মোবারক!!

সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২০

কেমন হবে আগামীর শিক্ষা?

করোনা ভাইরাস আবির্ভাবের প্রথম দিকে বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞই নানান ধরনের ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, এই মূহুর্তে যাকে মনে পড়ছে তিনি হলেন  হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল লিওং; গত ফেব্রুয়ারীর দিকে  তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। তাঁর সেই আশঙ্কা যে নেহায়েতই অমূলক তা কিন্ত নয়; এখনো পর্যন্ত তা পুরোপুরি সত্য না হলেও একটি নিশ্চিত ঘটনা অলরেডি ঘটে গেছে— সারা বিশ্বের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ৪৬০ কোটি মানুষ একই সময়ে ঘরে বন্দী জীবনযাপন করেছেন এবং করছেন। বলতে গেলে পুরোপুরি কর্মহীন অবস্থায় শুধু শুয়ে বসে সময় পার করেছেন সারা বিশ্বের মানুষ। উৎকন্ঠা নিয়ে চুপচাপ এক জায়গায় বন্দী জীবন কাটানো সে যে কতটা কঠিন একটি বিষয় এমন পরিস্থিতিতে না পড়লে হয়তো আমরাও কোনদিন তা বিশ্বাস করতে পারতাম না, অনুধাবন তো দূরের কথা। এমন অসহনীয় উৎকণ্ঠিত একাকী জীবনের কথা কি কখনও কেউ আগে থেকে চিন্তা করতে পেরেছেন, না কি ভাবা যায়? 

বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে করোনা ভাইরাস আবারও ফিরে এসেছে বা আসছে, অনেক দেশের মানুষ পুনরায় বন্দীত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। ঘরে বন্দী জীবন কাটাবেন বা কাটাচ্ছেন এবং সাথে থাকছে অনাকাঙ্ক্ষিত উৎকন্ঠা— না জানি আমি কখন এই মরণ ভাইরাসে আক্রান্ত হই? মানবসভ্যতার ইতিহাসে এত বেশি সংখ্যক মানুষ একই সাথে একই সময়ে একটানা এতো দীর্ঘক্ষণ ঘরে বন্দী থেকেছেন বা এমন করে লকডাউন করেছেন নিজে নিজেকে বা কোথাও বন্দী  হয়ে বসে থেকেছেন এমনতর নজির পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি আছে কিনা আমার জানা নেই। এক অদৃশ্য অতি ক্ষুদ্র ভাইরাসের কাছে মানুষ নামক অনন্য অসাধারণ গর্বিত প্রাণীটি এতো অসহায় হয়ে পড়লো, যার আক্রমণে তছনছ হয়ে গেল গোটা বিশ্ব; ভেঙে পড়লো একবিংশ শতাব্দীর সর্বোত্তম নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ সকল  বিশ্বব্যবস্থা! এসব কি ভাবা যায়?

এই অবস্থা থেকে বিশ্ববাসী আর কখনো কোনদিনও পুরোপুরি মুক্তি পাবেন কিনা বা বিশ্ববাসী আর কখনও মোটেও আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন কিনা তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় আছে; হয়তো পরবর্তী পৃথিবী হবে করোনাময় অথবা  করোনা সম্পৃক্ত পৃথিবী! আসলে কি করোনার থাবা থেকে আমাদের কখনও  মুক্তি মিলবে? তা নিশ্চিত কেউ জানি না, তার কোন সুস্পষ্ট ধারণাও এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের দিতে পারছেন না। কিন্তু পরবর্তী বিশ্ব সম্পর্কে অনেকে অনেক রকম কথাই বলেছেন বলছেন, এবং বিশেষজ্ঞরা যার যার মতো করে তাদের মতও প্রকাশ করছেন। সব কিছুতে দ্বিমত থাকলেও একটি বিষয়ে কিন্তু প্রায় সকলেই একমত— পৃথিবী আর আগের মতো নেই, থাকবে না; আর কখনো আগের মতো হবেও না। বিগত কয়েক মাস ধরে যা ঘটেছে ঘটছে তার প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী হবে এই ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই, প্রত্যেকেই অনেকটা নিশ্চিত। এই মহামারী শুরুর পর থেকে একে একে বদলে গেছে পুরো বিশ্বপ্রকৃতি এবং সাথে সাথে  পাল্টে গেছে বিশ্বপরিস্থিতিও। আমাদের কামকাজ, আমাদের  প্রাত্যহিক জীবনযাপন, ভ্রমন-বিনোদন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য সমেত অর্থনীতি-রাজনীতি-রাষ্ট্রনীতি-সমাজনীতিসহ সব সবকিছু বদলে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর শতকোটি মানুষ ঘরে বন্দী, সেই সুযোগে প্রকৃতি তার আসল রূপ পেয়েছে, আপন রূপে ফিরে গেছে। পৃথিবীর সব বড় বড় শহর-নগর-বন্দরগুলোকে মনে হয়েছে হচ্ছে ওসব যেন প্রাণহীন মৃত্যুপুরী; দিনের বেলায়ও রাস্তা-ঘাট থাকছে জনমানবশূন্য। বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, বন্ধ থেকেছে দোকানপাট-বার-রেস্টুরেন্ট-শপিংমল, বন্ধ হয়ে গেছে খেলাধূলা, এমন কি বাতিল হয়ে গেছে অলিম্পিক গেমসও। বিশ্বের অনেক দেশে জেলখানা থেকে বন্দীদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে, বাড়ি গিয়ে তাদেরকে চুপচাপ ঘরে বসে থাকতে বলা হয়েছে। ছোট-বড় ধনী-দরিদ্র বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ তাদের যার যার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে, বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বিমান চলাচলও। সকল প্রকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড— আভ্যন্তরীণ কিম্বা বৈশ্বিক কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে; শেয়ার বাজারে  ধস নেমেছে। সর্বোপরি  বেকার হয়ে পড়েছে বিশ্বের কোটি কোটি কর্মজীবী কর্মোদ্যোগী  মানুষ। এক অদৃশ্য শত্রুর আতংকে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আজ ভীত-সন্ত্রস্ত! 

কি ঘটতে যাচ্ছে এবং কেমন হতে যাচ্ছে করোনামুক্ত পরবর্তী পৃথিবী? আদৌও পৃথিবী করোনামুক্ত হবে কি? এ'সবের সার্বিক আলোচনায় আপাততঃ  যাচ্ছি না, আজ শুধুমাত্র শিক্ষার্থী তথা ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষতির দিক নিয়ে কিছুটা আলোচনা করার চেষ্টা করবো। আমার বিবেচনায় সারা বিশ্বে এখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং নাজুক অবস্থায় পড়ে আছে শিক্ষার্থীরা। শিশুদের কল্যাণে কাজ করা 'সেইভ দ্য চিলড্রেন' থেকে বলা হয়েছে— বিশ্ব মহামারীর এই কঠিন পরিস্থিতিতে শিক্ষার সুযোগ হারাবে প্রায় এক কোটি শিশু। তারা আরও বলেছে— বাল্যবিবাহ, শিশু শ্রম, শিশু নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। এই সংস্থা আরও বলেছে— করোনা পরবর্তীতেও আর কোন দিন হয়তো স্কুলেই যাওয়া হবে না এক কোটি শিশুর। সেভ দ্যা চিলড্রেন-এর এক আলোচনায় উঠে এসেছে এমনতর সব ভয়ঙ্কর তথ্য। ইউনেস্কোর তথ্যের উপর ভিত্তি করে আরও জানা গেছে যে, গত এপ্রিল থেকে ১.৬ বিলিয়ন তরুণ-তরুণী স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে দিয়ে বসে আছে, অলস সময় কাটাচ্ছে; যা বিশ্বের পুরো শিক্ষার্থীর সংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ।

উক্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মানব ইতিহাসে এই প্রথমবার এমন চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে বিশ্বের শিক্ষা ক্ষেত্রে। চরম এই সংকট থেকে বাঁচার পথ খুঁজতে ইতিমধ্যে গোটা বিশ্বপরিস্থিতি পর্যালোচনা করা শুরু হয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, পারিবারিক আর্থিক সংকট কাটাতে আগামীতে তরুণ তরুণীরা রোজগারের চেষ্টা করা শুরু করবে। অভাব অভিযোগ ও পারিবারিক দায় মুক্ত হতে বা দায় মুক্ত করতে অধিকাংশ মেয়েকেই খুব অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে পরিবারের পক্ষ থেকেই। এসবের  ফলশ্রুতিতে ৯.৭ মিলিয়ন শিশু স্থায়ীভাবে স্কুল ছাড়বে। ইউনেস্কো ইতিমধ্যেই সতর্ক করে বলেছে করোনা পরবর্তী বিশ্বে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলি ২০২১ সাল থেকেই কাটছাঁট করবে শিক্ষা বাজেটে। আর এতে করে গোটা বিশ্বের শিক্ষা বাজেটে প্রায় ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘাটতি দেখা দেবে। 

শিশুদের স্কুলে ফেরাতে বিশ্বের প্রতিটি দেশের সরকারেরই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। আর তা যদি না করা হয় তাহলে আগামী দিনে ধনী এবং দরিদ্র ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রবলভাবে প্রকোট হয়ে উঠবে অসাম্য। তাই ইউনেস্কোর দাবী করোনা পরবর্তী বিশ্বে কোটি কোটি শিশুর স্কুল ছুট বন্ধ করতে সরকারি ও বেসরকারি স্তরে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি বিশ্ব জুড়ে একটি তহবিল গঠনের ডাক দিয়েছে এই সংস্থা। সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, করোনাপরবর্তী বিশ্বে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র ও প্রান্তিক শিশুরা; আর যারা দূরশিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণে অক্ষম তাদের সমস্যা আরো বেশি বাড়বে। সমস্যা কাটাতে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতে শিক্ষা ঋণ পরিশোধে কিছু ছাড় দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে। সংস্থার পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হয়েছে, এই সংকট যদি প্রথমে মোকাবিলা করা না হয় বা না যায় তাহলে আগামী দিনে সমস্যা আরও বাড়বে, এমনকি প্রকট রূপ ধারণ করবে।

সংস্থার পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যই হলো ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সমস্ত শিশুকে ন্যূনতম শিক্ষা পরিসেবার আওতাভুক্ত করা বা আওতায় আনা। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করায় বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রই তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তাই এখন থেকে বিশ্বের সকল দেশগুলোর কাছে এসব নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে ইউনেস্কো। সংস্থার তৈরি তালিকায় যেসব দেশে সবথেকে বেশি প্রভাব পড়তে পারে এমন দেশগুলো হচ্ছে— নাইজেরিয়া, মালি, চাদে, লাইবেরিয়া, আফগানিস্তান, গিনি, মরিশানিয়া, ইয়েমেন, নাইজার, পাকিস্তান, সেনেগাল আর আইভোরিকোস্ট। ইতিমধ্যেই ২৫৮ মিলিয়ন শিশু ও কিশোর-কিশোরী স্কুল ছেড়ে দিয়েছে বলে তাদের প্রথমিক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে। 

আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের কি অবস্থা? এমনতর দুর্যোগের পর সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং নির্দেশনাই-বা কি? দেশের সমগ্র  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ আছে সেই মার্চ থেকে; করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে। কবে নাগাদ স্কুল-কলেজ খুলবে তাও কেউ জানে না বা কেউ বলতে পারে না। ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা এখনও পর্যন্ত সংঘটিত হয়নি, কবে নাগাদ তা সংঘটিত হবে তাও কেউ জানে না; তাই অভিভাবক ও  শিক্ষার্থীরা চরম উৎকন্ঠিত।  ক্লাস এবং পরীক্ষার অনিশ্চয়তা নিয়ে এক মহা দুশ্চিন্তার মধ্যে কালাতিপাত করছে দেশের সমস্ত ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা। প্রত্যেকেই এখন অলস সময় পার করছে এবং সেশনজট  নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন; কিন্তু কিছুই তো আর করার নেই।  প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা স্কুলে পড়াশোনা করতে না পারায় তারা মানসিকভাবে অনেক বেশি  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বা করোনা সিম্পটমে মৃত্যুর সংখ্যা কিন্তু এদেশে এখনো নেহায়েত কম নয়, তাছাড়া কেন যেন এখনো পর্যন্ত করোনা সংক্রমিত হওয়া মানুষের সংখ্যা এদেশে কিছুতেই কমছে না, বরং কোন কোন অঞ্চলে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই যে কোনো স্তরের শিক্ষার্থীর জন্য করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে; তাই সরকারও শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে বারংবার  সতর্ক থাকার বা হওয়ার  নির্দেশ দিচ্ছে। এমনতর  পরিস্থিতিতেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও অনলাইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে এবং কোথাও কোথাও তা শুরুও হয়েছে। এরই মধ্যে কিছু সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনলাইনে ক্লাস নিতে শুরু করছেন, তারা অ্যাসাইনমেন্ট ও হোমওয়ার্কও দিচ্ছেন এবং তা ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে জমাও নিচ্ছেন। 
 
দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে নিশ্চিত করেই বলা যায়, এ'দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারের; আর্থিক সংকটের কারণে তারা অনেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে না। অনেকেরই নেই অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণ করার মতো ন্যূনতম সরঞ্জাম— স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ  আলাদা, সেখানকার বেশিরভাগ শিক্ষার্থী আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের এবং তারা সবকিছুই সামাল দিতে পারবে। কিন্তু স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা কি হবে বা কি হচ্ছে? ঘোষণা দিয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা টিভিতে ক্লাস নিচ্ছেন। কিন্তু তা শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা মঙ্গলজনক বা কার্যকরী হচ্ছে? অনলাইন ক্লাস এদেশে কার্যকর করার মতো সার্বিক পরিস্থিতি এখনো অনেক দূর;  বাচ্চাদের জন্য তো তা মোটেও প্রযোজ্য নয় বা আদৌও কার্যকরী হবে বলে আমার মনে হয় না। বাচ্চাদের জন্য শ্রেণীকক্ষে সরাসরি ক্লাসের কোন বিকল্প নেই। তাই এতসব উদ্ভট চিন্তা বাদ দিয়ে দূরত্ব বজায় রেখে বা অন্য কোন উপস্থিত প্রক্রিয়ায় বাস্তব কারিকুলামে কি করে শ্রেণীকক্ষে তাদের  ক্লাস নেয়া যায় তা নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত।  

গত ১৭ই মার্চ থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে, ৬ই আগস্ট ছুটি শেষ হলেও স্কুল-কলেজ খুলে দেয়া হবে কিনা সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। আর এ'সব বিষয়ে এখনও পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে কোন সিদ্ধান্ত না আসায় উদ্বেগে আছেন শিক্ষক-অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীরা। বাংলাদেশের সকল প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম সমন্বয়ের কাজে ফেসবুককে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর; বিষয়টি বড়ই চিন্তার। কারণ, ছোট ছোট বাচ্চারা একবার ফেসবুকে ঢুকলে এবং ফেসবুক আসক্ত হয়ে গেলে পরিস্থিতি কি হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া কতটাই-বা কাজে আসবে বা কাজ হবে বা করতে পারবে শিক্ষা সমন্বয়ে ফেসবুকের ব্যবহার?  এইবারের এসএসসি পাশ করা ছাত্রছাত্রীরা ভর্তির অপেক্ষায় আছে। দেশের গ্রামগঞ্জসহ সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কলেজ, সে সব কলেজে একাদশ শ্রেণীতে অনলাইনে ভর্তির পরিপত্র জারি করা হয়েছে; সেখানেই ঠিক মতো ভর্তি  কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারছে না এদেশের এসএসসি পাশ ছাত্রছাত্রীরা। এমতাবস্থায় অনলাইনে পড়ালেখা কি চাট্টিখানি কথা?  

গত মাসে এক ভিডিওবার্তায় মাননীয়  শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানিয়েছেন, চলতি শিক্ষাবর্ষ আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে; সেইসাথে পরের শিক্ষাবর্ষ কমিয়ে নয় মাস করার কথাও ভাবা হচ্ছে। যদিও এ'সব বিষয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য  বিভাগগুলো চেষ্টা করছে এই বছরের মধ্যেই শিক্ষাবর্ষ শেষ করতে। তবে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বিবেচনায় যদি ছুটি আরও বাড়ানো হয়, তাহলে এই শিক্ষাবর্ষ মার্চ মাস পর্যন্ত বাড়ানো নিয়েও আলোচনা হচ্ছে বলে জানান আন্ত:শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মূলতঃ দু'টো বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে— প্রথমতঃ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত করা যায় এবং দ্বিতীয়তঃ মেধার মূল্যায়নের দিকটিও যেন আপোষ করতে না হয়। তবে কবে নাগাদ এ'সব সিদ্ধান্ত আসতে পারে সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত  স্পষ্ট করে কোন কিছুই জানা যায়নি।

চলতি শিক্ষাবর্ষ আরও কিছুটা বাড়ানো হলে আগে যেমন নভেম্বর ডিসেম্বরে সমাপনী পরীক্ষা শেষ হতো, সেই পরীক্ষা শেষ হবে সামনের বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চে। অন্যদিকে সামনের শিক্ষাবর্ষ ১২ মাস থেকে কমিয়ে ৯ মাসে নামিয়ে আনার কথা চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এখানে একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, একটি শিক্ষাবর্ষে ১৪০ দিনের মতো পড়ানো হয়, ৩৬৫ দিনের বাকিটা সময় ধরে থাকে ছুটি আর ছুটি। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক এমনতর কার্যক্রম কাটছাঁট করে পরের শিক্ষাবর্ষের সমাপনী পরীক্ষা যেন ডিসেম্বরেই নেয়া যায় সে দিকে খেয়াল রেখে সিলেবাস কমানোর পাশাপাশি ঐচ্ছিক ছুটিছাটাও বাতিল করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা।

করোনার এই সময়টা নিশ্চয়ই একদিন কেটে যাবে, বন্ধ থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও হয়তো আবার খুলে দেয়া হবে; প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে শহর-নগর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীতে আবারও মুখরিত হয়ে উঠবে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ক্যাম্পাস। কিন্তু সময়টা আরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামীর শিক্ষা ব্যবস্থার কি হবে, কেমনই-বা হবে? করোনার কারণে তৈরি হওয়া অনলাইন আর অফলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার এই অসম বৈষম্য আমরা কি করে দূর করবো?  এসব প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গেলে বা সমাধান করতে গেলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা অবশ্যই আরো বাড়াতে হবে এবং সবাইকে সৎ ভূমিকা রাখতে হবে। 

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন— ১৯৩০ সালের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে আছে বিশ্ব; সে কারণে করোনা পরবর্তী বিশ্ব হবে ক্ষুধাময়।  ওদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছে না! কবে নাগাদ এই করোনাভাইরাস বিশ্ব থেকে নির্মূল হবে, বা আদৌও নির্মূল হবে কি? যতই বলা হউক না কেন কোভিড-১৯-এর ভেকসিন আবিষ্কার হয়ে গেছে; কিন্তু তা  বাস্তবায়িত হতে এবং মানবজাতির কল্যাণে আসতে সময় নেবে আরও অনেক। ততদিন কি শিক্ষা থেমে থাকবে আর সভ্যতা বিপর্যস্ত হবে??

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
২৭ জুলাই, ২০২০.

শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২০

সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নয় বিশ্বশান্তিই ইসলামের মূলনীতি:


'ইন্নাদ্দীনা ইন্দাল্লাহ্হীল ইসলাম'— নি:সন্দেহে আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম হলো শান্তি (ইসলাম);  কিন্তু কোথায় শান্তি? কোথায় স্বস্তি? শান্তি স্বস্তি কি পৃথিবী থেকে বিদাই নিয়েছে? - অনেকের মনে এ'রকম হাজার প্রশ্ন; বর্তমান সময়ে ইসলাম মানেই যেন অশান্তি! ভিন্ন ভিন্ন ছোট ছোট দল-উপদল ও মতের প্রাধান্য বিস্তারের অপচেষ্টা, হানাহানি মারামারি; ধর্ম নিয়েই যত সব বাড়াবাড়ি! কিন্তু কেন? কারণ, কেউ মদ বেচে দুধ খান, কেউ-বা দুধ বেচে মদ খায়!  
   
মাওলানা আব্দুর রহমান (আসল নাম নয়; মাওলানা অনুরোধ করেছিলেন যেন তাঁকে প্রচার না করি।) ধর্মীয় উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত একজন বিজ্ঞ আলেম। এই বাংলারই কোন এক উপজেলা পরিষদ মসজিদে তিনি ইমামতি করেন। এক অনুষ্ঠানে তাঁর সাথে আমার সাক্ষাত। আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে এমন সব কিছু কথা তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো যা সচারাচর আজকের আলেম বা কোন ইমামদের কাছে প্রত্যাশাও করা যায় না। যতই তাঁর কথা শুনছিলাম ততোই ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহ আলাইকে মনে পড়ছিল। 

আজ থেকে হাজার বছর আগে ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ইসলামকে পুনঃ জাগরিত করে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে এই ধরাধাম ত্যাগ করেছিলেন। যিনি বলে গেছেন - 'প্রস্রাব দিয়ে কাপড় দৌত করতে যেয়ে যত দামী  সাবান সোডাই ব্যবহার করা হউক না কেন যেমন কাপড়ের পরিত্রতা আনয়ন করা যায় না, তদ্রুপ হারাম উপার্জিত পয়সা দিয়ে দান-খয়রাত বা ছদগা-যাকাত করলেও তা পাপ বৈ পুণ্য বয়ে আনে না।' 

উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে জানতে পারি মাওলানা আব্দুর রহমান উপজেলা পরিষদ থেকে ইমামতির জন্য কোন বেতন বা টাকাপয়সা নেন না। উপজেলা পরিষদের পতিত জমি তিনি চাষাবাদ করেন এবং উৎপাদিত ফসলের ভাগের এক অংশ উপজেলা কোষাগারে জমা দিয়ে বাকীটা দিয়ে তিনি জীবনযাপন করেন। আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেন যেন কথাগুলো আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল না। তাই উৎসাহ ও উৎগ্রীবতা নিয়ে ঘটনা প্রত্যক্ষ করার অভিপ্রায়ে তাঁর সাথে বাসায় দেখা করতে চাইলাম; তাৎক্ষনিক সাক্ষাতে তিনি রাজি হলেন না। আমার সম্বন্ধে ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে বেশ কয়েকদিন  পর উপজেলা চেয়ারম্যান মারফত আমাকে জানালেন, যে কোন দিন আমি যেন তাঁর বাসায় যাই। প্রথমদিন কেন তিনি আমার সাথে সাক্ষাত দিতে চাননি তার কারণও সেদিন সাক্ষাতে জানতে পেরেছিলাম; বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি আমাকেও অন্য দশ জনের মতোই ভেবেছিলেন।  

আমি যেদিন মাওলানার বাসায় প্রথম যাই সেদিন সকাল ১০.১৫ টায় গিয়ে পৌঁছি, তিনি তখন বাসার পাশে একটা বেগুন ক্ষেতে আগাছা পরিস্কার করছিলেন। প্রায় পনে দু'ঘন্টা ঐ বেগুন ক্ষেতেই আমাদের দু'জনের দীর্ঘ আলাপচারিতা। যদিও তিনি আমাকে দেখেই কাজ বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি তা করতে দেইনি। তাঁর কাছে গিয়েই বুঝেছিলাম এই জীবনে এখনো আমার অনেক কিছু শিখার বাকী আছে। পরবর্তীতে সময় ও সুযোগ পেলেই হুটহাট তাঁর ওখানে চলে যেতাম এবং মত বিনিময় করতাম। 

আত্মিক ও বাহ্যিক এবাদত-সংযমের এক জ্বলন্ত  উদাহরণ, উৎকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারী  এই মাওলানা আব্দুর রহমান; যাঁর মাঝে আমি দেখতে পেয়েছি আল্লাহর নূর, তাঁর চেহারায় তা সুস্পষ্ট  ফুঁটে উঠেছে। তিনি বর্তমানের তথাকথিত কমার্শিয়াল আলেম বা ইমামদের মত নন; তিনি বলেন, 'নামাজ তো আমার জন্যও ফরয। আমার ফরয তো আমাকে আদায় করতেই হবে। নিজ ইমামতিতে আমি নিজে আমার ফরয আদায় করছি, অন্যরাও আমার পিছনে যার যার ফরয আদায় করে নিচ্ছেন, এবাদত-বন্দেগীর প্রতিদানের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ্‌; এর জন্য আমি অন্যের কাছ থেকে বিনিময় নেবো কেন?'

