শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০

সুখ তুমি কি বড় জানতে ইচ্ছে করে :


সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু
            অনলে পুড়িয়া গেল|
অমিয়া-সাগরে সিনান করিতে
            সকলি গরল ভেল|
  
সখি কি মোর করমে লেখি|
শীতল বলিয়া ও চাঁদ সেবিনু
            ভানুর কিরণ দেখি|

উচল বলিয়া অচলে চড়িতে
            পড়িনু অগাধ জলে|
লছিমি চাহিতে দারিদ্র্য বেড়ল
          মাণিক্য হারানু হেলে|

নগর বসালাম সায়র বাঁধিলাম
            মাণিক পাবার আশে|
সাগর শুকাল মাণিক লুকাল
         অভাগার করম-দোষে|

পিয়াস লাগিয়া জলদ সেবিনু
             বজর পড়িয়া গেল|
জ্ঞানদাস কহে কানুর পিরীতি
             মরণ অধিক শেল|

ড. মঞ্জুরে খোদা দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় আজ একটি সচিত্র প্রতিবেদনমূলক প্রবন্ধ লিখেছেন— 'কানাডার বেগমপাড়া একটি থিম' শিরোনামে। সেখানে তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের অসৎ-দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী-আমলা-কামলা-রাজনীতিকদের পরিবার কানাডার যেসব স্থানে বাসা-বাড়ি কিনে বসবাস করছে সেসব স্থানকে ওখানকার বাঙালিরা 'বেগমপাড়া' বলে অভিহিত করেছে; কানাডায় আসলে সুনির্দিষ্টভাবে 'বেগমপাড়া' বলে কোনো জায়গা নেই। 'বেগমপাড়া' নামকরণ করার কারণটি হচ্ছে বাংলাদেশের লুটেরা দুর্নীতিবাজদের দ্বিতীয় আবাসভূমির প্রতীকী হিসেবে; সাহেবরা সব বাংলাদেশে লুট করে, আর বেগমরা কানাডায় আরাম-আয়েশ করে!

যে দেশের সাধারণ জনগণ এখনো দু'মুঠো ভাত যোগাড় করতে হিমসিম খাচ্ছে, রাস্তায় ভুখানাঙা হতাশাগ্রস্ত মানুষ ঘুরেফিরে হাহাকার করছে, দুটো ভাতের জন্য ভিক্ষাবৃত্তির মতো নিকৃষ্ট পেশাটি বেছে নিয়েছে অসংখ্য মানুষ, সেদেশেরই কিছু দূর্নীতিবাজ লুটেরা অপকর্মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে তাদের পরিবারপরিজনকে দেশের টাকায় বিদেশে সেটেল্ড করছে; এবং দেশ থেকে অবৈধভাবে টাকা কামিয়ে অবৈধ উপায়েই সেসব পাঠিয়ে তাদের পরিজনকে আয়েসি, নিরাপদ ও বিলাসবহুল জীবনযাপন করাচ্ছে! এদেশের চাষাভুষা খেটে-খাওয়া মানুষের অর্থ-সম্পদ চুরি করে তা পাচার করছে তাদের নিজ পরিবারপরিজনকে নিরাপদে বিদেশে সুখে শান্তিতে রাখার মতো হীন কর্মটি করতে।
   
চিরন্তন উচ্চারণ, এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি— ভাব-সমপ্রসারণটি ছোটবেলায় বেশ মজা করে পড়তাম, এবং এ নিয়ে তখন পাতার পাতা লিখতেও পারতাম। আজ এর ভাব সম্প্রসারণ করতে গিয়ে প্রথমেই তুলে ধরছি  একটি কথা— মানুষের চাওয়া পাওয়ার কোন শেষ নেই, কারণ চাহিদা অপরিসীম; যে যত পায় সে তত আরও চায়। লক্ষ টাকা মাসিক বেতন পাওয়া একজন সরকারি আমলা ঘুষ খেয়ে কামায় কোটি টাকা, দশ হাজার টাকা মাসিক বেতন পাওয়া একজন কামলা বকশিস নামের বোঁঝা সাধারণের কাঁধে চাপিয়ে মাসে কামায় লক্ষ টাকা, আর অসৎ ব্যবসায়ীরা সবকিছুতে ভেজাল দিয়ে মানুষকে ঠকিয়ে সম্পদের পাহাড় বানিয়ে সেসব পাচার করে এবং করছে বিদেশে!  কি অদ্ভুত এদেশের এক শ্রেণীর লোকজনের মানসিকতা?     

এমন চাওয়া-পাওয়া কাদের? বর্তমানের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যারাই সম্পদশালী তারা হয়তো নেতা-নেত্রী, আমলা-কামলা বা অসৎ ব্যবসায়ী। সম্পদের প্রতি তাদের তৃষ্ণা প্রকট, দুর্নিবার ও অসীম। নির্বিচারে সম্পদ সংগ্রহের ফলে দেশের সব গরীবের সম্পদ তাদের হাতে চলে যাচ্ছে, গরিবেরা হচ্ছে  নিষ্পেষিত, আর মধ্যবিত্তরা হচ্ছে নিঃশেষিত। দরিদ্র কাঙ্গালেরা এক-দুই বেলা দুমুঠো  ভাত জোগাড় করতে যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, কোনমতে বেঁচে থাকার আশা পোষণ করতে গিয়ে যেখানে অন্ধকারের অতল গহব্বরে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, সেখানে ঐ শ্রেণীর লোকজন গড়ছে বিত্তবৈভবের  পাহাড়! দুর্ভাগ্য তাদের যারা সামান্য নুন-ভাতও অনেক সময় জোটাতে পারছে না। 

এমনতর অসমান অবস্থার জন্য কারও থাকছে ঐশ্বর্য্যের প্রাচুর্য আলোর আতশবাজী খেলা, আবার কারও ঘরে অন্ধকারে প্রদ্বীপ জ্বলছে না। যে ব্যক্তি একবেলা আহার যোগাড় করতে পারছে না, সে চায় জীবন ধারণের ন্যূনতম অন্ন টুকু, কিন্তু যার সব কিছু আছে তার তো কোন অভাব থাকতে পারে না? অথচ পৃথিবীর মানুষের চিরাচরিত স্বভাব চাই আর চাই! আমি দেখেছি যার ধন সম্পদের আর প্রয়োজন নেই, তার জীবনেই অভাববোধ সবচেয়ে বেশি এবং প্রকট। কথায় আছে না- রাজাই সব সময় প্রজার ধন সম্পদের অধিকারী হয়, ধনী দরিদ্রকে শোষণ করেই বড় হয়; এই বৈষম্যটি একটি নিষ্ঠুর জাগতিক সত্য বিষয়। লুব্ধ মানুষের বড় হবার নীতিই হলো দরিদ্রের সব কিছু জোর করে কেড়ে নিয়ে তাকে সর্বশান্ত করা, সব কিছু হতে বঞ্চিত করা। এর হিসেব কেউ রাখে না বা কেউ খবরের প্রয়োজনও বোধ করে না। লক্ষ্য করে দেখেছি লোভী মানুষের সংখ্যা সমাজে দিনদিন তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে; তারা যে কোন ভাবে যে কোন উপায়ে শুধু পরের ধন চুরি করে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার সমৃদ্ধি চায়। তারা অর্থসম্পদের মাঝে সুখ খোঁজে, আর সুখি হতে চায় বিত্তবৈভব দিয়ে।

আঙুল ফুলে ফেঁপে কলাগাছ হওয়া ধনীরা গরীব ভুখা নাঙা মানুষের রক্ত শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে, এবং সদা সচেষ্ট; গরীবরা শোষিত,  বরং বলা উত্তম চিরশোষিত লাঞ্চিত। অনাহারী, নিরন্ন মানুষের ন্যূনতম সম্পদটুকুর প্রতিও ভয়াল থাবা প্রসারিত করতে এসব ঠকরা এতটুকুও কুণ্ঠিত হয় না! বিত্তবানদের এ অতৃপ্ত সর্বগ্রাসী প্রক্রিয়া সমাজের সর্বস্ব নিঃস্ব লোকদের বেঁচে থাকার স্পৃহাকে নিঃশেষ করে দেয়। ধন-সম্পদ উপরওয়ালার দান, যা ধনী-গরীব উভয় শ্রেণীর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে নির্ধারিত। যারা তকদীর মানেন তাদের উচিৎ সন্তুষ্ট থাকা এবং সৎকর্ম চালিয়ে সবুর করা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণের জন্য কারোই অতিরিক্ত লোভ করা উচিত নয়। অবশ্যই যার যতটুকু সম্পদ প্রযোজন ঠিক তাকে ততটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা বাঞ্ছনীয়। কবরে কিন্তু কেউ সম্পদ নিয়ে যেতে পারেন না।  দুনিয়ার সম্পদ দুনিয়াতেই থেকে যায়। দুনিয়াতে কত ধনী হলো আর গেলো,কে তার খবর রেখেছে? কিন্তু হাজার হাজার বছর আগের না খেতে পাওয়া সক্রেটিসকে আজকের পৃথিবীবাসীরাও চেনে। তাই আফসোস করে কোন লাভ নেই।

চলতি বছর মার্চে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক অর্থপাচারবিরোধী সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই) জানিয়েছিল গত সাত বছরে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ হাজার ২৭০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে, যা স্থানীয় মুদ্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মালয়েশিয়া, কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন। ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানতের অর্থ নানা কৌশলে তারা বিদেশে পাচার করে সেখানে সেকেন্ড হোম গড়ে তুলছে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ)-এর তথ্য অনুযায়ী বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালেই এদেশে  বেশি টাকা পাচার হয়। নানা পন্থায় বিদেশে টাকা পাচার করে এক শ্রেণীর লোকজন প্রবাসে বাড়ি-গাড়ি ও স্থায়ী সম্পদের মালিক হয়; আর এ অভিযোগ এদেশের রাজনৈতিক নেতা আমলা আর ব্যবসায়ীদের  বিরুদ্ধে; সুখের আশায় কত কিই না করছে তারা, বাঁধছে বাসা দ্বীপান্তরে!

ইদানীংকালের নিউজফিডে প্রতিনিয়ত এমনতর সব ছেঁচড়া বড়লোকের আমিত্বের খবর ভেসে উঠছে যা কল্পনাতীত। যখনই সেসব আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বা তালগাছ হওয়া কোটিপতির কোন খবর দেখি, চমকে যাই এবং মনে পড়ে মধ্যযুগীয় বাংলা কবি (যাঁর জন্ম ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দ, যিনি ষোল শতকের পদাবলী সাহিত্যের একজন সেরা কবি ছিলেন) কবি জ্ঞানদাস-এর বৈষ্ণবপদাবলীর অমর সেই কথাগুলো, যা এ লেখার সূচনাতেই তুলে ধরেছি। অমর এ গীতিকবিতাটি কেউ বুঝতে পাড়লে তার জীবনে 'সুখ' নিয়ে আর কোন জ্ঞানের প্রয়োজন পরবে বলে আমি মনে করি না। 

সুখ আসলে কি? কোথায়, কোনখানে আছে সুখ??- সুখের আভিধানিক অর্থ হলো— পরিতোষ, প্রেম, পূর্ণতা, পুলক, উল্লাস, আহ্লাদ ইত্যাদির এক বা একাধিক বা সম্মিলিত অনুভুতি; যা একান্তই একটি মানবিক ব্যাপার, সাময়িক অনুভূতি। সুখ মনের একটি অবস্থা বা অনুভূতি যা ভালোবাসা, তৃপ্তি, আনন্দ বা উচ্ছ্বাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং সত্য ও সুন্দর দ্বারা  প্রস্ফুটিত। জৈবিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক, দর্শনভিত্তিক এবং ধার্মিক দিক থেকে সুখের সংজ্ঞা নির্ধারণ ও নিরূপণ এবং এর উৎস নির্ণয়ের প্রচেষ্টা সাধিত হয়েছে এবং হয়। সঠিকতার মাপযন্ত্রে সুখকে পরিমাপ করা এবং নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন। 

অবশ্য এ ব্যাপারে গবেষকেরা একটি কৌশল উদ্ভাবন করেছেন, যা দিয়ে সুখের পরিমাপ কিছুটা হলেও করা যায় বা সম্ভব; মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা তাত্ত্বিক মডেলের ভিত্তিতে সুখকে পরিমাপ করে থাকেন। এই মডেলে সুখকে ইতিবাচক কর্ম ও আবেগ সমূহের সমষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া এক্ষেত্রে তিনটি বিশেষ অবস্থাকেও বিবেচনা করা হয়: আনন্দ, অঙ্গীকার এবং অর্থ। গবেষকগণ এমন  কিছু বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন যেগুলো সুখের সাথে পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত: বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্ক, বহির্মুখী বা অন্তর্মুখী অবস্থা, বৈবাহিক অবস্থা, স্বাস্থ্য, গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা, আশাবাদ, ধর্মীয় সম্পৃক্ততা, আয় এবং অন্যান্য সুখী মানুষের সাথে নৈকট্য। 

প্রত্যেক সমাজেই ধনী, গরিব, সুখী, অসুখী বিভিন্ন ধাঁচের মানুষের বসবাস। তবে বর্তমান পৃথিবীতে প্রকৃত সুখী মানুষ খুঁজে পাওয়া সোনার পাথর বাটির মতো। সকলেই কি সুখী হতে পারে?- কখনো না। তবে, একটি কথা চিরসত্য— সুখী হতে পয়সা লাগে না। নিজের সততা এবং ইচ্ছা থাকলেই হয়; অবশ্যই সুখী হওয়া যায়, এবং তা খুব বেশি কঠিন নয়, সম্ভব। নিজের যতটুকু আছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকলে, আনন্দ খুঁজে পেলে সুখী হওয়া তেমন কঠিন কিছু নয়। চাহিদা ও যোগানের সামাঞ্জস্য করতে পারলে অসুখী হওয়ার কোন আর অবকাশ থাকবে না। তবে, সুখ একটি আপেক্ষিক ব্যাপার; এ নিয়ে মতের ভিন্নতা থাকবেই। তবে মনে রাখতে হবে, ধনবান ব্যক্তি হলেই কেবল সুখী হওয়া যায় না যাবে না, এমনটি কখনও হয় না; আত্মতুষ্টি নিয়ে ছোট্ট কুটিরে বা রাস্তায় ঘুমিয়েও সুখ লাভ করা যায়, যা অতৃপ্তে প্রাসাদেও মেলে না।

দর্শনশাস্ত্র এবং ধর্মীয় চিন্তাবিদরা প্রায়ই আবেগের পরিবর্তে একটি ভালো জীবন বা সমৃদ্ধশালী জীবনধারণের ক্ষেত্রকে সুখ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন। এই অর্থে সুখকে অনুবাদ করার জন্য গ্রিক eudaimonia ব্যবহৃত হতো, এবং এখনও নৈতিকতার নীতিতে তা ব্যবহার করা হয়। সময়ের সাথে সাথে একটি পরিবর্তন হয়েছে যেখানে গুনের সাথে সুখের সম্পর্কের চেয়ে সুখের সাথে গুনের সম্পর্কের উপর বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। সহস্রাব্দ ঘুরে আসার পর থেকে, বিশেষ করে অমর্ত্য সেনের মানবিক বিকাশের পদ্ধতিটি উন্নত হয়েছে তার ফলে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের উপর আগ্রহ বেড়ে গেছে। বিশেষত মার্টিন সেলিগম্যান, এড ডায়নার এবং রুউৎ ভেনহোভেনের কাজ, এবং পল আনন্দ এর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এবং চিকিৎসা গবেষণায় ব্যাপক অবদানের ফলে এই বিষয়ের গুরুত্ব বেড়ে যায়।

১৭৭৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থমাস জেফারসন দ্বারা লিখিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ব্যাপকভাবে আলোচিত রাজনৈতিক মূল্যবোধ ছিল; কারণ তিনি উল্লেখ করেছিলেন, 'সুখের অনুধাবন করা' একটি সার্বজনীন অধিকার। মনে হচ্ছে এটি একটি বিষয়ভিত্তিক ব্যাখ্যা করার কথা বলে তারপরেও তা একাই আবেগ অতিক্রম করে। আসলে, এই আলোচনাটি প্রায়শঃই সহজ ধারণার উপর ভিত্তি করে চলছে; সুখ শব্দটি একই জিনিস বোঝায় যা ১৯৭৬ সালে ছিল এবং আজও তাই আছে। প্রকৃতপক্ষে, অষ্টাদশ শতকে সুখ বলতে বুঝাতো— সমৃদ্ধি, উন্নতি এবং সুস্থতা।

আজকাল সুখ একটি ঝাপসা ধারণা এবং ভিন্ন ভিন্ন লোকের কাছে এর অর্থ ভিন্ন মনে হতে পারে। সুখের বিজ্ঞান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো— সুখ নিয়ে বিভিন্ন ধারণা চিহ্নিত করা এবং যেখানে প্রযোজ্য সেই অনুযায়ী তাদের উপাদানগুলোকে বিভক্ত করা। প্রাসঙ্গিক ধারণাগুলো হচ্ছে সুস্থতা, জীবনের মান এবং সমৃদ্ধি। নিদেনপক্ষে একজন হলেও লেখক সুখকে তুষ্টি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। কিছু ভাষ্যকার আনন্দবাদী ঐতিহ্যের মাধ্যমে সুখকে অনুসন্ধান এবং অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতাগুলোকে অবজ্ঞা করার মাধ্যমে ইউডামোনিক উপায়ে জীবনকে পুরোপুরি এবং গভীরভাবে ও পরিতৃপ্তির সাথে উপভোগ করার উপর বেশি জোর দেন।

২০১২ সালের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্যক্তিগত কল্যাণমূলক পদক্ষেপে, প্রাথমিক বিশুদ্ধতম জীবনের মূল্যায়ন এবং মানসিক প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা। সুখকে উভয় জীবন মূল্যায়নে ব্যবহার করা হয়, যেমন— মোটের উপর আপনি আপনার জীবনে কতটা সুখী? এবং মানসিক প্রতিবেদনে— এখন আপনি কতটা সুখী?- লোকজন এই ধরনের মৌখিক contexts-এ সুখকে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারে বলে মনে হয়। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস প্রতিবেদনগুলো এই পরিমাপ পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে সুখের সর্বোচ্চ স্তরের দেশগুলোকে চিহ্নিত করে থাকেন।

১৯৬০-এর দশক থেকে গ্যারান্টোলজি, সামাজিক মনোবিজ্ঞান, ক্লিনিক্যাল এবং মেডিক্যাল গবেষণা এবং সুখ অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক শাখায় সুখ নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। বিগত দুই দশক ধরে, বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্র ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে এবং বিভিন্ন মতামতের উপর ভিত্তি করে সুখের কারণগুলো এবং যে বিষয়গুলোর সাথে সুখের আন্তঃসম্পর্ক আছে সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সুখের ধারণাকে উন্নত করার জন্যে অনেক স্বল্পমেয়াদী স্ব-উদ্যোগের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ব্যাপক অর্থে সুখ হলো একটি পরিবারের জন্য আনন্দদায়ক একটি অবস্থা, যেমন— আনন্দ, পরিতৃপ্তি, সন্তুষ্টি, উষ্ণতা এবং জয়লাভ। 

উদাহরণস্বরূপ, সুখ মূলতঃ অপ্রত্যাশিত ইতিবাচক ঘটনাগুলোর মাধ্যমে, অন্যদের দেখার মাধ্যমে, এবং অন্যদের প্রশংসা করা এবং গ্রহণ করা থেকে আসে। আরও সংকীর্ণভাবে, এটি পরীক্ষামূলক এবং মূল্যায়নযোগ্য সুখের কথা উল্লেখ করে। 
অভিজ্ঞতাগত সুখ, বা বিষয়গত সুখ, প্রশ্নের মাধ্যমে যাচাই করা হয়; যেমন— এখন আপনার অভিজ্ঞতাটি কতটুকু ভাল বা মন্দ? পক্ষান্তরে, মূল্যায়ন করার মত সুখ নিয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা যায়, যেমন— আপনার অবকাশ কতটা ভাল ছিল? এবং অতীত সুখ সম্পর্কে একজন ব্যক্তির বিষয়ভিত্তিক চিন্তা এবং অনুভূতিগুলো পরিমাপ করার চেষ্টা করা। 

পরীক্ষামূলক সুখ কম ত্রুটিপূর্ণ যা মেমোরির মাধ্যমে পুনরুৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু সুখের উপর ভিত্তি করে লেখা বেশিরভাগ সাহিত্য মূল্যায়নের সুফলকে বোঝায়। হিরোস্টিকস দ্বারা সুখ পরিমাপের সাথে দুইটি বিষয় জড়িত থাকতে পারে, যেমন— peak-end rule এর কথা বলা যেতে পারে। সুখ পুরোপুরি বহিরাগত বিষয় নয়, এমনকি মুহূর্তের আনন্দ থেকেও তা প্রাপ্ত হয় না। প্রকৃতপক্ষে, প্রচলিত ধারণায় সুখ দ্রুতগামী বলা সত্ত্বেও গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, সময়ের সাথে সাথে সুখ স্থিতিশীল হয়। সুখ আংশিকভাবে জিনগত। যমজ গবেষণা করে প্রাপ্ত তথ্য থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, মানুষের সুখ স্তরের ৫০ শতাংশ জিনগতভাবে নির্ধারিত হয়, ১০ শতাংশ জীবনের চলমান পরিস্থিতি এবং অবস্থা দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ সুখ আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়।

এ্যাক্রোনিম পিইআরএমএ সুখের সাথে সম্পর্কযুক্ত পাঁচটি বিষয়কে সংক্ষেপ করে এভাবে—
১. আনন্দ (সুস্বাদু খাদ্য, উষ্ণ বাথ, ইত্যাদি), 
২. যোগদান (বা প্রবাহ, একটি উপভোগ্য কার্যকলাপ যা এখনো চ্যালেঞ্জিং পর্যায়ে আছে), 
৩. সম্পর্ক (সামাজিক সম্পর্ককে সুখের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য নির্দেশক বলা যায় ), 
৪. অর্থ (একটি অনুভূতির খোঁজ করা বা বড় কিছুর সাথে সম্পর্কিত), এবং 
৫. অর্জন (বাস্তব লক্ষ্য উপলব্ধি করা)।
এবং বিশেষ করে পিতা-মাতার সাথে সম্পর্কযুক্ত ভালোবাসার ক্ষমতা এবং পারষ্পরিক সংযুক্তি যা মানুষের জীবনে সুখের একটি দৃঢ় অবস্থার কথা বলে।
মস্তিষ্কের বামদিকের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের উচ্চ কার্যকলাপের দিকে লক্ষ্য করে বুঝা যায় যে এই অংশটির সাথে মানুষের সুখানুভূতির আন্তঃসম্পর্ক আছে।

