শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

খেলাফত থেকে রাজতন্ত্র :

হযরত হাসান (রাঃ) ছিলেন খুলাফায়ে রাশেদীনের পঞ্চম খলিফা; যার প্রমাণ মেলে এই হাদিস থেকে, "আমার পরে খেলাফতনীতি বহাল থাকবে ৩০ বছর; তারপর শুরু হবে রাজতন্ত্র।"—(দালাইল-ই নুবুওয়াত)। হযরত হাসান (রাঃ)-র শাসনামল যোগ করলে খেলাফত কাল মোট ৩০ বছর পূর্ণ হয়; রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত ১১ হিজরি'র রবিউল আউয়াল মাস, আর ৪১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে হযরত হাসান (রাঃ) ও মু'য়াবিয়া (রাঃ)-র মধ্যে সন্ধিচুক্তি হয়। চার শর্তে— 'মুয়াবিয়া আল্লাহর কিতাব এবং নবীর সুন্নত অনুসারে কাজ করবেন; মুয়াবিয়া তার উত্তরাধিকারী নিয়োগ করতে পারবেন না, তবে একটি নির্বাচন পরিষদ (শূরা) থাকবে; জনগণ যেখানেই থাকুক না কেন তারা নিজেরা, তাদের সম্পত্তি এবং তাদের বংশধরেরা নিরাপদ থাকবে; মুয়াবিয়া গোপনে বা প্রকাশ্যে হাসান বা আলি (রাঃ)-র বংশধরদের বিরুদ্ধে কোন অন্যায় করবেন না এবং সাহাবীদের কাউকে ভয় দেখাবেন না।'— হযরত হাসান (রাঃ) খেলাফত থেকে সরে দাঁড়ান।

এর আগে হযরত আলি (রাঃ) আহত থাকা অবস্থায় লোকজন তাঁকে বলেছিল, হে আমিরুল মু'মিনীন! আপনার পরে খলিফা কে হবে তা নির্ধারিত করে দিন। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, "না, তা আমি করবো না, বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে যেমন খলিফা না করে রেখে  গিয়েছিলেন আমিও তেমনই রেখে যাবো। মহান আল্লাহ যদি তোমাদের কল্যাণ চান তাহলে তোমাদের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠতম, তাঁর খলিফা নির্ধারণে তিনিই তোমাদের ঐক্যবদ্ধ করে দেবেন, যেমন রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর পরে উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির খলীফা নির্বাচনে তিনি তোমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে দিয়েছিলেন।"

খলিফাতুল মুসলিমীন ইন্তেকাল করলেন, তাঁর জেষ্ঠপুত্র হযরত হাসান (রাঃ) তাঁর জানাযার নামাজে ইমামতি করলেন। দাফন-কাফন শেষে সময়ের পরিক্রমায় গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বপ্রথম আজারবাইজানের গভর্ণর কায়স ইবনে সা'দ ইবনে উবাদা (রাঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-র সন্মুখে এলেন এবং বললেন, "আপনার হাত প্রসারিত করুন। আল্লাহর কিতাব ও রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর সুন্নাত বাস্তবায়নের মর্মে আমরা আপনার হাতে বায়'আত করবো।" এরপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-র আহবানে উপস্থিত লোকজন একে একে বায়'আত নিতে থাকেন; মুয়াবিয়া (রাঃ) শাসিত শ্যাম ছাড়া সমগ্র মুসলিম জাহানের গভর্ণরগণ ও সাধারণ লোকজনও এসে দলে দলে খেলাফতের বায়'আত গ্রহণ করেন।

খেলাফত থেকে রাজতন্ত্র- সে এক দীর্ঘ পরিক্রমা। তাই কোন ভূমিকা ছাড়াই শুরু করলাম; কারণ বহুদূর যেতে হবে, আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা যেন তৌফিক দান করেন। আমরা বর্তমান মুসলমানরা না বুঝেই ইসলামের ইতিহাসকে অবজ্ঞা করি; অথচ পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফের বেশির ভাগ আয়াতই ইতিহাস বর্ণনায় ব্যবহৃত। যে'সব ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার দীক্ষা দিয়েছেন স্বয়ং মা'বুদ মাওলা। দুনিয়ার বর্তমান মুসলিম প্রজন্ম ইতিহাস অবজ্ঞা করার বহুবিধ কারণ রয়েছে; মূল কারণ, জ্ঞানের স্বল্পতা; তথ্য থেকে সঠিক ঘটনা না বের করতে পারার ব্যর্থতা বা না বুঝতে পারা বা সঠিক ইতিহাস জাস্টিফাই করতে না পারার প্রবণতা। আমি নিজেও এক সময় এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলাম। ইসলামের সঠিক ইতিহাস জানতে গিয়ে জীবনে কত রাইটারের বই যে পড়েছি তার কোন ইয়ত্তা নেই; শেষ পর্যন্ত পেয়েছি এবং পেরেছি! জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যা আবিষ্কার করেছি সে'সবের নির্যাসই আজ আপনাদের জন্য তুলে ধরার ইচ্ছে পোষণ করছি। জ্ঞানপিপাসুদের জন্য লেখাটি হয়তো জোনাকিপোকা হয়ে উঠতে পারে (এ লেখার অনেক কিছুই বিভিন্ন কিতাব থেকে হুবহু তুলে ধরা হয়েছে)।

তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটা বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যায়, ক্ষমতার লোভে উমাইয়ারা তখন ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল; মুসলিম সাম্রাজ্যের আনাচেকানাচে আচমকা গুপ্ত হত্যা ও রাহাজানি চরমভাবে ছড়িয়ে দিয়েছিল। কেন্দ্রীয় খলিফার বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরে তারা ইসলামের বারোটা বাজিয়েছিল শুধুমাত্র দুনিয়ার ক্ষমতা দখলের অভিপ্রায়ে; আর তা বুঝতে পেরেছিলেন হযরত হাসান (রাঃ)। তিনি মনে করেছিলেন মুসলমানে মুসলমানে রক্তপাত আর কত ঘটবে? তা বন্ধ করতে তাঁর মসনদ থেকে সরে যাওয়া উচিত; তিনি তা করেও ছিলেন। অনেকের মতো এ সিদ্ধান্তে তাঁর আপন ছোটভাই হযরত হোসাইন (রাঃ)-ও দ্বিমত পোষণ করেছিলেন; কিন্তু হাসান (রাঃ) ছিলেন অটল। মুসলিম বিশ্বকে গৃহযুদ্ধ থেকে মুক্ত করে একক শাসন প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে সে সময়ে হযরত হাসান (রাঃ) যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমার বিবেচনায় তা যুগান্তকারী এবং সঠিক। অনেকের অভিমত মুয়া'বিয়া (রাঃ) হযরত হাসান (রাঃ)-এর চেয়ে খেলাফতের যোগ্যতর ছিলেন বলে হাসান (রাঃ) তার কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেন, প্রকৃতার্থে মোটেও তা না; সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল ইসলামের বৃহত্তর ও মহান স্বার্থে।

সুরা তওবা'র ১০০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা স্পষ্ট ঘোষণা করেন—"ওয়সসা-বিকুনাল আওয়্যালূনা মিনাল মুহা-জ্বিরীনা ওয়াল আনসা-রি ওয়ালল্লাযীনাততাবা‘ঊহুম বিইহ সা-নির রাদ্বিয়াল্লা-হু ‘আনহু ওয়ারাদূ 'আনহু ওয়া আ'আদ্দালাহুম জ্বান্না-তিন তাজরী তাহতাহাল আনহা-রু খা-লিদীনা ফীহাআবাদান যা-লিকাল ফাওঝুল ‘আজীম।" অর্থাৎ— "আর যেসব মুহাজির ও আনসার (ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী এবং প্রথম, আর যেসব লোক সরল অন্তরে তাদের অনুগামী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁতে সন্তুষ্ট আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত; যার মধ্যে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে; এটা মহাসাফল্য।"

এই আয়াতে তিন শ্রেণীর লোকের বর্ণনা বিদ্যমান; প্রথমতঃ মুহাজিরগণ, যাঁরা দ্বীনের খাতিরে আল্লাহ ও রসূলের আদেশ পালনার্থে মক্কা ও অন্যান্য এলাকা থেকে হিজরত করতঃ সকল কিছু ত্যাগ করে মদীনায় চলে যান। দ্বিতীয়তঃ আনসারগণ, এঁরা মদীনার অধিবাসী ছিলেন; এঁরা সর্বাবস্থায় রসূল (সাঃ)-এর সাহায্য ও সুরক্ষা বিধান করেছিলেন এবং মদীনায় আগত মুহাজিরদের যথাযথ সম্মান করেছিলেন এবং নিজেদের সবকিছু তাদের খিদমতে কুরবান করে দিয়েছিলেন। এখানে সেই উভয় শ্রেণীর 'ওয়াস-সাবিক্বূনাল আওয়ালূন' (অগ্রবর্তী ও প্রথম) ব্যক্তিবর্গের কথা বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ— সেই উভয় শ্রেণীর মধ্যে ঐ সকল ব্যক্তি যাঁরা সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। 

ওঁনারা কারা ছিলেন, তা নির্ধারণ করণে মতবিরোধ রয়েছে। অনেকের নিকট 'ওয়াস-সাবিক্বূনাল আওয়ালূন' তাঁরা, যাঁরা উভয় ক্বিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়েছেন। অর্থাৎ— ক্বিবলা পরিবর্তন হওয়ার পূর্বে যে সমস্ত মুহাজির ও আনসারগণ মুসলমান হয়েছিলেন তাঁরা। আবার অনেকের নিকট 'ওয়াস-সাবিক্বূনাল আওয়ালূন' ঐ সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম, যাঁরা হুদাইবিয়ায় অনুষ্ঠিত বাইআতে-রিযওয়ানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আবার অনেকের নিকট ওঁরা হলেন তাঁরা, যাঁরা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ইমাম শওকানী (রহঃ) বলেন, সকল অভিমতই সঠিক হতে পারে। তৃতীয়তঃ ঐ সকল ব্যক্তি, যাঁরা একনিষ্ঠভাবে সেই মুহাজির ও আনস্বারদের অনুগামী ছিলেন। কেউ কেউ বলেন, তাঁরা হলেন পারিভাষিক অর্থে তাবেয়ীগণ, যাঁরা নবী কারীম (সাঃ)-এর দর্শন লাভ করতে পারেননি, কিন্তু সাহাবায়ে কিরামগণের সাথী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। আবার কেউ কেউ তা সাধারণ রেখেছেন, অর্থাৎ— কিয়ামত পর্যন্ত যে সকল মুসলিম মুহাজির ও আনসারগণের সাথে মহব্বত রাখবেন ও তাঁদের আদর্শের উপর চলবেন, তাঁরা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত; এতে পারিভাষিক অর্থে তাবেয়ীগণও এসে যাচ্ছেন। 

'আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট' বাক্যটির অর্থ হলো, আল্লাহ তা'আলা তাঁদের সৎকর্ম গ্রহণ করেছেন, মানুষ হিসাবে তাঁদের কৃত ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তিনি তাঁদের উপর অসন্তুষ্ট নন। যদি তা না হত, তাহলে উক্ত আয়াতে তাঁদের জন্য জান্নাত ও জান্নাতের নিয়ামতের সুসংবাদ দেওয়া হল কেন? এই আয়াত দ্বারা এটাও জানা গেল যে, আল্লাহর এই সন্তুষ্টি সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং চিরস্থায়ী। যদি রসূলপাক (সাঃ)-এর মৃত্যুর পর সাহাবায়ে কিরামগণের মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত (যেমন এক বাতিল ফির্কার বিশ্বাস আছে), তাহলে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিতেন না। এ থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, যখন আল্লাহ তাআলা তাঁদের সমস্ত ত্রুটি মার্জনা করে দিয়েছেন, তখন তাঁদের সমালোচনা করে তাঁদের ভুল-ত্রুটি বর্ণনা করা কোন মুসলিমের উচিত নয়। বস্তুতঃ এটাও জানা গেল যে, তাঁদের প্রতি মহব্বত রাখা এবং তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা'র সন্তুষ্টি অর্জনের কারণ। আর তাঁদের প্রতি শত্রুতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা পোষণ করা আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা'র সন্তুষ্টি থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ। 

উক্ত তিন শ্রেণীর ছাড়াও ইসলাম গ্রহণকারী আরেকটি দল আছে, যারা সুবিধা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় বা ঠেলায় পড়ে মুসলমান হয়েছিল; ইসলামের পরিভাষায় তাদেরকে বলে 'তোলাকা'। মক্কা বিজয়ের দিন যারা খানায়ে কাবায় বা আবু সুফিয়ানের বাড়িতে নিরুপায় হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল এবং ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তাদের বেশিরভাগই তোলাকা; আবু সুফিয়ানের ইসলাম কবুল করার ঘটনা দিয়েই তা অনুধাবন করা যায়। যেমন—

আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ইসলাম প্রতিষ্ঠার অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত ইসলামের চরম শত্রু ছিলেন, মক্কা বিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। সহীহ বর্ণনায় এসেছে— মক্কা বিজয়ের আগের রাতে ভীত ও শংকিত কুরায়েশ নেতা আবু সুফিয়ান, হাকীম বিন হেযাম ও বনু খোযা‘আহ নেতা বুদাইল বিন ওয়ারক্বা মুসলমানদের খবর জানার জন্য রাত্রিতে ময়দানে বের হয়ে এসেছিলেন। তারা হঠাৎ গভীর রাতে দিগন্তব্যাপী আগুনের শিখা দেখে হতচকিত হয়ে পড়েন ও একে অপরে নানারূপ আশংকার কথা বলাবলি করতে থাকেন। এমন সময় হযরত আববাস (রাঃ) তাদের কণ্ঠস্বর চিনতে পারেন ও কাছে এসে বলেন, কি দেখছ, এগুলি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সেনাবাহিনীর জ্বালানো আগুন। একথা শুনে ভীত কম্পিত আবু সুফিয়ান বলে উঠলেন, ‘তোমার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গীত হৌন- এখন বাঁচার উপায় কি? আববাস (রাঃ) বললেন, ‘আল্লাহর কসম! তোমাকে পেয়ে গেলে তিনি অবশ্যই তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবেন’। অতএব এখুনি আমার খচ্চরের পিছনে উঠে বস এবং চলো রাসূল (সাঃ)-এর কাছে গিয়ে আমি তোমার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করছি’। কোনরূপ দ্বিরুক্তি না করে আবু সুফিয়ান খচ্চরের পিছনে উঠে বসলেন এবং তার সাথী দু’জন ফিরে গেলেন।

রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তাঁবুতে পৌঁছার আগ পর্যন্ত সকলে রাসূল (সাঃ)-এর সাদা খচ্চর ও তাঁর চাচা আববাসকে দেখে সসম্মানে পথ ছেড়ে দিয়েছে। ওমরের নিকটে পৌঁছলে তিনি উঠে কাছে এলেন এবং পিছনে আবু সুফিয়ানকে দেখেই বলে উঠলেন, ‘আবু সুফিয়ান, আল্লাহর দুশমন! আলহামদুলিল্লাহ কোনরূপ চুক্তি ও অঙ্গীকার ছাড়াই আল্লাহ তোমাকে আমাদের নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছেন’। বলেই তিনি রাসূল (সাঃ )-এর তাঁবুর দিকে চললেন। আববাস (রাঃ) বলেন, আমিও দ্রুত খচ্চর হাঁকিয়ে দিলাম এবং তার আগেই রাসূল (সাঃ)-এর নিকটে পৌঁছে গেলাম। অতঃপর তাঁর সম্মুখে বসে গেলাম। ইতিমধ্যে ওমর এসে পৌঁছলেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! এই সেই আবু সুফিয়ান! আমাকে হুকুম দিন ওর গর্দান উড়িয়ে দেই’। আববাস (রাঃ) তখন রাসূল (সাঃ )-কে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে আশ্রয় দিয়েছি’। অতঃপর আমি রাসূল (সাঃ )-এর কাছে উঠে গিয়ে কানে কানে বললাম, ‘আল্লাহর কসম! আমি ছাড়া অন্য কেউ আজ রাতে আপনার সাথে গোপনে কথা বলবে না’। এরপর ওমর ও আববাসের মধ্যে কিছু বাক্য বিনিময় হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, হে আববাস! এঁকে আপনার তাঁবুতে নিয়ে যান। সকালে ওঁকে নিয়ে আমার কাছে আসুন’।

সকালে তাঁর নিকটে গেলে তিনি আবু সুফিয়ানকে বললেন, ‘তোমার জন্য দুঃখ হে আবু সুফিয়ান! আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, একথা উপলব্ধি করার সময় কি তোমার এখনো আসেনি’? আবু সুফিয়ান বললেন, ‘আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গীত হউন! আপনি কতইনা সহনশীল, কতই না সম্মানিত ও কতই না আত্মীয়তা রক্ষাকারী। আমি বুঝতে পেরেছি যে, যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য থাকত, তাহ’লে এতদিন তা আমার কিছু কাজে আসত’। তখন রাসূল (সাঃ ) বললেন, 'তোমার জন্য দুঃখ হে আবু সুফিয়ান! আমি যে আল্লাহর রাসূল একথা উপলব্ধি করার সময় কি তোমার এখনো আসেনি’? আবু সুফিয়ান বললেন, আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গীত হৌন! আপনি কতই না সহনশীল, কতই না সম্মানিত এবং কতই না আত্মীয়তা রক্ষাকারী, ‘কেবল এই ব্যাপারটিতে আমার মনের মধ্যে এখনো কিছুটা সংশয় রয়েছে’। সঙ্গে সঙ্গে ধমকের সুরে আববাস (রাঃ) তাকে বললেন, ‘তোমার ধ্বংস হৌক! গর্দান যাওয়ার পূর্বে ইসলাম কবুল কর এবং সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’। সঙ্গে সঙ্গে আবু সুফিয়ান কালেমায়ে শাহাদাত পাঠের মাধ্যমে ইসলাম কবুল করলেন।

অতঃপর হযরত আববাস (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ‘আবু সুফিয়ান গৌরব প্রিয় মানুষ। অতএব এ ব্যাপারে তাকে কিছু প্রদান করুন’। রাসূলুল্লাহ (সাঃ ) বললেন, 'বেশ, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি তার ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে, সে নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি অস্ত্র ফেলে দিবে, সে নিরাপদ থাকবে এবং যে ব্যক্তি মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ থাকবে’। —(ইবনু হিশাম : ২/৪০৩; মুসলিম : হাদীস-১৭৮০; আবুদাঊদ :  হাদীস-৩০২১; মিশকাত : হাদীস-৬২১০।)

সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রমাণিত এবং এই কথাটি প্রায় সবার কাছে প্রকাশিত যে, মানবসৃষ্ট রাষ্ট্রনীতি রাজতন্ত্র এবং রাজার রাজনীতি খুবই খতরনাক ব্যাপারস্যাপার; কিন্তু আল্লাহর খেলাফত সম্পূর্ণ আলাদা বরকতময় একটি জিনিস। 'খেলাফত' শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রতিনিধিত্ব করা, অন্য কারো স্থানে স্থলাভিষিক্ত হওয়া। আর 'খলিফা' শব্দের অর্থ প্রতিনিধি, স্থলাভিষিক্ত; 'খলিফা' শব্দের বহুবচন 'খুলাফা' এবং 'খালাইফ'। ইসলামে 'খেলাফত' এমন একটি শাসন ব্যবস্থার নাম যা মহান আল্লাহর বিধান ও মহানবী (সাঃ)-এর সুন্নাহ দ্বারা পরিচালিত। এই শাসন ব্যবস্থায় সার্বভৌমত্বের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা। তিনিই বিশ্বজগতের স্রষ্টা এবং সর্বোচ্চ শাসক। মানুষের মর্যাদা হলো, সে সর্বোচ্চ শাসকের প্রতিনিধি বা খলিফা এবং তার রাজনৈতিক ব্যবস্থা হবে সর্বোচ্চ শাসকের বিধানের অধীন। খলিফার কাজ হলো, সর্বোচ্চ শাসক আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা'র আইনকে তাঁর প্রকৃত লক্ষ্য অনুযায়ী কার্যকর করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা।

খেলাফত সম্পর্কে খুলাফায়ে রাশেদিন এবং রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সাহাবিদের সর্বসম্মত অভিমত ছিল— খেলাফত একটি নির্বাচনভিত্তিক পদমর্যাদা; মুসলমানদের পারস্পরিক পরামর্শ এবং তাঁদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের মাধ্যমেই তা কায়েম করতে হবে। বংশানুক্রমিকভাবে বা বল প্রয়োগের দ্বারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া কিংবা নেতৃত্ব দেয়া তাদের মতে খেলাফত নয়, বরং তা রাজতন্ত্র। খেলাফত ও রাজতন্ত্রের যে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ধারণা সাহাবি (রা:)-গণ পোষণ করতেন, হজরত আবু মুসা আল-আশ‘আরি (রাঃ) তা ব্যক্ত করেছেন এভাবে— 'খেলাফত হচ্ছে তাই, যা প্রতিষ্ঠা করতে পরামর্শ নেয়া হয়েছে; আর তরবারির জোরে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা হচ্ছে বাদশাহী বা রাজতন্ত্র।'

ইসলামের এই খেলাফত ব্যবস্থা সর্বজনীন। আল্লাহর এই প্রতিনিধিত্বের অধিকার বিশেষ কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা বিশেষ কোনো শ্রেণীর জন্য নির্দিষ্ট বা সংরক্ষিত নয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাসী এবং তাঁদের বিধান ও আইন মান্যকারী সব মানুষই আল্লাহর দেয়া এই প্রতিনিধিত্বের সমান অধিকারী। এ প্রসঙ্গে কুর'আনুল কারীমায় বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার ও সৎকর্মশীল আল্লাহ তাঁদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন।’ —(সূরা আন নূর : ৫৫)। 

ইসলামে নবুওয়াতের পদমর্যাদার পর এই খেলাফত ব্যবস্থাই সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন এবং এ পদটি পবিত্র দায়িত্বপূর্ণ পদ। বস্তুত ইসলামে খেলাফতের দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত ব্যাপক ও সর্বাত্মক। যাবতীয় বৈষয়িক, ধর্মীয় ও তমদ্দুনিক উদ্দেশ্যের পূর্ণতা বিধান এরই ভিত্তিতে হয়ে থাকে। রাসূলের কার্যাবলিকে চালু ও প্রতিষ্ঠিত রাখা এবং যেকোনো প্রকার মিশ্রণ বা ভেজাল থেকে তা সংরক্ষণ ও উৎকর্ষ সাধন করা খেলাফতের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