ইসলামের আসল বুনিয়াদ এই আব্দুর রহমান মাওলানাদের হাতেই। তাঁরাই প্রকৃত ইসলামের ধারক ও বাহক। কে বলে ইসলামে শান্তি নেই? মাওলানা আব্দুর রহমানের মতো অনেক মু'মিন মুসলমান এখনো এই ধরণীতে জিন্দা আছেন, তাঁদের সংসার দেখতে যান; দেখবেন, তাঁদের  কোন কিছুরই ঘাটতি নেই, অভাব নেই। আল্লাহ-র খাস রহমত ও বরকত তাঁদের উপর সব সময়ই বিদ্যমান। 

ইসলাম মানে শান্তি, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ এক পরম শান্তির বিষয়;  এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত বা ভিন্নমত থাকার কথা নয়। হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা আহাম্মদ মুস্তোবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লাম পর্যন্ত সকল নবী রাসুলগণ পৃথিবীতে এই শান্তির ধর্মের বুনিয়াদই রচনা করে গেছেন, আমরন তাঁরা চেষ্টা করে গেছেন শান্তি-সাম্য-সৌহার্দ্যের পৃথিবী গড়ে তুলতে। কোন নবী বা রাসুলের জীবনীই আমাদের ধর্মীয় উস্কানি, সন্ত্রাসবাদ বা অশান্তির শিক্ষা দেয় না। 

ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করার জন্যই পবিত্র কুর'আনুল কারীমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নবী-রাসুলগণের জীবনী ও ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে; শান্তি, সাম্য ও সৌহার্দ্যের বাণী সমেত। যা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে আমরা পথের দিক নির্দেশনা পাই এবং নিজ  জীবনের দিক নির্ণয় করতে পারি। তাছাড়া ভিন্ন ধর্মমত ও পথেরও যারা দুনিয়াতে জ্ঞানের তাপস হিসেবে এসেছিলেন সেই সব গ্রেট দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টেটল, আলেকজান্ডার দি গ্রেটরাও কিন্তু পৃথিবীতে  শান্তির বুনিয়াদই বপন  করে গেছেন; জ্ঞানের বিকাশে তাঁরাও রেখে গেছেন স্মরণীয় বরণীয় সব অবদান। ধর্মকর্ম বা মৌলিক এবাদত-বন্দেগীর কথা বাদ দিয়ে দেখলে দেখা যায় যে বিশ্বশান্তির প্রশ্নে পৃথিবীতে আসা সকল মনীষীর মত ও পথ এক ও অভিন্ন। 

সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লাম বার বার ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। সারে চৌদ্দশ বছর আগেই তিনি জানতেন, মুসলিমদের মাঝে ধর্ম নিয়েই বাড়াবাড়ি হবে সবচেয়ে বেশি। তাই তিনি অসংখ্যবার মুসলিমদের মধ্যপ্রন্থা অবলম্বন করার তাগিদ দিয়ে গেছেন। সহীহ  ছিত্তায় এরূপ অসংখ্য হাদীসের সন্নিবেশ দেখা যায়। পরবর্তীতে পৃথিবীর সকল মুসলিম মনীষীর লেখা থেকেও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের কথার অনুসরণ ও অনুকরণের মিলও খুঁজে পাওয়া যায়। 

উম্মতে মুহাম্মদী মানেই মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের অনুসরণ ও অনুকরণ। যা করতে হবে তা আত্মিক ও বাহ্যিক উভয় প্রন্থায়ই করতে হবে। সাধারণভাবে ইসলাম বলতে আমরা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের প্রবর্তিত ও প্রচারিত ধর্মকেই বুঝি। আর এই ইসলামের সকল মূল নীতি, বাণী ও উদ্দ্যেশ্য-বিদেয় পুরোপুরিভাবে শান্তির সাপেক্ষে, অশান্তির বিপক্ষে। মুলতঃ বিশ্বশান্তিই ইসলামের মূল নীতি; আর সকল নবী-রাসুলের প্রচার-প্রচারণা এই নীতিমালার  উপরই প্রতিষ্ঠিত।   

অনেকেই ভাবতে পারেন— তবে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদীন সহ সকল মুসলিম খলিফাগণ এতো যুদ্ধ করেছেন কেন? তখনকার পরিবেশ, পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতা মুলতঃ অন্য রকম ছিল। তৎকালীন জাজিরাতুল আরব ছিল আইয়ামে জাহেলিয়াতের নিকৃষ্ট একটি চারণভূমি। নেংটো হয়ে সেই সময় তারা কাবাঘর তাওয়াফ করতো। পৌত্তলিকতা ছিল আরবিয়দের বেশিরভাগের ধর্ম। বংশ ও গুষ্টিগত দাঙ্গা হাঙ্গামা তাদের মাঝে লেগেই থাকতো। সে সময় সেখানে পিতারা পিতা হয়েও নিজ কন্যা সন্তানকে জ্যান্ত মাটিচাপা দিত! 

সমাজ সভ্যতা বলতে আজকের আমরা যা বা যতটুকো বুঝি, তৎকালীন আরবের অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ তার বিপরীত। হিংস্রতা নিষ্ঠুরতা বর্বরতা ছিল তাদের পৌরুষত্ত্ব জাহিরের মানদণ্ড। আরবের সেই চরম পর্যায়ে আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন আলোর দিশারি রূপে তাঁর প্রিয় হাবীব, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী মহানবী হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামকে সেই পংকিল সমাজে প্রেরণ করেন। মহানবী (সাঃ) তাঁর কাঁধে বর্তানো দায়িত্ব সম্পুর্ণ সুচারুভাবে সম্পন্ন করে দুনিয়া থেকে ওফাত নেয়ার পর থেকেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ভিন্ন মতবালম্বীরা; আজও সেই একই গতিতে তাদের কুকর্ম অব্যাহত রয়েছে।  

সময়ের প্রেক্ষিতে কেন জানি বিদাই হজ্জে রাসুলপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের সেই দিকনির্দেশনা শেষ ভাষণ খুব বেশি মনে পড়ছে। সুরা আন-নাছর নাজিল হওয়ার পর ৬৩২ খৃষ্টাব্দে ২৩ ফেব্রুয়ারি লক্ষাধিক সাহাবী (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে মহানবী (সাঃ) হজ্জ করতে মক্কা যান। ৯ যিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত বিশাল জনসমুদ্রে 'জাবালে রহমত'-এর উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন—
  
  ১। হে মানব সকল! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোন, কারণ আগামী বছর আমি তোমাদের সাথে এখানে সমবেত হতে পারবো কিনা জানি না।
  ২। আজকের এই দিন, এই স্থান, এই মাস যেমন পবিত্র, তেমনই তোমাদের জীবন ও সম্পদ পরস্পরের নিকট পবিত্র।
  ৩। মনে রাখবে অবশ্যই একদিন সকলকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। সেদিন সকলকে নিজ নিজ কাজের হিসাব দিতে হবে।
   ৪। হে বিশ্বাসীগণ! স্ত্রীদের সাথে সদয় ব্যবহার করবে। তাদের উপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তেমনই তোমাদের উপরও তাদের অধিকার রয়েছে।
   ৫। সর্বদা অন্যের আমানত রক্ষা করবে এবং পাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে ও সুদ খাবে না।
   ৬। আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না, আর অন্যায়ভাবে একে অন্যকে হত্যা করবে না।
    ৭। মনে রেখো দেশ বর্ণ গোত্র সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল মুসলিম সমান। আজ থেকে বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব বিলুপ্ত হলো। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো আল্লাহ ভীতি বা সৎকর্ম। সে ব্যক্তিই সবচেয়ে সেরা যে নিজের সৎকর্ম দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে।
   ৮। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, পূর্বের অনেক জাতি এ কারণে ধ্বংস হয়েছে। নিজ যোগ্যতা বলে ক্রীতদাস যদি নেতা হয় তার অবাধ্য হবে না। এবং তার আনুগত্য করবে।
   ৯। দাস দাসীদের প্রতি সদ্ধ্যবহার করবে। তোমরা যা আহার করবে ও পরিধান করবে তাদেরও তা আহার করাবে ও পরিধান করাবে। তারা যদি কোন অমার্জনীয় অপরাধ করে ফেলে, তবে তাদের মুক্ত করে দেবে; তবু তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করবে না। কেননা তারাও তোমাদের মতোই মানুষ, আল্লাহর সৃষ্টি। সকল মুসলিম একে অন্যের ভাই এবং তোমরা একই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।
  ১০। জাহিলি যুগের সকল কুসংস্কার ও হত্যার প্রতিশোধ বাতিল করা হলো। তোমাদের পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহর বাণী এবং তাঁর রাসুলের আদর্শ রেখে যাচ্ছি। একে যতদিন তোমরা আঁকড়ে থাকবে ততোদিন তোমরা বিপদগামী হবে না।
    ১১। আমিই শেষ নবী, আমার পর আর কোন নবী আসবেন না।
     ১২। তোমরা যারা উপস্থিত আছো তারা অনুপস্থিতদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দেবে।

এই ছিল মোটামুটিভাবে বিদাই হজ্জ-এ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের মূল বাণী, যা উম্মতে মুহাম্মদী (সাঃ)-এর প্রত্যেকের জীবন চলার পথের পাথেয়।

কত কাঠখড় পেড়িয়ে আজকের এই ইসলাম তা হয়তো বর্তমান প্রজন্ম খুব একটা বেশি জানে না। জানবেই-বা কি করে? বিকৃত আর ভ্রান্ত মত ও পথের প্রচার প্রসার দুনিয়ায় যে ভাবে বিস্তার লাভ করেছে, তাতে প্রকৃত সত্য অনেকটাই ধামাচাপা পড়ে গেছে। ইসলামের অপ্রিয় সত্য কেউ তুলে ধরতে চায় না, আবার কেউ তুলে ধরলে তার জন্য তাকেও গালমন্দ শুনতে হয়। অসত্য অসুন্দর ইতিহাস ও ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদী-নাসারা ষড়যন্ত্র চক্রান্ত তুলে না ধরলে প্রকৃত সত্য ও সুন্দর প্রজন্মের কাছে খোলসা হবে কি করে? না বললে, না জানলে তো তুলনা করা সম্ভব হবে না, ভুলও সংশোধন করা যাবে না। 

আমার লেখা নিয়ে এরই মাঝে একটি শ্রেণী খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তারা অনেকেই  অনেক ধরনের বিকৃত রুচির পরিচয় দিচ্ছে। তাদের উদ্দ্যেশে বলছি— ধর্ম সম্বন্ধে ভালভাবে না জেনে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে কেউ কখনো আসে না; বিশেষ করে পবিত্র কুর'আনুল কারীম ও হাদীস নিয়ে আলোচনা করার তো প্রশ্নই উঠে না। পবিত্র কালাম পাক নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করতে হলে যে সব জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন,  আখলাক ইবাদত দরকার, আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীনের খাস রহমত, আমি সেগুলো অর্জন করতে চেষ্টা করেছি, করছি। আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীনের দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া, কোন ভ্রান্ত মতবাদ কোনদিনও আমাকে প্রভাবিত করতে পারেনি। 

আমি মনে করি পবিত্র কুর'আনুল কারীম ও সহীহ ছিত্তাহ অনুসরণ করে মহান স্রষ্টার কৃপা প্রার্থনা করলেই সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া যায়, তা পাওয়া দুষ্করও নয়। তাছাড়া বিশিষ্ট মুসলিম মনীষী— ইমামে আযম ও হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-সহ পাইওনিয়র মুসলমানদের লেখা অজস্র কিতাব আমাদের পথ প্রদর্শনে সহায়িকা হিসেবে কাজ করবে। অবশ্য বর্তমানে বহু পথভ্রষ্ট দল বেরিয়েছে, যারা ইমামে আযম বা ইমামে রাশেদীন অথবা হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-কে মানতে নারাজ! তারা মনে করে শুধু কুর'আন পড়লেই যথেষ্ট। তাদের এই যুক্তি আমি অবশ্যই মানি; কিন্তু সঠিক ধারাবাহিকতার অনুসরণ? 