এটিও যুক্তিযুক্ত করা হয়েছে যে, টাকার মাধ্যমে কার্যকরভাবে সুখ কিনতে পারা যায় না, যদি না একে সুনির্দিষ্ট উপায়ে ব্যবহার করা হয়। এটি ছাড়াও যে ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ আছে যার মাধ্যমে তারা সহজেই খাবার কিনতে পারে, নতুন কাপড় পরিধান এবং ঘর বাড়ি বানাতে পারে - এমনকি অনেক লোকের বেশি অর্থ আছে যা তাদের সামান্য সুখী করতে পারে। অন্যদের জন্য অর্থ ব্যয় করে সত্যিই আমরা অনেক সুখ অনুভব করি; কিন্তু নিজেদের জন্য ব্যয় করলে ততটা সুখ করি না।

ধর্ম কীভাবে সুখের সাথে সম্পর্কযুক্ত তা নিয়ে কিছু গবেষণা করা হয়েছে। সাধারণ সম্পর্ক অস্পষ্ট, কিন্তু ধর্মের মধ্যে মানুষকে বেশি সুখী হতে দেখা যায়। PERMA-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ধর্ম নিজের চেয়ে আরও ব্যাপক অর্থবোধক এবং সংযোগের অনুভূতি প্রদান করতে পারে। ধর্ম মানুষকে সাম্প্রদায়িক সদস্যপদ দিতে পারে, যা সাধারণ সম্পর্ক থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী। অন্য একটি উপাদান এর কথা বলা যায় যা রীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

মাসলো চাহিদার অনুক্রমের একটি পিরামিড অঙ্কন করেছেন— যা মানবিক চাহিদা, মানসিক এবং শারীরিক মাত্রার চিত্র তুলে ধরে। যখন একজন মানুষ পিরামিডের ধাপে উঠবে, সে আত্মতৃপ্তির চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছবে। প্রয়োজন পূরণের রুটিনের বাহিরে, Maslow অসাধারণ অভিজ্ঞতার মুহূর্তের কথা বলেছেন যা চূড়ান্ত অভিজ্ঞতা হিসাবে পরিচিত। তাছাড়া প্রেমের গভীর মুহূর্ত, বোঝা, সুখ বা পরমানন্দ, যার ফলে একজন ব্যক্তি অনুভব করে আরও পুরো, জীবিত, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং নিজেকে বিশ্বের একটি অংশ হিসেবে অনুভব করে। এটি মিহালি সিস্কসজেন্টমিহালি প্রবাহ ধারণার অনুরূপ।

স্ব-সংকল্প তত্ত্ব তিনটি চাহিদার সাথে সম্পর্কিত: দক্ষতা, স্বায়ত্তশাসন এবং সংশ্লিষ্টতা।

বিশ্বব্যাপী ক্রস বিভাগীয় গবেষণাগুলো সুখের সাথে ফল এবং শাক-সবজি খাওয়ার একটি সম্পর্ককে সমর্থন করে। প্রতিদিন ফল এবং শাক-সবজি খাওয়াকে 'খুব খুশি' হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। তারা মনে করেন ফল এবং শাক-সবজি খাওয়া ও সুখের মধ্যে একটি শক্তিশালী এবং ইতিবাচক পারস্পরিক সম্পর্ক আছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, চিলি, ইউএসএ বা ইউকে-তে ব্যাপক হারে ফল এবং উদ্ভিজ্জ ব্যবহারে অধিক সুখের সাথে ইতিবাচক সহযোগিতা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধূমপান, ব্যায়াম, বডি মাস ইনডেক্স এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও সুখের সাথে জড়িত।

Layard এবং অন্যান্যরা দেখান যে, সুখের উপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে মানসিক স্বাস্থ্য। ব্রাহ্মকুমারী রাজা যোগ ব্যায়ামে ধ্যানকারীদের উপর অক্সফোর্ডের সুখের প্রশ্নাবলী ব্যবহার করে একটি গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রিত গ্রুপের চেয়ে অনিয়ন্ত্রিত গ্রুপের লোকেরা বেশি সুখী। Yongey Mingyur Rinpoche বলেছেন যে— স্নায়ু বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় লক্ষ্য করেছেন ধ্যানের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার সুখের বেসলাইন পরিবর্তন করতে পারেন।

ধর্ম এবং সুখ নিয়ে অনেক গবেষক গবেষণা করেছেন এবং গবেষণা হয়েছে। ধর্মীয় বিষয় সুখের উপাদান হিসাবে অনেক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করে, যা ইতিবাচক মনোবিজ্ঞান দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। সুখের সাথে সংগঠিত ধর্মের সামাজিক সংযোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে; প্রার্থনা এবং বিশ্বাস দ্বারা স্নায়বিক সুবিধা লাভ করা যায় অনেক বেশি।

এমন অনেক বিষয় আছে যা দ্বারা ধর্ম একজন ব্যক্তিকে নেক ও সুখী করতে পারে; এমনকি সামাজিক যোগাযোগ এবং সমর্থন যা ধর্মীয় pursuits থেকে যা পাওয়া যায়। তাছাড়া মানসিক কার্যকলাপ, যা আশাবাদ এবং স্বেচ্ছাসেবী বিষয়ের সঙ্গে জড়িত, কি কৌশলের মাধ্যমে মানসিক চাপ মোকাবেলা করা যাবে এবং এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যাবে। এটাও হতে পারে যে ধার্মিক লোকেরা ভাল স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আচরণ, যেমন— পদার্থের কম অপব্যবহার করে; যেহেতু মনস্তাত্ত্বিক পদার্থের ব্যবহারকে কখনও কখনও অপব্যবহার বলে মনে করা হয়। The Handbook of Religion and Health-এ Feigelman (১৯৯২) দ্বারা পরিচালিত একটি জরিপের বর্ণনা দিয়েছে যে, যারা ধর্মকে ছেড়ে দিয়েছে এমন আমেরিকানদের মধ্যে সুখ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে, সেখানে এটি পাওয়া গেছে যে, ধর্মীয় অধিভুক্তি বাতিল ও অসুখের মধ্যে সামান্য সম্পর্ক রয়েছে। 

কসমিন ও লচম্যান (১৯৯৩) তাদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ধর্মের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের তুলনায় যাদের ধর্মের সাথে কোন সম্বন্ধ নেই তাদের বিষণ্ণতা উপসর্গের ঝুঁকি µ অনেক বেশি। ১৪৭ টি স্বাধীন তদন্তকারীর গবেষণায় দেখা গেছে— ধর্মীয়বোধ এবং বিষণ্নতাগত উপসর্গগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল -০.০৯৬; যা ইঙ্গিত দেয় যে, বৃহত্তর ধর্মীয়বোধ হালকাভাবে কম উপসর্গের সাথে জড়িত।

ল্যাজাটুম প্রসপারিটি ইনডেক্স সুখের বিজ্ঞান নিয়ে যে গবেষণা পরিচালনা করেছে সেই গবেষণায় এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, ধর্মীয় সংযুক্তি ও সুখের সাথে একটি ইতিবাচক লিংক আছে; তারা এই রিপোর্ট করে যে, যাদের জীবনে ঈশ্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তারা তাদের জীবনে অনেক বেশি সন্তুষ্ট থাকে, তাদের আয়, বয়স এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য হিসাব করার পরও। 

গালাপের জরিপ, জাতীয় মতামত গবেষণা কেন্দ্র এবং প্যা অর্গানাইজেশন এই উপসংহারে পৌঁছেছে যে, আধ্যাত্মিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ব্যক্তিরা অন্তত ধর্মীয়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ব্যক্তিদের তুলনায় 'খুব খুশি' হওয়ার রিপোর্টের দ্বিগুণ। ২০০ টিরও বেশি সামাজিক গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, উচ্চ ধার্মিকতা— বিষণ্ণতা এবং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার এবং আত্মহত্যার ঝুঁকির পরিমাণ কমিয়ে দেয়, শুধু তাই নয় যৌন জীবন এবং সন্তুষ্টির দিক থেকেও তারা অনেক এগিয়ে। তবে ধর্ম এবং সুখের মধ্যে সম্পর্ক ধর্মগ্রন্থের উপর সর্বদা নির্ভরশীল। 

ধর্ম এবং যন্ত্রণা এর মধ্যে অনেক বড় সংযোগ রয়েছে (লিঙ্কন ১০৩৪); এবং ৪৯৮ টি সমীক্ষা পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণা পর্যালোচনা করে উপসংহারে এসেছেন যে, একটি ইতিবাচক পারস্পরিক সম্পর্ক দেখিয়েছে বড় সংখ্যার ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি সাথে অনুভূত সুখ এবং আত্মসম্মান এবং নিম্ন রক্তচাপ, বিষণ্ণতা, এবং ক্লিনিক্যাল কর্তব্যে অবহেলার বিষয় গুলো জড়িত। 

১৯৯০ থেকে ২০০১ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত ৩৪ টি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ধার্মিকতার মানসিক সমন্বয়ের সাথে একটি ভাল সম্পর্ক রয়েছে, কম মানসিক অসুস্থতা, আরও বেশি জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি এবং ভাল আত্ম-তুষ্টি লক্ষ্য করা গেছে। অবশেষে, ৮৫০টি গবেষণাপত্রের একটি সাম্প্রতিক পদ্ধতিগত পর্যালোচনা করে এই উপসংহারে এসেছিল যে— বেশিরভাগ সুশৃঙ্খল গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, উচ্চ মাত্রায় ধর্মীয় সম্পৃক্ততার সাথে ইতিবাচকভাবে মনস্তাত্ত্বিক সুখের সূচক (জীবন সন্তুষ্টি, সুখ, ইতিবাচক প্রভাব, এবং উচ্চতর মনোবল) এবং কম বিষণ্ণতা, আত্মঘাতী চিন্তা ও আচরণ, ড্রাগস বা অ্যালকোহল এর ব্যবহার ও অপব্যবহারসহ বিষয়গুলো সম্পৃক্ত। 

যাইহোক, পণ্ডিতদের মধ্যে দৃঢ় মতবিরোধ রয়েছে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রভাব বিশেষ করে গির্জায় যোগদান বা অন্যথায় ধর্মীয় গোষ্ঠীর অন্তর্গত হওয়া, আধ্যাত্মিক বা সামাজিক দিকগুলোর কারণে মানুষ সুখী হতে পারে কিনা এই সব বিষয় নিয়ে। যারা গির্জা বা অনুরূপ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অন্তর্গত তারা শুধুমাত্র সামাজিক সংযোগের প্রভাবে প্রভাবিত হতে পারে। এই সুবিধাগুলোই যথেষ্ট, যা তারা একই বা অন্য ধর্ম নিরপেক্ষ দল, ক্লাব বা অনুরূপ সংস্থাগুলোতে যোগদান করে লাভ করতে পারে।

ইসলামে— ৫০% সুখকে 'রিদাহ বাই আল-কাদাহ' বলা হয় (ভাগ্যে যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা)। এর অর্থ হলো— ইমানদার হওয়া। যদি আমরা সত্যিই আল্লাহকে ভালোবাসি এবং তাঁর উপরে নির্ভর করি, আমাদের জন্য তিনি যা আদেশ করেছেন তা নিয়ে যেন আমরা অবশ্যই সন্তুষ্ট থাকি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ভাগ্য নিয়ে অনেক কথা বলেছেন এবং সন্তুষ্টির গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। অতএব, আমাদের মুসলমানদের ওইসব  অনুরোধগুলো অবশ্যই পড়ার প্রচেষ্টা চালানো উচিত— 'আমি আল্লাহকে আমার পালনকর্তা হিসাবে পেয়ে খুশি হয়েছি, আমার ধর্ম হিসাবে ইসলামের সাথে এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে আমার নবী হিসাবে পেয়ে  [সহীহ্ আবু দাউদ]।' 'হে আল্লাহ্‌, আমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে আমাকে সন্তুষ্ট করে দিন, আমার জন্য আশীর্বাদ পাঠান, এবং আমার জন্য প্রত্যেকটি অনুপস্থিত জিনিসের মধ্য দিয়ে ভাল কিছু রাখুন [সহীহ্ বুখারী]।'

বৌদ্ধধর্ম মতে— সুখ হচ্ছে বৌদ্ধ শিক্ষার একটি কেন্দ্রীয় বিষয় । দুঃখকষ্ট থেকে চূড়ান্ত স্বাধীনতা লাভের জন্য নোবেল আটটি পথ তার অনুশীলনকারীদেরকে নির্বান লাভের স্তরে নিয়ে যায়, যাকে বলা হয় চির সুখের একটি স্থান। পরম সুখ শুধুমাত্র অর্জিত হবে তখন, যখন চাওয়া পাওয়াকে কেউ অতিক্রম করতে পারবে। সম্পদ অর্জন এবং ভালো বন্ধুত্ব বজায় রাখার মধ্যেও জাগতিক সুখের সন্ধান পাওয়া যায়, যা মানুষের জন্য যোগ্য লক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃত। বৌদ্ধ ধর্ম সমবেদনা, সমস্ত মানুষের সুখ এবং কল্যাণের জন্য উৎসাহ দেয়।

ইহুদীধর্ম মতে— সুখ বা সিম্ছাকে  ঈশ্বরের সেবায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাইবেলের গসপেল 'সুখের সাথে পালনকর্তার পূজা করা, আনন্দের গান নিয়ে তাঁর সামনে আসা (গীতসংহিতা ১০০: ২)'। ঈশ্বরের সেবা আনন্দের উপর জোর দেয়। ঊনবিংশ শতকের রাব্বি নাচম্যান ব্রেসলভ দ্বারা একটি জনপ্রিয় শিক্ষা চাছিদিক রাব্বি, 'মিৎস্ভা গেদোলাহ লাহিয়ত বাসিমচা তামিড'—এটি একটি মহান মিৎস্ভা (আজ্ঞা) সব সময় ভাল থাকার একটি পর্যায়। যখন একজন ব্যক্তি সুখী থাকে, তখন তারা ঈশ্বরকে সেবা করার এবং বিষণ্ণ বা বিরক্তির চেয়ে তাদের দৈনিক ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে আরও বেশি সক্ষম হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় সুখের প্রধান অর্থ সৌভাগ্য, সুযোগ বা যা ঘটছে। 
গ্রিক দর্শনে প্রাথমিকভাবে এটি নৈতিকতা অর্থে বোঝায়। 

ক্যাথলিকবাদে— মানুষের অস্তিত্বের চূড়ান্ত বিষয়টি গ্রীক ইউদাইমনিয়ার সমতুল্য বা 'আশীর্বাদপূর্ণ সুখ'; যা ত্রয়োদশ শতাব্দীর দার্শনিক-ধর্মতত্ত্ববিদ টমাস অ্যাকুইনাসের ঈশ্বরীয় উপায়ে একটি বিস্ময়কর দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মানুষের জটিলতাগুলো, যেমন— কারণ এবং চেতনা, যা সুস্থতা বা সুখ উৎপাদন করতে পারে; কিন্তু এই ধরনের ফর্ম সীমিত এবং ক্ষণস্থায়ী। আক্ষরিক জীবনের মধ্যে ঈশ্বরের চিন্তা, অসীম সুন্দর এবং ইচ্ছার সর্বোচ্চ বাস্তবায়নজনিত বিষয়গুলো জড়িত থাকে। Beatitudo বা সম্পূর্ণ সুখ বলতে যা বুঝায় তা এই জীবনে অর্জন করা যাবেনা, কিন্তু পরবর্তী জীবনে তা অবশ্যই সম্ভব।

যদিও ধর্ম প্রায়ই আনুষ্ঠানিক এবং সম্প্রদায় ভিত্তিক, কিন্তু আধ্যাত্মিকতা পৃথক হয়ে থাকে, যা অনানুষ্ঠানিকভাবে হিসাবে চর্চা করা হয়। ২০১৪ সালের একটি গবেষণায় পাবলিক এবং প্রাইভেট স্কুল উভয় ক্ষেত্রেই ৮-১২ বছর বয়সী শিশুদের ৩২০ জনকে আধ্যাত্মিক সুস্বাস্থ্য সম্পর্কিত কিছু প্রশ্নের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতা ও সুখের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক মূল্যায়ণ করা হয়েছে। আধ্যাত্মিকতা— যা ধর্মীয় চর্চা নয় (প্রার্থনা, গির্জা সেবা ,যোগদান)। ছেলেমেয়েদের মধ্যে সুখের ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে যে, যারা যত বেশি আধ্যাত্মিক ছিল তারা তত বেশি সুখী ছিল। আধ্যাত্মিকতা থেকে প্রাপ্ত সুখের মধ্যে প্রায় ৩-২৬% ভিন্নতার জন্য দায়ী।

২৩০০ বছর আগে চীনের কনফুসিয়ান চিন্তক মেনসিউস যুদ্ধ জড়িত নির্দয় রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শ দিতে চেয়েছিলেন, তিনি মনে করেছিলেন যে—ক্ষুদ্র স্বার্থ (শারীরবৃত্তীয় স্বার্থ) এবং বৃহত্তর স্বার্থ (নৈতিক স্বার্থ )-র মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করেছিল যা ঋষি হুড পর্যন্ত পৌঁছতে সাহায্য করবে বলে তিনি দাবী করেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, যদি আমরা ন্যায়পরায়ণ কাজ ও প্রাণবন্ত শক্তি দিয়ে কাউকে পুষ্ট করার জন্য সন্তুষ্টি বা পরিতোষ অনুভব না করি, তবে সেই শক্তি কুচকিয়ে যাবে (মেনেসিয়াস, ৬এ:১৫ ২এ: ২)। আরও বিশেষভাবে, তিনি বিশেষ করে সংগীতের মাধ্যমে মহান গুণাবলীগুলোর অনুশীলনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রঃ)(১০৫৮-১১১১) একজন জগৎবিখ্যাত মুসলিম সূফী চিন্তাবিদ; Alchemy of Happiness লিখে তিনি সুখের ভিত্তি দাঁড় করিয়ে গেছেন, যা বর্তমানে মুসলিম বিশ্ব জুড়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত এবং প্রচলিত।

যোগসূত্রের লেখক হিন্দু চিন্তাবিদ পতঞ্জলি সুখের মনোবৈজ্ঞানিক ও আণবিক শক্তির উপর লিখে গেছেন।

৩৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে লিখিত Nicomachean Ethics-এ অ্যারিস্টেটল বলেন যে, সুখ (ভাল হওয়া এবং ভাল কাজ করা বুঝায়); সুখ হলো একমাত্র জিনিস যা মানুষ নিজের জন্য কামনা করে এবং যা ধন, সম্মান, স্বাস্থ্য বা বন্ধুত্বের মতো নয়। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, মানুষ শুধুমাত্র নিজের জন্য নয় বরং সুখী হওয়ার জন্য ধন, সম্মান বা স্বাস্থ্যের সন্ধান করে। উল্লেখ্য, আমরা ইউডাইমোনিয়া শব্দটিকে 'সুখ' হিসাবে অনুবাদ করি, যাকে অ্যারিস্টেটল আবেগ বা একটি অবস্থার পরিবর্তে একটি কার্যকলাপ হিসেবে দেখেছিলেন। 

এভাবে বোঝা যায় যে, সুখী জীবন হলো ভালো জীবন; অর্থাৎ এমন একটি জীবন যার মধ্যে একটি মানুষ অপর একটি মানুষের প্রকৃতিকে একটি চমৎকার উপায়ে উদযাপন করে। বিশেষতঃ অ্যারিস্টেটল যুক্তি দেন যে, ভাল জীবন হচ্ছে চমৎকার যুক্তিপূর্ণ কার্যকলাপের মাধ্যমে অতিবাহিত জীবন। তিনি ফাংশন আর্গুমেন্টের মাধ্যমে এই দাবি উত্থাপন করেছিলেন। মূলতঃ যদি এটি সঠিক হয়— প্রতিটি জীবন্ত জিনিসের একটি ফাংশন আছে, যা অনন্য উপায়ে কাজ পরিচালনা করে। চমৎকার যুক্তিপূর্ণ কার্যকলাপের মাধ্যমে পরিচালিত জীবনই হলো সুখী জীবন; অ্যারিস্টেটল এটা বলাও ছেড়ে দেননি। কারণ, তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে— চমৎকার যুক্তিপূর্ণ কার্যকলাপে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ জীবন রয়েছে। এই দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ জীবন হলো নৈতিক গুণাবলীর জীবন।

অনেক নৈতিকতাবাদি যুক্তি দিয়েছেন সুখের আচরণের উপর ভিত্তি করে পৃথকভাবে বা যৌথভাবে কিভাবে মানুষের আচরণ করা উচিত তা নিয়ে। ইউটিলিটেরিয়নরা, যেমন— জন স্টুয়ার্ট মিল এবং জেরেমি বেন্থহ্যাম নৈতিক আচরণের পথ নির্দেশনা হিসাবে সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ নীতির কথা বলেছিলেন। ফ্রেডরিখ নয়েৎশে সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ অর্জন নিয়ে ইংরেজি উটিলিটিরিয়ান ফোকাসের নিন্দা করে বলেন, মানুষ সুখের জন্য সংগ্রাম করে না, শুধু ইংরেজরাই করে। নয়েৎশে মনে করেছিলেন যে, সুখ মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য, মানুষের অস্তিত্বের লক্ষ্য, যা মানুষকে নীচ করে তোলে; নয়েৎশ এর পরিবর্তে একটি সংস্কৃতির জন্য আকাঙ্ক্ষিত, যা নিখুঁত সুখ প্রতিষ্ঠিত করবে। সেন্ট অগাস্টিন এবং টমাস অ্যাকুইনাসের মতে, শেষের সুখটিই হল আসল সুখ— সমস্ত মানুষ শেষ প্রান্তের আশা করতে সম্মত হয়, যা প্রকৃত সুখ।