হজরত আলি (রাঃ) বলেন, "মহানবী (সাঃ) বলেছেন, হজরত আবু বকর (রাঃ) এবং হজরত উমর (রাঃ) নবী-রাসূলগণ ব্যতীত পৃথিবীর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত জান্নাতবাসী বয়স্ক লোকদের নেতা হবেন।" —(জামে তিরমিজি)।
হজরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) বলেন, "রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আলি (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেছেন, হজরত মুসা (আঃ)-এর কাছে হজরত হারুন (আঃ)-এর যে মর্যাদা ছিল, তুমিও আমার কাছে সেই মর্যাদায় অভিষিক্ত। তবে আমার পরে কোনো নবী নেই।" — (সহিহ বুখারি)।

খোলাফায়ে রাশেদার ৩০ বছর শাসনকাল ৬৩২ খ্রি. থেকে ৬৬১ খ্রি. পর্যন্ত পর্যালোচনা করলে একজন খলিফার যে বৈশিষ্ট্যগুলো জানা যায় তা সমগ্র মানবজাতিকে বিমোহিত করে—
১) খুলাফায়ে রাশেদিনের আমল হুজুরপাক (সাঃ)-এর পবিত্র জীবনাদর্শ উজ্জ্বল প্রদীপে পরিণত হয়েছিল এবং তা সমগ্র পরিমণ্ডলকে নির্মল আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত করে রেখেছিল। খলিফাগণের প্রতিটি কাজে ও চিন্তায় তার গভীর প্রভাব বিদ্যমান। হযরত হাসান (রাঃ)-সহ পূর্ববর্তী চারজন খলিফাই হুজুরপাক (সাঃ)-এর একান্ত প্রিয়পাত্র ও বিশিষ্ট সাহাবি ছিলেন। তাঁরা ছিলেন তাঁর সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত এবং তাঁর উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত প্রাণ। হজরত আলি (রাঃ) ও হাসান (রাঃ) ব্যতীত অন্য তিনজন খলিফা মহানবী (সাঃ)-এর দ্বিতীয় কর্মকেন্দ্র ও শেষ শয্যাস্থল মদিনায় রাজধানী রেখেই খিলাফতের প্রশাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করেছিলেন।
২) তাঁরা ছিলেন মুসলিম উম্মাহর সর্বাপেক্ষা অধিক আস্থাভাজন। আধুনিক কালের পদ্ধতিতে নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন হলেও তখন কেবল তাঁরাই যে সর্বাধিক ভোটে নির্বাচিত হতেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
৩) খেলাফতে রাশেদার আমলে আইন প্রণয়নের ভিত্তি ছিল কুরআন ও সুন্নাহ। যে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশ পাওয়া যেত না, সে বিষয়ে ইজতিহাদ করে সুষ্ঠু সমাধান বের করার চেষ্টা করা হতো এবং এ ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহয় পারদর্শী প্রত্যেক নাগরিকেরই মতামত দেয়ার সমান অধিকার স্বীকৃত ছিল।
৪) খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে রাজকীয় ভোগবিলাস, জাঁকজমক ও শান-শওকতের কোনো স্থান ছিল না। খলিফাগণ একান্তই সাধারণ নাগরিকদের ন্যায় জীবনযাপন করতেন। তাঁদের কোনো দেহরক্ষী ছিল না। লোকজন যখন ইচ্ছা খলিফার নিকট উপস্থিত হতে পারতেন।
৫) খুলাফায়ে রাশেদিন বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রের সরকারি কোষাগারকে জাতীয় সম্পদ ও আমানতের ধন মনে করতেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মঞ্জুরি ব্যতীত নিজের জন্য একটি কপর্দকও কেউ ব্যয় করতেন না।
৬) তাঁরা নিজেদেরকে জনগণের খাদেম মনে করতেন। কোনো ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেদেরকে জনসাধারণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ধারণা পোষণ করতেন না। তাঁরা কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই জননেতা ছিলেন না, নামাজ ও হজ্জ প্রভৃতি ধর্মীয় ব্যাপারেও যথারীতি তাঁরাই নেতৃত্ব দিতেন।

খেলাফতে রাশেদার বৈশিষ্ট্য এবং মূলনীতিগুলো এতোক্ষণ পর্যালোচনা করা হলো। বস্তুত খেলাফতে রাশেদা কেবল একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাই ছিল না, বরং তা ছিল নবুয়াতের পূর্ণ প্রতিনিধিত্বশীল একটি ব্যবস্থা অর্থাৎ দেশের শাসন-শৃংখলা বজায় রাখা, শান্তি স্থাপন ও সীমান্ত রক্ষা করাই কেবল তাঁর দায়িত্ব না; বরং তাঁরা মুসলমানদের সামাজিক জীবনে শিক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক এবং পথ-প্রদর্শকের এমন সব দায়িত্ব পালন করতেন, যা নবী কারীম (সাঃ) তাঁর জীবনে পালন করেছেন। দারুল ইসলাম তথা ইসলামী রাষ্ট্রে সত্য-সনাতন দ্বীনের পরিপূর্ণ ব্যবস্থাকে তার সত্যিকার আকার-আঙ্গিক এবং প্রাণ-ধারায় সঞ্জীবিত করে পরিচালনা করা এবং বিশ্বে মুসলমানদের গোটা সামাজিক শক্তি নিচয়কে আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করার কাজে নিয়োজিত করাই ছিল তাঁদের দায়িত্ব। এ কারণে তাঁদেরকে কেবল খেলাফতে রাশেদা না বলে বরং এ সঙ্গে খেলাফতে মুরশেদা, সত্য-পথ প্রদর্শক খেলাফত বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত হবে। খেলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়াত, নবুয়াতের পদাংক অনুসারী খেলাফত কথাটিতে এ উভয় বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। এ ধরনের রাষ্ট্রই ইসলামের অভিপ্রেত, নিছক রাজনৈতিক শাসন-কতৃত্ব নয়, দ্বীনের সামান্য জ্ঞানসম্পন্ন কোন ব্যক্তিই এ সম্পর্কে অনবহিত থাকতে পারে না।

যে সকল পর্যায় অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত এ খেলাফত রাজতন্ত্রের রূপ পরিগ্রহ করেছে, এখানে আমরা সেগুলো পর্যালোচনা করবো। এ পরিবর্তন মুসলমানদের রাষ্ট্রকে ইসলামের শাসননীতি থেকে কতটা দূরে সরিয়ে নিয়েছে, মুসলমানদের সমাজ জীবনে তার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তাও আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। 
 
পরিবর্তনের সূচনা—

হযরত ওমর (রাঃ) যেখান থেকে এ পরিবর্তনের আশংকা করেছিলেন, ঠিক সেখান থেকেই এ পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। ওফাতের নিকটবর্তী সময়ে যে বিষয়ে তিনি সবচেয়ে বেশী অশংকা করতেন, তা ছিল এই যে, তাঁর স্থলাভিষিক্তরা যেন তাদের বংশ, গোত্র এবং নিকটাত্মীয়দের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর সময় থেকে তাঁর (হযরত ওমর) শাসনকাল পর্যন্ত অব্যাহত নীতির পরিবর্তন না করে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর গোটা শাসনামলে হযরত আলি (রাঃ) ব্যতীত বনী হাশেমের অপর কোন ব্যক্তিকে কোন পদ দান করেননি। হযরত আলি (রাঃ) তাঁর খেলাফত কালে নিজের বংশ-গোত্র থেকে কাউকে কোন পদ দান করেননি। হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর দশ বৎসরের শাসনামলে বনী আদীর কেবলমাত্র একজন লোককে একটি ক্ষুদ্র পদে নিযুক্ত করেন এবং অবিলম্বেই তাকে সে পদ থেকে বরখাস্ত করেন; এ কারণে সে সময় গোত্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পায়নি। হযরত ওমর (রাঃ)-এর আশংকা ছিল, এ নীতি পরিবর্তিত হলে তা মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হবে। তাই তিনি তাঁর তিনজন সম্ভাব্য উত্তরসূরী— হযরত ওসমান, হযরত আলী এবং হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)-কে পৃথক পৃথকভাবে ডেকে ওসিয়াত করেন, "আমার পরে তোমরা খলীফা হলে তোমাদের গোত্রের লোকদেরকে মুসলমানদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে না।" —[‘তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৬৪; তাবাকাতে ইবনে সা’দ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪০, ৩৪১, ৩৪৩, ৩৪৪।]

কিন্তু তাঁর পরে হযরত ওসমান (রাঃ) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে ধীরে ধীরে এ নীতি থেকে দূরে সরে যান। তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে একের পর এক বিরাট বিরাট সব পদ দান করতে থাকেন। তিনি তাদেরকে এমনসব সুযোগ-সুবিধা দান করেন, যা জনগণের মধ্যে সাধারণভাবে সমালোচনার লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়। উদাহরণ স্বরূপ— তিনি আফ্রিকার গনীমতের মালের এক-পঞ্চমাংশের সম্পূর্ণ অংশই (৫ লক্ষ দীনার) মারওয়ানকে দান করেন। এ ঘটনা সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনুল আসীর তাঁর গবেষণা বিবৃত করেছেন এ ভাবে— আবদুল্লাহ ইবনে সা’দ ইবনে আবিসারাহ আফ্রিকার গনিমাতের মালের এক-পঞ্চমাংশ মদীনায় নিয়ে আসেন এবং মারওয়ান ইবনুল হাকাম ৫ লক্ষ দীনার দিয়ে তা খরদী করেন। অতঃপর হযরত ওসমান (রাঃ) তার নিকট থেকে এ মূল্য গ্রহণ করেননি। যেসব কারণে হযরত ওসমান (রাঃ)-র সমালোচনা করা হয়, এটা ছিল তার অন্যতম। আফ্রিকার মালে গনীমতের এক-পঞ্চমাংশ সম্পর্কে যতো বর্ণনা পাওয়া যায় এ বর্ণনা তন্মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ। 
কেউ কেউ বলেন, হযরত ওসমান (রাঃ) আফ্রিকার গনীমতের মালের এক-পঞ্চমাংশ আবদুল্লাহ ইবনে সা’আদকে দান করেন; আবার কেউ কেউ বলেন, মারওয়ান ইবনে হাকামকে দান করেন। এ বর্ণনা থেকে এ তত্ত্ব জানা যায় যে, হযরত ওসমান (রাঃ) আফ্রিকার প্রথম যুদ্ধের গনীমাতের মালের এক-পঞ্চমাংশ আব্দুল্লাহ ইবনে সা’দকে দান করেন, আর দ্বিতীয় যুদ্ধ— যাতে আফ্রিকার গোটা এলাকা বিজিত হয় তার গনীমাতের মালের এক-পঞ্চমাংশ মারওয়ানকে দান করেন। —(আল-কামেল ফিত তারীখ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬, মাতবাআতুত তিবআতীল মুনীরিয়্যাহ, মিসর ১৩৪৮ হিজরী।) ইবনে সা’আদও তাবাকাত-এ ইমাম যুহরীর সনদে বর্ণনা করেন— হযরত ওসমান (রাঃ) মিসরের গনীমতের মালের এক-পঞ্চমাংশ মারওয়ানকে লিখে দিয়েছেন —(৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৬৪)। ইমাম যুহরীর এ বর্ণনা সম্পর্কে আপত্তি করা চলে যে, ইবনে সা’আদ এ বর্ণনাটি ওয়াকেদীর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন; আর ওয়াকেদী বিশ্বাসভাজন বর্ণনাকারী নয়। 