ধারাবাহিকতা ছাড়া সরাসরি আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন বা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামকে অনুসরণ করা কি করে কার পক্ষে সম্ভব? ঈমান ও ইসলামকে জানতে হলে বুঝতে হলে অবশ্যই আমাদের কারো না কারো লেখার উপরই নির্ভর করতে হবে, কোন না কোন ধারাবাহিকতার উপর আমল করতে হবে। আমি মনে করি হুজ্জাতুল ইসলামের ক্ষুরধার লেখাই আমাদের সঠিক পথ বাতলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। সঠিকভাবে কুর'আনুল কারীম জানতে ও বুঝতে হলেও অবশ্যই সঠিক তাফসীর কারকের তাফসীর পড়তে হবে, অনুসরণ করতে হবে। ব্রিটিশ মদদে গড়া মৌদুদীর তাফসীর পড়ে সঠিক ইসলামের নাগাল মোটেও পাওয়া যাবে না। এতে দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই বরবাদ হবে।
  
ইসলামের সেই প্রথম যুগেই বেইমানী,  নেমকহারামী, মোনাফেকী নামক বিষফোঁড়াগুলো মুসমানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছিল। শ্রেষ্ঠ সাহাবী হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ)-এর ঘরেই জন্ম নিয়েছিল কুখ্যাত মালাউন ইয়াজিদ; যে কিনা মসজিদে নববীকে ঘোড়ার আস্তাকূর বানিয়েছিল! ইয়াজিদের মতো অসংখ্য মালাউন মুসলিম সাম্রাজ্যের সম্রাট হয়েছে! স্বীকৃত মোনাফেক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের কথা ইতিপূর্বে বহুবার আলোচনা করেছি। ইহুদী-নাসারা চক্রান্তে যুগের পরিক্রমায় সেই উবাইরা ও খাচ্চোর শাসকরা মিলে পৃথিবীর শান্তির ধর্ম ইসলামকে বিতর্কিত করেছে, ভ্রান্ত মতবাদ ও নতুন নতুন ফিতনার উৎপত্তি ঘটিয়েছে। তারা তাদের দুনিয়াবি  হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দ্যেশেই এ'সব করেছে। 

ইসলামে ধর্মীয় সন্ত্রাস বা ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতাবাদ উগ্রবাদের সূচনা মূলতঃ হযরত ওসমান (রাঃ) -র শাসনামলের শেষ দিকেই শুরু হয়েছিল। ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দে যা ব্যাপক রূপ ধারণ করে; আব্দুল আজিজ আল সাউদ ও মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব নাজদী মিলে ইসলামে জঙ্গিবাদের বীজ বোপণ করে, যা পরবর্তীতে মুসলিম রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হিসেবে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। ভ্রান্তমতবালম্বী আব্দুল ওহাব নাজদী ধর্মীয় নেতা সেজে একের পর এক বিকৃত ফতোয়া দিতে থাকে, আর ডাকাত সর্দার আব্দুল আজিজ আল সাউদ রাষ্ট্রনায়ক সেজে (যার নামে জাজিরাতুল আরব সৌদি আরব হয়েছে ) নাজদীর ফতোয়া বাস্তবায়ন করতে থাকে! 

তৎকালীন জাজিরাতুল আরবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের বংশধরগণকে নিধনের যে জঘন্য প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছিল আব্দুল ওহাব নাজদী ও আব্দুল আজিজ আল সাউদ তা ভাষায় বর্ণনা করার মত নয়। সকল সাহাবী রাদি'আল্লাহু আনহুগণের কবরের শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকো মুছে দেয়াই যেন ছিল নাজদীর ফতোয়ার মুখ্য বিষয়। এমন কি শালা-ভগ্নীপতি মিলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের পবিত্র রওজা মোবারক গুঁড়িয়ে দেয়ার অপচেষ্টাও করেছিল। সে এক বিকৃত ইতিহাস; অন্য আরেক সময় তা তুলে ধরার আশা পোষণ করছি। 

সেই থেকেই শুরু হয় নামধারী মুসলিমের হাতে ঈমানদার সব  মুসলিম নিধন! একদিকে ঈমান ও আকিদাগত বিষয়গুলো পরিবর্তিত হতে থাকে ধর্মীয়  সংস্কারের নামে, অন্যদিকে চলতে থাকে সারে তেরশ বছরের ইসলামের ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্নগুলোর মুন্ডুপাত। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নবী কারীম (সাঃ)-এর বংশধারগণ প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আফগানিস্তান পাকিস্তানের বন জঙ্গলে  আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। স্বভাবতই নবীর বংশধরগণ শান্ত ভদ্র নম্র হন; হিংস্রতা বর্বরতা তাঁরা বুঝেন কম। ডাকাতদের সাথে কুলিয়ে উঠা তাঁদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব ছিল না। 

ডাকাতদের বর্বরতার কাছে হার মেনে মাতৃভূমি ছেড়ে তাই তাঁরা আত্নগোপন করেছিলেন এই অঞ্চলে। নির্মম নিষ্ঠুর নিয়তি, সেই একই অবস্থা আজও বিদ্যমান। মার্কিনরা ওসামা-বিন-লাদেনকে আরবে তৈরী করে, শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানে আত্মগোপনের বাহানাকে ইস্যু করা ছিল আফগানিস্তানে মার্কিনী আক্রমনের একটি কূটকৌশল; আসল উদ্দ্যেশ্য ছিল অন্য, প্রকৃত মুসলিম দমন।  

বর্তমান পৃথিবীর নব্য আকিদার মুসলিম শুধুমাত্র নামকাওয়াস্তেই মুসলিম। কার কতটুকো ঈমানী জোর আছে তা একটু স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বা স্বার্থ সম্পৃক্ত ব্যাপারে জড়ালেই স্পষ্ট হয়ে যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য ওহাবী মতবাদ আজ সাড়া মুসলিম জাহানকে খণ্ড-বিখণ্ডিত করে দিয়েছে; অন্যদিকে মওদুদীবাদ আমাদের এই উপমহাদেশকে উত্তপ্ত করেছে। এই দুই ভ্রান্ত দল  মিলে সমগ্র  ইসলামী জাহানকেই আজ এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বানিয়ে ছেড়েছে। একদিকে ইহুদী-নাসারা চক্রান্ত, অন্যদিকে মুসলিম রূপি এই সব মুনাফিকদের আধিপত্য, সমগ্র মুসলিম জাহানকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। এর মুল কারণ মুসলিম বিশ্বে আল্লাহ প্রদত্ত ধনসম্পদের পর্যাপ্ত সমাহার।

অতি সাধারণ একটি চিন্তা— ইসরাইলে ইহুদী সন্ত্রাসীরা প্রতিদিন নিরস্ত্র মুসলিম নর-নারী-শিশুর উপর পশুর মতো হামলে পড়ছে, অকাতরে অকারণে ছোট ছোট অবোধ শিশুদেরকেও হত্যা করছে। আর আল কায়েদার বর্তমান প্রধান জাওয়াহিরি ইসরাইল বাদ দিয়ে এশিয়ার মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ অঞ্চলে আঘাতের পরিকল্পনা করছে! সত্যি সত্যিই আল কায়েদা যদি প্রকৃত ইসলামী চেতনা সমৃদ্ধ কোন গ্রুপ হতো, তবে জাওয়াহিরি সকল ইসলামী গ্রুপগুলো নিয়ে অতর্কিতে ইসরাইলের উপরই ঝাঁপিয়ে পড়তো; বাংলাদেশ বা মুসলিম দেশে সাধারণ মুসলিম মারার পরিকল্পনা করতো না। আমাদের দেশে বা মুসলিম বিশ্বে যে সব সন্ত্রাসী উগ্রবাদী গ্রুপগুলো আছে, তারাও কোনভাবেই  আল কায়েদার সাহায্যে এগিয়ে আসতো না। ইসলামী বলে পরিচিত এই সব সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো আসলে মার্কিনীদের তৈরী, মার্কিন চক্রান্ত বাস্তবায়নের এজেন্ট ওরা। মুখ ও অবয়বে ইসলামী লেবাস এঁটে ইহুদী-নাসারাদের চড় হিসেবে মুসলিম বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। 

ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যুগে যুগে মুসলমানের ঘরেই জন্ম নিয়েছে বেইমান আর মুনাফিক। যারা কূটচালে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে ইসলামকে বার বার বিতর্কিত করেছে। হিংসা প্রতিহিংসা তাদের মূল চালিকাশক্তি; তারাই ভিন্ন মতবালম্বী। ইসলামকে সব সময়ই তারা হাতিয়ার বা ঢাল  হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং আজও করে আসছে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের কোন মূলনীতিরই তারা ধার ধারে না। বাহ্যিক ঈমানদার ও ইবাদতি ভাব প্রকাশ করে তারা ইসলামিষ্ট সাজার ভান করে মাত্র। 

ইসলাম আল্লাহ মনোনীত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান; রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, ব্যক্তি কোন কিছুই এই বিধানের বাহিরে নয়। ইসলামের মুল বিষয়গুলো মানুষের মৌখিক, আত্নিক ও বাহ্যিক অবস্থার সাথে পুরোপুরিভাবে সম্পৃক্ত;  যেমন— আল্লাহ ও আল্লাহর হাবীব (সাঃ)-কে মুখে স্বীকার করা, অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা ও আল্লাহর আদেশ নিষেধ মান্য করা ও নিজ জীবনে  বাস্তবায়ন করা। সেই হিসেবে ঈমান ও ইসলাম প্রধানতঃ তিন ধরনের দেখা যায়। কেউ মনে করেন - ঈমান ও ইসলাম এক ও অভিন্ন। আবার কেউ মনে করেন - দুটোই ভিন্ন ভিন্ন, পরস্পরের কোন মিল নেই। এবং কারো কারো মতে - দুটো আলাদা হলেও একটি অপরটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। 
 
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-র মতে - আভিধানিক অর্থে ঈমান হলো সত্যায়ন করা; অর্থাৎ সত্যি বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস ও প্রকাশ করা। এবং ইসলামের প্রকৃত অর্থ হলো আনুগত্য স্বীকার করা ও অস্বীকৃতি, অবাধ্যতা, হটকারিতা হতে নিজকে দূরে রাখা। ঈমান প্রশ্নে, সত্যায়ন বা বিশ্বাস এক বিশেষ স্থান, তথা অন্তর দিয়ে হয়ে থাকে; যার প্রকাশক হলো মুখ, আর স্বীকার করা হয় মুখ, অন্তর ও প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে। অভিধানের ভাষায় ইসলাম একটি ব্যাপক বিষয়, আর ঈমান হলো একটি বিশেষ বিষয়। 

ইসলাম যদি একটি প্রকান্ড গাছ হয় ঈমান হলো তার একটি শাখা মাত্র। মূলতঃ ইসলামের শ্রেষ্ঠ অংশের নাম হলো ঈমান। ঈমানহীন কোন মানুষ কখনো একজন সত্যিকার মুসলিম হতে পারে না। যারা না বুঝে ভ্রান্ত সব ইসলামী গ্রুপের পাল্লায় পড়ে ঈমান নাশক টেবলেট খাচ্ছে, শহীদ বা গাজি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, হে আল্লাহ আপনি  তাদেরকে হেফাজত করুন এবং হেদায়েত দান করুন।
 
    শত সহস্র পথের মধ্যে
               সত্য কেবল একটি পথ।
   সেই পথের যাত্রী সবায়
               একই লক্ষ্য একই মত।
   কেউ কি কোন খবর রাখে
               তাদের লক্ষ্য-কাম্য কি?
   ভ্রান্ত পথের যাত্রী যারা
               তারাই-বা বুঝবে কি? 

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
০৮-০৯-২০১৪.

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২০

কর্মসংস্থানে পৃষ্ঠপোষকতা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো যোগ্যতা ও আত্মবিশ্বাস:

জীবন চলার পথে ‌হাজারো প্রতিকূলতা— দারিদ্রতার কষাঘাত, এক বেলা খাবার জোটে তো আরেক বেলা জোটে না, পরিধানে ভালো পোশাক নেই, ধার-দেনা করে পড়াশোনা শেষ করতে না করতেই আইটি জায়ান্ট মাইক্রোসফট-এর নিয়োগপত্র হাতে পাওয়া; বছরে বেতন ১.০২ কোটি রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এটি হলো ভারতের সেই বাৎসল্য চৌহানের জীবনের গল্প। 

নিশ্চয় আপনারা ভুলে যাননি ২০১৬ সালের প্রথম দিকে ভারতের আনন্দবাজার ও বাংলাদেশের কিছু পত্রিকায় ঝড় তোলা সেই খবর - 'কোটি টাকার চাকরি পেলেন ঝালাই মিস্ত্রির ছেলে'। ভারতের বিহার রাজ্যের খাগাড়িয়ার বাৎসল্য চৌহান আইআইটি খড়গপুর-এর শেষ বর্ষের ছাত্র ছিল সে তখনও, বয়স মাত্র ২১ বছর। বাবা একজন ঝালাই মিস্ত্রি, মা অতি সাধারণ গৃহবধূ; ছয় ভাই-বোনের মাঝে প্রচণ্ড অভাবের সংসারে সংগ্রাম চালিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল বাৎসল্য চৌহান। তার সেই সংগ্রাম ছিল শিক্ষার মাধ্যমে মেধা বিকাশ করে জীবনযুদ্ধে নামার সংগ্রাম; আত্মবিশ্বাস ও একাগ্রতা তাকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিল। 