যাইহোক, সুবিধার জন্য প্রাথমিক সরঞ্জাম হিসাবে পরিণামের ফলাফলের ভিত্তিতে যুক্তিবাদী ব্যক্তিরা অ্যাকুইনাস এবংং অ্যারিস্টেটলের সাথে একমত হন যে, সুখ কেবল কাজের পরিণতি নিয়ে যুক্তিযুক্তভাবেই পৌঁছতে পারে না, তবে কার্যের জন্য ভালো কারণগুলোর অনুসরণ করারও প্রয়োজন হয়, যেমন— নৈতিকতা অনুযায়ী অভ্যাস; অভ্যাস এবং কাজ যা সাধারণত সুখের দিকে পরিচালিত হয়। অ্যাকুইনাসের মতে যা আইন অনুসারে সৃষ্ট, যেমন— প্রাকৃতিক আইন এবং ঐশ্বরিক আইন। অ্যাকুইনাস এর মত অনুযায়ী এই আইনগুলো প্রথম কারণ দ্বারা সৃষ্ট, বা ঈশ্বর দ্বারা।

অ্যাকুইনাসের মতে— সুখ একটি ফটকামূলক বুদ্ধিমত্তার অপারেশন নিয়ে গঠিত হয়; ফলস্বরূপ সুখ সাধারণত এমন একটি অপারেশন নিয়ে গঠিত যা ঐশ্বরিক বিষয়ের সাথে জড়িত এবং শেষ প্রয়াস সক্রিয় জীবন যাপন করতে পারে না, যা বাস্তবিক বুদ্ধি সম্পর্কিত।

সাধারণ বাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেমন জিডিপি এবং জিএনপি হিসাবে সফল নীতির পরিমাপ হিসাবে ব্যবহার করা হয় এবং হয়েছে; গড় ধনী দেশগুলো দরিদ্র দেশগুলোর তুলনায় বেশি সুখী হয়। তাই এই প্রভাবটি ধন-সম্পদের সাথে কিছুটা  সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়। এটি দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, নির্ভরশীলতা লিনিয়ার নয় তবে লগারিদমিক; অর্থাৎ,জিএনপিতে একই শতাংশ বৃদ্ধি দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ধনী দেশে সুখ বৃদ্ধি করে। ক্রমবর্ধমানভাবে, একাডেমিক অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলি বহু-মাত্রিক ড্যাশবোর্ডের জন্য বাদানুবাদ করছে এবং বিকাশ করছে যা মানবীয় কল্যাণের আরও সরাসরি ও সুস্পষ্ট মূল্যায়ন প্রদানের জন্য ব্যক্তিগত ও উদ্দেশ্য সূচককে একত্রিত করা যায় কিনা। পল আনান্দ এবং তার সহকর্মীদের দ্বারা এই বিষয়টিকে তুলে ধরতে সহায়তা করে যে, সুখের প্রতিফলন ঘটেছে সুখের পরিপ্রেক্ষিতে অংশীদারত্বের দিক থেকে, যেমন— প্রধান সীমাবদ্ধতার উপস্থিতি এবং সেই ন্যায্যতা, স্বায়ত্তশাসন, সম্প্রদায় এবং অংশগ্রহণগুলো সুখ ও সুখের প্রধান দিক, যা সারাজীবন জুড়ে পরিচালিত হয়।

উদারপন্থী চিন্তাবিদ কাটো ইন্সটিটিউট দাবি করেন যে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সুস্পষ্টভাবে সুখের সাথে সম্পর্কযুক্ত। প্রাথমিকভাবে একটি পাশ্চাত্যের মিশ্র অর্থনীতি, মুক্ত সংবাদ এবং গণতন্ত্রের সাথে সম্পৃক্ত। নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো (কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা শাসিত) পশ্চিমাদের তুলনায় কম সুখী ছিল, এমনকি সমান দরিদ্র দেশগুলোর চেয়েও কম সুখী।

তবে, নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক বেঞ্জামিন রেডক্লিফ, যিনি সুখ অর্থনীতির ক্ষেত্রে অনেক গবেষণা করেছেন, তিনি মনে করেন— গণতান্ত্রিক দেশে জীবন সন্তুষ্টি অনেক দৃঢ় হয়, যদি ইতিবাচকভাবে একটি উদার সামাজিক নিরাপত্তা নেট, প্রো- শ্রম বাজার প্রবিধান এবং শক্তিশালী শ্রম ইউনিয়নের ব্যবস্থা করা যায়। একইভাবে, অনেক প্রমাণ আছে যে পাবলিক পলিসিগুলো দারিদ্র্যতা কমাতে এবং একটি শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সমর্থন করতে পারে, যদি উচ্চতম ন্যূনতম মজুরি সুনিশ্চিত করা যায় তাহলে তা সুখের উপর অনেক প্রভাব ফেলে।

এটি সাধারণভাবে গৃহীত হয় যে, সুখ অন্ততঃপক্ষে ডোপমিনার্জিক, অ্যাড্রেনার্জিক এবং সেরোটোনার্জিক বিপাকের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করা হয়। হরমোনের মাত্রা এবং সুখের মধ্যে একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। SSRIs, যেমন— Prozac ক্লিনিক্যালভাবে অসুখী কিনা সেরোটোনিকের মাত্রা সমন্বয়ের মাধ্যমে তা যাচাই করা হয়। গবেষকরা, যেমন— আলেকজান্ডার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অনেক লোক মাদকদ্রব্য ব্যবহার করে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য হরমোনের মাত্রা সংশোধন করার প্রচেষ্টা করলে ফলাফল হতে পারে বিপরীত যা তাদের অসন্তুষ্ট করে। একটি ইতিবাচক সম্পর্ক মস্তিষ্কের ডান পাশে precuneus এলাকায় ধূসর কিছু উপাদান পাওয়া গেছে যার মাধ্যমে সুখের মাত্রা পরিমাপ করা যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধ্যান ভিত্তিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে লক্ষ্য করা গেছে যে, precuneus এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য হারে ধূসর উপাদান বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

২০০৫ সালে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে এন্ড্রু স্টেপটো এবং মাইকেল মারমোট কর্তৃক পরিচালিত একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, সুখ জৈবিক মার্কারদের সাথে সম্পর্কিত যা স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষকরা লক্ষ্য করেন যে, সুখ এবং তিনটি জৈবিক মার্কার এর মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে কি না, যেমন— হৃৎস্পন্দন, করটিসোল স্তর এবং প্লাজমা ফাইব্রিনোজেন এর মাত্রা। যারা নিজেদেরকে কমপক্ষে সুখী মনে করেন তাদের মধ্যে করটিসোলের মাত্রা ছিল ৪৮% বেশি যারা নিজেদেরকে সবচেয়ে বেশি সুখী বলে মনে করে তাদের থেকে। অন্তত সুখী বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে দুটি স্ট্রেস-ইনডুইটিং টাস্কগুলোর একটি বড় প্লাজমা ফাইব্রিনোজেন প্রতিক্রিয়া— স্ট্রোপ পরীক্ষা এবং একটি মিররে একটি তারকার ট্রেসিং করা। তিন বছর পরে তাদের বিষয়গুলো পুনরাবৃত্তি করে যে, স্টেপটো এবং মারমোটে পাওয়া যায় তাতে ইতিবাচক আবেগগুলোর মধ্যে উচ্চতর অংশগ্রহণকারী কোরিটিসোল এবং ফাইব্রিনোজেনের নিম্ন স্তরের পাশাপাশি নিম্ন হার্টের হারও অব্যাহত ছিল।

হ্যাপি পিপল লাইভ লংগার (২০১১), ব্রুনো ফ্রাই জানায় যে, সুখী মানুষেরা ১৪% বেশি সময় বেঁচে থাকে, দৈর্ঘ্য ৭.৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত। এবং রিচার্ড ডেভিডসনের বেস্টসেলার (২০১২) The Emotional Life of Your Brain যুক্তি দেয় যে, ইতিবাচক আবেগ এবং সুখ ভাল স্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।

যাইহোক, ২০১৫ সালের আগে পরিচালিত গবেষণাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, মৃত্যুর উপর সুখের কোন প্রভাব নেই। মৌলিক বিশ্বাস হলো— যদি আপনি সুখী হন তাহলে আপনি দীর্ঘকাল বাঁচবেন; এটা সত্য নয়। সুসঙ্গত ফলাফল হলো সুস্বাস্থ্যের পাশাপাশি সুখী মানুষের বয়স বেশি হতে পারে— ধূমপান না করা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকা, কঠোর অনুশীলন করা , সঙ্গীর সাথে বাস করা, ধর্মীয় বা গোষ্ঠী ক্রিয়াকলাপ পরিচালনা করা এবং রাতে অন্তত আট ঘণ্টা ঘুমানো।

সুখ দেহের রোগপ্রতিরোধে প্রভাব ফেলে বলে মনে করা হচ্ছে। ধূমপান, মদ্যপান, ব্যায়াম, এবং ঘুমের মতো অন্যান্য কারণগুলোর সাথে ইতিবাচক আবেগ অনুধাবনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে যা ঠাণ্ডা ও ফ্লু প্রতিরোধে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে। (তথ্যসূত্র: ইউকি)

পরিশেষে— ভিন্ন দেশের সেকেন্ড হোমে সুখ নেই, নেই  সুখ কানাডার বেগমপড়ায় বা অন্য কোথাও;  সুখের আসল ঠিকানা সৎ মানুষের চিত্ত। আর চিত্তে সুখ থাকলে অরণ্যে বসবাসেও সমস্যা নেই। 'সুখ' অত্যন্ত আপেক্ষিক ও জটিল একটি বিষয়; জীবন থেকে এ কথাটি নিশ্চিত বলতে পারি— চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে পারলে সে জীবনে সুখের আর কোন কমতি থাকে না থাকবে না।।  

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
২৭ নভেম্বর, ২০২০.

সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২০

ধর্ষণ!


ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেই ধর্ষক সব চুপসে যাবে, আমি মোটেও তা মনে করি না। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে অনুমোদন পেয়েছে জেনে খুশি হয়েছি, কিন্তু দেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি বা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার যে বাজে অবস্থা তা চিন্তা করে শংকিতও হচ্ছি; মোটেও ভরসা পাচ্ছি না। এ থেকে বিচারব্যবস্থা কি আদপে বেরুতে পারবে? বিচার প্রক্রিয়ার গ্যারাকলে পড়ে কোন ধর্ষিতা আবার বারংবার ধর্ষিত হবে না তো? যে গাছের গোড়ায় পচন, সে গাছের আগায় পানি দিয়ে কি লাভ হবে? 

যে জাতির বেশিরভাগ মানুষের বোধ-বুদ্ধি বলতে গেলে লোপ পেয়েছে, সে জাতির সামনে এসব কাগুজে আইন পাশের খবরের কোন মাহাত্ম্য আছে কি? তাছাড়া বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে চলমান বিদ্যমান, সমাজব্যবস্থাকে যা প্রায় গ্রাস করে ফেলেছে, সেখানে শুধুমাত্র আইন পাশ করে কোন লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না; বরং আইনের প্রয়োগের জন্য কঠিন  আইন করা উচিত, করতে হবে। ভাবতেও কষ্ট লাগে— লাইন না থাকলে এখনো এদেশে আইনের ধারেকাছেও যাওয়া যায় না বা পাওয়া যায় না! আইনের প্রয়োগ অপপ্রয়োগ সব যেন দূর্বলের জন্য! হাই/হ্যালো  বা অনৈতিক  অর্থনৈতিক সুবিধার মাঝে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে সবকিছু। আমরা তো এমন ছিলাম না, কেন এমন হলাম? অন্যের দোষ খুব বেশি চোখে পড়ে আমাদের,  নিজের দোষ মোটেও চোখে পড়ে না। পুরো সমাজব্যবস্থায়ই ধস নেমেছে, দেশের বিচারব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে সে তো অনেক আগেই, অথবা শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। এমতাবস্থায় শুধুমাত্র আইন সংশোধন করে বা সাজা বাড়িয়ে কি লাভ?   

যে মানুষের মগজে পচন ধরে সে মানুষকে বাঁচানো কঠিন, আর যে সমাজের রন্ধ্রে পচন ধরে সে জাতির কপালে অন্ধকার অমানিশা। সমাজের প্রতিটি স্তর যেভাবে নষ্ট হয়েছে শুধুমাত্র আইন করে কি ধ্বংস ঠেকানো বা রোধ করা সম্ভব?  কাগুজে  আইন যতই করা হউক না কেন, তা কার্যকরী না হলে তাতে জাতির কোনই কল্যাণ হবে না, এবং যতদিন না মানুষের বিবেক জাগ্রত হবে ততদিন কিছুতেই কিচ্ছু হবে না। তাছাড়া আইন যখন নিজস্ব গতি হারিয়ে প্রভাবশালীদের হাই/হ্যালো বা বিত্তবানদের অর্থের বৃত্তে আবদ্ধ  হয়ে পড়েছে, সে সমাজে সাধারণ জনগণ কি আশা করতে পারে বা পারবে? তা তাদের কোন কল্যাণেই আসবে না। সমাজের প্রতিটি সাধারণ মানুষ আজ জিম্মি, অসহায়। হাতেগোনা কিছু অমানুষের কাছে আমরা প্রায় সবায় জিম্মি, সেইসব কিছু দুষ্কৃতিকারীর কাছেই আমরা যেন সব কিছু তুলে দিয়ে বসে ঝিমাচ্ছি। আর তারা নির্ভয়ে ও নির্ভাবনায় তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। 

স্পর্শকাতর কিছু ঘটনায় হয়তো আমরা সোস্যাল মিডিয়ায় কখনো চিল্লাচিল্লি করি, করছি  লিখছি কেউ কেউ! সেই প্রতিবাদ আন্দোলন বা আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষিতে যদিওবা কোন অপরাধীর বিরুদ্ধে সরকার সক্রিয় হয়, কিছু করে, এক সময় দেখা যায় আইনের মারপ্যাঁচে ফলাফল শূন্য; রায় বিলম্বিত হওয়ার কারণে ভিকটিম নিশ্চুপ হয়ে যায়, আর সেই সুযোগ নেয় ধর্ষক। তাছাড়াও আরও কিছু বাজে সংস্কৃতি এর পেছনে কাজ করে— একশ্রেণির লোকের আইনি ব্যবসাকে চাঙ্গা করার প্রক্রিয়ায় বিচারকার্য দীর্ঘ হতে থাকে, সরকারেরও চেষ্টা থাকে জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর; জন্ম হয় নতুন ধর্ষকের! এভাবেই জন্ম নিচ্ছে নতুন ধর্ষক। 

আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়া, প্রচারমাধ্যম ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে যে ছকে বেঁধে রাখা হয়েছে সেই ছকের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ ঢুকে গেছে অদ্ভুত সব অমানবিকতার চর্চা এবং তা আমরাই করছি। প্রতিটি ছক চলছে এখন অদ্ভুত এক পুঁজিবাদী আর বস্তুবাদী কায়দায়। আর এ'সকল সকল মিডিয়ায়ই নারী হলো আনন্দ-বিনোদনের এক মোহনীয় পণ্যবস্তু! ফলে নারীরা কখনো  নিজেকে উচ্চতর সত্তা ভাবতেও পারছে না। সবখানে এমনভাবে নারীকে চিত্রায়িত করা হচ্ছে— যেন নারীর কাজই হলো নিজেকে রূপসজ্জায় সজ্জিত রাখা বা করা! আর পুরুষ হবে সেই সাজসজ্জার ভোক্তা! এভাবে মিডিয়া আজ নারী ও পুরুষ উভয়কে মোহাচ্ছন্নতার জালে আবদ্ধ করে ফেলেছে এবং রাখছে। আর এ ধরনের মিডিয়াকেই দেয়া হচ্ছে অপার স্বাধীনতা। বহুজাতিক কোম্পানির পুঁজিবাদী বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো চাঙ্গা রাখতে এরূপ নিম্নমানের স্বাধীনতাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধতা দেয়া হচ্ছে এবং তাদের মদদও যোগানো হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রায় সবার হাতে আজ চলে এসেছে স্মার্টফোন। যে তিনবেলা খাবার জোগাড় করতে পারে না তার হাতেও আছে একটি স্মার্টফোন। এই স্মার্টফোনের মধ্যে কি রক্ষিত আছে তা আমরা কেউ ভাবি না! রক্ষিত আছে নেশাদ্রব্যের মতো অদ্ভুত সব বিনোদনসামগ্রী। এসব বিনোদন সামগ্রীই প্রতিটি মুহূর্তে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা প্রত্যেককে ইন্দ্রিয় লালসায় উন্মত্ত করে তুলছে। একটি স্মার্টফোন যত সহজে একজন মানুষকে উত্তেজিত করে তুলতে পারে, এমনটি আর কোন যন্ত্র করতে পারে কিনা আমার সন্দেহ। ফলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সব দুয়ার আজ বন্ধ হওয়ার পথে বা হয়ে গেছে। মাদকের ব্যাপারে আইনি বাধা থাকলেও স্মার্টফোনের ব্যাপারে কোন আইনি বাধাই নেই। অথচ স্মার্টফোন যে ভয়ংকর মাদকতা ছড়াচ্ছে, তা ভাবারও অতীত। এর পরিণতি কত ভয়ানক ও ভয়াবহ তা হয়তো অনেকে কল্পনাও আনতে পারে না। শুধুমাত্র স্মার্টফোনের মেসেঞ্জারে প্রতিদিন যে পরিমাণ ইভ টিজিং হয়, তা কেউ হিসাব রেখেছে কি? ভুক্তভোগীমাত্রই তা জানেন ও বোঝেন। আমার মনে হয় শুধুমাত্র ফেসবুক মেসেঞ্জারে যে ইভ টিজিং প্রতিক্ষণে হয়, তা-ই অন্য সব মাধ্যমকে হার মানায়!

বেশিরভাগ ধর্মীয় বয়ানেও প্রাজ্ঞতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে; বক্তারা এমন সব বক্তব্য করে বা দেয় যেখানে ক্ষণে ক্ষণে থাকে অতি উত্তেজক কথাবার্তা। কেউ কেউ আবার এমনসব  বাচনভঙ্গি করে যা নারীর বিরুদ্ধে পুরুষকে উস্কে দেয়। যারা এসব করছে, তাদের মধ্যে সূক্ষ্মদর্শী বিশ্লেষণের বড়ই অভাব দেখা যায়; সস্তা জনপ্রিয়তা ও ভোগ তাদের একমাত্র কাম্য। এসব বয়ানে নারীদের যেভাবে হিজাবের ব্যাপারে উচ্চ সতর্ক হতে বলা হয়, সেভাবে পুরুষদের লক্ষ্য করে কখনো তাদেরকে তেমন একটা বলতে দেখি না। তাছাড়া নারীর বেপর্দাকে যেভাবে ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয়, সেভাবে পুরুষের বেপর্দাকে দায়ী করা হয় না। ধর্ষণের ক্ষেত্রে আক্রমণকারী যেহেতু পুরুষ, সেক্ষেত্রে কী করে পুরুষরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কীভাবে নারী ও পুরুষের নৈতিকতার চর্চা করতে হয়, এসব বিষয় নিয়ে তারা খুব একটা ভাবে না, বা এসব বিষয়ে তাদের পর্যাপ্ত জ্ঞানও নেই বলে মনে হয়।

তাছাড়া গ্লোবালাইজেশনের ছোঁয়ায় আধুনিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা কি? উত্তেজনাই যে শিক্ষার প্রথম পাঠ, নৈতিকতা গঠনের পরিমাপক। যেখানে  বহুবিধ সম্পর্ক, পরকীয়া আর ব্যভিচারকে বলতে গেলে সামাজিক বৈধতা দেয়া হয়! হটাৎ এক দিনে তো এসব ঘটছে না বা এমন অবস্থা হয়নি? মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানুষের মানসিক বিকাশ বিষয়ে একটি বৈপ্লবিক তত্ত্ব দিয়েছিলেন, আজকের দুনিয়ার মানুষ সেই তত্ত্ব অনুসরণ করেই চলছে। এ থেকেই এসব; এবং সমাজের এমনটা হয়েছে বলে আমি মনে করি। এই তত্ত্বে মানুষের মানসিক বিকাশকে কাম তথা যৌনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। 

ফ্রয়েডের মতে— মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ সর্বমোট পাঁচটি যৌন স্তরের মধ্যে দিয়ে সম্পূর্ণ হয়। এর যে কোনও একটিতে সমস্যা- বিশেষ করে অতৃপ্তি ঘটে গেলে মানুষের ব্যক্তিত্ব অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। শিশুকাল থেকে যে পাঁচটি মানসিক যৌন স্তরের মধ্য দিয়ে মানুষকে যেতে হয় সেগুলো হচ্ছে— মৌখিক অবস্থা (oral stage), পায়ু অবস্থা (anal stage), শিশ্ন অবস্থা (phallic stage),সুপ্তযৌন অবস্থা (latency stage), এবং উপস্থঃ অবস্থা (genital stage)।

ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের যৌন বাসনাগুলো যদি ভালভাবে পূর্ণ না হয়, তবে মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সেজন্য তিনি মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশের স্তরগুলোকে মনোযৌন বিকাশ নামকরণ করেছিলেন। ফ্রয়েড মনোযৌন বিকাশ তত্ত্ব দ্বারা প্রমাণ করেন যে, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির মতো শিশুদেরও যৌন অনুভূতি থাকে। শৈশবকালে নিজ দেহের যৌন-সংবেদী অঞ্চলগুলির সুখদায়ক অনুভূতি শিশুকে যৌন-তৃপ্তি দেয়। শৈশব যৌনতাকে ফ্রয়েড আত্ম-রতি (Auto-Erotism) বলে অভিহিত করেছিলেন।

বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় আজ আমরা সকলেই কমবেশি ফ্রয়েডীয় চিন্তা-চেতনার দাস হয়ে ধীরে ধীরে অনুগামীও হয়ে পড়েছি। আধুনিক শিক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তির অবাধ প্রসারে ফ্রয়েডীয় ধ্যান-ধারণার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। ফ্রয়েডীয় লিবিডো ধারণাকেই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাচ্ছে পুঁজিবাদী বিশ্বের সকল পুঁজিবাদী মিডিয়া। ফলে সকল মাধ্যমেই কামুকতার চর্চাকে আজ আত্মনিয়ন্ত্রণের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আর তাতে অভ্যস্ত করে তুলছে আমাদের সবাইকে। 

যৌবনের ধর্ম হলো এক অদ্ভুত অবদমন বা মানসিক অস্থিরতা অনুভব। আমারা কি পারছি বা কতটা পেরেছি আমাদের  সমাজে ফ্রয়েডীয় চিন্তার পরিপূর্ণ বিস্তার ঘটাতে? কত পার্সেন্ট বাবা-মা তার সন্তানের সাথে যৌবনের ধর্ম নিয়ে খোলামেলা আলাপ করতে পারে? বা কত পার্সেন্ট পোলাপানই-বা সুযোগ পায় কার্যকরী ফ্র‍য়েডীয় মতবাদ শিখার বা প্র‍য়োগের? তাই তো স্মার্টফোন মিডিয়ায় ডুবে থাকা নগ্নতার নিষিদ্ধ আকর্ষণে না-জানা না-চেনা নেশায় উন্মত্ত  হয়ে অনেকেই ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজে উদ্ভুদ্ধ হয়ে উঠে; তাই তো এর এতো বিস্তার এত প্রসার; যা আজ মহামারী রূপ নিয়েছে। আমি বলি কি— সমস্যাটা আসলে ধর্ষণের মধ্যে নয়, সমস্যাটা সমাজের; অনাঙ্ক্ষিতভাবে ফ্রয়েডীয় কালচারের প্রচার-প্রসার ও অপরিপক্ক অভ্যস্ততার। তাই, গোড়ায় হাত না দিয়ে আগা পরিস্কার করে কোন লাভ হবে না, চিন্তা করতে হবে মূল সমস্যার, নয়তো সমস্যা আরও প্রকট হবে এবং ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।

সময় এসেছে নতুনভাবে চিন্তা করার— নিজেকে পাল্টাবার, তবেই পাল্টাবে সমাজ; পাল্টাবে দেশ ও জাতি। তখন আর এদেশে কোন নারী ধর্ষিত হবে না, ধর্ষকের জন্য নতুন আইনও পাশ করতে হবে না।। 

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
১২ অক্টোবর, ২০২০.

শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২০

প্রোপাগাণ্ডার পরিসমাপ্তি কবে হবে?

মুক্তিযুদ্ধ ও তদপরবর্তী সময়, বিশেষ করে ৭৪/৭৫ নিয়ে এদেশের তরুণ প্রজন্মের একাংশের মাঝে এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণার জন্ম হয়েছে, যা করা হয়েছে অত্যন্ত কূটকৌশলে;  যা পড়ে জেনে আজকের তরুণতরুণীর অনেকে এরই মাঝে বিভ্রান্তির অতলে তলিয়ে গেছে। তাদের মনে এমনসব ভ্রান্ত ধারণা জন্ম নেয়ার পিছনের বহুবিদ কারণের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে - গুগোল সার্চে ঐ সময়কার সঠিক তথ্য সম্বলিত সামাজিক চিত্র বা ইতিহাস তুলে ধরে লেখালেখি তারা খুব কমই পেয়েছে, পায়; বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের পক্ষের লেখার চেয়ে বিরুদ্ধে লেখা  তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি পাওয়া যায়, পাচ্ছে এবং দেখেছে, পড়ছে। তারা যা বা যতোটুকোই লেখা পাচ্ছে বা দেখেছে তার প্রায় সবটাই ৭৫ পরবর্তীতে তৈরি করা স্বাধীনতাবিরোধীদের লেখা, তাদের হাতে গড়া এক ধরনের মিথ্যার পাণ্ডুলিপি; অথবা তৎকালীন সময়ে তৈরী করা এক ধরনের নেতিবাচক প্রচার-প্রচারণা, যা ছিল বেশিরভাগই প্রোপাগাণ্ডা। 

আজকের তরুণতরুণীরা অনেকটাই অনলাইন নির্ভর। তারা যা বা যতটুকো পড়ে তার সবটাই অনলাইনে পড়তে চায় জানতে চায়; পবিত্র কোর'আন পড়লেও তারা তা অনলাইনে পড়ে! গল্প ইতিহাস উপন্যাস কবিতা সাহিত্য সব সবকিছুই তারা অনলাইন থেকে পড়তে চায় জানতে চায়; এক কথায় দিনদিন তারা অনেকটাই অনলাইনের উপর নির্ভরশীল ও বিশ্বাসী হয়ে পড়ছে। তাই অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মিথ্যা ইতিহাস পড়ে পড়ে তা-ই তারা ধারণ করছে। অনেক চিন্তা করে আমি আবিষ্কার করেছি সেই সব মিথ্যা অপপ্রচার এখন অনেকেই বিশ্বাস করছে এবং তা নিয়ে মেতেও আছে। 

একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের যেসব ঘটনা অনলাইন জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার সবটাই প্রায় এক ধরণের মিথ্যা অপপ্রচার। ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ ও পূর্ববর্তী সময়গুলোকে তারা বলতে চায় বঙ্গবন্ধুর কুশাসনের ফসল। বলার কারণ, ওইসব একচেটিয়া একমুখী লেখালেখি। কখনো ওরা এর পিছনের গভীর ষড়যন্ত্রের কথা চিন্তাও করেনি; যা স্বাধীনতার পর থেকেই করা হয়েছে এবং চলে আসছে। অনেক খুঁজে আমি একটি জিনিস আবিষ্কার করেছি— এইসব লেখালেখি হয়তো স্বাধীনতাবিরোধীদের কারো না কারো, নয়তো তাদের পয়সায় বিক্রি হওয়া কোন বুদ্ধিব্যবসায়ীর মনগড়া সব পাণ্ডুলিপি। অনলাইনে এখনো মুক্তিযুদ্ধের অনেক নেতিবাচক বানানো গল্প বসে আছে বা ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। এইসব পড়ে পড়ে তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ প্রতিনিয়ত নতুনভাবে বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হচ্ছে এবং সেই সব বিভ্রান্তিতেই মেতে আছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বেকার প্রজন্ম আমরা যারা কালের স্বাক্ষী হয়ে আজও বেঁচে আছি নিশ্চয় এসব দেখে আমাদের কষ্ট হয়, কিন্তু কিছুই করার নেই; এই সব দেখারও যেন কেউ নেই। 

হে আজকের তরুণ প্রজন্ম, তোমরা একটু ভাল করে ভেবে দেখো দেশ শাসন করার মতো কতোটা সময় পেয়েছিলেন জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান? দেশ গঠন করা বা গড়ার মতো কতটুকো সময় তিনি পেয়েছিলেন? যুদ্ধবিধ্যস্ত একটা দেশ ও জাতি ৩/৪ বছরে পুনর্গঠিত করা যায় কি করে বা তা কি করে সম্ভব? সময়ের আগেই তো বপন করা হয়ে গিয়েছিল গভীর এক ষড়যন্ত্রের বীজ, শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র। তারা খুব ভাল করেই জানতো বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে না পারলে তারা কোনদিনও এদেশে সুবিধা করতে পারবে না; তাই তিনিই তাদের প্রথম টার্গেট হন। যুদ্ধাপরাধীর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা শোনার পর দেশবিদেশে লুকিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে এবং কিছু অতিলোভী মুক্তিযুদ্ধাকেও তাদের দলভুক্ত করে নেয়। ১৫ আগস্ট ৭৫ তারা ষোলকলা পূর্ণ করে জাতিরজনককে হত্যার মাধ্যমে। 

এই তো, মনে হয় যেন সেই দিন; কত কঠিনই-না ছিল আমাদের সেই পথচলা। বিশেষ করে ৭০ এর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর পরবর্তী দিনগুলো। মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়গুলোকে বিতর্কিত করার দূরঅভিসন্ধি নিয়ে আজ যারা এর পিছনে কলকাঠি নাড়ছে তারাই সেইদিন গোপনে অথবা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল। আজ যেমন যুদ্ধাপরাধীর বিচার সময়ের দাবী, সেদিন স্বাধীনতাও ছিল সময়ের দাবী। 

১২ নভেম্বর ১৯৭০, উপকূলীয় এলাকায় ঘটে গিয়েছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং প্রলয়ঙ্করী এক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস; সমগ্র উপকূলবাসীর জন্য সেই দিনটি ছিল এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের দিন। দীর্ঘ ৪৫ বছর কেটে গেলেও স্বজনহারা মানুষ সেদিনের কথা আজও ভুলতে পারেনি। সেদিন পূর্ব পাকিস্থানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড হয়ে শুধু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসটি ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে গিয়েছিল, প্রায় সমগ্র দেশটাকে তচনচ করে ফেলেছিল। 

যতটুকো মনে পরে সেই দিনটি ছিল রোজার দিন। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিসহ সারাদিন সারাদেশে টানা বাতাস বইছিল। রাতে উপকূলের উপর দিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটারের উপর বেগে বয়ে যায় এক প্রচণ্ড শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস; শুধু রেখে যায় রাশিরাশি ধ্বংসযজ্ঞ। বহু মানুষ সেদিন তাদের প্রিয়জনের লাশও খুঁজে পায়নি। জলোচ্ছ্বাসের পর থেকে দেড় মাস পর্যন্ত স্বজনহারাদের কান্নায় উপকূলের আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে গিয়েছিল। গত ৪ দশকে পৃথিবীর এই অঞ্চলে যতক'টি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে তার সবক'টির চেয়ে ওই ঝড়টি ছিল সবচেয়ে বেশি হিংস্র ও মারাত্মক। 

৭০-এর 'হারিকেন'রূপী ওই ঝড়টি উপকূলীয় ভোলা, বরিশাল, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনাসহ দেশের প্রায় ১৮টি জেলাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি আজকের মতো এতোটা শক্তিশালী ছিল না, অনেকটা দুর্বল থাকায় উপকূলের অনেক মানুষই ঝড়ের পূর্বাভাস জানতে পারেনি শুনতে পায়নি। তাই হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল কল্পনাতীত। ঘূর্ণিঝড়ে জলোচ্ছ্বাস ছিল ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট। কেউ-বা গাছের ডালে কেউ-বা উঁচু ছাদে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে প্রাণে রক্ষা পেলেও ৩/৪ দিন তাদের অভুক্তই কাটাতে হয়েছিল।  

পরবর্তীতে জানা যায় ১২ নভেম্বর রাতের সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২২ কিলোমিটার বা ১৩৮ মাইল। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ, বাতাসে মানুষপঁচা গন্ধ। ৩ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হওয়াতে মৃতদেহগুলো দাফন করাও সম্ভব ছিল না। আর করবেই-বা কে? সে সময় দুর্গত অঞ্চলে পৌঁছানো এতো সহজ ছিল না। তদানীন্তন পাকিস্থান সরকার নুন্যতম খোঁজখবরটুকো পর্যন্ত নেয়নি। সেদিনের ঝড়ে কত মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল তার সঠিক হিসাব অদ্যাবধি জানা না গেলেও উপকূলীয় অঞ্চলের ৮৭% ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং তিন চার মাস পরেও ৫২.৪% মানুষ গৃহহীন অবস্থায় জীবন যাপন করেছিল। ধারণা করা হয় সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে লাখ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটেছিল। ঘটনার দুই দিন পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কর্তাব্যক্তিরা দুর্গত অঞ্চলের খোঁজ-খবর নিতে শুরু করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে কেন যেন তাও বন্ধ হয়ে যায় বা করে দেয়। বিদেশী সংবাদ কর্মীদেরও তখন দুর্গত অঞ্চল পরিদর্শনে যেতে দেয়া হয়নি, বরং তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। 

জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাসানীসহ তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের এ অঞ্চলের অনেকে অনেক কষ্ট করে তৎক্ষণাৎ উপদ্রুত এলাকায় দুর্গত মানুষের পাশে ছুটে গিয়েছিলেন, সার্বিক অবস্থা দেখে সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে শুধু কেঁদেছিলেন। সেদিন বঙ্গবন্ধু ও ভাসানী যে যার মতো করে সবাইকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ডাক দিয়েছিলেন। সেই সময়ের পাকিস্তানের শাসক ইয়াহিয়া খান একটি বারের জন্যও বাংলার স্বজনহারা মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়নি, এমনকি নুন্যতম খোঁজখবরটুকো পর্যন্ত নেননি। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ সেই ধ্বংসযজ্ঞের পূর্ণাঙ্গ দলিল অদ্যাবধি সুস্পষ্টভাবে কোথাও লিখা হয়নি বা প্রকাশিত হয়নি। 

৭০-এর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের রেষের মাঝেই শুরু হয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। অনেকে বলে বঙ্গবন্ধু সেদিন স্বাধীনতা চান নি, চেয়েছিলেন স্বায়ত্তশাসন। মিথ্যা কথা, ভুল ধারণা; সেদিন  পূর্বাঞ্চলের প্রতিটা মানুষের হৃদয়ের দাবী ও কামনা ছিল স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের নেতা ছিলেন, তিনি প্রতিটি মানুষের পার্লস খুব ভাল করেই বুঝতেন। পরিবেশ পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতা আমাদের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। যুদ্ধের ইতিহাস সবারই কমবেশি জানা থাকলেও, এর নিকট অতীত ও নিকট ভবিষ্যৎ অনেকের কাছে আজও অজানা; আর সেই সুযোগটাই গ্রহণ করেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা। নিজেদের ইচ্ছেমত লিখে তা তারা অনলাইনে ছেড়ে দিয়েছে এবং প্রজন্ম পরম্পরায় মিস গাইড করেছে করছে। 
দেশজুড়ে যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা বিরাজ করছিল তারই মাঝে যুদ্ধ শুরু হয়। নয় মাসের সেই ভয়াবহ সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সঠিক অনেক ইতিহাস ও পূর্ণাঙ্গ দলিল থাকলেও পরবর্তী সময় নিয়ে এদেশে একটা ঘোলাটে অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছিল, আর এর পিছনে যাদের হাত ছিল তারা হলো মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি। যারা পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছে স্বাধীনতার আগে ও পরে এবং এখনও করেই যাচ্ছে! 

নয় মাসের দুঃস্বপ্ন বিভীষিকাময় যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলো, পৃথিবীর মানচিত্রে  নতুন একটি দেশ স্থান পেলো, যার নাম— 'বাংলাদেশ'। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্যস্ততা; দুইয়ে মিলে অভাব অভিযোগের অন্ত ছিল না। চতুর্দিকে শুধু হাহাকার আর হাহাকার, অভাব আর অভাব, অভিযোগ আর অভিযোগ। চুরিডাকাতি লেগেই থাকতো। এরই মাঝে শুরু হলো দেশ পুনর্ঘটনের কাজ। অনেককেই আজ অনেক বড় বড় কথা বলতে শুনি; কিন্তু সেদিনের সেই সময়টা ছিল 'এক নেতার এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ'। বঙ্গবন্ধু সেদিন যা'ই বলতেন তা'ই সবায় মেনে নিত। বয়স কম হলেও সেদিন কেন যেন আমার বেশ  খটকা লেগেছিল, মনে হয়েছিল বঙ্গবন্ধু মারাত্মক একটা ভুল কাজ করেছেন— যুদ্ধাপরাধীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে; যদিও সেই সাধারণ ক্ষমা সকল যুদ্ধাপরাধীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। তথাপি আমার কাছে আজও মনে হয় সেদিনের সেই ঘোষণার জন্যই স্বাধীনতাবিরোধীরা এতোটা সাহস পেয়েছিল এবং সংঘবদ্ধ হয়ে পুনরায় ষড়যন্ত্র করতে পেড়েছিল। সেদিন যদি রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু সকল রাজাকার, আল-সামস, আল-বদরকে হত্যার নির্দেশ দিতেন তবে হয়তো এদেশে আর কোন দিনও তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতো না, দেশেও দ্বিবিভক্তির সৃষ্টি করতে পারতো না। 

আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দের বিষয় এটাই যে আমি নিজ চোখে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকর হতে দেখে যেতে পাড়লাম। মাননীয়া বঙ্গবন্ধু কন্যার এই দৃঢ়প্রত্যয় এ অসীম সাহসিকতার জন্য তাঁকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি ও চিরকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তিনি যুদ্ধাপরাধীর সেইদিনের ঝুলে থাকা বিচারের রায় আজ এতো বছর পর সম্পন্ন করে এক বিরল নজীর সৃষ্টি করে গেলেন। আমি নিশ্চিত— আগামী প্রজন্মের কাছে তিনি ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকবেন। আমি আরোও নিশ্চিত করে বলতে পারি সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হলে, তাদের সাজা কার্যকর হলে একটা সময় এদেশের মানুষ কিছুটা হলেও শান্তিতে থাকতে পারবে; নয়তো প্রজন্ম পরম্পরায় এর খেসারত গুনতেই হবে। 

৭৪ বলতে শুধুই অভাব আর হাহাকার যারা বুঝে তারা একবারও ভেবে দেখে না সে সময়ের প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি। সেই বছর ও তার আগের বছরের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়াবহ বন্যা ও খরা দেশটাকে সম্পূর্ণভাবে উলটপালট করে দিয়েছিল। বন্যার পর খরায় সেই বছর ক্ষেতে মোটেও ফসল ফলেনি, ঘরে ভাত ছিল না। তাই সেই সময় কবিরা কবিতায় লেখতো - 'ভাত দে হারামজাদা, নয়তো মানচিত্র খাবো'। দূর্ভিক্ষে চতুর্দিকে মানুষ মরছে; খড়ের অভাবে গোয়ালে গরু মরে পরে আছে, ঘাসের অভাবে ছাগল-ভেড়া; মাঠেঘাটে পরে থাকতো মরা গরু ছাগল ভেড়ার পাল, শকুন সে'সব নিয়ে টানাটানি করতো। 

না! এতো অভাব অভিযোগের পরও বঙ্গবন্ধুর সময়োচিত পদক্ষেপে তা মনন্তরে রূপ নিতে পারেনি। সেইদিনের সেই অভাবের জন্য একপক্ষ একচেটিয়া শাসনব্যবস্থাকে দায়ী করে আসছে; আমি কিন্তু তা মোটেও মনে করি না। আমার মতে সেই দূর্ভিক্ষটা হয়েছিল কিছুটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ও বাকীটা তৈরি করা হয়েছিল বা অনেকটা জন্ম দেওয়া হয়েছিলো ষড়যন্ত্র করে। 

কি করে? 

যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্যস্বাধীন একটা দেশে অভাব অভিযোগ থাকাটা খুবই সাধারণ ও স্বাভাবিক ব্যাপার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি জাপানীরাও খাদ্যের অভাবে লতা-পাতা মরাপঁচা সাপ-ব্যাঙ সব কিছু খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছে, জীবন রক্ষা করেছিল। আর আমরা কি করেছি? একদিকে যুদ্ধবিধস্ত দেশ তার উপর প্রতি বছর লেগে থাকা বন্যা ও খরায় একমাত্র উপার্জনক্ষম পণ্য পাটের উৎপাদন কমে যায়। তাই সোনালি আঁশ পাট রপ্তানিও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে জাসদ ও সর্বহারারা একের পর এক পাটের গুদামের পর গুদামে আগুন দিয়ে যায়! একদিকে বন্যা খরা অন্যদিকে পাট রপ্তানি থেমে যাওয়া। তাই সেদিন বঙ্গবন্ধু হাত পাততে বাধ্য হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিরোধীতা করা পরাশক্তি আমেরিকার কাছেও। খয়রাতি পিএল-৪৮০ কার্যক্রমের আওতায় দুইটি আমেরিকান জাহাজ খাদ্যশস্য বোঝাই করে ওয়াশিংটন থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনাও দিয়েছিল, তৈরি ছিল আরো দুইটি জাহাজ। এর মাঝেই ঢাকার মার্কিন দুতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে খবর গেলো, বাংলাদেশ কিউবার সঙ্গে পাটবিক্রির চুক্তি করেছে, দুইটি জাহাজে পাট বোঝাই করা হয়েছে। তথ্যটা একজন সচিব নিশ্চিত করেছিল। তিনি স্বশরীরে গিয়ে জাহাজের নাম ও পাটের পরিমাণসহ সমগ্র তথ্য মার্কিন দূতাবাসে জানিয়ে এসেছিলেন। 

যা হওয়ার তাই হলো, মাঝসাগরে ফেলে দেওয়া হলো বাংলাদেশের জন্য আনা দুই জাহাজ খাদ্যশস্য, বাকি দুই জাহাজ রওনা দিলো অন্য দিকে করাচির উদ্দেশ্যে। সেই যাত্রা বাংলাদেশ কিছুটা হলেও রক্ষা পেয়েছিলো শুধুমাত্র রাশিয়া ও ভারতের তড়িৎ সাহায্যের জন্য। কিন্তু ততদিনে দেশে প্রচুর মানুষের প্রাণ চলে গেছে, মরে গেছে অনেকে। তাদের নিয়ে শুরু হয়েছিল আবার নতুন এক ষড়যন্ত্র  রাজনীতির। ১৯৭১ সালে কনসার্ট ফর বাংলাদেশের পোস্টার থেকে ছবি নিয়ে সেটা চালানো হয়েছিল দূর্ভিক্ষের ছবি বলে। ওটা ধরিয়ে দেওয়ার পর এলো জাল পড়া বাসন্তী! বোবা বাসন্তীকে জাল পড়িয়ে ইত্তেফাকের আফতাব আহমেদ নতুন ছবি বানালো, সেই কুখ্যাত ছবিও একই ষড়যন্ত্র 'ষড়যন্ত্র-৭৪' এর অংশ ছিল; ছবি সুপারহিট! 'বাসন্তী' দেশবিদেশে ঝড় তুললো!