প্রথমতঃ সকল মুহাদ্দিদসই ইবনে সা'আদকে নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বাসভাজন বলে স্বীকার করেন। তাঁর সম্পর্কে স্বীকার করা হয় যে, তিনি যাচাই-বাছাই করে রেওয়ায়াত গ্রহণ করতেন। এ কারণে তাঁর কিতাব তাবাকাত ইসলামের ইতিহাসের একান্ত নির্ভরযোগ্য উৎস বলে স্বীকৃত। দ্বিতীয়তঃ স্বয়ং ওয়াকেদী সম্পর্কেও জ্ঞানীরা এ কথা জানেন যে, আহকাম এবং সুনান সম্পর্কে তাঁর হাদীসকে রদ করা হয়েছে। বাকি থাকে ইতিহাস এবং বিশেষ করে মাগাযী এবং সিয়ার অধ্যায়। এ ব্যাপারে কে ওয়াকেদীর বর্ণনা গ্রহণ করেননি। ইতিহাসের ব্যাপারে কোন ব্যক্তি যদি বর্ণনার প্রমাণের জন্য হুবুহু এমনসব শর্ত আরোপ করে শরীয়তের বিধানের ক্ষেত্রে মুদহাদ্দিদসগণ যা আরোপ করেছেন, তাহলে ইসলামের ইতিহাসের শতকরা ৯০ ভাগ বরং তার চেয়েও বেশী অংশকে বাদ দিতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, ইবনে খালদুন সহ কেউ কেউ যাঁকে অন্যদের চেয়ে বেশী বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেন, তিনি ইবনে আসীর এবং ইবনে সা’দের এ বর্ণনা সমর্থন করেছেন; দ্রষ্টব্য দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট পৃষ্ঠা- ১৩৯-১৪০। 

হযরত ওসমান (রাঃ) হযরত সা’আদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)-কে পদচ্যুত করে তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই ওয়ালীদ ইবনে উকবা ইবনে আবী মোয়াইতকে কুফার গবর্ণর নিযুক্ত করেন। এরপরে তাঁর অপর এক বন্ধু সাঈদ ইবনে আ’সকে এ পদ দান করেন। হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে বসরার গবর্ণরের পদ থেকে বরখাস্ত করে তাঁর মামাত ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আমেরকে তাঁর স্থলে নিয়োগ করেন। হযরত আমর ইবনুল আসকে মিসরের গভর্ণরী থেকে সরিয়ে নিজের দুধভাই আবদুল্লাহ ইবনে সা’আদ ইবনে আবিসারাহকে নিযুক্ত করেন। সাইয়্যেদুনা হযরত ওমর ফারুক (রাঃ)-এর জামানায় হযরত মুআবিয়া (রাঃ) কেবল সিরিয়ার শাসনকর্তা ছিলেন। হাফেয ইবনে কাসীর বলেন— 'সত্য কথা এই যে, হযরত ওসমান (রাঃ) সিরিয়ার গোটা এলাকা হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ)-র গভর্ণরীতে সংযোজন করেন। হযরত ওমর (রাঃ) তাঁকে কেবল সিরিয়ার অংশবিশেষের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন।’ —(আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২৪।) হযরত ওসমান (রাঃ) দামেস্ক, হেমছ, ফিলিস্তিন, জর্দান এবং লেবাননের গোটা এলাকা তাঁর শাসনাধীন করে দেন। 

অতঃপর তাঁর চাচাতো ভাই মারওয়ান ইবনুল হাকামকে তিনি তাঁর সেক্রেটারী নিযুক্ত করেন, যার ফলে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তার প্রভাব প্রতিপত্তি পড়ে। এমনি করে একই বংশের হাতে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়।

কেবল সাধারণ লোকদের উপরই নয়, বড় বড় সাহাবীদের উপরও এসব বিষয়ের প্রতিক্রিয়া খুব একটা শুভ হয়নি, হতেও পারে না। উদাহরণস্বরুপ— ওয়ালীদ ইবনে ওকবা কুফার গভর্ণরীর পরওয়ানা নিয়ে হযরত সা’আদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)-র নিকট উপস্থিত হলে তিনি বলেন, ‘জানি না, আমার পরে তুমি বেশী জ্ঞানী হয়ে গেছো, না আমি বোকা হয়ে গেছি।’ তিনি জবাব দেন, 'আবু ইসহাক! ক্রুদ্ধ হয়ো না, এটাতো বাদশাহী। সকালে একজন এ নিয়ে মৌজ করে, সন্ধ্যায় আরেক জন।’ হযরত সা’আদ (রাঃ) বলেন, 'বুঝতে পেরেছি, সত্যিই তোমরা একে বাদশাহী বানিয়ে ছাড়বে।’ প্রায় এহেন মনোভাব হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-ও ব্যক্ত করেন। —(ইবনে আবদুল বার আল-এস্তীআব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৬০৪।)

এটা কেউ অস্বীকার করতে পারে না যে, হযরত ওসমান (রাঃ) নিজের বংশের যেসব ব্যক্তিদেরকে এসব সরকারী পদ দান করেন, তাঁরা নিজেদের উন্নত পর্যায়ের প্রশাসনিক এবং সামরিক দক্ষতা প্রমাণ করেছেন তাঁদের হাতে বহু ভূখন্ড বিজিত হয়েছে; কিন্তু এ কথা সুস্পষ্ট যে, যোগ্যতা কেবল এদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উৎকৃষ্ট যোগ্যতার অধিকারী আরও অনেকেই বর্তমান ছিলেন; তাঁরা ইতিপূর্বে এদের চেয়েও উত্তম খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন। খোরাসান থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত গোটা এলাকা একই বংশের গভর্ণরদের অধীনে আনা এবং কেন্দ্রীয় সেক্রেটারীয়েটেও একই বংশেরই লোক নিয়োগ করার জন্য নিছক যোগ্যতাই একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। রাষ্ট্রপ্রধান যে বংশের হবেন, রাষ্ট্রের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে সে বংশের লোকদের নিয়োগ করা প্রথমতঃ এমনিতেই আপত্তিকর। কিন্তু এ ছাড়াও আরো এমন কিছু কার্যকরণ ছিল, যার ফলে পরিস্থিতিতে আরও জটিলতা দেখা দেয়।

প্রথমতঃ উমাইয়া খান্দানের যেসব লোক হযরত ওসমান (রাঃ)-এর সময়ে অগ্রসর হয়েছেন, তাঁরা সকলেই ছিলেন তোলাকা। তোলাকা মানে হচ্ছে মক্কার এমন এক বংশ, যারা শেষ পর্যন্ত নবী (সঃ) এবং ইসলামী দাওয়াতের বিরোধী ছিল। মক্কা বিজয়ের পর হুজুরপাক (সঃ) তাদেরকে ক্ষমা করেন এবং তারা ইসলাম গ্রহণ করে। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) ওয়ালীদ ইবনে ওকবা (রাঃ) এবং মারওয়ান ইবনুল হাকাম এ ক্ষমাপ্রাপ্ত সেই বংশের লোকজন ছিলেন। আর আবদুল্লাহ ইবনে সা'আদ ইবনে আবি সারাহ তো মুসলমান হওয়ার পরে মুর্তাদ হয়ে যান। মক্কা বিজয়ের পর যেসব ব্যক্তি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সঃ) নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, এরা খানায়ে কাবার গিলাফ জড়িয়ে ধরে থাকলেও এদেরকে হত্যা করে দাও, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। হযরত ওসমান (রাঃ) তাকে নিয়ে হঠাৎ রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সামনে উপস্থিত হন এবং তিনি নিছক হযরত ওসমানের মর্যাদার খাতিরে তাকে ক্ষমা করে দেন। প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম সারির মুসলমানগণ, ইসলামের বিজয়ের জন্য যাঁরা নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, যাঁদের ত্যাগ-কুরবানীর ফলে আল্লাহ-র দ্বীন বিজয়ী হয়েছে, তাঁদেরকে পেছনে সরিয়ে দিয়ে এরা উম্মাতের নেতা হবে— স্বভাবত এটা কেউ পছন্দ করতে পারেননি।

দ্বিতীয়তঃ ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বের জন্য এরা উপযুক্তও ছিলেন না; কারণ, তারা ঈমান অবশ্য এনেছিলেন, কিন্তু নবী করীম (সাঃ)-এর সান্নিধ্যে প্রশিক্ষণ দ্বারা এতটুকু উপকৃত হওয়ার তাদের সুযোগ হয়নি, যাতে তাদের মন-মানসিকতা এবং নীতি-নৈতিকতার আমুল পরিবর্তন সূচিত হতে পারে। তারা উৎকৃষ্ট ব্যবস্থাপক, প্রশাসক এবং বিজেতা হতে পারেন; বাস্তবে তারা তাই প্রমাণিত হয়েছেন, কিন্তু ইসলাম তো নিছক রাজ্য জয় আর দেশ শাসনের জন্য আসেনি। ইসলাম প্রথম এবং মূলতঃ মঙ্গল-কল্যাণের একটি ব্যাপক আহ্বান বিশেষ। এর নেতৃত্বের জন্য প্রশাসনিক এবং সামরিক যোগ্যতার চেয়ে মানসিক এবং নৈতিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন বেশী দরকার। আর এ বিবেচনায় এদের স্থান ছিল সাহাবা-তাবেঈনদের প্রথম সারিতে নয়, বরং পেছনের সারিতে। 

এ প্রসঙ্গে উদাহরণস্বরূপ মারওয়ান ইবনে হাকামের অবস্থাটাই লক্ষণীয়। তাঁর পিতা হাকাম ইবনে আবিল আস হযরত ওসমান (রাঃ)-এর চাচা ছিলেন। তিনি মক্কা বিজয়ের সময় মুসলমান হন এবং মদীনায় এসে অবস্থান করতে থাকেন। কিন্তু তাঁর কোন কোন আচরণের কারণে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে মদীনা থেকে বের করে দেন এবং তায়েফে বসবাসের নির্দেশ দেন। ইবনে আবদুল বার তাঁর আল এস্তীআব-এ এর অন্যতম কারণ বর্ণনা করে বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বড় বড় সাহাবীদের সাথে একান্তে যেসব পরামর্শ করতেন, তিনি কোন না কোন প্রকারে তা সংগ্রহ করে ফাঁস করে দিতেন। দ্বিতীয় কারণ তিনি এই বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)- এর ভান ধরতেন; এমনকি রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে এমনটি করতেও দেখে ফেলেন। —(আল-এস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১১৮-১১৯, ২৬৩) 

যাই হোক, যেকোন মারাত্মক অপরাধের কারণে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে মদীনা ত্যাগের নির্দেশ দেন; মারওয়ানের বয়স তখন ৭-৮ বছর। তিনিও পিতার সঙ্গে তায়েফে বসবাস করতে থাকেন। হযরত আবুবকর (রাঃ) খলীফা হলে তাঁর কাছে তাঁকে ফিরিয়ে আনার অনুমতি চাওয়া হলে তিনি অস্বীকার করেন। হযরত ওমর (রাঃ) এর সময়েও তাঁকে ফিরিয়ে আনার অনুমতি চাওয়া হলে তিনিও অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। মারওয়ান বা হাকামকে মদীনায় আসার অনুমতি দেয়া হয়নি। হযরত ওসমান (রাঃ) তাঁর খেলাফতকালে তাঁকে ডেকে আনেন, এবং এক বর্ণনা অনুযায়ী তিনি এর কারণ এই বর্ণনা করেন যে, 'আমি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট তার জন্য সুপারিশ করেছিলাম, তিনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে, তাকে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দেবেন।' এমনি করে পিতা-পুত্র উভয়ে তায়েফ থেকে মদীনা চলে আসেন। —(ইবনে হাজার; আল-এসাবা, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪৪, ৩৪৫; আর রিয়াযুন নায়েরাহ, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠ- ১৪৩।)

মারওয়ানের এ পটভূমির প্রতি লক্ষ্য করলে এ কথা ভালভাবেই হৃদয়ঙ্গম করা যায় যে, তাঁর সেক্রেটারী পদে নিয়োগকে লোকেরা কিছুতেই সহ্য করতে পারেননি। হুজুরপাক (সাঃ) হযরত ওসমান (রাঃ) এর সুপারিশ গ্রহণ করে তাঁকে ফিরিয়ে আনার ওয়াদা করেছিলেন— জনগণ হযরত ওসমান (রাঃ)-র কথায় আস্থা স্থাপন করে এটা মেনে নিয়েছিলেন। তাই তাকে মদীনায় ডেকে আনাকে তাঁরা আপত্তিকর মনে করেননি। কিন্তু বড় বড় সাহাবীকে বাদ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর বিরাগভাজন ব্যক্তির পুত্রটিকেই সেক্রেটারী করার ব্যাপারটি মেনে নেয়া তাদের জন্য বড়ই কঠিন হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে তার বিরাগভাজন পিতা তখন জীবিত এবং পুত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কার্যে তার প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা ছিল। প্রকাশ থাকে যে, হাকাম হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শেষ সময় পর্যন্ত জীবিত ছিলেন; হিজরী ৩২ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।

তৃতীয়তঃ তাদের কারো চরিত্র এমন ছিল যে, সে সময়ের পবিত্রতর ইসলাম সমাজে তাদের মতো লোকদেরকে উচ্চপদে নিয়োগ করা কোন শুভ প্রভাব প্রতিফলিত করতে পারতো না। উদাহরণস্বরূপ— ওয়ালীদ ইবনে ওকবার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে; ইনিও ছিলেন মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে বনীল মুস্তালিকের সদকা উসুল করার জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি তাদের এলাকায় পৌঁছে কোন কারণে ভীত হয়ে ফিরে আসেন। তাদের সাথে সাক্ষাৎ না করেই তিনি মদীনায় ফিরে এসে উল্টো রিপোর্ট দেন যে, 'বনীল মুস্তালিক যাকাত দানে অস্বীকার করেছে এবং আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে।' এতে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের বিরুদ্ধে এক সামরিক বাহিনী প্রেরণ করেন। এক বিরাট অঘটন ঘটার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু কবীলার সর্দাররা এ সম্পর্কে যথাসময়ে অবহিত হন। তাঁরা মদীনায় হাজির হয়ে আরজ করেন, 'ইনি তো আমাদের নিকটই আসেননি। আমরা প্রতীক্ষা করছিলাম, কেউ আমাদের নিকট এসে যাকাত উসুল করে নিয়ে যাবে।' 

এ উপলক্ষে কুর'আনের নিন্মোক্ত আয়াতটি নাযিল হয় — "ঈমানদাররা! কোন ফাসেক ব্যক্তি তোমাদের কাছে এসে কোন খবর দিলে তোমরা অনুসন্ধান করো। তোমরা অজানা অবস্থায় কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং পরে নিজেদের কর্মকান্ডের জন্য অনুতাপ করবে- এমন যেন না হয়।" —(আল হুজুরাত-৬)  
তাফসীরকারকগণ সাধারণত উপরোক্ত ঘটনাকেই এ আয়াতের শানে নুযুল হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তাফসীরে ইবনে কাসীর দ্রষ্টব্য— ইবনে আবদুল বার বলেন, আয়াতটি ওয়ালীদ ইবনে ওকবা প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে; এ ব্যাপারে জ্ঞানীদের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই। ইবনে তাইমিয়াও স্বীকার করেন যে, এ আয়াত ওয়ালীদ ইবনে ওকবা সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। —(মিনহাজুস সুননাতিন নববীয়্যাহ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা – ১৭৬ আমীরিয়্যা প্রেস, মিসর ১৩২২ হিজরী)।)
এ ঘটনার বেশ কয়েক বছর পর ওমর (রাঃ) তাঁকে পুনরায় খেদমতের সুযোগ দান করেন। হযরত ওমর (রাঃ) এর শেষ সময়ে তাকে আল-জাসীয়ারা আরব এলাকায়— যেখনে বনী তগলব বাস করতো, তাকে সেখানকার আমেল (কালেক্টর) নিযুক্ত করা হয়। —[তাহযিবুত তাহযীব, ১১শ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৪; ওমদাতুল কারী, ১৬শ খণ্ড, পৃষ্ঠ- ২০৩; ইদারাতুত তিবাআতিল মুনীরিয়্যাহ, মিসর।]

২৫ হিজরীতে এ ক্ষুদ্র পদ থেকে তুলে নিয়ে হযরত ওসমান (রাঃ) তাকে হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)-র স্থলে কুফার মতো বিরাট এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। সেখানে এ রহস্য ফাঁস হয়ে যায় যে, তিনি শরাব পানে অভ্যস্ত। এমন কি একদিন তিনি ফজরের সালাত ৩ রাকাত আদায় করান, অতঃপর মুসুল্লীদের প্রতি লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করেন, 'আরো আদায় করবো?' —[ আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৫৫; আল-ইস্তীআব, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৬০৪] ইবনে আবদুল বার বলেন যে, নেসাগ্রস্থ অবস্থায় ওয়ালীদের সালাত আদায় করানো, অতঃপর আরও আদায় করবো কি? জিজ্ঞেস করা প্রসিদ্ধ। নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীরা হাদীসবেত্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
এ ঘটনা সম্পর্কিত অভিযোগ মদীনায় পৌঁছে, এবং জনগণের মধ্যে এর ব্যাপক চর্চা হতে থাকে। অবশেষে হযরত মেসওয়ার ইবনে মাখরামা ও আবদুর রহমান ইবনে আসওয়াদ হযরত ওসমান (রাঃ) এর ভাগ্নে ওবায়দুল্লাহ ইবনে আদী ইবনে খেয়ারকে বলেন, 'তুমি গিয়ে তোমার মামার সাথে কথা বলো, তাঁকে বলো যে, তাঁর ভাই ওয়ালীদ ইবনে ওকবার ব্যাপারে লোকেরা তাঁর কার্যকলাপ সম্পর্কে অনেক আপত্তি তুলেছে।' তিনি এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষন করে আরয করেন যে, ওয়ালীদের ওপর ‌’হুদ’ (শরীয়াতের বিধান অনুযায়ী দণ্ড দান) জারী করা আপনার জন্য জরুরী। এ আবেদন জানালে হযরত ওসমান (রাঃ) ওয়াদা করেন যে, 'এ ব্যাপারে আমরা হক অনুযায়ী ফায়সালা করবো, ইনশাআল্লাহ।' 

তদনুযায়ী সাহাবায়েকেরামের প্রাকশ্য সমাবেশে ওয়ালীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। হযরত ওসমান (রাঃ) এর নিজের আযাদকৃত দাস হুরমান সাক্ষ্য দেয় যে, ওয়ালীদ মদ্য পান করেছিলেন। অপর এক সাক্ষী সাব ইবনে জুসামা (বা জুসমা ইবনে সাব) সাক্ষ্য দেন যে, ওয়ালীদ তাঁর সামনে মদ-বমি করেছিল(ইবনে হাজারের বর্ণনা অনুযায়ী)। এ ছাড়াও আরও ৪ জন সাক্ষী-আবু যয়নাব, আবু তুআররা, জুন্দুর ইবনে যোহাইর আল-আযদী এবং সাদ ইবনে মালেক আল-আশআ’রীকে পেশ করা হয়। তারাও অপরাধের স্বপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন।  তখন তার উপর ‘হদ’ জারীকরার জন্য হযরত ওসমান (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ) কে নির্দেশ দেন। 
হযরত আলী (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফরকে একাজে নিযুক্ত করেন এবং তিনি ওয়ালীদকে ৪০টি বেত্রঘাত করেন। বুখারী, কিতাবুল মানাকেব, বাবো মানাকেবে ওসমান ইবনে আফফান, ও বাবো হিজরাতিল হাবশা; মুসলিম, কিতাবুল হুদুদ বাবো হাদ্দিল খামর; আবুদাউদ, কিতাবুল হুদুদ, বাবো হাদ্দিল খামর। এসব হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ফকীহ ও মুহাদ্দেসগণ যা কিছু লিখেছেন, তা নিম্নরুপ—

হাফেজ ইবনে হাজার ফতহুলবারী গ্রন্থে লিখেছেন, লোকেরা যে কারণে ওয়ালীদের ব্যাপারে ব্যাপক আপত্তি করছিল, তা ছিল এই যে, হযরত ওসমান (রাঃ) তার ওপর ‘হদ’ কায়েম করছিলেন না। দ্বিতীয় কারণ এ ছিল যে, হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)-কে পদচ্যুত করে তাঁর স্থলে ওয়ালীদকে নিয়োগ করা লোকেরা পছন্দ করতো না। কারণ, হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) ছিলেন আশারা-ই-মোবাশশারা এবং শুরার অন্যতম সদস্য। জ্ঞান-মাহাত্ম, দ্বীনদারী এবং প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণের এমন সব গুণাবলীর সমাবেশ তাঁর মধ্যে ঘটেছিল, যার কোন একটি গুণও ওয়ালীদ ইবনে ওকবার মধ্যে ছিল না…….. 
হযরত ওসমান (রাঃ) ওয়ালীদকে এ জন্য কুফার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন যে, তাঁর নিকট তার যোগ্যতা প্রকাশ পেয়েছিল এবং তিনি আত্মীয়তার হকও আদায় করতে চেয়েছিলেন। অতঃপর তার চরিত্রের ত্রুটি তাঁর কাছে প্রকাশ পেলে তিনি তাকে পদচ্যুত করেন। তার বিরুদ্ধে যারা সাক্ষী দিচ্ছিল, তাদের অবস্থা ভালভাবে জানার জন্য তিনি তার শাস্তি বিধানে বিলম্ব করেন। অতঃপর প্রকৃত পরিস্থিতি জানার পর তিনি তার ওপর ‘হদ’ জারী করার নির্দেশ দান করেন। —(ফতহুল বারী, কিতাবুল মানাকেব বাবো মানাকেবে ওসমান)।
অন্যত্র ইবনে হাজার লিখেন, মুসলিমের রেওয়াতের বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ আদ-দানাজ যইফ ছিলেন- এ কারণে তাহাবী মুসলিমের বর্ণনাকে দুর্বল প্রতিপন্ন করেছেন। কিন্তু বায়হাকী তাঁর এ মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে লিখেন যে, হাদীসটি সহীহ-বিশুদ্ধ; মাসানীদ এবং সুনান গ্রন্থে হাদীসটি গৃহীত হয়েছে। এ বর্ণনা সম্পর্কে তিরমিযী ইমাম বুখারীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেন; মুসলিমও তাকে সহীহ বিশুদ্ধ বলে গ্রহণ করেন। ইবনে আবদুল বার বলেন, এ হাদীস এ অধ্যায়ে সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য……. আবুযুরআ’ এবং নাসায়ী আবদুল্লাহ আদ-দানাজকে বিশ্বস্ত-নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। —(ফতহুল বারী, কিতাবুল হুদুদ, বাবুয যারবি বিল জারীদ ওয়ান নেয়াল)।
ইমাম নববী লিখেন, মুসলিমের এ হাদীস ইমাম মালেক এবং তাঁর সমমনা ফকীহদের এ মতের প্রমাণ যে, যে ব্যক্তি মদ-বমি করে, তার ওপর মদ পানের ‘হদ’ জারী করা হবে। ….... এ ব্যাপারে ইমাম মালেকের দলীল অত্যন্ত শক্তিশালী। সাহাবাগণ সর্ব সম্মতিক্রমে ওয়ালীদ ইবনে ওকবাকে বেত্রাঘাতের ফায়সালা করেছিলেন। —(মুসলিমের ভাষ্য, কিতাবুল হুদুদ বাবো হদ্দিল খামর)।