অনেকেই এখানে ভাগ্যকে বড় করে দেখতে চাইবেন। হ্যাঁ, মুসলিম হিসেবে ভাগ্যকে অবশ্যই মানতে হবে, তবে বাস্তবতা থেকে একটি জিনিস আমি আবিস্কার করেছি, প্রচেষ্টা না থাকলে কারো ভাগ্য কোন দিনও সুপ্রসন্ন হয় না। কলেজ জীবনে আমাদের একজন বন্ধু ছিল, তার বেশভূষা ও চালচলন ছিল সম্পূর্ণ  অন্যরকম। সেই ৭০-এর দশকেও সে দু'টো প্রাইভেট কার অদল বদল করে কলেজে আসতো; মা-বাবার একমাত্র সন্তান। বাবা তার জন্য অগাধ অর্থ-সম্পদ, মিল-কারখানা ও ঢাকায় বিশাল বাড়ি রেখে গেছেন। আমাদের এই সংক্ষিপ্ত জীবনেই আমরা তাকে একসময় প্রচন্ড রকমের অভাবগ্রস্থ হতেও দেখেছি! শুনেছি তার বাবার মৃত্যুর পর সে খারাপ লোকজনের সংস্পর্শে পড়ে বাবার রেখে যাওয়া সেই বিশাল সম্পদের সব কিছই ধ্বংস করে ফেলেছে। 

অতিরিক্ত অর্থ-সম্পদ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষকে অমানুষ বানিয়ে ফেলে। সন্তানকে প্রকৃত শিক্ষা দিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলতে পারলে বা বানাতে পারলে তার জীবনে সম্পদের কোন অভাব কখনো হয় না। ছোট থেকে বাস্তবতা ও কিছুটা দারিদ্রতার সাথে প্রকৃতি থেকে শিক্ষা দিয়ে বড় করতে পারলে দেখবেন আপনার সন্তান বাস্তবতার নিরিখেই জীবন গড়বে এবং কর্মজীবনেও সফলতাকে অতি সহজে কুক্ষিগত করে ফেলতে পারবে।

কেএফসির ফাস্টফুড এখন এদেশেও বেশ জনপ্রিয়। বড় বড় শহর থেকে শুরু করে ছোট ছোট মফস্বল শহরেও এখন কেএফসি ফাস্টফুড শপের দেখা মেলে। তাই কেএফসির লোগোর সেই ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওয়ালা হাসিমুখের লোকটিকে আমরা অনেকেই চিনি, তিনি হলেন কনোনেল স্যান্ডার্স; যিনি কেএফসি নামের বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় ফাস্টফুড চেইন শপের প্রতিষ্ঠাতা। 

তুমি যদি তোমার এলাকায় কেএফসির একটি শাখা খুলতে চাও, তবে তোমাকে শুধু তাদের ফ্রেঞ্চাইজি ব্যবহারের জন্য ৪৫ হাজার ডলার বা প্রায় ৩৮ লাখ টাকা দিতে হবে।  এতবড় কোম্পানী যাঁর রেসিপি থেকে শুরু, সেই রেসিপি বিক্রি করতে গিয়ে তাঁকে ১০০৯ বার ব্যর্থ হতে হয়েছিল!

৫ বছর বয়সে বাবা হারানোর পর থেকে তাঁর জীবন সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। নিজের রান্নার দক্ষতার কারণে কাজ পেতে তাঁকে কখনও তেমন একটা অসুবিধায় পড়তে হয়নি;  কিন্তু যখনই তিনি নিজে কিছু করতে গেছেন – তখনই ব্যর্থ হয়েছেন। ১৯৩৯ সালে ৪৯ বছর বয়সে অনেক কষ্টেসৃষ্টে তিনি একটি মোটেল শুরু করেন। ৪ মাস চলার পরই মোটেলটিতে আগুন ধরে ধ্বংস হয়ে যায়। ৫০ বছর বয়সে তিনি তাঁর সিক্রেট চিকেন ফ্রাই রেসিপি নিয়ে আবার কাজ করতে শুরু করেন।

১৯৫৫ সালে তাঁর আরও একটি উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। চার রাস্তার মোড়ে তিনি একটি রেস্টুরেন্ট খুলেছিলেন। ভালোই চলছিল, কিন্তু নতুন রাস্তা হওয়ার ফলে সেই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে রেস্টুরেন্টও বন্ধ করে দিতে হয়। সেই বছর ৬৫ বছর বয়সী কনোনেলের হাতে মাত্র ১৬৫ ডলার ছিল। এরপর তিনি তাঁর চিকেন রেসিপি বিক্রী করার চেষ্টা করেন। ১০০৯টি রেস্টুরেন্ট তাঁকে ফিরিয়ে দেয়ার পর একটি রেস্টুরেন্ট তাঁর রেসিপি নিয়ে কাজ করতে রাজি হয়; বাকিটা ইতিহাস! 

আমি লক্ষ্য করেছি আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা অন্যের সাফল্যের গল্পগাঁথা শুনতে বা পড়তে প্রচন্ড ভালোবাসে; অবশ্যই এটা খুবই ভাল একটি লক্ষণ, যদি ঐ গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করার প্রত্যয়ে সে তা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই নিজের জীবনে এসব বাস্তবায়ন করতে চায় না বা পারে না; বরং অনেককে আমি দেখেছি হতাশায় সাগরে হাবুডুবু খেতে। তাদের অভিযোগ ঘুষ, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা মামা চাচার জোর ছাড়া এদেশে কিছুই হয় না; চাকুরীর তো প্রশ্নই উঠে না। 

কিছু ছেলেমেয়ের কাছ থেকে এমনসব হতাশাজনক কথাবার্তা শুনে অনেক সময় আমার মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। আসলে কি এসব অভিযোগ পুরোপুরি সত্য? আমার তো তা মোটেও মনে হয় না। এমনটা সত্য হলে সুবিধা বঞ্চিত পরিবারের ছেলেমেয়েরা বিসিএস কোয়ালিফাই করে সরকারী চাকুরীতে অহরহ ডুকছে কি করে? এমন উদাহরণ দেশে কি খুবই কম? মোটেও কম নয়। তাছাড়া দেশের সব বিখ্যাত ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালেই দেখা যায় মেধা ও যোগ্যতার বলেই যথেষ্ট পরিমাণে হতদরিদ্র পরিবারের অতি সাধারণ ছেলেমেয়েরা স্থান করে নিচ্ছে।

ছোট্ট ভূখণ্ডের বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশের পারিপার্শ্বিকতার বাস্তবতাকে তোমাদের অবশ্যই মেনে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। জীবন ধারণের সকল ক্ষেত্রেই বর্তমান দুনিয়ায় প্রত্যেককে প্রতিটি প্রতিযোগিতায় কোয়ালিফাই করতে হয়, আর এটাই স্বাভাবিক; চাকুরী ক্ষেত্রে তো আরো অনেক বেশি, করতেই হবে। তাই গো ধরে বসে থাকলে চলবে না, আত্মকর্মসংস্থানের জন্যও প্রচেষ্টা চালাতে হবে; কোন কর্মকেই কখনও খাটো করে দেখা যাবে না। তোমরা কি জানো বিদেশে ভার্সিটিতে পড়তে থাকা ছেলেমেয়েরা গ্রুপ করে বাসা বাড়ি বা অফিস আদালত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার কায়িক পরিশ্রমের কাজ করে বা বাসাবাড়ির টয়লেট পরিস্কারের কাজ কন্ট্রাক্ট নেয়? আর ওসব করে অল্প সময়ে কায়িক পরিশ্রম দ্বারা তারা বেশ কিছু বাড়তি ডলার কামিয়ে নিতে পারে। 

তোমাদের জন্য আমার উপদেশ, শিক্ষা জীবন শেষ না হতেই কর্মসংস্থানের দিকে পা বাড়াও, এটা ওটা করে অভ্যাস করো; পাশ করে যদি কিছুদিন বসে থাকো বিশ্রাম নাও, দেখবে আস্তে আস্তে তোমার কর্মস্পৃহা কমে যাবে, লোপ পেতে শুরু করবে এবং এক সময় হতাশায় নিমজ্জিত হবে। অবিরামভাবে চলে যারা শিক্ষা জীবন থেকে কর্মজীবনে প্রবেশ করে তারা তুলনামূলক সাফল্য পায় অনেক বেশি। তাছাড়া, একটু খেয়াল করে সঠিকটা জেনে দেখো, এদেশেও বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরা নিজ যোগ্যতা বলে চাকুরী পেয়েছে এবং পাচ্ছে, অন্যের টেলিফোনের জোরে নয়। 

আমি এমন অনেক ছেলেমেয়েকে চিনি ও জানি যারা বাবা-চাচা-মামার জোর বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই নিজের যোগ্যতায় শুধুমাত্র আত্মবিশ্বাসের জোরে উপরে উঠেছে। রাবারের স্পঞ্জ পায়ে লুঙ্গি পড়ে আমাদের অফিসে এসেছিলেন কোন একজন,  কর্ম গুণে আজ তিনি আমাদের পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার। সফলতার আগে মানুষের জীবনে আসে ব্যর্থতা; আর ব্যর্থতা আসে বারবার। প্রতিটি মানুষের জীবনেই ব্যর্থতা আসে এবং আসবেই। মানুষের কোনও বড় স্বপ্নই একবারে পূরণ হয় না। স্মরণ রাখতে হবে— ব্যর্থতা  জীবনের অবিচ্ছেদ্য  অংশ। 

পৃথিবীতে অসাধারণ সাফল্য সেইসব মানুষরাই অর্জন করতে পেরেছেন যাঁরা বারংবার ব্যর্থ হয়েও চেষ্টা করে গেছেন। একবার ব্যর্থ হলে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁরা আবার শুরু করেছেন, তারপর আবার ভুল করেছেন, আবার শুরু করেছেন। এভাবে শত শত বা হাজার হাজার বার ব্যর্থ হতে হতে একটা সময়ে গিয়ে ঠিকই সফল হয়েছেন। এমন অনেক আত্মবিশ্বাসী মানুষের সাফল্যের কাহিনী আমার জানা আছে, এই ছোট্ট পরিসরে এসব বলা সম্ভব নয়, তাতে লেখা অনেক বড় হয়ে যাবে; তাই সেদিকে আজ আর যাচ্ছি না। 

আমার মনে হয় আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারলেই জীবনে অনেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়; আত্মকর্মসংস্থান তো তেমন কোন ব্যাপারই নয়। তাছাড়া আত্মবিশ্বাস মানুষকে সব অসাধ্য সাধনে সহযোগিতা করে। আত্মবিশ্বাস শুধু একটি শব্দ নয়, এটি একটি শক্তি; যা মানুষের জীবনের কঠিন পরিস্থিতিও সহজ ভাবে মোকাবেলা করতে সাহায্য করে; আর এর অভাব মস্তিস্কের ভিতরের সমস্ত সম্ভাবনাকে কুঁড়িতেই ঝরিয়ে দেয়। 

পুঁথিগতবিদ্যা কোন বিদ্যা নয়, যদি তা বাস্তব বিবর্জিত হয়। পুস্তক থেকে বিদ্যা মস্তিস্কে ধারণ করে নিজ জীবনে সেসব বাস্তবায়ন করতে হবে, আর গ্রুপ ওয়ার্কিং করে বাস্তবমুখী শিক্ষার মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ছোট থেকেই প্রত্যেককে গড়ে উঠতে হবে; সফলতা আসবেই।। 

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
২২ জুলাই, ২০১৭.


বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২০

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কিছু কথা:

৭৫ পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু, তাঁর সন্তান ও আওয়ামী লীগ নিয়ে এদেশে নানান ধরনের কোটারি (বঙ্গবন্ধুর ভাষায়) বা ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে সেসব প্রচার হয়ে আসছে। স্বাধীনতা ও তৎপূর্ববর্তী-পরবর্তী সময়ের ইতিহাস, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে এদেশে একসময় বিভিন্ন কল্পকাহিনী তৈরি করা হতো এবং অত্যন্ত কূটকৌশলে একটা গোষ্ঠী সেইসব মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিত। আওয়ামী লীগ ও মুসলিম লীগকে এক কাতারে দাঁড় করানোর হীন অপচেষ্টা সেই গোষ্ঠী সব সময়ই করতো। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো - মুসলিম লীগ পাক-ভারত বিভক্তির দল আর আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ - পাকিস্তান বিভক্তির দল। এক সময় এদেশের মুক্তিকামী ভাল মানুষেরা মুসলিম লীগ ছেড়ে আওয়ামী লীগ গঠন করে এবং জনগণ সেই দলকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে রুপান্তরিত করে; মুসলিম লীগ আস্তে আস্তে পাকিস্তান প্রন্থী সুবিধাবাদী বুর্জোয়া শ্রেণীর দলে পরিণত হয়। 
সুতরাং মুসলিম লীগার বা পাক-প্রন্থী দলগুলোর লোকদের কাছে বাংলাদেশ তাদের নিজের দেশ মনে হবে না - এমনটাই স্বাভাবিক(!) এবং তারা বঙ্গবন্ধুকে খারাপ হিসেবে প্রমাণ করতে চাইবে - এমনটাই চরম সত্য ও নির্মম বাস্তবতা! 