আফতাব আহমেদ এর মতো এমন কুলাঙ্গার আরো অনেক ছিল, যারা স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে গড়া নতুন নতুন কাহিনীর পরিচালক, যারা একের পর এক মিথ্যা কল্পকাহিনীর জন্ম দিতো; যা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলকে বিতর্কিত করা যায়। এ'সবের সবই ছিল মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল। 

অবশ্য পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত আমেরিকার কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশান এর ত্রৈমাসিক পত্রিকা 'ফরেন এ্যাফেরার্স' এর এক গবেষণামূলক নিবন্ধ থেকে সবই স্পষ্ট হয়ে যায়। সেখানে তারা বলেছিল— ৭৪ এর দুর্ভিক্ষের কারণগুলো আসলে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের আয়ত্তাধীন ছিল না। ওই নিবন্ধে এমা রথসচাইল্ড বিচিত্র সব আমেরিকান সরকারের দলিলপত্র দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন এবং স্পষ্ট বলেছিলেন— ৭৪ এর দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের প্রায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্যে দায়ী ছিল প্রকৃতপক্ষে মার্কিন সরকার। 

জিয়া, এরশাদ, খালেদাজিয়া ও জামাত প্রায় একই সুরে একই কায়দায় মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় নিয়ে এবং বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়ে বারংবার যতসব মিথ্যা কথা আওড়িয়ে গেছেন, অপপ্রচার চালিয়ে গেছেন এবং আজও যাচ্ছেন; যার পুরোটাই সম্পূর্ণভাবে অপপ্রচার এবং শুধুমাত্র একটা রাজনৈতিক অপকৌশল। ওইসব মিথ্যা অপপ্রচার শুনে শুনে আজ এদেশে একটা শ্রেণীই তৈরি হয়ে গেছে যারা প্রকৃত সত্যের ধারেকাছেও ঘেষতে চায় না, যায় না সত্য ইতিহাসের ধারেকাছেও। তারা সবায় মিথ্যাকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছে এবং তাই অন্তরে ধারণ করছে!

দেখতে দেখতে অনেক দিন অনেক বছর চলে গেল, দ্বিবিভক্ত এই জাতি এক কদম আগায় তো দুই কদম পিছায়। আর এ'সবের পিছনের কারণ সেই একই অপশক্তি স্বাধীনতাবিরোধী। আর কত? চোর সবসময়ই ছোটমনা থাকে, প্রকাশ্যে আসতে পারে না; আমরা ঐক্যবদ্ধ হলে তারা পিছু হটবেই। সময় এসেছে সত্য জানার, শুধরাবার এবং নিজ দেশটাকে ভালোবাসবার। 

৪৪তম বিজয় দিবসের ঊষালগ্নে আসুন আমরা সবায় মিলে শপথ করি, রাজাকার মুক্ত সুন্দর বাংলাদেশ গড়ি।। 

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
১৬ - ১২ - ২০১৫.

বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২০

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স:

স্যার, এই করোনায় চাকরিজীবী যেগুলি শয়তান.....তারা তো দেশের উন্নয়নের টাকা আত্মসাৎ করে করে কোটিপতি হয়ে গেলো.....মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটুখানি ঝাঁকি দিলেই লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বের হয়ে আসতো....যা দিয়ে বাংলাদেশ ১০০ বছর এগিয়ে যেতো.....যত করোনা তত আত্মসাৎ.... কিছু অজাতের হাতে অফিস আদালত জিম্মি হয়ে যাচ্ছে......যে কর্মকর্তা/কর্মচারী, তারাই আবার ঠিকাদার.....একই স্কুলের বেঞ্চের বিল কতবার যে উত্তোলন  হচ্ছে...... আমার চোখ কামড়ায়...... কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারিনা.....

কোন রাখঢাক না করে সরকারি অফিসে  চাকুরী করা আমার এক বোনের কিছু অসমাপ্ত কথা দিয়েই আজ লিখার সূচনা করলাম। নিশ্চয় এতটুকুতেই পুরো  বাংলাদেশের অফিস-আদালতের দুর্নীতির সার্বিক চিত্র সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।  শুধুই কি অফিস-আদালতে দুর্নীতি হয়? দুর্নীতি এখন কোথায় নেই, কোথায় হচ্ছে না? আমার তো মনে হয় আমাদের অস্থিমজ্জা সব সবকিছুই এখন দূর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। মাছওয়ালা মাছে ভেজাল করে মাছ বেচে শাক কিনে, শাকওয়ালা তার শাকে ভেজাল করে শাক বেচে চাল কেনে, চালওয়ালা চালে ভেজাল করে চাল বিক্রি করে ঔষধ কেনে, ঔষধওয়ালা ঔষধে ভেজাল করে ঔষধ বেচে জামা কিনে, জামাওয়ালা জামায় ভেজাল করে......... আসলে কে কাকে ঠকাচ্ছি আমরা? দিন শেষে সবাই ঠকছি! দুর্নীতি করছি সবাই, সবাই আমরা দুর্নীতিবাজ!  

দার্শনিক ধর্মতাত্ত্বিক নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোন আদর্শের নৈতিক বা আধ্যাত্মিক অসাধুতা বা বিচ্যুতি বা ব্যত্যয় মানেই দুর্নীতি। বৃহৎ পরিসরে বলতে গেলে বলতে হয়— ঘুষ প্রদান, সম্পত্তির আত্মসাৎ এবং সরকারি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার নাম দুর্নীতি। দুর্নীতি শব্দটি যখন বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন সাংস্কৃতিক অর্থে  'সমূলে বিনষ্ট হওয়াকে' নির্দেশ করে। এই শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪ –৩২২), তাঁর পরে মার্কাস টুলিয়াস সিসারো (খ্রীস্টপূর্ব ১০৬— ৪৩); সিসারো এর সাথে নীতিহীন আদানপ্রদান অর্থাৎ  ঘুষ এবং সৎ অভ্যাস ত্যাগ প্রত্যয়ের যোগ করেছিলেন। রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক মরিস  লিখেছেন, দুর্নীতি হলো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য  অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার। 

অর্থনীতিবিদ আই. সিনিয়র একে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছেন— দুর্নীতি এমন একটি কাজ যেখানে (১) গোপনে প্রদানের কারণে, (২) তৃতীয় কোনো পক্ষ সুবিধা পায়, (৩) যার ফলে তারা বিশেষ ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করে, যা (৪) দুর্নীতির সাথে যুক্ত পক্ষটি এবং তৃতীয় পক্ষ উভয়ই লাভবান হয়, (৫) এবং এই কাজে দুর্নীতিগ্রস্ত পক্ষটি থাকে কর্তৃপক্ষ। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কাফম্যান দুর্নীতির ধারণাটিকে আরো বিস্তৃত করেন 'আইনানুগ দুর্নীতি' শব্দদ্বয় যোগ করার মাধ্যমে যেখানে আইনকে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করা হয়, যাতে নিজেদের রক্ষা করার জন্য আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনের ক্ষমতা আইন প্রণেতার নিকট রক্ষিত থাকে।

ট্রান্সপারেন্সির এক জরিপে দেখা যায় যে, দুর্নীতিতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এ হিসাব করা হয় ১০০ পয়েন্ট এর ভিত্তিতে। যে দেশ যত দুর্নীতি মুক্ত সে দেশের তত পয়েন্ট। হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে, এদিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে সোমালিয়া; এ দেশের পয়েন্ট ১০০-তে মাত্র ১০। এরপর কয়েকটি দেশের পরে আছে সিরিয়া; এর পয়েন্ট মাত্র ১৩। এরপর ১৪ পয়েন্ট নিয়ে অবস্থান করছে লিবিয়া, সুদান ও ইয়েমেন; এরপর ইরাকের আছে ১৭, লেবাননের আছে ২৮। 

প্রথম আলোর তথ্যমতে, আরব বিশ্বের নয়টি দেশ ও ভূখণ্ডে (ফিলিস্তিন) গত বছর দুর্নীতির পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে মনে করে সেখানকার সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে গভীর সংকটে পড়া লেবানন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের  অবস্থা আরও বেশি খারাপ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতে, প্রায় ১১ হাজার অংশগ্রহণকারীর মতামতের ভিত্তিতে পাওয়া জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে যে, এ অঞ্চলের দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া অন্য দেশ ও ভূখণ্ড হলো আলজেরিয়া, মিসর, জর্ডান,  মরক্কো, ফিলিস্তিন, সুদান ও তিউনিসিয়া। অংশগ্রহণকারীদের ৬১ শতাংশ এসব দেশে গত বছর দুর্নীতি বেড়ে গেছে বলে তাদের ধারণা ব্যক্ত করেছেন। 

টিআই বলছে, 'আরব বসন্ত শুরুর পর প্রায় অর্ধদশক পেরিয়ে গেলেও বিশ্বব্যাপী আমাদের দুর্নীতির পরিমাপকে দেখা গেছে, সরকারি খাতের দুর্নীতি কমাতে বিভিন্ন সরকারের প্রচেষ্টা নিয়ে এখনো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে।' দুর্নীতিবিরোধী এ সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, আরব দেশগুলোর অধিকাংশ নাগরিক মনে করেন, সম্প্রতি এসব দেশে দুর্নীতি বেড়েছে। আবার অনেকে মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তা ও পার্লামেন্ট সদস্যরা ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে লেবাননের ৯২ শতাংশ, ইয়েমেনের ৮৪ শতাংশ, জর্ডানের ৭৫ শতাংশ মনে করছেন দেশগুলোতে দুর্নীতি বেড়েছে। 

বিপরীতে মিসরের ২৮ শতাংশ ও আলজেরিয়ার ২৬ শতাংশ মনে করেন তাঁদের দেশে দুর্নীতি বেড়েছে। জরিপে যাঁদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ ইয়েমেনি ও প্রায় অর্ধেক মিসরীয় বলেন, সরকারি সেবা পেতে তাঁদের ঘুষ দিতে হয়েছে। একই কথা বলেন তিউনিসিয়ার ৯ শতাংশ ও জর্ডানের ৪ শতাংশ সাক্ষাৎকার প্রদানকারী। জরিপ প্রতিবেদনের রচয়িতা কোরালাই প্রিং বলেন, তাঁরা লেবাননের দুর্নীতি পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ উদ্বিগ্ন। গভীর রাজনৈতিক বিভক্তির মধ্যে দেশটি ২০১৪ সালের মে থেকে কোনো প্রেসিডেন্ট ছাড়াই চলছে। কোরালাই আরও বলেন, বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে জনগণ যে শুধু দুর্নীতি রোধে সরকারি প্রচেষ্টাতেই তাঁদের প্রচণ্ড অসন্তোষ জানিয়েছেন তা-ই নয়, বরং সরকারি খাতজুড়ে দুর্নীতির উচ্চহারেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আমাদের দেশের কি অবস্থা? 

তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সচিবালয়ে গিয়ে প্রথমদিনই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন 'দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স'। মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে তিনি বেশকিছু নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সুশাসন খুবই জরুরি। সাথে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন কর্মকর্তাদের; এবং বলেছিলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, ফলে এখন আর দুর্নীতির প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবতায় ঘটেছে কি?

অবশ্য দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতিতে কঠোর অবস্থানে দেখা গেছে এক মাত্র এবং একজন মাত্র ব্যক্তিকে, আর তিনি হলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। দেরিতে  হলেও তাঁর নির্দেশনায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সর্বাত্মক অভিযান। আশার বিষয় হলো আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যত প্রভাবশালী আর ক্ষমতাসীনই হউক বা সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দলের যত ঘনিষ্ঠজনই হউন না কেন, ছাড় পাচ্ছে না কোনো অপরাধীই। হয়তো কারও ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নিতেও নারাজ সরকার। সরকারের এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সুশীল সমাজসহ সর্বমহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে হচ্ছে। আমরা আশান্বিত। 

সাম্প্রতিককালের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা-বিবৃতিগুলোতে আবারও সেই অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ গত ৯ জুলাই জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দুর্নীতিবাজ যে-ই হোক ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। কে কোন দলের তা বড় কথা নয়, দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িতদের আমরা ধরে যাচ্ছি, ধরে যাব।' এর আগের দিন সংসদে আরেক বক্তৃতায় করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে প্রতারণায় যুক্ত রিজেন্ট হাসপাতাল ও এর চেয়ারম্যান মো. সাহেদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ওই হাসপাতালের এই তথ্য আগে কেউ দেয়নি, জানাতে পারেনি। সরকারের পক্ষ থেকেই খুঁজে বের করেছি, ব্যবস্থা নিয়েছি।' 

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, করোনা সংকট শুরুর পর থেকে বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস মোকাবিলার পাশাপাশি কঠোরহস্তে তিনি অনিয়ম-দুর্নীতি দমনে জোর দিয়েছেন। তার নির্দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আগে থেকেই চলে আসা অভিযান নতুন মাত্রা পেল বলে মনে হচ্ছে। এরই মধ্যে মানব পাচারে অভিযুক্ত স্বতন্ত্র এমপি শহীদ ইসলাম পাপুলের কুয়েতে গ্রেপ্তার হওয়াসহ দেশের কয়েকটি স্থানে ত্রাণ বিতরণ নিয়ে দলের কয়েকজন নেতা ও জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

গত রোববার দুর্নীতির ফাইলের খোঁজে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই দিন দুর্নীতির অভিযোগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) তিন কর্মকর্তাকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অন্যদিকে অনুমতি ছাড়া করোনা ও অ্যান্টিবডি পরীক্ষার অভিযোগে গতকালই রাজধানীর সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির দুই কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। 

করোনাকালে এখন পর্যন্ত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত দুটি ঘটনা হচ্ছে করোনার সনদ জালিয়াতিসহ নানা প্রতারণায় জড়িত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম এবং জেকেজির প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরী ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা। সাহেদের বিরুদ্ধে করোনা পরীক্ষা ছাড়াই ছয় হাজার এবং আরিফ-সাবরিনা দম্পতির বিরুদ্ধে ১৫ হাজার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ ছিল। এ দুই প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে করোনা পরীক্ষার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেই এমন প্রতারণা চালিয়ে আসছিল। 

অভিযানকালে শুধু সাহেদ ও আরিফ-সাবরিনাই নন, তাদের অনেক সহযোগী গ্রেপ্তার হয়েছেন। বন্ধ হয়েছে অনিয়মে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের বিরুদ্ধে বেশকিছু মামলা করার পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব জব্দ ও অন্যান্য আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রতারক সাহেদ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য পরিচয় দিয়ে সরকার ও দলের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিল। মন্ত্রী ও নেতানেত্রীদের সঙ্গে ছবি তুলে অপব্যহারের মাধ্যমে প্রতারণার জাল বিস্তার করে আসছিল। 

অবৈধভাবে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক বনে যায় এই মহাপ্রতারক সাহেদ। আশাজাগানিয়া বিষয়টি হলো দলীয় পরিচিতি কিংবা এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে 'ঘনিষ্ঠতা'- কোনো কিছুতেই তার শেষরক্ষা হয়নি। সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ৯ দিন আত্মগোপনে থাকার পর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে সাতক্ষীরা সীমান্তে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। ঠিক তার মতোই নানা অসাধু উপায়ে অবৈধভাবে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছিল সাবরিনা-আরিফও; পরিশেষে তাদেরও শেষরক্ষা হয়নি।

এদিকে, করোনা পরীক্ষা, পিপিই ও কিট সরবরাহ নিয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া স্বাস্থ্য খাতের কয়েকজন হর্তাকর্তার বিরুদ্ধেও নানা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। করোনাকালে ত্রাণ তৎপরতায় যেসব জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাদেরও তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করে কঠোর বার্তা দিয়েছে সরকার। অনেকে গ্রেপ্তারও হয়েছে। এসব জনপ্রতিনিধির বেশিরভাগ ছিলেন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত।সংসদ সদস্য শহীদ ইসলাম পাপুলও মানব পাচারে অভিযুক্ত হয়ে কুয়েতে গ্রেপ্তারের ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। 

পাপুল ও তার স্ত্রী সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলামের অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অনুসন্ধান, ব্যাংক হিসাব এবং স্ত্রী-শ্যালিকাসহ অনেকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ওদের ব্যাপারে মাননীয়  প্রধানমন্ত্রী  নিজেই সংসদে বলেছেন, 'ওই সংসদ সদস্য (পাপলু) কুয়েতের নাগরিক কিনা, তা নিয়ে কুয়েতের সঙ্গে কথা বলছি। বিষয়টি দেখব। যদি এটা হয়, তাহলে তার ওই আসনটি (লক্ষ্মীপুর-২) খালি করে দিতে হবে। যেটা আইন আছে, সেটাই হবে। আর তার বিরুদ্ধে এখানেও তদন্ত চলছে।'

পাপুল-সাহেদ-সাবরিনা ছাড়াও অনিয়ম-দুর্নীতিতে যুক্ত আরও অনেকের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে হচ্ছে। তদবির-বাণিজ্যে যুক্ত হয়ে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক বনে যাওয়া পাপিয়া নামের এক যুব মহিলা লীগ নেত্রীকে গ্রেপ্তার ও জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে এমন কঠোর অবস্থানে আগে থেকেই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং মনে হচ্ছে একাই তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন; দেশের  বাকী আমরা সবায় তামাশা দেখছি। সারা বিশ্ব যখন করোনা নিয়ে উদ্বিগ্ন আর আমরা তখন উদ্বিগ্ন দুর্নীতি নামক বিষফোঁড়া নিয়ে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে, তা রোখা কি একা একজনের পক্ষে সম্ভব?  

দুর্নীতির বিষবৃক্ষটি এতটাই  মহিরুহ আকার ধারণ করেছে, যা বলা বাহুল্য।  এর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে, সমগ্র জাতির সমস্ত প্রক্রিয়ায়। দুর্নীতির ব্যাপকতা কতটা বেড়েছে তা করোনাকালে আমরা কিছুটা হলেও টের পেয়েছি, প্রকাশ হয়েছে বলে। বিশেষ করে  আমাদের স্বাস্থ্য খাত যে কতটা ভঙ্গুর এবং দুর্নীতিগ্রস্ত, তা স্পষ্ট হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। গত বছর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির ১১টি খাত চিহ্নিত করেছিল; যন্ত্রপাতি কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলিসহ আরও বিভিন্নভাবে এ মন্ত্রণালয়ে যেসব দুর্নীতি হয়ে থাকে সেসবের; কিন্তু তদন্ত  কার্যক্রম কেন থেমে ছিল? বুঝে আসে না। 

এদেশে অনেকেই জিরো টলারেন্স জিরো টলারেন্স বলে চিল্লায়, এই 'জিরো টলারেন্স' কি শুধুই কথার কথা? এর আগে আমরা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা শুনেছি, এখন যুক্ত হয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। সেই ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, মন্ত্রী-সচিবেরা সৎ হলে ৫০ শতাংশ দুর্নীতি কমে যাবে, কিন্তু এখন তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক এবং দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি  মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী; দিনশেষে তিনি কতটা কি করেছেন বা করতে পারলেন?! 

প্রধানমন্ত্রী হয়েই মাননীয় শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে দুর্নীতিগ্রস্তদের শোধরানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন; মনে করেছিলাম শুভসূচনা। দুর্নীতি উচ্ছেদের সংকল্পের পাশাপাশি তিনি স্বীকারও করেছিলেন— দুর্নীতি নিয়ে সমাজে অস্বস্তি রয়েছে। এবারের কথা তো আগেই বলেছি। তাঁদের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না বা কার্যকর হচ্ছে না কেন? বরং দিনেদিনে  দুর্নীতি কমার বদলে বহুগুণ বেড়েছে!    

এবারের মন্ত্রিসভার নতুন মন্ত্রীদের মুখে  প্রথমেই আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড় বড় নানা কথা শুনেছিলাম; স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক '১০০ দিনের কর্মসূচিতে' দুর্নীতিগ্রস্ত কাউকেই সরকার রেহাই দেবে না বলে মন্তব্য করেছিলেন। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী কোনো দুর্নীতি প্রশ্রয় না দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ভূমিতে দুর্নীতির ক্ষেত্রে 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণা করেই শুধু ক্ষান্ত হননি ভূমিমন্ত্রী, তিনি ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভূমি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হিসাব চেয়েছিলেন। ওনাদের কথার কোন বাস্তবতা কি আমরা দেখেছি, না-কি পেয়েছি??      

পরিকল্পনামন্ত্রী, অর্থ প্রতিমন্ত্রীও বলেছিলেন— এখন আর দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা কোনো ছাড় পাবে না, 'চরম শাস্তির' মুখোমুখি হতে হবে। রাজউকসহ গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে সব প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই 'সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত' করার ঘোষণা দিয়েছিলেন গণপূর্তমন্ত্রী। রেলমন্ত্রী এতটুকু অনিয়ম ছাড় না দেওয়ার কথা বলেছিলেন। পরিবেশমন্ত্রী, সমাজকল্যাণমন্ত্রীর মুখেও শোনা  গিয়েছিল একই সংকল্পের কথা। আর দুদকের চেয়ারম্যান সবাইকে টপকে বলেছিলেন— 'দুর্নীতির গন্ধ' পেলেই তিনি ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু  বাস্তবতায় ঘটেছে উল্টো! সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি আজ মহিরুহ; জাতির অভিশাপ হয়ে পুরো দেশকে গ্রাস করে ফেলেছে।      

শতাব্দীর শুরুতে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে টানা পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এতকাল পর ২০২০ সালে এসে আজ আবারও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা শুনতে হচ্ছে; আফসোস! তাহলে এত দিন আমরা তবে কোন নীতিতে চলেছি এবং কেন? কেন এখনো  পারিনা আমরা বুক ফুলিয়ে বাঁচতে?   আর একটি কথা— সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি আমাদের কী দিয়েছে? কিছু সাফল্য অবশ্যই আছে, কিন্তু তা-ই-বা কতটুকু? এবং কি-ই-বা  মূল্যে তা পেয়েছি?? 
না-কি আবারও সব কিছুই আগের মতো ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে যাবে???

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
৫ অগাস্ট, ২০২০.