ইবনে কোদামা বলেন, মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, একজন সাক্ষী যখন এ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ওয়ালীদকে মদ-বমি করতে দেখেছেন, তখন হযরত ওসমান (রাঃ) বলেন, মদ পান না করে সে কি করে মদ-বমি করতে পারে। এ কারণে তিনি হযরত আলী (রাঃ)-কে তার ওপর হদ জারী করার নির্দেশ দেন। আর যেহেতু এ ফায়সালা হয়েছিল নেতৃস্থানীয়, জ্ঞানী ও আলেম সাহাবীদের উপস্থিতিতে, তাই এর ওপর ‘ইজমা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। —(আল-মুগনী ওয়াশ শরহুল কবীর, ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৩২, মানার প্রেস, মিসর, ১৩৪৮ হিজরী) 
অতঃপর কেউ যদি বলে যে, যেসব ব্যক্তি ওয়ালীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দান করেছিলেন, তারা সকলেই ছিলেন বিশ্বাসের অযোগ্য, তাহলে সে ব্যক্তি কেবল হযরত ওসমান (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে নয়, বরং সাহাবাদের বিরাট দলের বিরুদ্ধেই এই দেষারোপ করে যে, তাঁরা বিশ্বাসের অযোগ্য সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে একজন মুসলমানকে শাস্তি দান করেন। 
এ ব্যাপারে জনৈক ব্যক্তি দাবী করে বসেছেন যে, হযরত হাসান (রাঃ) এ ফায়সালা সম্পর্কে নারাজ ছিলেন। কিন্তু ইমাম নববী মুসলিম এর ভাষ্যে এ হাদীসের যে ব্যাখ্যা করেছেন, তাতে এ মিথ্যার জারীজুরী ফাঁস হয়ে গিয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে, হযরত হাসান (রাঃ) এর ক্রোধ ওয়ালীদের ওপর ছিল, তার বিরুদ্ধে ফায়সালাকারীদের প্রতি নয়। 

এসব কারণে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর নীতি লোকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়। খলীফার আপন বংশের লোকদেরকে একের পর এক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা এমনিতেই ছিল যথেষ্ট আপত্তিকর কারণ। এর পরও তারা যখন দেখতে পেলো যে, এদেরকেই সামনে টেনে আনা হচ্ছে, তখন তাদের অস্থিরতা-অসন্তুষ্টি আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে এ প্রসঙ্গে দুটি বিষয় এমন ছিল, যা সুদুরপ্রসারী এবং মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে।  
প্রথমটি হচ্ছে, হযরত ওসমান (রাঃ), হযরত মুআবিয়া (রাঃ) কে ক্রমাগত দীর্ঘদিন ধরে একই প্রদেশের গবর্ণর পদে বহাল রাখেন। তিনি হযরত ওমর (রাঃ)- এর সময়ে ৪ বছর ধরে দামেশকের শাসনকর্তার পদে নিয়োজিত ছিলেন। হযরত ওসমান (রাঃ) আইলা থেকে রোম সীমান্ত পর্যন্ত এবং আল-জাযিরা থেকে উত্তর মহাসাগর পর্যন্ত গোটা এলাকা তার আওতাধীন করে গোটা শাসনকালে (১২ বছর) তাঁকে সে প্রদেশেই বহাল রাখেন। —[তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৪০৬, আল-ইস্তীআব, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২৫৩। বর্তমানে এ এলাকায় সিরিয়া, লেবানন, জর্দান এবং ইসরাইল ৪টি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত। এ ৪টি রাষ্ট্রের মোট আয়তন আজও প্রায় তাই, যা আমীর মুআ’বিয়ার গবর্ণর কালে ছিল। হযরত মুআ বিয়া, পৃষ্ঠা- ৩৪-৩৫ দ্রষ্টব্য)]

শেষ পর্যন্ত হযরত আলি (রাঃ)-কেও এর পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। এ শ্যাম প্রদেশটি তৎকালীন ইসলামী সাম্রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক এলাকা ছিল। এর এক দিকে ছিল সকল প্রাচ্য প্রদেশ, আর অপর দিকে ছিল সকল পাশ্চাত্য প্রদেশ। মধ্যখানে এ দেশটি এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিল যে, এর শাসনকর্তা কেন্দ্র থেকে বিমুখ হলে প্রাচ্য প্রদেশসমূহকে পাশ্চাত্য প্রদেশগুলি থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারতেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এ প্রদেশের শাসনকার্যের দীর্ঘকাল নিয়োজিত ছিলেন। তিনি সেখানে ভালভাবে আসন গেড়ে বসেছিলেন। তিনি কেন্দ্রের আওতায় ছিলেন না, বরং কেন্দ্র ছিল তাঁর দয়া-অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি এর চেয়েও মারাত্মক গোলযোগপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছিল, তা ছিল খলিফার সেক্রেটারীর গুরুত্বপূর্ণ পদে মারওয়ান ইবনুল হাকামের নিযুক্তি্। ইনি হযরত ওসমান (রাঃ)-এর কোমল প্রকৃতি এবং আস্থার সযোগে এমন অনেক কাজ করে বসেন, যার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত হযরত ওসমান (রাঃ) এর ওপর বর্তায়। অথচ এ সব কাজের জন্য তাঁর অনুমতি-অবগতির কোন তোয়াক্কাই করা হতো না। উপরন্ত তিনি হযরত ওসমান (রাঃ) এবং বড় বড় সাহাবীদের সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল ধরাবার নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালাতে থাকেন, যাতে খলিফা তাঁর পুরাতন বন্ধুদের স্থলে তাঁকে বেশী শুভাকাংখী এবং সমর্থক জ্ঞান করেন। —[তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৫ম খণ্ড, ৩৬ পৃষ্ঠা; আল-বেদায়া নেহায়া, ২৫৯ পৃষ্ঠা।] 

কেবল তাই নয়, তিনি একাধিকার সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-দের সমাবেশে এমন সব হুমকিপূর্ণ ভাষণ দান করতেন, তোলাকাদের মুখ থেকে যা শুনে সহ্য করে যাওয়া প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের পক্ষে ছিল নিতান্ত কষ্টকর। এ কারণে অন্যরা তো দুরের কথা, হযরত ওসমান (রাঃ)-র স্ত্রী হযরত নায়লাও এ মত পোষণ করতেন যে, হযরত ওসমান (রাঃ) এর জন্য সংকট সৃষ্টির বিরাট দায়িত্ব মারওয়ানের ওপর বর্তায়, এমনকি একদা তিনি স্বামীকে স্পষ্ট বলে দেন, 'আপনি মারওয়ানের কথা মতো চললে সে আপনাকে হত্যা করিয়ে ছাড়বে। এ ব্যক্তিটির মনে আল্লার কোন মর্যাদা নেই, নেই কোন ভয়-ভীতি ও ভালবাসা।' —[তাবারী, ৩য় খণ্ড, ২৯৬-৯৭ পৃষ্ঠা, আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খণ্ড, ১৭২-১৭৩ পৃষ্ঠা।]

দ্বিতীয় পর্যায়—

হযরত ওসমান (রাঃ) এর নীতির এ দিকটি নিঃসন্দেহে ভুল ছিল; আর ভুল কাজ ভুলই, তা যে কেউ করুক না কেন। ভাষার মারপ্যাচে তাকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করা বুদ্ধিবৃত্তি ইনসাফের দাবী নয় বরং কোন সাহাবীর ভুলকে ভুল বলে স্বীকার না করা দ্বীনেরও দাবী হতে পারে না। কিন্তু সত্য কথা এই যে, একটি দিক বাদে অন্য সব দিক থেকে তাঁর চরিত্র খলীফা হিসাবে একটা আদর্শ চরিত্র ছিল, যার বিরুদ্ধে, আপত্তি উত্থাপন করার কোন অবকাশই নেই। উপরন্ত তাঁর খেলাফত কালে সামগ্রীকভাবে সুকৃতি এত প্রবল ছিল এবং তাঁর শাসনামলে ইসলামের বিজয়ের এত বড় কাজ সম্পন্ন হচ্ছিল যে, এ বিশেষ দিকটির ব্যাপারে জনগণ আশ্বস্ত না হওয়া সত্ত্বেও গোটা সাম্রাজ্যের কোথাও সাধারণ মুসলমানরা তাঁর গভর্ণর সাঈদ ইবনুল আ’স-এর কর্মধারায় অসন্তুষ্ট হয়ে কিছু লোক বিদ্রোহ সৃষ্টির চেষ্টা করলেও জনগণ তাতে সাড়া দেননি। হযরত ওসমান (রাঃ) এর পক্ষ থেকে হযরত আবু মুসা আশআরী (রাঃ) জনগণকে বায়আত নবায়নের জন্য আহ্বান জানালে বিদ্রোহের পতাকাবাহীরা ছাড়া সকলেই ছুটে আসেন। —[ তাবাকাতে ইবনে সাআদ, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩২-৩৩, তাবারী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৭২। ]

যার কারণে যে ক্ষুদ্র দলটি তাঁর বিরুদ্ধে গোলযোগের জন্য এগিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, তারা ব্যাপক বিদ্রোহের আহ্বান জানাবার পরিবর্তে ষড়যন্ত্রের পথ অবলম্বন করে। এ আন্দোলনের পতাকাবাহীদের সম্পর্ক ছিল মিসর, কুফা এবং বসরার সাথে। তারা পারস্পরিক পত্র বিনিময় করে অকস্মাৎ মদীনা আক্রমণের জন্য গোপনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারা হযরত ওসমান (রাঃ) এর বিরুদ্ধে অভিযোগের এক বিরাট ফিরিস্তি প্রণয়ন করে, যার অধিকাংশই ছিল ভিত্তিহীন বা এমন দুর্বল অভিযোগ সম্বলিত, যার যুক্তিপূর্ণ জবাব দেয়া যায়, এবং পরে তা দেয়াও হয়েছে। এদের সংখ্যা দু’হাজারের বেশী ছিল না। পারস্পরিক চুক্তি অনুযায়ী তারা মিসর, কুফা এবং বসরা থেকে একযোগে মদীনা পৌঁছে।