অনেকটা না বুঝে ছাত্রজীবনে বাধ্য হয়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে আঁতাত করা একটা গোষ্ঠীর সাথে আমাকে একই প্লাটফর্মে দাঁড়াতে হয়েছিল। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক কোটারি কখনো আমার কাছে তেমন একটা ভাল লাগতো না, তাদের হত্যার রাজনীতিও কোনদিন পছন্দ করতাম না। জিয়াউর রহমানের নৃশংস হত্যা আমার স্বচক্ষে দেখা অত্যন্ত নোংরা রাজনীতির একটা নির্মম অধ্যায়। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডটা আমার কাছে কিছুটা দোয়াসা ও আবছা বিষয় হলেও জিয়ার হত্যাকান্ডটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার ব্যাপার মনে হয়েছে। জিয়ার ছাত্র সংগঠন ঘটন করার সুবাদে অনেকটা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছিলাম, কিছুটা সময় তাঁর খুব কাছেও ছিলাম। সেই সুবাদে কেমন করে যেন মানুষটাকে প্রচণ্ড ভালও বেসে ফেলেছিলাম। অনেকের মতো না বুঝে তখন আমিও জিয়াকে খলিফা ওমর (রা)-এর সাথে তুলনা করতাম। 

স্বাধীনতা পূর্ব ও পরবর্তীর অনেক মিথ্যা ইতিহাস ও কল্পগল্প আমার মাঝেও দানা বাঁধা ছিল। মানিক মিয়া এভিনিউর সেই বিশাল জনসমুদ্রে অনেকের সাথে সেদিন আমিও ষ্টেজে ছিলাম। বিউগলের করুণ সুর আর হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষের কান্নার আওয়াজ আজও আমার কানে বাঁজে। যারা এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল পরবর্তীতে তারাই একজন আনাড়ি আনকোরা শতভাগ গৃহবধূ বেগম জিয়াকে রাজনীতির পঙ্কিল ময়দানে নামিয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে এদেশের রাজনীতিকে গুডবাই জানিয়ে সবসময় তা থেকে একশ গজ দূরে থাকতে চেষ্টা করেছি এবং সকল ধরনের রাজনীতিমুক্ত থেকেছি।
শুকরিয়া! আল্লাহ আমাকে অনেক ভাল রেখেছেন। 

স্বাধীনতার ঘোষণা, জিয়ার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, খালেদা জিয়া বা তারেক জিয়া প্রসঙ্গ উঠলেই প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আজকের বিএনপির রাজনৈতিক নেতাদের অনেক বড় বড় কথা বলতে শুনি, অতিরিক্ত তোষামোদ ও এক ধরনের হীন ভ্রষ্টাচার করতে দেখি; তখন আনমনে শুধু মুচকি হাসি এবং কল্পনা করি - জিয়া যদি আজ বেঁচে থাকতেন হয়তো এই সব নীতিহীন ভ্রষ্টাচার নেতানেত্রীদের মাথায় ফাইভ স্টার ঠেকিয়ে গুলি করতেন। 

স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ের কত মিথ্যা বিকৃত ইতিহাসই না সেইসময় আমরা জানতাম। মাওলানা ভাসানী ও অন্যান্য আরোও কিছু নেতা সম্বন্ধে কত কি বাড়াবাড়ি কথাই না শুনতাম। বঙ্গবন্ধুকে খাটো করে অন্যদের গুরুত্ব দিয়ে কত মিথ্যা ইতিহাসই না আমাদের মাঝে প্রচার করা হতো, ভুল শিখানো হতো। বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী না পড়লে হয়তো অনেক কিছু অজানা অপূর্ণই থেকে যেত; স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট ও প্রকৃত ইতিহাস এতোটা কোনদিনও জানতে বা বুঝতে পারতাম না। আমার মাঝে বদ্ধমূল থাকা অনেক মিথ্যা ইতিহাস ও ভুল ধারনার আজ পরিসমাপ্তি ঘটেছে। 

যত ধরনের মিথ্যা অপপ্রচার ও প্রোপাগাণ্ডা  আছে তার সবই একসময় রাষ্ট্রীয়ভাবে এদেশে প্রচার করা হতো, মুক্তিযোদ্ধারাও তখন খুব অসহায় ছিল। ৭৫ পরবর্তী দীর্ঘ সময়টা এদেশটাকে যারা শাসন করেছে তাদের আসল রূপ-স্বরূপ কি ছিল তা আজ পরিষ্কার হয়ে গেছে আমার মত অনেকের কাছেই। ৪৭ পূর্ববর্তী সেই ষড়যন্ত্রকারী বেনিয়াগোষ্ঠি, বঙ্গবন্ধুর ভাষায় সেদিনের কোটারি করা লোকগুলোই বংশ পরম্পরায় বার বার ঘুরেফিরে এ অঞ্চলের শাসন ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত হয়েছিল, ছলে-বলে কৌশলে তারাই বার বার ক্ষমতায় এসেছে; যারা সাধারণ জনগণকে জিম্মি করে শুধু নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে। খুব অল্প কয়েকটা দিন বঙ্গবন্ধু তাঁর শাসনব্যবস্থা চালাতে পেড়েছিলেন।

একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলেই বুঝা যাবে সেই কয়কটা দিনের প্লানিংই আজ পর্যন্ত এখনো এদেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তারপরও কমবেশি যতটুকো উন্নতি উন্নয়ন বাংলাদেশে হয়েছে, বর্তমান পাকিস্তানে কি তার কিয়দংশও হয়েছে? তবে কেন এতো পাকিস্তান প্রীতি? যদি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজও বেঁচে থাকতেন তবে হয়তো পৃথিবীর সব দেশ সব জাতিকে অতিক্রম করে আজ আমরা উন্নত একটা দেশে রূপান্তরিত হতাম, অগ্রগামীদের দলে শরিক হতাম। তিনি এদেশটাকে এদেশের মানুষকে কতোটা ভালবাসতেন তা তাঁর লেখার প্রতিটি শব্দ প্রতিটি লাইন থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্ট প্রতীয়মান।
 
মহান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বাঙালি জাতির প্রকৃত স্বাধীনতার মূলমন্ত্র পাঠকারী, সৌহার্দের প্রতীক ও স্বাধীনতার স্থপতি সৃষ্টিকারী। তাঁকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে এই আত্মজীবনীতে তিনি বাঙালি জাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। বইয়ের ৪৮ নং পৃষ্টায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন - "শহীদ সাহেব ছিলেন উদার, নীচতা ছিল না, দল মত দেখতেন না, কোটারি করতে জানতেন না, গ্রুপ করারও চেষ্টা করতেন না। উপযুক্ত হলেই তাকে পছন্দ করতেন এবং বিশ্বাস করতেন। কারণ তাঁর আত্মবিশ্বাস  ছিল অসীম। তাঁর সাধুতা, নীতি, কর্মশক্তি ও দক্ষতা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে চাইতেন। এজন্য তাঁকে বার বার অপমানিত ও পরাজয়বরণ করতে হয়েছে। উদারতা দরকার, কিন্তু নিচ অন্তঃকরণের ব্যক্তিদের সাথে উদারতা দেখালে ভবিষ্যতে ভালর থেকে মন্দই বেশি হয়, দেশের ও জনগ্ণের ক্ষতি হয়।

আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হল 'আমরা মুসলমান, আর একটা হল, আমরা বাঙালি।' পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোন ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, 'পরশ্রীকাতরতা'। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে 'পরশ্রীকাতর' বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষায়ই পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই, ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা, সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ার খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততদিন এদের মুক্তি আসবে না।

অনেক সময় দেখা গেছে, একজন অশিক্ষিত লোক লম্বা কাপড়, সুন্দর চেহারা, ভাল দাড়ি, সামান্য আরবি ফার্সি বলতে পারে, বাংলাদেশে এসে পীর হয়ে গেছে। বাঙালি হাজার হাজার টাকা তাকে দিয়েছে একটু দোয়া পাওয়ার লোভে। ভাল করে খবর নিয়ে দেখলে দেখা যাবে এ লোকটা কলকাতার কোন ফলের দোকানের কর্মচারী অথবা ডাকাতি বা খুনের মামলার আসামি। অন্ধ কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাসও বাঙালির দুঃখের আর একটা কারণ।"

স্বাধীনতার এতোগুলো বছর পেরিয়ে গেল, একটা স্বাধীন দেশ আমরা পেলাম, স্বাধীন দেশে বসবাস করছি, অথচ আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন অগ্রগতি এখনো তেমন একটা আহামরি কিছু হয়নি; সামাজিক অবস্থান, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধত্ব সেই আগের মতো একই রকম আছে। ধর্মকে আজও এক দল রাজনৈতিক ঢাল হিসেবেই সব সময় ব্যাবহার করছে। আজকের জাপান চিনের কথা চিন্তা করলে মনে হয় আমরা তাদের থেকে যোজন যোজন দূরে পিছিয়ে আছি। 

আমাদের দেশে কতোটুকো কি হয়েছে এই মুহুর্তে তা আমি বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি না; প্রত্যেকে নিজে নিজের মতো মূল্যায়ন করে নিবেন। যতটুকো যা হয়েছে তাও অত্যন্ত ধীরগতিতে হয়েছে। মনে হয় যেন সেই ৪৭ পূর্ববর্তী বা ৫২ পূর্ববর্তী বা ৭১ পূর্ববর্তী সময়েই আমরা বার বার ফিরে গিয়েছিলাম, সেই সব শাসকরাই ঘুরেফিরে আমাদের দেশটাকে শাসন করেছিল। আশ্চর্য! আজও এদেশে ধর্মীয় উস্কানিতে দাঙ্গা হয়।

জীবনযাত্রার মানের কিছুটা পরিবর্তন ঘটলেও রাজনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন তেমন কিছুই ঘটেনি। রাজনীতিবিদদের মানসিকতার পরিবর্তন এতটুকোও হয়নি, বরং রাজনীতিবিদদের চারিত্রিক অবক্ষয় সর্বনিন্ম ও নিকৃষ্ট পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। চাটুকারিতা, মিথ্যাচার, শঠতা এখন রাজনৈতিক নেতানেত্রীর চারিত্রের অন্যতম ভূষণ। তখন আমরা যারা স্কুল কলেজে পড়তাম, বিশেষ করে তাদের কাছে স্বাধীনতা সম্বন্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন সব তথ্য ও অপপ্রচার করা হতো, যেন আমরা সবায় মনে করি - বঙ্গবন্ধু খুবই সাধারণ একজন। স্বাধীনতার স্থপতিকে সবায় যেন ভুল বুঝে এই অপচেষ্টাই তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে করা হতো এবং নানানভাবে তখনকার প্রজন্মকে মিথ্যা বুঝানোর চেষ্টা চলতো। 

দীর্ঘদিন এমন অপপ্রচারের ফলে তখনকার প্রজন্মের অনেকের মাঝেই এমন সব প্রশ্নের অবতারণা হয়েছিল - হয়তো বঙ্গবন্ধু তাঁর সন্তানকে সত্যি সত্যি মানুষ করতে পারেননি, শাসন করেননি। শেখ কামাল সত্যি সত্যিই বুঝি মেজর ডালিমের স্ত্রীকে অপহরণ করেছিল বা বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতির সাথে জড়িত ছিল। আরো কত সব মিথ্যা অপপ্রচার চলত তার কোন ইয়ত্তা নেই।

যদিও যুদ্ধের সময়ের প্রজন্ম আমরা, কিন্তু বয়স ছিল কম। ৭৫-এর পর অনেকের মুখে এই সব মিথ্যা কথা আমরা শুনতাম। যেমন - আমাদের পাড়ার এক বড়ভাই একদিন তার এক বন্ধুকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল - এই সেই সাদেক যে শেখ কামালের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতি করেছে। আমরা অনেকে কথাটা শুনে তার মুখ থেকে সেই ঘটনা শোনার জন্য উৎগ্রীব হয়ে উঠলাম। যা শুনেছিলাম তা অনেকটা এই রকম - একটা জীপ নিয়ে তারা বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতি করে টাকা ছড়াতে ছড়াতে বাসাবো হয়ে মাদারটেক তালতলার দিকে চলে গিয়েছিল। 

কিছুদিন পর এমন আরেকজনকে সে নিয়ে আসল এবং বলল - সেও নাকি বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতির সাথে জড়িত। কিন্তু তার মুখ থেকে অন্য এক আজগুবি গল্প শুনেছিলাম। একটা গল্পের সাথে আরেকটা গল্পের কোন মিল ছিল না। এমনভাবে অনেক গল্প কল্পকাহিনী তখন বাতাসে ভেসে বেড়াত। যারা এসব কল্পকাহিনী তৈরি করত তারা বা তাদের সন্তানরা হয়তো ৭১-এ গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে বাড়ির পর বাড়ি ডাকাতি করত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কি কখনো তা করেছিলেন? খুব সাধারণ বিবেকও তো এসব বুঝবে? কোন ভদ্রলোকের সন্তান কোনদিনও ব্যাংক ডাকাতি করতে পারে না। তাছাড়া একজন জাতিরপিতার সন্তান, দেশের প্রেসিডেন্টের সুশিক্ষিত সন্তান, কি করে ব্যাংক ডাকাতি করতে পারে বা নিজের স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও কি করে অন্যের স্ত্রীকে অপহরণ করতে পারে তা কতটুকো বিশ্বাসযোগ্য, কতটা গ্রহণযোগ্য? 