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২০

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত ঐশী বাণী:

হযরত নূহ (আঃ) ছিলেন হযরত আদম (আঃ)-এর অষ্টম অধস্তন প্রজন্ম। হাদিস ও তাফসীর থেকে জানা যায় - হযরত নূহ (আঃ) ও হযরত আদম (আঃ)-এর মধ্যবর্তী যুগ ছিল প্রায় এক হাজার বছর, অর্থাৎ তাঁদের দুনিয়ায় আসার সময়ের ব্যবধান ছিল প্রায় এক হাজার বছর। ঐ সময়ের মাঝেখানে পৃথিবীতে এসেছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ নবী ও রাসুল; যাঁর কথা আমরা অনেকেই জানি না বা অনেকে আবার নামও শুনিনি। 

হযরত নূহ (আঃ)-এর সময়ে একবছর ব্যাপী মহাপ্লাবন এবং হযরত নুহ ( আঃ)-এর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা সম্বন্ধে কমবেশি আমাদের সমাজের সবার কিছুটা জানা আছে, আলেম সমাজ এই সব বিষয় নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা করেন, বিশেষ করে নুহ (আঃ)-এর সময়কার দীর্ঘ প্লাবন নিয়ে তাঁরা বেশ ব্যাপকভাবে আলোকপাত করেন। কিন্তু পবিত্র কুর'আনুল কারীমে বর্ণিত আরও  অনেক পয়গম্বর-কে নিয়ে তাঁরা তেমন কিছুই বলেন না, তাই ওনাদের কথা সবার কাছে অজ্ঞাতই থেকে যায়; তেমন একটা জানাও হয়ে উঠে না। আজ আমি তেমনই অজানা অচেনা একজন পয়গম্বরকে নিয়ে কিছু লিখার প্রত্যাশা রাখছি।  

গণিতবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষাকে আজকাল অনেক আলেমই অবজ্ঞা করেন, এমনকি এ'সবকে কুফরি শিক্ষা নাস্তিকদের শিক্ষা হিসেবে আখ্যায়িত করেন! না জেনে না বুঝে ব্যঙ্গ করে গণিতবিদ বা জ্যোতির্বিদদের নামে মিথ্যা ফতোয়া দিয়ে বসেন; এ'সব আসলে তাদের অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ। আজ আমি গণিত বিদ্যা কি করে পৃথিবীতে আবির্ভূত হলো তার ইতিহাস তুলে ধরে দু'চার কথা লিখতে চেষ্টা করবো। প্রত্যাশা করছি অন্ততঃ দু'চার জন হলেও এ লেখা পড়বেন এবং হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করবেন, তবেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা সার্থক হবে। আপনারা হয়তো অনেকেই হযরত ইদ্রিস (আঃ) এর নাম পর্যন্ত শোনেননি বা চিনেন না জানেন না। তাই গণিতের জন্মকথা বলার আগে পবিত্র কোর'আন ও হাদিসের আলোকে হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের কিছুটা তুলে ধরছি। 

সূরা মারইয়ামে উল্লেখ করা হয়েছে, "এই গ্রন্থে উল্লেখিত ইদ্রিসের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, সে ছিল সত্যবাদী নবী। আমি তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছি।" এই আয়াতের তাফসীর থেকে জানা যায়, এখানে ইদ্রিস (আঃ)-এর কথা বর্ণনা করা হয়েছে; তিনি ছিলেন একজন সত্য নবী এবং আল্লাহ তা'আলার একজন বিশিষ্ট বান্দা। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। 

হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত আছে মেরাজ গমনকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের সাথে হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর সাক্ষাত ঘটেছিল। এ নিয়ে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একটি অতি বিস্ময়কর হাদীস তুলে ধরেছেন - তিনি বলেন, ইবনে আব্বাস (রাঃ) কা'আব ( রাঃ)-কে "ওয়ারাফ'না মাকা-নান আলিয়্যা" - আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন, "আল্লাহ তা'আলা হযরত ইদ্রিস (আঃ)-কে ওহী করেন - 'আদম সন্তানের আমলের সমান তোমার একার আমল আমি প্রতিদিন উঠিয়ে থাকি। কাজেই আমি পছন্দ করি যে, তোমার আমল বৃদ্ধি পাক।' অতঃপর তাঁর নিকট একজন বন্ধু ফেরেশতা আগমন করলে তিনি তাঁর কাছে বলেন - 'আমার নিকট ওহী এসেছে; অতএব আপনি মৃত্যুর ফেরেশতাকে বলে দিন তিনি যেন একটু দেরি করে আমার জান কবজ করেন, যাতে আমার আমল বৃদ্ধি পায়।'" 

ঐ বন্ধু ফেরেশতা তখন তাঁকে নিজের পালকের উপর বসিয়ে নিয়ে আকাশে উঠে যান এবং চতুর্থ আসমানে গিয়ে মালাকুল মাউত ফেরেশতার সাক্ষাত পান। ঐ ফেরেশতা মালাকুল মাউত ফেরেশতাকে হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর ব্যাপারে সুপারিশ করলে মৃত্যুর ফেরেশতা বন্ধু ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করেন, "তিনি কোথায় আছেন?" 
উত্তরে বন্ধু ফেরেশতা বলেন, "এই তো তিনি আমার পালকের উপর বসে আছেন।" 

মৃত্যুর ফেরেশতা তখন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, "সুবহানাল্লাহ! আমাকে এখনই নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আমি যেন ইদ্রিস (আঃ) এর রুহ চতুর্থ আসমান থেকে কবয করি। কিন্তু আমি চিন্তা করছিলাম - ইদ্রিস (আঃ) তো আছেন জমিনে, চতুর্থ আসমান থেকে তাঁর রুহ কবয করবো কিভাবে?" 

অতঃপর তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত ইদ্রিস (আঃ) রুহ কবয করে নেন। উক্ত রেওয়াতটিই অন্য এক সনদে এভাবে এসেছে - হযরত ইদ্রিস (আঃ) বন্ধু ফেরেশতার মাধ্যমে মালাকুল মাউত ফেরেশতাকে জিজ্ঞাস করেছিলেন, "আমার হায়াত আর কত দিন বাকী আছে?" অন্য আর এক হাদিসে আছে তাঁর এই প্রশ্নের উত্তরে মালাকুল মাউত বলেছিলেন, "আমি লক্ষ্য করছি, চক্ষুর একটা পলক ফেলার সময় মাত্র বাকী আছে।" 
বন্ধু ফেরেশতা তাঁর পলকের নিচে তৎক্ষণাৎ তাকিয়ে দেখেন, হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জান এরই মধ্যে কবয করা হয়ে গেছে। 

হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন - হযরত ইদ্রিস (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, তিনি মৃত্যুবরণ করেননি, বরং তাঁকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর মতো জীবিত উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। আউফী (রঃ)-এর রিওয়াতের মাধ্যমে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে - হযরত ইদ্রিস (আঃ)-কে ষষ্ঠ আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল, আর সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। 

হযরত ইদ্রিস (আঃ) হযরত নূহ (আঃ)-এর পূর্ববতী নবী ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত নূহ (আঃ)-এর দাদা এবং হযরত হাবিল (আঃ)-এর বংশধর। মেরাজের হাদিসে বর্ণিত আছে হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর সাথে হযতর মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের সাক্ষাতের সময় তাঁকে তিনি উত্তম নবী ও উত্তম ভাই বলে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।  —[মূস্তাদরাক হাকীম] 

হযরত আদম (আঃ)-এর পর তিনিই সর্ব প্রথম পূর্ণাঙ্গ নবী ও রাসুল; যাঁর প্রতি আল্লাহ রাব্বুল তা'আলামিন ত্রিশটি সহীফা নাযিল করেন। হযরত ইদ্রিস (আঃ) সর্ব প্রথম মানব যাঁকে মু'জিযা হিসেবে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও অংকবিজ্ঞান দান করা হয়েছিল। —[বাহরে মুহীত] 

তিনিই প্রথম মানব যিনি কলমের দ্বারা লিখা ও কাপড় সেলাই আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর পূর্বে সাধারণতঃ মানুষ পোশাকের পরিবর্তে পশুর চামড়া বা গাছের পাতা বা ছাল ব্যবহার করতো। ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি সর্বপ্রথম তিনিই আবিষ্কার করেন এবং আস্ত্র-শস্ত্রের আবিষ্কারও তাঁর আমল থেকেই শুরু হয়। তিনিই অস্ত্র তৈরি করে তা দিয়ে কাবীল গোত্রের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন। 

সর্ব বিবেচনায় এখন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় যে, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত হলো আল্লাহর তরফ থেকে আসা ঐশী বাণী। এখন আপনারাই বলেন যারা গণিতবিদ বা জ্যোতির্বিদদেরকে নাস্তিক বলে উপহাস করেন তারা কোথায় কি অবস্থায় আছেন? তাদের জ্ঞানের গভীরতাই-বা কতটুকো? 

বিখ্যাত মুসলিম মনীষী এবং একজন তা'বে তা'বেঈ মূসা আল খায়েরী যামী আজকের আধুনিক গণিত শাস্ত্র তথা বীজগণিতের জনক। এ ছাড়াও অনেক মুসলিম মনীষীই গণিতের বিভিন্ন শাখাকে উদ্ভাসিত করে গেছেন। জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিম মনীষীদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ আজকের আলেম সমাজ ফতোয়া দিয়ে বেড়াচ্ছেন বা বেড়ায় গণিত নাস্তিকদের বিদ্যা(!), জ্যোতির্বিদ্যা নাস্তিকদের বিদ্যা(!), বিজ্ঞান যারা পড়ে তারা নাস্তিক(!); অজ্ঞতাই আজকের মুসলিম সমাজের প্রথম এবং প্রধান প্রতিবন্ধকতা। অথচ এক সময় এই মুসলমানদের জ্ঞান প্রজ্ঞায়ই সাড়া পৃথিবী উদ্ভাসিত হতো এবং হয়েছে;  এক কথায় বললে বলা যায়— মুসলিমদের জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও গরিমার কাছে অন্যান্য জাতি-ধর্ম-গোষ্ঠীর জ্ঞান-গরিমা ছিল নস্যি। 

কিন্তু আজকের আলেমরা করছেন কি?  বেহেস্ত আর দোযখের বর্ণনা ছাড়া তাদের মুখে অন্য কোন কিছুই রোচে না। দুনিয়ায় বিচরণের নিয়ম কানুন এক সময় মুসলিম আলেমগণই শিক্ষা দিতেন, শিক্ষা দিতেন দুনিয়াই আখেরাতের চারণক্ষেত্র; দুনিয়ার বিখ্যাত সব বিদ্যাপীঠ মুসলিমদেরই হাতে গড়া। মুসলিম সমাজকে তথা সমগ্র দুনিয়াকে সুন্দর ও সঠিক পথের সন্ধান দিতেন মুসলিম আলেমগণই। 

পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ভুলে আজকের আলেমরা আছেন শুধু ফতোয়া আর ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের ধান্দা নিয়ে; নিজ স্বার্থ ও মতের এতটুকো ব্যত্যয় ঘটলেই অন্যের বিরুদ্ধে তারা ফতোয়া দিয়ে বসেন, এক আলেম অন্য আলেমকে নিয়ে যা-তা মন্তব্য করে বসেন; সাধারণের সাথে কি করেন সে কথা না হয় বাদই দিলাম। এইসব দেখেশুনে ওদের থেকে শিক্ষা নিয়ে মুসলিম আজ শতধা বিভক্ত, পুরো সমাজ তচনচ হয়ে গেছে। পৃথিবীর প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্রের দিকে তাকালে এই একই দৃশ্য গোচরীভূত হয়। 

মসজিদের নগরী হিসেবে ঢাকা পৃথিবী বিখ্যাত এবং সমগ্র বাংলাদেশেটাই মসজিদে ছেঁয়ে আছে ছেঁয়ে গেছে। যেখানেই যতটুকো অবৈধ জায়গা পাওয়া যায়, সেই জায়গাটুকোই দখল করে গড়ে তোলা হয় মসজিদ বা মাদ্রাসা। এক জঘন্য প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ কাজের; গড়ে তোলা হয় বিশাল বিশাল সব অট্টালিকা, আলিশান সব কাঠামো আর সৌখিন সব ইতালিয়ান আমেরিকান বা জাপানী ইহুদী খ্রিষ্টানদের উপঢৌকন দেয়া টাইলস দিয়ে মসজিদ সাজানোর কাজ। জায়গার সত্ত্ব উৎস বা অর্থ যোগান উৎসের চিন্তা করার কারো কোন বালাই নেই, এ'সব কোন কিছুই বিবেচনায় নেয়া হয় না বা বিবেচ্য বিষয় হিসেবে ধরা হয় না! 

দেশে আজ মসজিদের অভাব নেই, নেই মুসল্লিরও অভাব; আবার মসজিদে জুতা চোরেও অভাব নেই! মুসলিম সমাজ আজ এক ধরনের অন্ধত্ব ও জান্নাতি অহংবোধে এক মিথ্যা মরীচিকার পিছু ছুটছে; জান্নাত পাওয়ার আশায় কেউ-বা আবার জঘন্য পাপ মানুষ হত্যার কাজেও লিপ্ত হচ্ছে। চোগলখোরি, মোনাফেকি, পরশ্রীকাতরতা, চোরাকারবারি, সুদখোরি, ঘুষখোরি এই সব বদ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি এখন মুসলমাদের মাঝেই বেশি পরিলক্ষিত হয়। এসব করে জান্নাতের প্রত্যাশা অবান্তর নয় কি? হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-এর অমর একটি বাণী এই মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি- "প্রস্রাব দিয়ে কাপড় দৌত করে যেমন কাপড়ের পবিত্রতা আনয়ন করা যায় না, তদ্রূপ হারাম উপার্জিত পয়সা দিয়ে দানখয়রাতও ইহকাল ও পরকালের অকল্যাণ বৈ কল্যাণ বয়ে আনে না আনতে পারে না।" 

জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা আজকাল মুসলিম সমাজ থেকে যেন উঠেই গেছে; সন্দেহ প্রবনতা ও পরশ্রীকাতরতা থেকে জন্ম নেয়া হিংসা বিদ্বেষ আর খুনাখুনি আজ সমগ্র মুসলিম জাহানের  প্রতিটি সমাজের সামাজিক চিত্র; কোথাও শান্তি নেই। অথচ 'ইসলাম' বলতেই আমরা সবাই বুঝি 'শান্তি'; একজন মুসলিম হিসেবে অনেকে যথেষ্ট অহংবোধও করি(!)। কিন্তু, কোথায় শান্তি? 

আত্ম অহংকার করার মতো বা অহংবোধ করার মতো আমরা কিছু করি কি? শান্তি নেই ঘরে, শান্তি নেই বাইরে; শান্তি নেই আমাদের সমাজে, শান্তি নেই দেশজুড়ে; শান্তি নেই আরবে, শান্তি নেই পারস্যে; শান্তি নেই প্রাচ্য-পাশ্চাত্যে, শান্তি নেই কোথাও! তাহলে কবরে গিয়ে কি শান্তি পাবো? এমন মোনাফেকি করে?
সে শুধুই এক অবান্তর কল্পনা।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
২২-১-২০১৫.

শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২০

ঈদ মোবারক!

মানুষ তার স্বপ্ন নিয়েই বাঁচে, বেঁচে থাকে;  ভালো দিন আসবেই ইনশাআল্লাহ! সৃষ্টির শুরু থেকে সেই কত কি প্রতিকূলতা! প্রকৃতির সাথে যুুদ্ধ করেই মানুষ বেঁচে থেকেছে। মানব ইতিহাসের সেই শুরুতে মা হাওয়া (আঃ) ও আদম (আঃ) দীর্ঘ একটা সময় আলাদা থেকেছেন। নবী-রাসুল (আঃ)-গণ কত ত্যাগ স্বীকার করেছেন; হুজুর পাক (সাঃ)-এর ত্যাগের মহিমা আর নাইবা বললাম। সাহাবী (রাঃ)-গণ ত্যাগের এক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।  

এই উপমহাদেশের সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে অনেকে বছরের পর বছর কারাগারে কাটিয়েছেন; দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বছরের পর বছর তাঁরা কত কি দুঃখকষ্ট স্বীকার করেছেন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে আমাাদের কষ্ট তাঁদের কষ্টের তুলনায় কতটুকু? আমরা হয়তো একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে ঘরে বন্দী জীবনযাপন করছি, এই তো? 

হয়তো অচিরেই ভেকসিন আবিষ্কার হবে; মানুষের বিচ্ছিন্নতা ঘুচবে। আমরা আজ একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন, নির্বাসিত; এই বিচ্ছিন্নতা মানুষের জন্য খুবই বিপজ্জনক। প্রকৃতিতে মানুষই সবচেয়ে অরক্ষিত প্রাণী। বিভিন্ন প্রাণীর আত্মরক্ষার জন্য তাদের নানা রকমের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকে; কারও দাঁত, কারও নখ, কারও বিষ ইত্যাদি। কিন্তু মানুষের আত্মরক্ষার জন্য তেমন কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই। তাই প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষ সবচেয়ে অসহায়, সবচেয়ে অরক্ষিত প্রাণী। 

অরক্ষিত প্রাকৃতিক পরিবেশে এমনতর কঠিন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে মানুষ কী করে টিকে থাকলো? টিকে থাকতে পেরেছে— মানুষ মানুষকে সহযোগিতা করেছে বলে, মানুষ মানুষের জন্য দাঁড়ায় বলে। পরস্পর যুক্ত হলেই মানুষ বাঁচতে পারে; আর এভাবেই মানব জাতি নিজেদেরকে রক্ষা করে থাকে। মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পরস্পর নির্ভরশীলতা। মানুষ টিকে থাকে, টিকে থাকতে পারে মানুষেরই জন্য। আজকে সেই মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে; যা অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি। হয়তো আবারও মানুষ তার স্বভাবগত চরিত্রে ফিরে যাবে, সব কিছু ঠিক আগের মতো হয়ে যাবে।     

এতোকিছুর পরও আবারও শান্তি, সৌহার্দ্য আর আনন্দের বারতা নিয়ে বছর ঘুরে এলো খুশির ঈদ, পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। ঈদের এই খুশিতে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'য়ালা  আমাদের প্র‍ত্যেককে পূর্ণতা দান করুন, এই কামনা করছি৷ পবিত্র ঈদ-উল-আযহা সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধি৷ বছরের প্রতিটি দিন ঈদের দিনের ন্যায় আনন্দময় হোক। শুভ প্রত্যয় কামনান্তে— 'তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ (আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন)!
ঈদ মোবারক!!

সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২০

কেমন হবে আগামীর শিক্ষা?

করোনা ভাইরাস আবির্ভাবের প্রথম দিকে বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞই নানান ধরনের ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, এই মূহুর্তে যাকে মনে পড়ছে তিনি হলেন  হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল লিওং; গত ফেব্রুয়ারীর দিকে  তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। তাঁর সেই আশঙ্কা যে নেহায়েতই অমূলক তা কিন্ত নয়; এখনো পর্যন্ত তা পুরোপুরি সত্য না হলেও একটি নিশ্চিত ঘটনা অলরেডি ঘটে গেছে— সারা বিশ্বের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ৪৬০ কোটি মানুষ একই সময়ে ঘরে বন্দী জীবনযাপন করেছেন এবং করছেন। বলতে গেলে পুরোপুরি কর্মহীন অবস্থায় শুধু শুয়ে বসে সময় পার করেছেন সারা বিশ্বের মানুষ। উৎকন্ঠা নিয়ে চুপচাপ এক জায়গায় বন্দী জীবন কাটানো সে যে কতটা কঠিন একটি বিষয় এমন পরিস্থিতিতে না পড়লে হয়তো আমরাও কোনদিন তা বিশ্বাস করতে পারতাম না, অনুধাবন তো দূরের কথা। এমন অসহনীয় উৎকণ্ঠিত একাকী জীবনের কথা কি কখনও কেউ আগে থেকে চিন্তা করতে পেরেছেন, না কি ভাবা যায়? 

বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে করোনা ভাইরাস আবারও ফিরে এসেছে বা আসছে, অনেক দেশের মানুষ পুনরায় বন্দীত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। ঘরে বন্দী জীবন কাটাবেন বা কাটাচ্ছেন এবং সাথে থাকছে অনাকাঙ্ক্ষিত উৎকন্ঠা— না জানি আমি কখন এই মরণ ভাইরাসে আক্রান্ত হই? মানবসভ্যতার ইতিহাসে এত বেশি সংখ্যক মানুষ একই সাথে একই সময়ে একটানা এতো দীর্ঘক্ষণ ঘরে বন্দী থেকেছেন বা এমন করে লকডাউন করেছেন নিজে নিজেকে বা কোথাও বন্দী  হয়ে বসে থেকেছেন এমনতর নজির পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি আছে কিনা আমার জানা নেই। এক অদৃশ্য অতি ক্ষুদ্র ভাইরাসের কাছে মানুষ নামক অনন্য অসাধারণ গর্বিত প্রাণীটি এতো অসহায় হয়ে পড়লো, যার আক্রমণে তছনছ হয়ে গেল গোটা বিশ্ব; ভেঙে পড়লো একবিংশ শতাব্দীর সর্বোত্তম নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ সকল  বিশ্বব্যবস্থা! এসব কি ভাবা যায়?