তারা কোন অঞ্চলেরই প্রতিনিধি ছিল না, বরং চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের একটা দল গঠন করেছিল। মদীনার নিকটে পৌঁছে তারা হযরত আলি (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) এবং হযরত যুবায়ের (রাঃ)-কে নিজেদের দলে ভিড়াবার চেষ্টা করে; কিন্তু বুযুর্গত্রয় তাদেরকে হাঁকিয়ে দেন। হযরত আলি (রাঃ) তাদের প্রত্যেকটি অভিযোগের জবাব দিয়ে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর ভূমিকা সুস্পষ্ট করেন। মদীনার মোহাজের ও আনসারগণ, যারা তদানীন্তন ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনায় মৌল প্রাণশক্তি রূপে চিহ্নিত ছিল, তাদের সহায়ক হতে প্রস্তুত হয়নি। কিন্তু তারা নিজেদের হটকারিতায় অটল থাকে এবং অবশেষে তারা মদীনায় প্রবেশ করে হযরত ওসমান (রাঃ)- এর গৃহ অবরোধ করে। তাদের দাবী ছিল, মারওয়ান ইবনে হাকাম-কে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে, অন্যথায় হযরত ওসমান (রাঃ)-কে খেলাফত ত্যাগ করতে হবে। হযরত ওসমান (রাঃ)- এর জবাব ছিল, আমি তোমাদের যে কোন সঠিক এবং বৈধ অভিযোগ শুনতে প্রস্তুত, কিন্তু তোমাদের কথা মতো পদত্যাগের প্রস্তুত নই। —[ তাবাকাতে ইবনে সা’দ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা – ৬৬। ]

এরপর তারা ৪০ দিন ধরে গোলযোগ চালাতে থাকে; এ গোলযোগ চলাকালে তাদের দ্বারা এমনসব কাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা মদীনাতুর রাসুল-এ ইতিপূর্বে আর কখনো দেখা যায়নি। এমনকি, তারা উম্মুলমু’মিনীন হযরত উম্মে হাবীবা (রাঃ)-কে অপমান করে। 'এ অনাচারের সয়লাব ধারায় আমিও কি নিজের ইযযাত বিকিয়ে দেবো?'—এই বলে হযরত আয়েশা (রাঃ) মদীনা থেকে মক্কা চলে যান। শেষ পর্যন্ত তারা মারাত্মক হাঙ্গামা সৃষ্টি করে একান্ত নির্মমভাবে হযরত ওসমান (রাঃ)-কে শহীদ করে ফেলে। তিনদিন যাবৎ তার দেহ মোবারক দাফন থেকে বঞ্চিত থাকে। তাঁকে হত্যা করার পর জালেমরা তাঁর গৃহও লুট করে। —[বিস্তারিত বিবরণের জন্য আত-তাবারী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৭৬ থেকে ৪১৮ এবং আল-বিদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৬৮ থেকে ১৯৭ দ্রষ্টব্য।]

কেবল হযরত ওসমান (রাঃ)- এর উপরই নয়, বরং স্বয়ং ইসলাম এবং খেলাফতে রাশেদার ব্যবস্থার উপর এটা ছিল তাদের বিরাট জুলুম। তাদের অভিযোগের মধ্য থেকে যদি কোনটির একটুও গুরুত্ব থেকে থাকে তাহলে তা ছিল কেবলমাত্র একটির, যা ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি। সে অভিযোগ দূর করার জন্য কেবল এতটুকুই যথেষ্ট ছিল যে, তারা মদীনা শরীফের মোহাজের ও আনসার এবং বিশেষ করে বড় বড় সাহাবীদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের মাধ্যমে হযরত ওসমান (রাঃ)- কে সংশোধনের জন্য উদ্বুদ্ধ করতো। এ ব্যাপারে হযরত আলি (রাঃ) চেষ্টাও শুরু করেছিলেন এবং হযরত ওসমান (রাঃ) ভুলগুলো শুধরে নেবার ওয়াদাও করেছিলেন। —[আত-তাবারী, ৩য় খণ্ড পৃষ্ঠা- ৩৭৬, ৩৭৭, ৩৮৪, ৩৮৫, আল-বিদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৭১, ১৭২।]

উপরন্ত এসব অভিযোগ দূর না হলেও সে জন্য খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার এবং তাঁর পদচ্যুতি দাবী করার শরীয়ত সম্মত কোন বৈধতা আদৌ ছিল না; কিন্তু তারা খলীফার পদচ্যুতির জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। অথচ বসরা, কুফা এবং মিসরের মাত্র দুই হাজার লোক, তাও তারা নিজ নিজ এলাকার প্রতিনিধিও নয়, গোটা মুসলিম জাহানের খলীফাকে পদচ্যুতি করার অথবা তাঁর পদচ্যুতি দাবী করার কোন অধিকারই তারা পেতে পারে না। খলীফার প্রশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার তাদের অবশ্যই ছিল; অধিকার ছিল তাদের অভিযোগ উত্থাপন করার। নিজেদের অভিযোগ দূর করার দাবী জানাবার অধিকারও তাদের ছিল। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্রের মূল শক্তি তৎকালীন ইসলামী শাসনতন্ত্র অনুযায়ী যাকে খলীফা বানিয়েছে, আর বিশ্বের সকল মুসলমান যাকে খলীফা বলে স্বীকার করে নিয়েছে, কতিপয় লোক তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝান্ডা উড়িয়ে কোন প্রতিনিধিত্বশীল মর্যাদা ছাড়াই নিছক নিজেদের অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁর পদচ্যুতি দাবী করবে, তাদের অভিযোগের প্রকৃতই কোন মূল্য আছে কিনা, সে প্রশ্ন দিলেও-এ অধিকার তাদের অদৌ ছিল না। —[হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হযরত ওসমান (রাঃ)-কে এ কথাই বলেছিলেন।]

কিন্তু তারা এতটুকু বাড়াবাড়ি করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং শরীয়তের সকল সীমা লংঘন করে খলীফাকে হত্যা করে, তাঁর বাসভবন লুট করে। হযরত ওসমান (রাঃ)-র যে সকল কাজকে তারা অপরাধ মনে করতো, তা অপরাধ হলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তাকে এমন কোন অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করা যাবে না, যে জন্য কোন মুসলমানের রক্ত হালাল হতে পারে। এ কথাই বলেছিলেন হযরত ওসমান (রাঃ) তাঁর এক ভাষণে। তিনি বলেছিলেন, 'শরীয়ত মতে একজন লোক তো কতিপয় নির্দিষ্ট অপরাধের কারণে হত্যার যোগ্য হয়। আমি তো সে সব অপরাধের কোনটিই করিনি। তাহলে কি কারণে তোমরা নিজেদের জন্য আমার রক্ত হালাল করছ?' —[আল-বিদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা – ১৭৯।]

কিন্তু যারা শরীয়তের নাম নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করছিল, তারা নিজেরা শরীয়তের কোন পরওয়াই করেনি। কেবল তাঁর রক্তই নয় বরং সম্পদও নিজেদের জন্য হালাল করে নিয়েছিল তারা। এখানে কারো মনে সন্দেহ থাকা উচিত নয় যে, মদীনাবাসীরা তাদের এ কাজে সন্তুষ্ট ছিল। আসল ঘটনা এই যে, ওরা আকস্মাৎ মদীনায় প্রবেশ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘাটিগুলো অধিকার করে শহরবাসীদেরকে নিরুপায় করে দেয়। —[আল- বিদায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৯৮।]
উপরন্তু তারা হত্যার মতো মারাত্মক অপরাধ সত্যি সত্যিই করেই বসবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। মদীনাবাসীদের জন্য এটা ছিল একান্ত অপ্রত্যাসিত ঘটনা, যা আকাশ থেকে অকস্মাৎ বজ্রপাতের ন্যায় তাদের ওপর আপতিত হয়েছিল। পরে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজেদের শৈথিল্যের জন্য অত্যন্ত লজ্জিত হয়েছিল। —[তাবকাতে ইবনে সায়াদ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৭১।]

সবচেয়ে বড় কথা এই যে, স্বয়ং হযরত ওসমান (রাঃ) এ পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন। তিনি নিজের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য মদীনাতুর রাসুল-এ মুসলমানদেরকে পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত করতে চাচ্ছিলেন না। তিনি সমস্ত প্রদেশ থেকে সৈন্য বাহিনী তলব করে অবরোধকারীদের উচিৎ শিক্ষা দিতে পারতেন; কিন্তু তিনি তা থেকে বিরত থাকেন। হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রাঃ) তাঁকে বলেছিলেন, 'আপনার সমর্থনে সকল আনসার লড়তে প্রস্তুত।' কিন্তু তিনি জবাব দেন, 'না, যুদ্ধ করা যাবে না।' তিনি হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কেও এ কথা বলেন। সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষ থেকে পদচ্যুতির দাবী তীব্র হয়ে উঠলে হযরত ওসমান (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, 'এখন আমাকে কি করতে হবে?' তিনি বলেন, 'কিছু লোক তাদের আমীরের ওপর অসুন্তুষ্ট হলে তাকে পদচ্যুত করবেন, মুসলমানদের জন্য আপনি এ পথ খুলবেন না।' —(তাবাকাতে ইবনে সা’আদ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৬৬)। 
আবার এ কথা তিনি বলেছিলেন পদচ্যুতির দাবীদারের জবাবদানকালে অবরোধকারীদের উদ্দেশ্য— 'আমি কি মুসলমানদের সাথে পরামর্শ না করেই তরবারীর জোরে রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করেছি যে, তোমরা আমাকে তরবারীর জোরে পদচ্যুত করতে চাও?' —( তাবাকাতে...পৃষ্ঠ- ৬৮)  আমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নই। প্রাণপনে যুদ্ধ করার জন্য ৭ শত ব্যক্তি তাঁর মহলেই উপস্থিত ছিল। কিন্তু শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি তাদেরকেও নিবৃত্ত রাখেন। —[ তাবাকাতে.......৭০ –৭১ পৃষ্ঠা। ]

সত্য বলতে কি, অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে হযরত ওসমান (রাঃ) এমন কর্মপন্থা অবলম্বন করেছিলেন, যা একজন খলীফা এবং বাদশার পার্থক্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। তাঁর পরিবর্তে ওখানে কোন বাদশাহ হলে নিজের গদি রক্ষার জন্য যে কোন পন্থা অবলম্বনেই তিনি কুণ্ঠিত হতেন না। তার হাতে মদীনা শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলে, আনসার ও মোহাজেরদের পাইকারী ভাবে হত্যা করা হলে, রাসুলের পবিত্র স্ত্রীগণকে অপমান করা হলে এবং মসজিদে নবব্বী ভেঙ্গে মাটির সাথে মিসিয়ে দেওয়া হলেও তিনি তার পরওয়া করতেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন খলীফায়ে রাশেদা, সত্য ও ন্যায়ের পথে অভিসারী খলীফা। একজন আল্লাহভীরু শাসনকর্তা আপন গদি রক্ষার জন্য কতটুকু পারা যায়, কোথায় গিয়ে তাকে থেমে যেতে হয়, একান্ত কঠিন মুহুর্তেও তিনি তৎপ্রতি লক্ষ রেখেছেন। মুসলমানের ইজ্জত-আবরু বিকিয়ে দেয়ার চেয়ে নিজের প্রাণ দানকে তিনি অতি ক্ষুদ্র কাজ বিবেচনা করেছেন। কারণ, মুসলমানের ইজ্জত-অবরু একজন মুসলমানের নিকট দুনিয়ার সবকিছু থেকে অধিকতর প্রিয় হওয়াই বাঞ্চনীয়।