আমরা তখন গুলবাগ থাকতাম। আমাদের বাসার খুব কাছাকাছি মালিবাগ পাবনা কলোনীর ঠিক উত্তর পাশে চিকণ রাস্তার ওপারে মেজর ডালিমের একটা বাড়ি ছিল। ঐ বাড়ির আশেপাশে আমরা বন্ধুরা মিলে প্রায়ই আড্ডা দিতাম। পাবনা কলোনির সামনে ফাঁকা স্থানে কোট করে শীতে ব্যাডমিন্টনও খেলতাম। জনশ্রুতি ছিল ঐ বাড়ি থেকেই নাকি শেখ কামাল ডালিমের বউকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল; যা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। গুলবাগ আমাদের বাসা ও ডালিমের বাসার দূরত্ব ছিল খুবই কম; যদি সত্য হতো অবশ্যই আমরা জানতে পারতাম। আমরা কোনদিনও দেখিনি সেই বাসায় মেজর ডালিম বা তার স্ত্রী বসবাস করতে। 

একদিন এক পত্রিকায় পড়লাম, সেখানে লেখা - লেডিস ক্লাব থেকে শেখ কামাল মেজর ডালিমের বউকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এখনো অনেক সময় ফেসবুকের বিভিন্ন পেজে এইসব মিথ্যাচার দেখে অনেকটা আঁতকে উঠি, চোখে পড়লেই প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করি। যতসব বানানো আজগুবি গল্প দীর্ঘদিন ধরে এদেশের মানুষের মাঝে অত্যন্ত কূটকৌশলে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, হচ্ছে। যারা এসব ছড়াত বা ছড়ায় তারা হয়তো সত্যের মহিমা জানে না? ব্রিটিশ আমল থেকেই এমন একটি অর্বাচীন গোষ্ঠীর উদয় হয়েছিল, যারা আজও আমাদের সমাজে আমাদের সাথে আমাদের মাঝেই মিশে আছে। ধর্মের দোহাই, ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা যাদের মূল হাতিয়ার, সাময়িক স্বার্থ হাসিল যাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা কোনদিনও এই দেশ এই জাতিকে ভালবাসেনি, ভালবসতে পারেনি আর পারবেও না।

অনেকদিন ধরে বিভিন্ন টিভি মিডিয়ায় অনেকের মুখে শুনে আসছি, বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া ভার্চুয়াল মিডিয়া জুড়েও এই সব অপপ্রচার বেশ জোরালো - শেখ মুজিব স্বাধীনতা চাননি, চেয়েছিলেন স্বায়ত্তশাসন। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে এদেশের অতি উৎসাহী একটি দলের একটি গ্রুপের অতি বাড়াবাড়ি প্রায়শই চোখে পরে। আমার ধারণা এইসব এক ধরনের রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি। যারা এই সব বলেন বা করেন, তাদের আমি সবিনয় অনুরোধ করবো বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্নজীবনী পড়তে, স্বাধীনতার গোড়াপত্তন ও প্রকৃত ইতিহাস জানতে। বাংলাদেশ শুধুমাত্র ১৯৭১-এর যুদ্ধের ফসল যারা ভাবেন বা শুধুমাত্র মেজর জিয়ার একটিমাত্র ঘোষণার ফসল যারা মনে করেন, আমার মনে হয় তারা এখনো বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন এবং তাদের বলছি - জিয়া যদি বেঁচে থাকতেন আমি নিশ্চিত আপনার মাথায় ফাইভ স্টার ঠেকিয়ে তিনি একটা গুলি করে আপনার পৈত্রিক খুলিটা উড়িয়ে দিতেন।

১৯৪২ বা তারও পূর্ব থেকে এই বাংলাদেশ সৃষ্টির স্বপ্নের সূচনা। আমি নিজে দেখেছি এবং নিজ কানে জিয়ার মুখ থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রশংসার কথা শুনেছি; জিয়াকে দেখেছি - একান্তে বঙ্গবন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, পটভূমি ও মতধারায় ভিন্নতা থাকলেও ব্যক্তি জিয়া মিথ্যাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বঙ্গবন্ধুর খুন দেশবিদেশের একটা বিশাল ষড়যন্ত্রের ফসল। এসব বুঝার ক্ষমতা আমাদের মত ছোট চিন্তাশক্তির মানুষের পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। 

আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বিশেষ করে আশি নব্বই দশকের প্রজন্ম মিথ্যা ইতিহাস ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা শুনতে শুনতেই বড় হয়েছে। অনেকবার অনেকদিন এইসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে লেখেছি কিছু প্রত্যক্ষ ও আবছা ধারণা থেকে, বিভিন্ন ইতিহাসভিত্তিক বইপুস্তক থেকে। কিন্তু যেদিন আমি জাতিরজনকের নিজ হাতে লেখা অসমাপ্ত আত্নজীবনী প্রথম পড়লাম সেইদিন থেকে আমার সব ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সংকোচ-সংশয় কেটে গেছে। এখন আর কোন ধরনের কোন দোয়াসা আমার মাঝে নেই, আমি দ্বিধাহীনভাবে এখন অনেক কিছুই বুঝতে পারি বলতে পারি, যা ১০০% সঠিক। 

এদেশ সৃষ্টির সব সত্য ইতিহাসই আজ আমার চোখের সামনে সূর্যের মত জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। কারো কাছ থেকে এখন আর কোন কিছু আমার ধার করার নেই জানার নেই। কারো কাছ থেকে কোন স্বার্থ আদায় করার ইচ্ছা বা চাওয়া পাওয়ার প্রত্যাশা আমার কোনদিনও ছিল না আজও নেই। প্রকৃত সত্যকে উন্মোচনের অভিপ্রায়ে লেখেছি লেখি লেখে যাবো। কাউকে কোনদিন ভয় বা তোয়াজ করে জীবনে কিছু করিনি আর করবও না। সত্য উন্মোচনে ব্রত ছিলাম আছি থাকবো ইনশাল্লাহ। 

বহুদিন ধরে ভাবছি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিয়ে দু'চার কথা লেখতে চেষ্টা করব, কিন্তু পর মুহুর্তেই নিজকে সংবরণ সংযত করেছি। এতোবড় মহান ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আমার মত একজন ক্ষুদ্র মানুষ কি করে কি করবো? আমার পক্ষে কতোটুকো কি-ই-বা করা বা লেখা সম্ভব বা আউদ তা সম্ভব হবে কি-না? পাঠক সমাজই-বা তা কেমনভাবে নেবে? - এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অনেকদিন পার করলাম, আর নয়; কেউ পড়ুক বা না পড়ুক আমার হৃদয় নিঃসৃত কথাগুলো লেখে যাচ্ছি, কেউ প্রকাশ করুক বা না করুক তাতে আমার কিছু যায় আসে না। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রাণের নেতা, বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কিছু কথা কিছু অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে ইচ্ছে করছে, করছি।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রকাশিত হওয়ার পর প্রথম যখন তা হাতে পাই তৎক্ষণাৎ অনেক উৎগ্রীবতা নিয়ে বইয়ের প্রতিটা পৃষ্টা প্রতিটা লাইন প্রতিটা শব্দ অত্যন্ত মনোযোগের সাথে পড়েছি এবং আজও বার বার পড়ি; যতই পড়ছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি, চমৎকৃত হচ্ছি।
কত সরলসরলভাবে সহজসরল ভাষায় তিনি এদেশের জন্মের আদি অন্ত পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরেছেন এবং সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিখ্যাত সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেও কত চমৎকারভাবে তিনি বুঝতে পেরেছেন, তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লেখায় অতি সহজ ভাবে তুলে ধরেছেন। কত সহজভাবে তিনি এদেশের সাধারণ মানুষ থেকে বিখ্যাত সব মানুষের আপন হয়েছেন এবং সবার সাথে মিশেছেন; জনগণকে কতটা বুঝতেন এবং আপন করে নিতেন, সবার কতটা কাছের মানুষ ছিলেন। এই বইটা না পড়লে হয়তো আলোছায়ার ঘূর্ণিপাক থেকে কোন দিনও আমি মুক্ত হতে পারতাম না। আমার মনে হয় - এই অসমাপ্ত আত্নজীবনীর খণ্ডিত অংশ ক্লাশ অনুযায়ী জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত; আওয়ামী লীগের সমালোচকদের এই বই অবশ্যই পড়া উচিত। আওয়ামী লীগের প্রতি নেতাকর্মীর এই বইটি বারংবার মনোযোগ দিয়ে পড়া উচিত এবং এদেশের রাজনীতিবিদদের জন্য এই বইটা হতে পারে অন্যতম দিকনির্দেশনা। 

যারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অযথা অপ্রয়োজনে কটাক্ষ করেন তাদের বলবো - ইতিহাসের মূল না যেনে শুধুমাত্র আগা নিয়ে লাফালাফি করবেন না। ইতিহাস বিকৃতির কবলে পড়ে যারা বিভ্রান্ত হয়েছেন তাদের বলবো সত্য ইতিহাস জানার অভিপ্রায়ে এই বইটি পড়তে। যারা বঙ্গবন্ধুকে একেবারে দেখতে পারেন না, তারাও একটিবার বইটি পড়েন এবং অন্তর দিয়ে সত্য বুঝার ও জানার চেষ্টা করেন। আমি যখন প্রথম এই বইটি পড়তে শুরু করি তখন অযাচিতভাবে মনের অজান্তেই নিজের মধ্যে কেমন যেন একটা শিহরণ অনুভব করতে থাকি, খাওয়া দাওয়া ভুলে বিরামহীনভাবে পড়ে অসমাপ্ত এই পাণ্ডুলিপি সমাপ্ত করি। এই বয়সে এমন ইমোশনাল হয়ে বই নিয়ে বসে থাকব তা কল্পনারও অতীত। কি করবো?