এই অবস্থা থেকে বিশ্ববাসী আর কখনো কোনদিনও পুরোপুরি মুক্তি পাবেন কিনা বা বিশ্ববাসী আর কখনও মোটেও আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন কিনা তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় আছে; হয়তো পরবর্তী পৃথিবী হবে করোনাময় অথবা  করোনা সম্পৃক্ত পৃথিবী! আসলে কি করোনার থাবা থেকে আমাদের কখনও  মুক্তি মিলবে? তা নিশ্চিত কেউ জানি না, তার কোন সুস্পষ্ট ধারণাও এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের দিতে পারছেন না। কিন্তু পরবর্তী বিশ্ব সম্পর্কে অনেকে অনেক রকম কথাই বলেছেন বলছেন, এবং বিশেষজ্ঞরা যার যার মতো করে তাদের মতও প্রকাশ করছেন। সব কিছুতে দ্বিমত থাকলেও একটি বিষয়ে কিন্তু প্রায় সকলেই একমত— পৃথিবী আর আগের মতো নেই, থাকবে না; আর কখনো আগের মতো হবেও না। বিগত কয়েক মাস ধরে যা ঘটেছে ঘটছে তার প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী হবে এই ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই, প্রত্যেকেই অনেকটা নিশ্চিত। এই মহামারী শুরুর পর থেকে একে একে বদলে গেছে পুরো বিশ্বপ্রকৃতি এবং সাথে সাথে  পাল্টে গেছে বিশ্বপরিস্থিতিও। আমাদের কামকাজ, আমাদের  প্রাত্যহিক জীবনযাপন, ভ্রমন-বিনোদন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য সমেত অর্থনীতি-রাজনীতি-রাষ্ট্রনীতি-সমাজনীতিসহ সব সবকিছু বদলে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর শতকোটি মানুষ ঘরে বন্দী, সেই সুযোগে প্রকৃতি তার আসল রূপ পেয়েছে, আপন রূপে ফিরে গেছে। পৃথিবীর সব বড় বড় শহর-নগর-বন্দরগুলোকে মনে হয়েছে হচ্ছে ওসব যেন প্রাণহীন মৃত্যুপুরী; দিনের বেলায়ও রাস্তা-ঘাট থাকছে জনমানবশূন্য। বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, বন্ধ থেকেছে দোকানপাট-বার-রেস্টুরেন্ট-শপিংমল, বন্ধ হয়ে গেছে খেলাধূলা, এমন কি বাতিল হয়ে গেছে অলিম্পিক গেমসও। বিশ্বের অনেক দেশে জেলখানা থেকে বন্দীদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে, বাড়ি গিয়ে তাদেরকে চুপচাপ ঘরে বসে থাকতে বলা হয়েছে। ছোট-বড় ধনী-দরিদ্র বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ তাদের যার যার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে, বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বিমান চলাচলও। সকল প্রকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড— আভ্যন্তরীণ কিম্বা বৈশ্বিক কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে; শেয়ার বাজারে  ধস নেমেছে। সর্বোপরি  বেকার হয়ে পড়েছে বিশ্বের কোটি কোটি কর্মজীবী কর্মোদ্যোগী  মানুষ। এক অদৃশ্য শত্রুর আতংকে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আজ ভীত-সন্ত্রস্ত! 

কি ঘটতে যাচ্ছে এবং কেমন হতে যাচ্ছে করোনামুক্ত পরবর্তী পৃথিবী? আদৌও পৃথিবী করোনামুক্ত হবে কি? এ'সবের সার্বিক আলোচনায় আপাততঃ  যাচ্ছি না, আজ শুধুমাত্র শিক্ষার্থী তথা ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষতির দিক নিয়ে কিছুটা আলোচনা করার চেষ্টা করবো। আমার বিবেচনায় সারা বিশ্বে এখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং নাজুক অবস্থায় পড়ে আছে শিক্ষার্থীরা। শিশুদের কল্যাণে কাজ করা 'সেইভ দ্য চিলড্রেন' থেকে বলা হয়েছে— বিশ্ব মহামারীর এই কঠিন পরিস্থিতিতে শিক্ষার সুযোগ হারাবে প্রায় এক কোটি শিশু। তারা আরও বলেছে— বাল্যবিবাহ, শিশু শ্রম, শিশু নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। এই সংস্থা আরও বলেছে— করোনা পরবর্তীতেও আর কোন দিন হয়তো স্কুলেই যাওয়া হবে না এক কোটি শিশুর। সেভ দ্যা চিলড্রেন-এর এক আলোচনায় উঠে এসেছে এমনতর সব ভয়ঙ্কর তথ্য। ইউনেস্কোর তথ্যের উপর ভিত্তি করে আরও জানা গেছে যে, গত এপ্রিল থেকে ১.৬ বিলিয়ন তরুণ-তরুণী স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে দিয়ে বসে আছে, অলস সময় কাটাচ্ছে; যা বিশ্বের পুরো শিক্ষার্থীর সংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ।

উক্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মানব ইতিহাসে এই প্রথমবার এমন চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে বিশ্বের শিক্ষা ক্ষেত্রে। চরম এই সংকট থেকে বাঁচার পথ খুঁজতে ইতিমধ্যে গোটা বিশ্বপরিস্থিতি পর্যালোচনা করা শুরু হয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, পারিবারিক আর্থিক সংকট কাটাতে আগামীতে তরুণ তরুণীরা রোজগারের চেষ্টা করা শুরু করবে। অভাব অভিযোগ ও পারিবারিক দায় মুক্ত হতে বা দায় মুক্ত করতে অধিকাংশ মেয়েকেই খুব অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে পরিবারের পক্ষ থেকেই। এসবের  ফলশ্রুতিতে ৯.৭ মিলিয়ন শিশু স্থায়ীভাবে স্কুল ছাড়বে। ইউনেস্কো ইতিমধ্যেই সতর্ক করে বলেছে করোনা পরবর্তী বিশ্বে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলি ২০২১ সাল থেকেই কাটছাঁট করবে শিক্ষা বাজেটে। আর এতে করে গোটা বিশ্বের শিক্ষা বাজেটে প্রায় ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘাটতি দেখা দেবে। 

শিশুদের স্কুলে ফেরাতে বিশ্বের প্রতিটি দেশের সরকারেরই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। আর তা যদি না করা হয় তাহলে আগামী দিনে ধনী এবং দরিদ্র ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রবলভাবে প্রকোট হয়ে উঠবে অসাম্য। তাই ইউনেস্কোর দাবী করোনা পরবর্তী বিশ্বে কোটি কোটি শিশুর স্কুল ছুট বন্ধ করতে সরকারি ও বেসরকারি স্তরে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি বিশ্ব জুড়ে একটি তহবিল গঠনের ডাক দিয়েছে এই সংস্থা। সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, করোনাপরবর্তী বিশ্বে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র ও প্রান্তিক শিশুরা; আর যারা দূরশিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণে অক্ষম তাদের সমস্যা আরো বেশি বাড়বে। সমস্যা কাটাতে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতে শিক্ষা ঋণ পরিশোধে কিছু ছাড় দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে। সংস্থার পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হয়েছে, এই সংকট যদি প্রথমে মোকাবিলা করা না হয় বা না যায় তাহলে আগামী দিনে সমস্যা আরও বাড়বে, এমনকি প্রকট রূপ ধারণ করবে।

সংস্থার পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্যই হলো ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সমস্ত শিশুকে ন্যূনতম শিক্ষা পরিসেবার আওতাভুক্ত করা বা আওতায় আনা। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করায় বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রই তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তাই এখন থেকে বিশ্বের সকল দেশগুলোর কাছে এসব নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে ইউনেস্কো। সংস্থার তৈরি তালিকায় যেসব দেশে সবথেকে বেশি প্রভাব পড়তে পারে এমন দেশগুলো হচ্ছে— নাইজেরিয়া, মালি, চাদে, লাইবেরিয়া, আফগানিস্তান, গিনি, মরিশানিয়া, ইয়েমেন, নাইজার, পাকিস্তান, সেনেগাল আর আইভোরিকোস্ট। ইতিমধ্যেই ২৫৮ মিলিয়ন শিশু ও কিশোর-কিশোরী স্কুল ছেড়ে দিয়েছে বলে তাদের প্রথমিক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে। 

আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের কি অবস্থা? এমনতর দুর্যোগের পর সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং নির্দেশনাই-বা কি? দেশের সমগ্র  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ আছে সেই মার্চ থেকে; করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে। কবে নাগাদ স্কুল-কলেজ খুলবে তাও কেউ জানে না বা কেউ বলতে পারে না। ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা এখনও পর্যন্ত সংঘটিত হয়নি, কবে নাগাদ তা সংঘটিত হবে তাও কেউ জানে না; তাই অভিভাবক ও  শিক্ষার্থীরা চরম উৎকন্ঠিত।  ক্লাস এবং পরীক্ষার অনিশ্চয়তা নিয়ে এক মহা দুশ্চিন্তার মধ্যে কালাতিপাত করছে দেশের সমস্ত ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা। প্রত্যেকেই এখন অলস সময় পার করছে এবং সেশনজট  নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন; কিন্তু কিছুই তো আর করার নেই।  প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা স্কুলে পড়াশোনা করতে না পারায় তারা মানসিকভাবে অনেক বেশি  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বা করোনা সিম্পটমে মৃত্যুর সংখ্যা কিন্তু এদেশে এখনো নেহায়েত কম নয়, তাছাড়া কেন যেন এখনো পর্যন্ত করোনা সংক্রমিত হওয়া মানুষের সংখ্যা এদেশে কিছুতেই কমছে না, বরং কোন কোন অঞ্চলে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই যে কোনো স্তরের শিক্ষার্থীর জন্য করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে; তাই সরকারও শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে বারংবার  সতর্ক থাকার বা হওয়ার  নির্দেশ দিচ্ছে। এমনতর  পরিস্থিতিতেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও অনলাইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে এবং কোথাও কোথাও তা শুরুও হয়েছে। এরই মধ্যে কিছু সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনলাইনে ক্লাস নিতে শুরু করছেন, তারা অ্যাসাইনমেন্ট ও হোমওয়ার্কও দিচ্ছেন এবং তা ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে জমাও নিচ্ছেন। 
 
দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে নিশ্চিত করেই বলা যায়, এ'দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারের; আর্থিক সংকটের কারণে তারা অনেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে না। অনেকেরই নেই অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণ করার মতো ন্যূনতম সরঞ্জাম— স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ  আলাদা, সেখানকার বেশিরভাগ শিক্ষার্থী আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের এবং তারা সবকিছুই সামাল দিতে পারবে। কিন্তু স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা কি হবে বা কি হচ্ছে? ঘোষণা দিয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা টিভিতে ক্লাস নিচ্ছেন। কিন্তু তা শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা মঙ্গলজনক বা কার্যকরী হচ্ছে? অনলাইন ক্লাস এদেশে কার্যকর করার মতো সার্বিক পরিস্থিতি এখনো অনেক দূর;  বাচ্চাদের জন্য তো তা মোটেও প্রযোজ্য নয় বা আদৌও কার্যকরী হবে বলে আমার মনে হয় না। বাচ্চাদের জন্য শ্রেণীকক্ষে সরাসরি ক্লাসের কোন বিকল্প নেই। তাই এতসব উদ্ভট চিন্তা বাদ দিয়ে দূরত্ব বজায় রেখে বা অন্য কোন উপস্থিত প্রক্রিয়ায় বাস্তব কারিকুলামে কি করে শ্রেণীকক্ষে তাদের  ক্লাস নেয়া যায় তা নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত।  

গত ১৭ই মার্চ থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে, ৬ই আগস্ট ছুটি শেষ হলেও স্কুল-কলেজ খুলে দেয়া হবে কিনা সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। আর এ'সব বিষয়ে এখনও পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে কোন সিদ্ধান্ত না আসায় উদ্বেগে আছেন শিক্ষক-অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীরা। বাংলাদেশের সকল প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম সমন্বয়ের কাজে ফেসবুককে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর; বিষয়টি বড়ই চিন্তার। কারণ, ছোট ছোট বাচ্চারা একবার ফেসবুকে ঢুকলে এবং ফেসবুক আসক্ত হয়ে গেলে পরিস্থিতি কি হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া কতটাই-বা কাজে আসবে বা কাজ হবে বা করতে পারবে শিক্ষা সমন্বয়ে ফেসবুকের ব্যবহার?  এইবারের এসএসসি পাশ করা ছাত্রছাত্রীরা ভর্তির অপেক্ষায় আছে। দেশের গ্রামগঞ্জসহ সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কলেজ, সে সব কলেজে একাদশ শ্রেণীতে অনলাইনে ভর্তির পরিপত্র জারি করা হয়েছে; সেখানেই ঠিক মতো ভর্তি  কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারছে না এদেশের এসএসসি পাশ ছাত্রছাত্রীরা। এমতাবস্থায় অনলাইনে পড়ালেখা কি চাট্টিখানি কথা?  

গত মাসে এক ভিডিওবার্তায় মাননীয়  শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানিয়েছেন, চলতি শিক্ষাবর্ষ আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে; সেইসাথে পরের শিক্ষাবর্ষ কমিয়ে নয় মাস করার কথাও ভাবা হচ্ছে। যদিও এ'সব বিষয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য  বিভাগগুলো চেষ্টা করছে এই বছরের মধ্যেই শিক্ষাবর্ষ শেষ করতে। তবে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বিবেচনায় যদি ছুটি আরও বাড়ানো হয়, তাহলে এই শিক্ষাবর্ষ মার্চ মাস পর্যন্ত বাড়ানো নিয়েও আলোচনা হচ্ছে বলে জানান আন্ত:শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মূলতঃ দু'টো বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে— প্রথমতঃ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত করা যায় এবং দ্বিতীয়তঃ মেধার মূল্যায়নের দিকটিও যেন আপোষ করতে না হয়। তবে কবে নাগাদ এ'সব সিদ্ধান্ত আসতে পারে সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত  স্পষ্ট করে কোন কিছুই জানা যায়নি।

চলতি শিক্ষাবর্ষ আরও কিছুটা বাড়ানো হলে আগে যেমন নভেম্বর ডিসেম্বরে সমাপনী পরীক্ষা শেষ হতো, সেই পরীক্ষা শেষ হবে সামনের বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চে। অন্যদিকে সামনের শিক্ষাবর্ষ ১২ মাস থেকে কমিয়ে ৯ মাসে নামিয়ে আনার কথা চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এখানে একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, একটি শিক্ষাবর্ষে ১৪০ দিনের মতো পড়ানো হয়, ৩৬৫ দিনের বাকিটা সময় ধরে থাকে ছুটি আর ছুটি। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক এমনতর কার্যক্রম কাটছাঁট করে পরের শিক্ষাবর্ষের সমাপনী পরীক্ষা যেন ডিসেম্বরেই নেয়া যায় সে দিকে খেয়াল রেখে সিলেবাস কমানোর পাশাপাশি ঐচ্ছিক ছুটিছাটাও বাতিল করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা।

করোনার এই সময়টা নিশ্চয়ই একদিন কেটে যাবে, বন্ধ থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও হয়তো আবার খুলে দেয়া হবে; প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে শহর-নগর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীতে আবারও মুখরিত হয়ে উঠবে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ক্যাম্পাস। কিন্তু সময়টা আরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামীর শিক্ষা ব্যবস্থার কি হবে, কেমনই-বা হবে? করোনার কারণে তৈরি হওয়া অনলাইন আর অফলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার এই অসম বৈষম্য আমরা কি করে দূর করবো?  এসব প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গেলে বা সমাধান করতে গেলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা অবশ্যই আরো বাড়াতে হবে এবং সবাইকে সৎ ভূমিকা রাখতে হবে। 

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন— ১৯৩০ সালের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে আছে বিশ্ব; সে কারণে করোনা পরবর্তী বিশ্ব হবে ক্ষুধাময়।  ওদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছে না! কবে নাগাদ এই করোনাভাইরাস বিশ্ব থেকে নির্মূল হবে, বা আদৌও নির্মূল হবে কি? যতই বলা হউক না কেন কোভিড-১৯-এর ভেকসিন আবিষ্কার হয়ে গেছে; কিন্তু তা  বাস্তবায়িত হতে এবং মানবজাতির কল্যাণে আসতে সময় নেবে আরও অনেক। ততদিন কি শিক্ষা থেমে থাকবে আর সভ্যতা বিপর্যস্ত হবে??

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
২৭ জুলাই, ২০২০.

শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২০

সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নয় বিশ্বশান্তিই ইসলামের মূলনীতি:


'ইন্নাদ্দীনা ইন্দাল্লাহ্হীল ইসলাম'— নি:সন্দেহে আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম হলো শান্তি (ইসলাম);  কিন্তু কোথায় শান্তি? কোথায় স্বস্তি? শান্তি স্বস্তি কি পৃথিবী থেকে বিদাই নিয়েছে? - অনেকের মনে এ'রকম হাজার প্রশ্ন; বর্তমান সময়ে ইসলাম মানেই যেন অশান্তি! ভিন্ন ভিন্ন ছোট ছোট দল-উপদল ও মতের প্রাধান্য বিস্তারের অপচেষ্টা, হানাহানি মারামারি; ধর্ম নিয়েই যত সব বাড়াবাড়ি! কিন্তু কেন? কারণ, কেউ মদ বেচে দুধ খান, কেউ-বা দুধ বেচে মদ খায়!  
   
মাওলানা আব্দুর রহমান (আসল নাম নয়; মাওলানা অনুরোধ করেছিলেন যেন তাঁকে প্রচার না করি।) ধর্মীয় উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত একজন বিজ্ঞ আলেম। এই বাংলারই কোন এক উপজেলা পরিষদ মসজিদে তিনি ইমামতি করেন। এক অনুষ্ঠানে তাঁর সাথে আমার সাক্ষাত। আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে এমন সব কিছু কথা তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো যা সচারাচর আজকের আলেম বা কোন ইমামদের কাছে প্রত্যাশাও করা যায় না। যতই তাঁর কথা শুনছিলাম ততোই ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহ আলাইকে মনে পড়ছিল। 

আজ থেকে হাজার বছর আগে ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ইসলামকে পুনঃ জাগরিত করে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে এই ধরাধাম ত্যাগ করেছিলেন। যিনি বলে গেছেন - 'প্রস্রাব দিয়ে কাপড় দৌত করতে যেয়ে যত দামী  সাবান সোডাই ব্যবহার করা হউক না কেন যেমন কাপড়ের পরিত্রতা আনয়ন করা যায় না, তদ্রুপ হারাম উপার্জিত পয়সা দিয়ে দান-খয়রাত বা ছদগা-যাকাত করলেও তা পাপ বৈ পুণ্য বয়ে আনে না।' 

উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে জানতে পারি মাওলানা আব্দুর রহমান উপজেলা পরিষদ থেকে ইমামতির জন্য কোন বেতন বা টাকাপয়সা নেন না। উপজেলা পরিষদের পতিত জমি তিনি চাষাবাদ করেন এবং উৎপাদিত ফসলের ভাগের এক অংশ উপজেলা কোষাগারে জমা দিয়ে বাকীটা দিয়ে তিনি জীবনযাপন করেন। আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেন যেন কথাগুলো আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল না। তাই উৎসাহ ও উৎগ্রীবতা নিয়ে ঘটনা প্রত্যক্ষ করার অভিপ্রায়ে তাঁর সাথে বাসায় দেখা করতে চাইলাম; তাৎক্ষনিক সাক্ষাতে তিনি রাজি হলেন না। আমার সম্বন্ধে ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে বেশ কয়েকদিন  পর উপজেলা চেয়ারম্যান মারফত আমাকে জানালেন, যে কোন দিন আমি যেন তাঁর বাসায় যাই। প্রথমদিন কেন তিনি আমার সাথে সাক্ষাত দিতে চাননি তার কারণও সেদিন সাক্ষাতে জানতে পেরেছিলাম; বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি আমাকেও অন্য দশ জনের মতোই ভেবেছিলেন।  

আমি যেদিন মাওলানার বাসায় প্রথম যাই সেদিন সকাল ১০.১৫ টায় গিয়ে পৌঁছি, তিনি তখন বাসার পাশে একটা বেগুন ক্ষেতে আগাছা পরিস্কার করছিলেন। প্রায় পনে দু'ঘন্টা ঐ বেগুন ক্ষেতেই আমাদের দু'জনের দীর্ঘ আলাপচারিতা। যদিও তিনি আমাকে দেখেই কাজ বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি তা করতে দেইনি। তাঁর কাছে গিয়েই বুঝেছিলাম এই জীবনে এখনো আমার অনেক কিছু শিখার বাকী আছে। পরবর্তীতে সময় ও সুযোগ পেলেই হুটহাট তাঁর ওখানে চলে যেতাম এবং মত বিনিময় করতাম। 

আত্মিক ও বাহ্যিক এবাদত-সংযমের এক জ্বলন্ত  উদাহরণ, উৎকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারী  এই মাওলানা আব্দুর রহমান; যাঁর মাঝে আমি দেখতে পেয়েছি আল্লাহর নূর, তাঁর চেহারায় তা সুস্পষ্ট  ফুঁটে উঠেছে। তিনি বর্তমানের তথাকথিত কমার্শিয়াল আলেম বা ইমামদের মত নন; তিনি বলেন, 'নামাজ তো আমার জন্যও ফরয। আমার ফরয তো আমাকে আদায় করতেই হবে। নিজ ইমামতিতে আমি নিজে আমার ফরয আদায় করছি, অন্যরাও আমার পিছনে যার যার ফরয আদায় করে নিচ্ছেন, এবাদত-বন্দেগীর প্রতিদানের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ্‌; এর জন্য আমি অন্যের কাছ থেকে বিনিময় নেবো কেন?'