বইয়ে প্রতিটি পাতায় যেন লুকিয়ে আছে আমার প্রিয় বাংলাদেশ এবং আমার বাংলাদেশের ইতিকথা। কিছু নিন্দুক বঙ্গবন্ধুর বংশ পরিচয় ও মর্যাদা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার বিভিন্ন বিভ্রান্ত আজও ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের জন্য একটি চপটেঘাত - বইয়ের ১২ নং পৃষ্টায় তিনি লিখেছেন- "আমার জন্ম হয় টুঙ্গিপাড়া শেখ বংশে। শেখ বোরহানউদ্দিন নামে এক ধার্মিক পুরুষ এই বংশের গোড়াপত্তন করেছেন বহুদিন পূর্বে। শেখ বংশের যে একদিন সুদিন ছিল তার প্রমাণস্বরূপ মোগল আমলের ছোট ছোট ইটের দ্বারা তৈরি চকমিলান দালানগুলি আজও আমাদের বাড়ির শ্রীবৃদ্ধি করে আছে। বাড়ির চার ভিটায় চারটা দালান। বাড়ির ভিতরে প্রবেশের একটা মাত্র দরজা, যা আমরাও ছোট সময় দেখেছি বিরাট একটা কাঠের কপাট দিয়ে বন্ধ করা যেত। একটা দালানে আমার এক দাদা থাকতেন। এক দালানে আমার এক মামা আজও কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন। আর একটা দালান ভেঙে পড়েছে, যেখানে বিষাক্ত সর্পকুল দয়া করে আশ্রয় নিয়েছে। এই সকল দালান চুনকাম করার ক্ষমতা আজ তাদের অনেকেরই নাই। এই বংশের অনেকেই এখন এ বাড়ির চারপাশে টিনের ঘরে বাস করেন। আমি এই টিনের ঘরের এক ঘরেই জন্মগ্রহণ করি।"

অতঃপর ১৮ নং পৃষ্ঠায় তিনি লেখেন- "আমার জন্ম হয় ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ তারিখে। আমার আব্বার নাম শেখ লুৎফর রহমান। আমার ছোট দাদা খান সাহেব শেখ আবদুর রশিদ একটা এম ই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। আমাদের অঞ্চলের মধ্যে সেকালে এই একটা মাত্র ইংরেজি স্কুল ছিল, পরে এটা হাইস্কুল হয়, সেটি আজও আছে। আমি তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত এই স্কুলে লেখাপড়া করে আমার আব্বার কাছে চলে যাই এবং চতুর্থ শ্রেণীতে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হই। আমার মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। তিনি কোনোদিন আমার আব্বার সাথে শহরে থাকতেন না। তিনি সমস্ত সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন আর বলতেন, "আমার বাবা আমাকে সম্পত্তি দিয়ে গেছেন যাতে তাঁর বাড়িতে আমি থাকি। শহরে চলে গেলে ঘরে আলো জ্বলবে না, বাবা অভিশাপ দেবে।"

এই আত্নজীবনীর লেখাগুলো ব্রিটিশ থেকে পাক-ভারত বিভক্তির ইতিহাস অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে, ভাষা আন্দোলন ও তৎপরবর্তী পাকিস্তান আমলের পাকিস্তানিদের বাংলা শাসনের গভীর ষড়যন্ত্র - শাসন শোষণের নমুনাচিত্র সবই প্রকাশিত হয়েছে। 

১৯৪১ সালে বঙ্গবন্ধু মেট্রিক পরীক্ষা দেন, সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। সেই থেকে তিনি অখণ্ড ভারতের নিঃস্বার্থ মহান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সান্নিধ্য লাভ করতে সামর্থ্য হন এবং সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সান্নিধ্যে অল্প বয়সে আল্প সময়েই ব্রিটিশ শাসিত অবিভক্ত ভারতের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং সুষ্ঠ রাজনীতির খুঁটিনাটি আয়ত্ত করতে সক্ষম হন। সেই থেকে ওতপ্রোতভাবে তিনি মিশে থাকেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে এবং সোহরাওয়ার্দীর আদর্শ বুকে ধারণ করে কলেজ জীবনের শুরু থেকেই তিনি এই বড় মাপের নেতার সান্নিধ্য ও বিশ্বস্ততা অর্জন করে নিতে সক্ষম হন।

বইয়ের ২৯ নং পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- "তিনি যে সত্যি আমাকে ভালবাসতেন ও স্নেহ করতেন, তার প্রমাণ আমি পেয়েছি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার দিন পর্যন্ত। যখনই তাঁর কথা এই কারাগারে বসে ভাবি, সেকথা আজও মনে পড়ে। দীর্ঘ বিশ বৎসর পরেও একটুও এদিক ওদিক হয় নাই। সেইদিন থেকে আমার জীবনের প্রত্যেকটা দিনই তাঁর স্নেহ পেয়েছি। এই দীর্ঘদিন আমাকে তাঁর কাছ থেকে কেউই ছিনিয়ে নিতে পারে নাই এবং তাঁর স্নেহ থেকে কেউই আমাকে বঞ্চিত করতে পারে নাই।"

এতো বড় মাপের একজন মানুষের সান্নিধ্যে থেকে যিনি রাজনীতি ও মানবসেবা শিখেছেন, নিশ্চয় তিনি কোন সাধারণ মানুষ নন? তাছাড়াও শেরেবাংলা একে ফজলুল হক সাহেবও তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, এমনকি নাতি বলে সম্বোধন করতেন। বঙ্গবন্ধু যখনই তাঁর স্মরণাপন্ন হতেন তিনি সাড়া দিতেন। 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' ঘটনের প্রথম মিটিংয়েও শেরেবাংলা উপস্থিত ছিলেন। 

মাওলানা আব্দুল হামীদ খাঁন ভাসানী ছিলেন 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জনাব শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু জয়েন সেক্রেটারি; এটি একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। কিছুদিন পরই যা 'আওয়ামী লীগ'-এ রুপান্তরিত হয় এবং ভাসানী সভাপতি, বঙ্গবন্ধু সাধারণ সম্পাদক হন। মাওলানা আব্দুল হামীদ খাঁন ভাসানীর দীর্ঘ রাজনৈতিক সহপাঠী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; যিনি কিনা দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধুর কারাসাথিও ছিলেন।

শুধুমাত্র এদেশ ও এদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তির চিন্তায় যে মানুষটা মা-বাবা, স্ত্রী সন্তান ও আত্নিয়স্বজন আপনজন সবাইকে ফেলে রেখে জীবনের বেশিরভাগ সময় জেলের অভ্যন্তরে আলোবাতাসহীন ঘরে অন্তরীণ থাকতেন, নিশ্চয় তিনি কোন অর্থলোভে বা ক্ষমতালোভে এসব করেননি? এই মহা মানবের জন্ম না হলে হয়তো বাঙালির মুক্তি কোনদিনও মিলত না।

মাওলানা ভাসানীকে নিয়ে ১২৮ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন- "মাওলানা ভাসানীর উদারতার অভাব, তবু তাঁকে আমি শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতাম। কারণ, তিনি জনগণের জন্য ত্যাগ করতে প্রস্তুত। যে কোন মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয় তারা জীবনে কোন ভাল কাজ করতে পারে নাই - এ বিশ্বাস আমার ছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, এদেশে রাজনীতি করতে হলে ত্যাগের প্রয়োজন আছে এবং ত্যাগ আমাদের করতে হবে পাকিস্থানের জনগণকে সুখী করতে হলে।"

১২৫ পৃষ্ঠার তিনি একটি মজার ঘটনা তুলে ধরেন। সিরিয়াস কথার ফাঁকে হটাৎ এই অংশ পড়ে আমার খুব ভাল লেগেছে তাই আপনাদের জন্য তা তুলে ধরলাম। কত সহজসরল ও বড় মনের মানুষ হলে অকপটে একজনের পক্ষে এমন সব কথা তুলে ধরা সম্ভব - তাই ভাবছি। অবশ্য এই বইয়ের অনেক জায়গায়ই তিনি রসিকতার মাধ্যমে তাঁর মনের এমন বিশালতার পরিচয় দিয়ে গেছেন।

"আমি ও আলতাফ হোসেন সাহেব ঠিক করলাম, মাওলানা শামসুল হক সাহেবের (যিনি এখন লালবাগ মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল) সাথে দেখা করব। মাওলানা সাহেবের বাড়ি আমার ইউনিয়নে। জনসাধারণ তাঁকে আলেম হিসেবে খুবই শ্রদ্ধা করত। আমরা দুইজন রাত দশটায় একটা এক মাঝির নৌকায় রওয়ানা করলাম। নৌকা ছোট, একজন মাঝি। মধুমতী দিয়ে রওয়ানা করলাম। কারণ, তাঁর বাড়ি মধুমতীর পাড়ে। মধুমতীর একদিকে ফরিদপুর, অন্যদিকে যশোর ও খুলনা জেলা। নদীটা এক জায়গায় খুব চওড়া। মাঝে মাঝে, সেই জায়গায় ডাকাতি হয়, আমাদের জানা ছিল। ঠিক যখন আমাদের নৌকা সেই জায়গায় এসে হাজির হয়েছিল আমি তখন ক্লান্ত ছিলাম বলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পানির দেশের মানুষ নৌকায় ঘুমাতে কোন কষ্ট হয় না। কাজী সাহেব তখনও ঘুমান নাই। এই সময় একটা ছিপ নৌকা আমাদের নৌকার কাছে এসে হাজির হল। চারজন লোক নৌকার মাঝিকে জিজ্ঞাসা করল, আগুন আছে কি না? আগুন চেয়েই এই ডাকাতরা নৌকার কাছে আসে, এই তাদের প্রন্থা। আমাদের নৌকার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, "নৌকা যাবে কোথায়?" মাঝি বলল, টুঙ্গিপাড়া, আমার গ্রামের নাম। নৌকায় কে? মাঝি আমার নাম বলল। ডাকাতরা মাঝিকে বৈঠা দিয়ে ভীষণভাবে একটা আঘাত করে বলল, "শালা আগে বলতে পার নাই শেখ সাহেব নৌকায়।" এই কথা বলে নৌকা ছেড়ে দিয়ে তারা চলে গেল। মাঝি মার খেয়ে চিৎকার করে নৌকার হাল ছেড়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল। মাঝির চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কাজী সাহেব জেগে ছিলেন, তার ঘড়ি টাকা আংটি সব কিছু লুকিয়ে ফেলেছিলেন ভয়ে। কাজী সাহেব সৌখিন লোক ছিলেন, ব্যবসায়ী মানুষ, টাকা পয়সাও ছিল অনেক। আমি জেগে উঠে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপার কি? কাজী সাহেব ও মাঝি আমাকে এই গল্প বলল। কাজী সাহেব বললেন, "ডাকাতরা আপনাকে শ্রদ্ধা করে, আপনার নাম করেই বেঁচে গেলাম, না হলে উপায় ছিল না।" আমি বললাম, "বোধহয় ডাকাতরা আমাকে ওদের দলের একজন বলে ধরে নিয়েছে।"

ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে চীন স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৯ সালে, পাক-ভারত স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে। তাঁর জীবনের প্রথম বিদেশ সফর ছিল চিনের এক শান্তি সম্মেলনে। জীবনের প্রথম বিরোধী দলের একজন সদস্য হয়ে তিনি সেই সফর করেন। এই বইয়ের ২৪৪ পৃষ্ঠায় তিনি তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন - "আমরা স্বাধীন হয়েছি ১৯৪৭ সালে আর চীন স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৯ সালে। যে মনোভাব পাকিস্তানের জনগণের ছিল, স্বাধীনতা পাওয়ার সাথে সাথে আজ যেন তা ঝিমিয়ে গেছে। সরকার তা ব্যবহার না করে তাকে চেপে মারার চেষ্টা করেছে। আর চিনের সরকার জনগণকে ব্যবহার করছে তাদের দেশের উন্নয়নমূলক কাজে। তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য হল, তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল এই দেশ এবং এদেশের সম্পদ তাদের। আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর আর তারা যেন কেউ নয়। ফলে দেশের জনগণের মধ্যে ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। একটা মাত্র পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল সাদা চামড়ার জায়গায় কালা চামড়ার আমদানি হয়েছে।" 

দুই পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ মূল্যায়নে ২৫০ পৃষ্ঠায় তিনি উল্লেখ করেন- "পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিরাট প্রভেদ রয়েছে। সেখানে রাজনীতি করে সময় নষ্ট করার জন্য জমিদার, জায়গিরদার ও বড় বড় ব্যবসায়ী। আর পূর্ব পাকিস্তানে রাজনীতি করে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়। পশ্চিম পাকিস্তানে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত না থাকার জন্য জনগণ রাজনীতি সম্বন্ধে বা দেশ সম্বন্ধে কোন চিন্তাও করে না। জমিদার বা জায়গিরদার অথবা তাদের পীব সাহেবরা যা বলেন, সাধারণ মানুষ তাই বিশ্বাস করে। বহুকাল থেকে বাংলাদেশে কৃষক আন্দোলন হওয়াতে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়াও স্বাধীনতা আন্দোলনেও বাঙালিরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে।"

৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৫৬-র নির্বাচন, নির্বাচনে জিতে স্বল্পকালীন সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ এবং তারই পর্যায়ক্রমিক ধারাবাহিকতায় ৭১-এ আমাদের স্বাধীনতা। সকল রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতিটিতেই বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিল অগ্রণী। বাংলাদেশ সৃষ্টিরই ইতিহাস যেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের প্রতিচ্ছবি। অসমাপ্ত এই আত্মজীবনী যদি সমাপ্ত হতো পূর্ণতা পেতো, হয়তো বাঙালি জাতির ভাগ্যই বদলে যেতো; কিন্তু হায়েনা বেনিয়া গোষ্ঠী দেয়নি এই জীবনীর স্বাভাবিক পরিসমাপ্তি হতে।

বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। বাংলাদেশ সৃষ্টির অদ্বিতীয় মহানায়ক বঙ্গবন্ধু এবং বাঙালির মুক্তির পথপ্রদর্শক। অতএব, বাংলাদেশের যে নাগরিক তাঁকে বাঙালির জাতিরপিতা হিসেবে স্বীকৃতি না দেবে আমি নিশ্চিত বলতে পারি - সে বাঙালি নয় পাকিস্তানি। আমার ধারনা - তার কোন অধিকারই নেই এদেশের আলো বাতাস গ্রহণ করার।। 

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
০৮-০১-২০১৬.