ইসলামের আসল বুনিয়াদ এই আব্দুর রহমান মাওলানাদের হাতেই। তাঁরাই প্রকৃত ইসলামের ধারক ও বাহক। কে বলে ইসলামে শান্তি নেই? মাওলানা আব্দুর রহমানের মতো অনেক মু'মিন মুসলমান এখনো এই ধরণীতে জিন্দা আছেন, তাঁদের সংসার দেখতে যান; দেখবেন, তাঁদের  কোন কিছুরই ঘাটতি নেই, অভাব নেই। আল্লাহ-র খাস রহমত ও বরকত তাঁদের উপর সব সময়ই বিদ্যমান। 

ইসলাম মানে শান্তি, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ এক পরম শান্তির বিষয়;  এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত বা ভিন্নমত থাকার কথা নয়। হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা আহাম্মদ মুস্তোবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লাম পর্যন্ত সকল নবী রাসুলগণ পৃথিবীতে এই শান্তির ধর্মের বুনিয়াদই রচনা করে গেছেন, আমরন তাঁরা চেষ্টা করে গেছেন শান্তি-সাম্য-সৌহার্দ্যের পৃথিবী গড়ে তুলতে। কোন নবী বা রাসুলের জীবনীই আমাদের ধর্মীয় উস্কানি, সন্ত্রাসবাদ বা অশান্তির শিক্ষা দেয় না। 

ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করার জন্যই পবিত্র কুর'আনুল কারীমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নবী-রাসুলগণের জীবনী ও ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে; শান্তি, সাম্য ও সৌহার্দ্যের বাণী সমেত। যা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে আমরা পথের দিক নির্দেশনা পাই এবং নিজ  জীবনের দিক নির্ণয় করতে পারি। তাছাড়া ভিন্ন ধর্মমত ও পথেরও যারা দুনিয়াতে জ্ঞানের তাপস হিসেবে এসেছিলেন সেই সব গ্রেট দার্শনিক সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টেটল, আলেকজান্ডার দি গ্রেটরাও কিন্তু পৃথিবীতে  শান্তির বুনিয়াদই বপন  করে গেছেন; জ্ঞানের বিকাশে তাঁরাও রেখে গেছেন স্মরণীয় বরণীয় সব অবদান। ধর্মকর্ম বা মৌলিক এবাদত-বন্দেগীর কথা বাদ দিয়ে দেখলে দেখা যায় যে বিশ্বশান্তির প্রশ্নে পৃথিবীতে আসা সকল মনীষীর মত ও পথ এক ও অভিন্ন। 

সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লাম বার বার ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। সারে চৌদ্দশ বছর আগেই তিনি জানতেন, মুসলিমদের মাঝে ধর্ম নিয়েই বাড়াবাড়ি হবে সবচেয়ে বেশি। তাই তিনি অসংখ্যবার মুসলিমদের মধ্যপ্রন্থা অবলম্বন করার তাগিদ দিয়ে গেছেন। সহীহ  ছিত্তায় এরূপ অসংখ্য হাদীসের সন্নিবেশ দেখা যায়। পরবর্তীতে পৃথিবীর সকল মুসলিম মনীষীর লেখা থেকেও হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের কথার অনুসরণ ও অনুকরণের মিলও খুঁজে পাওয়া যায়। 

উম্মতে মুহাম্মদী মানেই মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের অনুসরণ ও অনুকরণ। যা করতে হবে তা আত্মিক ও বাহ্যিক উভয় প্রন্থায়ই করতে হবে। সাধারণভাবে ইসলাম বলতে আমরা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের প্রবর্তিত ও প্রচারিত ধর্মকেই বুঝি। আর এই ইসলামের সকল মূল নীতি, বাণী ও উদ্দ্যেশ্য-বিদেয় পুরোপুরিভাবে শান্তির সাপেক্ষে, অশান্তির বিপক্ষে। মুলতঃ বিশ্বশান্তিই ইসলামের মূল নীতি; আর সকল নবী-রাসুলের প্রচার-প্রচারণা এই নীতিমালার  উপরই প্রতিষ্ঠিত।   

অনেকেই ভাবতে পারেন— তবে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদীন সহ সকল মুসলিম খলিফাগণ এতো যুদ্ধ করেছেন কেন? তখনকার পরিবেশ, পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতা মুলতঃ অন্য রকম ছিল। তৎকালীন জাজিরাতুল আরব ছিল আইয়ামে জাহেলিয়াতের নিকৃষ্ট একটি চারণভূমি। নেংটো হয়ে সেই সময় তারা কাবাঘর তাওয়াফ করতো। পৌত্তলিকতা ছিল আরবিয়দের বেশিরভাগের ধর্ম। বংশ ও গুষ্টিগত দাঙ্গা হাঙ্গামা তাদের মাঝে লেগেই থাকতো। সে সময় সেখানে পিতারা পিতা হয়েও নিজ কন্যা সন্তানকে জ্যান্ত মাটিচাপা দিত! 

সমাজ সভ্যতা বলতে আজকের আমরা যা বা যতটুকো বুঝি, তৎকালীন আরবের অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ তার বিপরীত। হিংস্রতা নিষ্ঠুরতা বর্বরতা ছিল তাদের পৌরুষত্ত্ব জাহিরের মানদণ্ড। আরবের সেই চরম পর্যায়ে আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন আলোর দিশারি রূপে তাঁর প্রিয় হাবীব, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী মহানবী হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামকে সেই পংকিল সমাজে প্রেরণ করেন। মহানবী (সাঃ) তাঁর কাঁধে বর্তানো দায়িত্ব সম্পুর্ণ সুচারুভাবে সম্পন্ন করে দুনিয়া থেকে ওফাত নেয়ার পর থেকেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ভিন্ন মতবালম্বীরা; আজও সেই একই গতিতে তাদের কুকর্ম অব্যাহত রয়েছে।  

সময়ের প্রেক্ষিতে কেন জানি বিদাই হজ্জে রাসুলপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের সেই দিকনির্দেশনা শেষ ভাষণ খুব বেশি মনে পড়ছে। সুরা আন-নাছর নাজিল হওয়ার পর ৬৩২ খৃষ্টাব্দে ২৩ ফেব্রুয়ারি লক্ষাধিক সাহাবী (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে মহানবী (সাঃ) হজ্জ করতে মক্কা যান। ৯ যিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত বিশাল জনসমুদ্রে 'জাবালে রহমত'-এর উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন—
  
  ১। হে মানব সকল! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোন, কারণ আগামী বছর আমি তোমাদের সাথে এখানে সমবেত হতে পারবো কিনা জানি না।
  ২। আজকের এই দিন, এই স্থান, এই মাস যেমন পবিত্র, তেমনই তোমাদের জীবন ও সম্পদ পরস্পরের নিকট পবিত্র।
  ৩। মনে রাখবে অবশ্যই একদিন সকলকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। সেদিন সকলকে নিজ নিজ কাজের হিসাব দিতে হবে।
   ৪। হে বিশ্বাসীগণ! স্ত্রীদের সাথে সদয় ব্যবহার করবে। তাদের উপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তেমনই তোমাদের উপরও তাদের অধিকার রয়েছে।
   ৫। সর্বদা অন্যের আমানত রক্ষা করবে এবং পাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে ও সুদ খাবে না।
   ৬। আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না, আর অন্যায়ভাবে একে অন্যকে হত্যা করবে না।
    ৭। মনে রেখো দেশ বর্ণ গোত্র সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল মুসলিম সমান। আজ থেকে বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব বিলুপ্ত হলো। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো আল্লাহ ভীতি বা সৎকর্ম। সে ব্যক্তিই সবচেয়ে সেরা যে নিজের সৎকর্ম দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে।
   ৮। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, পূর্বের অনেক জাতি এ কারণে ধ্বংস হয়েছে। নিজ যোগ্যতা বলে ক্রীতদাস যদি নেতা হয় তার অবাধ্য হবে না। এবং তার আনুগত্য করবে।
   ৯। দাস দাসীদের প্রতি সদ্ধ্যবহার করবে। তোমরা যা আহার করবে ও পরিধান করবে তাদেরও তা আহার করাবে ও পরিধান করাবে। তারা যদি কোন অমার্জনীয় অপরাধ করে ফেলে, তবে তাদের মুক্ত করে দেবে; তবু তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করবে না। কেননা তারাও তোমাদের মতোই মানুষ, আল্লাহর সৃষ্টি। সকল মুসলিম একে অন্যের ভাই এবং তোমরা একই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।
  ১০। জাহিলি যুগের সকল কুসংস্কার ও হত্যার প্রতিশোধ বাতিল করা হলো। তোমাদের পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহর বাণী এবং তাঁর রাসুলের আদর্শ রেখে যাচ্ছি। একে যতদিন তোমরা আঁকড়ে থাকবে ততোদিন তোমরা বিপদগামী হবে না।
    ১১। আমিই শেষ নবী, আমার পর আর কোন নবী আসবেন না।
     ১২। তোমরা যারা উপস্থিত আছো তারা অনুপস্থিতদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দেবে।

এই ছিল মোটামুটিভাবে বিদাই হজ্জ-এ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের মূল বাণী, যা উম্মতে মুহাম্মদী (সাঃ)-এর প্রত্যেকের জীবন চলার পথের পাথেয়।

কত কাঠখড় পেড়িয়ে আজকের এই ইসলাম তা হয়তো বর্তমান প্রজন্ম খুব একটা বেশি জানে না। জানবেই-বা কি করে? বিকৃত আর ভ্রান্ত মত ও পথের প্রচার প্রসার দুনিয়ায় যে ভাবে বিস্তার লাভ করেছে, তাতে প্রকৃত সত্য অনেকটাই ধামাচাপা পড়ে গেছে। ইসলামের অপ্রিয় সত্য কেউ তুলে ধরতে চায় না, আবার কেউ তুলে ধরলে তার জন্য তাকেও গালমন্দ শুনতে হয়। অসত্য অসুন্দর ইতিহাস ও ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদী-নাসারা ষড়যন্ত্র চক্রান্ত তুলে না ধরলে প্রকৃত সত্য ও সুন্দর প্রজন্মের কাছে খোলসা হবে কি করে? না বললে, না জানলে তো তুলনা করা সম্ভব হবে না, ভুলও সংশোধন করা যাবে না। 

আমার লেখা নিয়ে এরই মাঝে একটি শ্রেণী খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তারা অনেকেই  অনেক ধরনের বিকৃত রুচির পরিচয় দিচ্ছে। তাদের উদ্দ্যেশে বলছি— ধর্ম সম্বন্ধে ভালভাবে না জেনে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে কেউ কখনো আসে না; বিশেষ করে পবিত্র কুর'আনুল কারীম ও হাদীস নিয়ে আলোচনা করার তো প্রশ্নই উঠে না। পবিত্র কালাম পাক নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করতে হলে যে সব জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন,  আখলাক ইবাদত দরকার, আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীনের খাস রহমত, আমি সেগুলো অর্জন করতে চেষ্টা করেছি, করছি। আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীনের দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া, কোন ভ্রান্ত মতবাদ কোনদিনও আমাকে প্রভাবিত করতে পারেনি। 

আমি মনে করি পবিত্র কুর'আনুল কারীম ও সহীহ ছিত্তাহ অনুসরণ করে মহান স্রষ্টার কৃপা প্রার্থনা করলেই সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া যায়, তা পাওয়া দুষ্করও নয়। তাছাড়া বিশিষ্ট মুসলিম মনীষী— ইমামে আযম ও হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-সহ পাইওনিয়র মুসলমানদের লেখা অজস্র কিতাব আমাদের পথ প্রদর্শনে সহায়িকা হিসেবে কাজ করবে। অবশ্য বর্তমানে বহু পথভ্রষ্ট দল বেরিয়েছে, যারা ইমামে আযম বা ইমামে রাশেদীন অথবা হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-কে মানতে নারাজ! তারা মনে করে শুধু কুর'আন পড়লেই যথেষ্ট। তাদের এই যুক্তি আমি অবশ্যই মানি; কিন্তু সঠিক ধারাবাহিকতার অনুসরণ? 

ধারাবাহিকতা ছাড়া সরাসরি আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন বা হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামকে অনুসরণ করা কি করে কার পক্ষে সম্ভব? ঈমান ও ইসলামকে জানতে হলে বুঝতে হলে অবশ্যই আমাদের কারো না কারো লেখার উপরই নির্ভর করতে হবে, কোন না কোন ধারাবাহিকতার উপর আমল করতে হবে। আমি মনে করি হুজ্জাতুল ইসলামের ক্ষুরধার লেখাই আমাদের সঠিক পথ বাতলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। সঠিকভাবে কুর'আনুল কারীম জানতে ও বুঝতে হলেও অবশ্যই সঠিক তাফসীর কারকের তাফসীর পড়তে হবে, অনুসরণ করতে হবে। ব্রিটিশ মদদে গড়া মৌদুদীর তাফসীর পড়ে সঠিক ইসলামের নাগাল মোটেও পাওয়া যাবে না। এতে দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই বরবাদ হবে।
  
ইসলামের সেই প্রথম যুগেই বেইমানী,  নেমকহারামী, মোনাফেকী নামক বিষফোঁড়াগুলো মুসমানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছিল। শ্রেষ্ঠ সাহাবী হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ)-এর ঘরেই জন্ম নিয়েছিল কুখ্যাত মালাউন ইয়াজিদ; যে কিনা মসজিদে নববীকে ঘোড়ার আস্তাকূর বানিয়েছিল! ইয়াজিদের মতো অসংখ্য মালাউন মুসলিম সাম্রাজ্যের সম্রাট হয়েছে! স্বীকৃত মোনাফেক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের কথা ইতিপূর্বে বহুবার আলোচনা করেছি। ইহুদী-নাসারা চক্রান্তে যুগের পরিক্রমায় সেই উবাইরা ও খাচ্চোর শাসকরা মিলে পৃথিবীর শান্তির ধর্ম ইসলামকে বিতর্কিত করেছে, ভ্রান্ত মতবাদ ও নতুন নতুন ফিতনার উৎপত্তি ঘটিয়েছে। তারা তাদের দুনিয়াবি  হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দ্যেশেই এ'সব করেছে। 

ইসলামে ধর্মীয় সন্ত্রাস বা ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতাবাদ উগ্রবাদের সূচনা মূলতঃ হযরত ওসমান (রাঃ) -র শাসনামলের শেষ দিকেই শুরু হয়েছিল। ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দে যা ব্যাপক রূপ ধারণ করে; আব্দুল আজিজ আল সাউদ ও মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব নাজদী মিলে ইসলামে জঙ্গিবাদের বীজ বোপণ করে, যা পরবর্তীতে মুসলিম রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস হিসেবে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। ভ্রান্তমতবালম্বী আব্দুল ওহাব নাজদী ধর্মীয় নেতা সেজে একের পর এক বিকৃত ফতোয়া দিতে থাকে, আর ডাকাত সর্দার আব্দুল আজিজ আল সাউদ রাষ্ট্রনায়ক সেজে (যার নামে জাজিরাতুল আরব সৌদি আরব হয়েছে ) নাজদীর ফতোয়া বাস্তবায়ন করতে থাকে! 

তৎকালীন জাজিরাতুল আরবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের বংশধরগণকে নিধনের যে জঘন্য প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছিল আব্দুল ওহাব নাজদী ও আব্দুল আজিজ আল সাউদ তা ভাষায় বর্ণনা করার মত নয়। সকল সাহাবী রাদি'আল্লাহু আনহুগণের কবরের শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকো মুছে দেয়াই যেন ছিল নাজদীর ফতোয়ার মুখ্য বিষয়। এমন কি শালা-ভগ্নীপতি মিলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সাল্লামের পবিত্র রওজা মোবারক গুঁড়িয়ে দেয়ার অপচেষ্টাও করেছিল। সে এক বিকৃত ইতিহাস; অন্য আরেক সময় তা তুলে ধরার আশা পোষণ করছি। 

সেই থেকেই শুরু হয় নামধারী মুসলিমের হাতে ঈমানদার সব  মুসলিম নিধন! একদিকে ঈমান ও আকিদাগত বিষয়গুলো পরিবর্তিত হতে থাকে ধর্মীয়  সংস্কারের নামে, অন্যদিকে চলতে থাকে সারে তেরশ বছরের ইসলামের ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্নগুলোর মুন্ডুপাত। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নবী কারীম (সাঃ)-এর বংশধারগণ প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আফগানিস্তান পাকিস্তানের বন জঙ্গলে  আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। স্বভাবতই নবীর বংশধরগণ শান্ত ভদ্র নম্র হন; হিংস্রতা বর্বরতা তাঁরা বুঝেন কম। ডাকাতদের সাথে কুলিয়ে উঠা তাঁদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব ছিল না। 

ডাকাতদের বর্বরতার কাছে হার মেনে মাতৃভূমি ছেড়ে তাই তাঁরা আত্নগোপন করেছিলেন এই অঞ্চলে। নির্মম নিষ্ঠুর নিয়তি, সেই একই অবস্থা আজও বিদ্যমান। মার্কিনরা ওসামা-বিন-লাদেনকে আরবে তৈরী করে, শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানে আত্মগোপনের বাহানাকে ইস্যু করা ছিল আফগানিস্তানে মার্কিনী আক্রমনের একটি কূটকৌশল; আসল উদ্দ্যেশ্য ছিল অন্য, প্রকৃত মুসলিম দমন।  

বর্তমান পৃথিবীর নব্য আকিদার মুসলিম শুধুমাত্র নামকাওয়াস্তেই মুসলিম। কার কতটুকো ঈমানী জোর আছে তা একটু স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বা স্বার্থ সম্পৃক্ত ব্যাপারে জড়ালেই স্পষ্ট হয়ে যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য ওহাবী মতবাদ আজ সাড়া মুসলিম জাহানকে খণ্ড-বিখণ্ডিত করে দিয়েছে; অন্যদিকে মওদুদীবাদ আমাদের এই উপমহাদেশকে উত্তপ্ত করেছে। এই দুই ভ্রান্ত দল  মিলে সমগ্র  ইসলামী জাহানকেই আজ এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বানিয়ে ছেড়েছে। একদিকে ইহুদী-নাসারা চক্রান্ত, অন্যদিকে মুসলিম রূপি এই সব মুনাফিকদের আধিপত্য, সমগ্র মুসলিম জাহানকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। এর মুল কারণ মুসলিম বিশ্বে আল্লাহ প্রদত্ত ধনসম্পদের পর্যাপ্ত সমাহার।

অতি সাধারণ একটি চিন্তা— ইসরাইলে ইহুদী সন্ত্রাসীরা প্রতিদিন নিরস্ত্র মুসলিম নর-নারী-শিশুর উপর পশুর মতো হামলে পড়ছে, অকাতরে অকারণে ছোট ছোট অবোধ শিশুদেরকেও হত্যা করছে। আর আল কায়েদার বর্তমান প্রধান জাওয়াহিরি ইসরাইল বাদ দিয়ে এশিয়ার মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ অঞ্চলে আঘাতের পরিকল্পনা করছে! সত্যি সত্যিই আল কায়েদা যদি প্রকৃত ইসলামী চেতনা সমৃদ্ধ কোন গ্রুপ হতো, তবে জাওয়াহিরি সকল ইসলামী গ্রুপগুলো নিয়ে অতর্কিতে ইসরাইলের উপরই ঝাঁপিয়ে পড়তো; বাংলাদেশ বা মুসলিম দেশে সাধারণ মুসলিম মারার পরিকল্পনা করতো না। আমাদের দেশে বা মুসলিম বিশ্বে যে সব সন্ত্রাসী উগ্রবাদী গ্রুপগুলো আছে, তারাও কোনভাবেই  আল কায়েদার সাহায্যে এগিয়ে আসতো না। ইসলামী বলে পরিচিত এই সব সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো আসলে মার্কিনীদের তৈরী, মার্কিন চক্রান্ত বাস্তবায়নের এজেন্ট ওরা। মুখ ও অবয়বে ইসলামী লেবাস এঁটে ইহুদী-নাসারাদের চড় হিসেবে মুসলিম বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। 

ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যুগে যুগে মুসলমানের ঘরেই জন্ম নিয়েছে বেইমান আর মুনাফিক। যারা কূটচালে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে ইসলামকে বার বার বিতর্কিত করেছে। হিংসা প্রতিহিংসা তাদের মূল চালিকাশক্তি; তারাই ভিন্ন মতবালম্বী। ইসলামকে সব সময়ই তারা হাতিয়ার বা ঢাল  হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং আজও করে আসছে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের কোন মূলনীতিরই তারা ধার ধারে না। বাহ্যিক ঈমানদার ও ইবাদতি ভাব প্রকাশ করে তারা ইসলামিষ্ট সাজার ভান করে মাত্র। 

ইসলাম আল্লাহ মনোনীত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান; রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, ব্যক্তি কোন কিছুই এই বিধানের বাহিরে নয়। ইসলামের মুল বিষয়গুলো মানুষের মৌখিক, আত্নিক ও বাহ্যিক অবস্থার সাথে পুরোপুরিভাবে সম্পৃক্ত;  যেমন— আল্লাহ ও আল্লাহর হাবীব (সাঃ)-কে মুখে স্বীকার করা, অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা ও আল্লাহর আদেশ নিষেধ মান্য করা ও নিজ জীবনে  বাস্তবায়ন করা। সেই হিসেবে ঈমান ও ইসলাম প্রধানতঃ তিন ধরনের দেখা যায়। কেউ মনে করেন - ঈমান ও ইসলাম এক ও অভিন্ন। আবার কেউ মনে করেন - দুটোই ভিন্ন ভিন্ন, পরস্পরের কোন মিল নেই। এবং কারো কারো মতে - দুটো আলাদা হলেও একটি অপরটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। 
 
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-র মতে - আভিধানিক অর্থে ঈমান হলো সত্যায়ন করা; অর্থাৎ সত্যি বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস ও প্রকাশ করা। এবং ইসলামের প্রকৃত অর্থ হলো আনুগত্য স্বীকার করা ও অস্বীকৃতি, অবাধ্যতা, হটকারিতা হতে নিজকে দূরে রাখা। ঈমান প্রশ্নে, সত্যায়ন বা বিশ্বাস এক বিশেষ স্থান, তথা অন্তর দিয়ে হয়ে থাকে; যার প্রকাশক হলো মুখ, আর স্বীকার করা হয় মুখ, অন্তর ও প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে। অভিধানের ভাষায় ইসলাম একটি ব্যাপক বিষয়, আর ঈমান হলো একটি বিশেষ বিষয়। 

ইসলাম যদি একটি প্রকান্ড গাছ হয় ঈমান হলো তার একটি শাখা মাত্র। মূলতঃ ইসলামের শ্রেষ্ঠ অংশের নাম হলো ঈমান। ঈমানহীন কোন মানুষ কখনো একজন সত্যিকার মুসলিম হতে পারে না। যারা না বুঝে ভ্রান্ত সব ইসলামী গ্রুপের পাল্লায় পড়ে ঈমান নাশক টেবলেট খাচ্ছে, শহীদ বা গাজি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, হে আল্লাহ আপনি  তাদেরকে হেফাজত করুন এবং হেদায়েত দান করুন।
 
    শত সহস্র পথের মধ্যে
               সত্য কেবল একটি পথ।
   সেই পথের যাত্রী সবায়
               একই লক্ষ্য একই মত।
   কেউ কি কোন খবর রাখে
               তাদের লক্ষ্য-কাম্য কি?
   ভ্রান্ত পথের যাত্রী যারা
               তারাই-বা বুঝবে কি? 

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
০৮-০৯-২০১৪.