তৃতীয় পর্যায়—

হযরত ওসমান (রাঃ)-র শাহদাতের পর মদীনায় নৈরাজ্য বিস্তার লাভ করে। কারণ, উম্মতের তখন কোন নেতা নেই, রাষ্ট্রের নেই কোন কর্ণধার; বহিরাগত সন্ত্রাসীদের জয়ে মদীনার মোহাজের-আনসার এবং বড় বড় তাবেয়ীরা সকলেই অস্থির। রোম সীমান্ত থেকে ইয়ামেন পর্যন্ত এবং আফগানিস্তান থেকে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত এ উম্মত এবং বিশাল সম্রাজ্য নেতা শূন্য অবস্থায় কয়েক দিনও কি করে চলতে পারে? যতোশীঘ্র সম্ভব একজন খলীফা নির্বাচন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল, আর এ নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে মদীনায়। কারণ, মদীনাই হচ্ছে ইসলামের কেন্দ্র ভূমি। ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ ইসলামী ও ইসলামী ব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ইসলামের মূল প্রাণশক্তি যে জনতা, যাদের বায়আতে এ যাবৎ খেলাফত সংঘটিত হয়ে আসছে, তারাও মদীনায় উপস্থিত। কাজেই এ ব্যাপারে কোন বিলম্ব করার অবকাশ ছিল না। মদীনার বাইরের দূর-দরায শহর বন্দরের দিকে দৃষ্টি দেবারও কোন প্রয়োজন ছিল না। এক মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। উম্মতকে সংগঠিত করার জন্য, রাষ্ট্রকে বিশৃংখলার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তৎক্ষণাৎ কোন যোগ্যতর ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্র প্রধান নিযুক্ত করা অপরিহার্য ছিল।
হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর ওফাতকালে যে ছ’জন সাহাবীকে উম্মাতের সবচেয়ে অগ্রগণ্য ব্যক্তি বলে অভিহিত করে গিয়েছিলেন, তখন তাদের মধ্য থেকে ৪ জন হযরত আলী (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ), হযরত যোবায়ের (রাঃ), হযরত সা'আদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) জীবিত ছিলেন। এদের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) সকল দিক থেকে প্রথম সারিতে ছিলেন। শুরা উপলক্ষে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) উম্মাতের জনমত যাচাই করে এ ফায়সালা দেন যে, হযরত ওসমান (রাঃ)-এর পরে যিনি উম্মতের সবচেয়ে বেশী আস্থাভাজন ব্যক্তি, তিনি হচ্ছেন হযরত আলী (রাঃ)। —[আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৬।] 

সুতরাং জনগণ খেলাফতের জন্য তাঁর প্রতিই দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে, এটাই ছিল একান্ত স্বাভাবিক। কেবল মদীনায়ই নয়, বরং গোটা মুসলিম জাহানে তিনি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন ব্যক্তিই ছিলেন না, যিনি এ উদ্দেশ্যে মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারতেন। এমনকি বর্তমান কালের প্রচলিত পন্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তিনি অবশ্যই বিপুল ভোটে জয় লাভ করতেন। —[ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বলেন, তখন হযরত আলী (রাঃ)-এর চেয়ে খেলাফতের যোগ্যতার অন্য কোন ব্যক্তি ছিল না;  আল-বেদায়া...., ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৩০।] তাই তো সকল নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর সাহাবী এবং মদীনার অন্যান্য লোকেরা তাঁর নিকট গিয়ে বলেন, 'কোন আমীর ছাড়া এ ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না। জনগণের জন্য একজন ইমাম অপরিহার্য। আজ এ পদের জন্য আপনার চেয়ে অন্য কোন যোগ্য ব্যক্তি আমরা দেখছি না। অতীতের খেদমত এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নৈকট্য কোন বিচারেই না।' 

তিনি অস্বীকৃতি জানান। লোকেরা পীড়াপীড়ি করতে থাকে। অবশেষে তিনি বলেন, 'গৃহে বসে গোপনে আমার বায়াত হতে পারে না। সাধারণ মুসলমানের সন্তুষ্টি ব্যতিত এমনটি হওয়া সম্ভব নয়।' অতঃপর মসজিদে নববীতে সাধারণ অধিবেশন বসে এবং সকল মোহাজের-আনসার তাঁর হাতে বায়াত করেন। সাহাবীদের মধ্যে ১৭ জন বা ২০ জন এমনও ছিলেন, যাঁরা তাঁর হাতে বায়াত করেন নি। —[আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৫০, ৪৫২; আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৫, ২২৬।] ইবনে আবদুল বার-এর বর্ণনা মতে, সিফফিন যুদ্ধে এমন ৮ শত সাহাবী হযরত আলী (রাঃ)-র সঙ্গে ছিলেন, যারা বায়আতুর রেযওয়ানের সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন; আল-এস্তীআব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪২৩।

যে'সব নীতির ভিত্তিতে খেলাফতে রাশেদা প্রতিষ্ঠা সম্ভব, হযরত আলী (রাঃ)-এর খেলাফত নিশ্চিতরূপে সে সব মূলনীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল। উপরের বিবরণী থেকে এ কথা সন্দেহাতীতরূপে প্রমাণিত হয়। তিনি জোর করে ক্ষমতা দখল করেননি। খেলাফত লাভের জন্য তিনি সামান্যতম কোন চেষ্টা তদবীরও করেননি। জনগণ নিজেরা স্বাধীন পরামর্শক্রমে তাঁকে খলীফা নির্বাচিত করেন। সাহাবীদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। পরে কেবলমাত্র শ্যাম প্রদেশ ব্যতীত গোটা মুসলিম জাহান তাঁকে খলীফা বলে স্বীকার করে। হযরত সাআদ ইবনে ওবায়দা (রাঃ)-র বায়াত না করায় যদি হযরত আবুবকর এবং হযরত ওমর (রাঃ)-এর খেলাফত সন্ধিগ্ধ না হয়, তাহেল ১৭ জন বা ২০ জন সাহাবীর বায়আত না করায় হযরত আলী (রাঃ)-এর খেলাফত কি করে সন্ধিগ্ধ সাব্যস্ত হতে পারে? উপরন্তু সে ক’জন সাহাবীর বায়আত না করা ছিল নিছক একটি নেতিবাচক কাজ; যার ফলে খেলাফতের আইনগত পজিশনের উপর কোন প্রভাব পড়ে না। তাঁর মুকাবিলায় কি এমন কোন খলীফা ছিল, যার হাতে তাঁরা প্রতি-বায়াত করেছিলেন? অথবা তাঁরা কি বলেছিলেন যে, এখন উম্মত বা রাষ্ট্রের কোন খলীফার প্রয়োজন নেই? অথবা তাঁরা কি বলেছিলেন যে, কিছু সময়ের জন্য খেলাফতের পদ শূন্য থাকা উচিত? এর কোন একটিও যদি না থাকে, তাহলে তাঁদের নিছক বায়াত না করার এ অর্থ কেমন করে হতে পারে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যাঁর হাতে বায়আত করেছে, মূলতঃ তিনি বৈধ খলীফা ছিলেন না?

এভাবে হযরত ওসমান (রাঃ)-র শাহাদাতের কালে খেলাফতে রাশেদার ব্যবস্থায় যে মারাত্মক ফাটল সৃষ্টি হয়েছিল মুসলমানরা তা পূরণ করার সুযোগ লাভ করেছিল এবং সুযোগ লাভ করেছিলেন হযরত আলী (রাঃ) তাঁকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করায়। কিন্তু তিনটি বিষয় এমন ছিল, যা সে ফাটল পুরণের সুযোগ দেয়নি। বরং তা ফাটলকে আরও বৃদ্ধি করে উম্মতকে মুলুকিয়্যাতের (রাজতন্ত্র) মুখে ঠেলে দেয়ার ব্যাপারে এক ধাপ অগ্রসর হয়।
১) হযরত ওসমান (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে যারা সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, যারা কার্যত হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছিল, হত্যায় প্রেরণা যুগিয়েছিল এবং তাতে সহায়তা করেছিল, এমনি করে সামগ্রিকভাবে এ মহা বিপর্যয়ের দায়িত্ব যাদের উপর পড়ে তারা সবাই হযরত আলী (রাঃ)- কে খলীফা করার ব্যাপারে অংশ নেয়। খেলাফত কার্যে তাদের অংশ গ্রহণ এক বিরাট বিপর্যের কারণ হয়ে পড়ে। কিন্তু মদীনার সে সময়ের পরিস্থিতি উপলব্ধি করার জন্য যে ব্যক্তিই চেষ্টা করবেন, তিনি এ কথা উপলব্ধি না করে পারবেন না যে, তখন খলীফা নির্বাচনের কাজ থেকে তাদেরকে কিছুতেই নিবৃত্ত করা যেত না। তাদের অংশ গ্রহণ সত্ত্বেও যে ফায়সালা গৃহীত হয়েছিল, তা ছিল অবশ্যি একটি সঠিক ফায়সালা। উম্মতের সকল প্রভাবশালী ব্যক্তি ঐকমত্যের ভিত্তিতে হযরত আলী (রাঃ)-এর হস্ত সুদৃঢ় করলে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদেরকে নিশ্চিত দমন করা সম্ভব হত এবং দুর্ভাগ্য বশতঃ বিপর্যয়ের যে ধারা সৃষ্টি হয়েছিল, তা সহজেই নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হত।

২) হযরত আলী (রাঃ)-এর বায়আত থেকে কোন কোন বড় সাহাবীর বিরত থাকা— কোন কোন বুযর্গ একান্ত সদুদ্দেশ্যে ফেতনা থেকে বাঁচার জন্য এ কর্মপন্থা অবলম্বন করলেও পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ প্রমাণ করেছে যে, যে ফেতনা থেকে তাঁরা দূরে থাকতে চেয়েছিলেন, তাদের এ কাজ তার চেয়েও বড় ফেতনার সহায়ক হয়েছে। তাঁরা ছিলেন উম্মতের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁদের প্রত্যেকের উপর হাজার হাজার মুসলমানের আস্থা ছিল। তাঁদের বিরত থাকার ফলে জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়, খেলাফতে রাশেদার ব্যবস্থা নব পর্যায়ে বহাল করার জন্য যে একাগ্রতার সাথে হযরত আলী (রাঃ)-এর সহযোগিতা করা উম্মাতের উচিত ছিল, যা ছাড়া তিনি এ কাজ আঞ্জাম দিতে পারতেন না, দুর্ভাগ্যবশত তা অর্জিত হতে পারেনি।

৩) হযরত ওসমান (রাঃ)-এর রক্তের দাবী। দু’পক্ষ দুটি দল এ দাবী নিয়ে এগিয়ে আসে— এক দিকে হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হযরত তালহা (রাঃ) ও হযরত যোবায়ের (রাঃ) এবং অপর পক্ষে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)। উভয় পক্ষের মর্যাদা এবং শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেও এ কথা না বলে উপায় নেই যে, আইনের দৃষ্টিতে উভয় পক্ষের পজিশনকে কিছুতেই সঠিক বলে স্বীকার করা যায় না। বলাবাহুল্য এটা জাহেলী যুগের কোন গোত্রবাদী ব্যবস্থা ছিল না; যে কোন ব্যক্তি যেভাবে খুশী নিহত ব্যক্তির প্রতিশোধের দাবী নিয়ে দাঁড়াবে, আর সে দাবী পূরণ করার জন্য ইচ্ছা মতো যে কোন কর্মপন্থা অবলম্বন করবে; এ ধরনের কোন ব্যবস্থা তখন ছিল না। সেখানে একটা বিধিবদ্ধ সরকার প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রতিটি দাবী উত্থাপন করার জন্য একটা নিয়ম এবং একটা বিধান বর্তমান ছিল। হ্ত্যার প্রতিশোধ দাবী করার অধিকার নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারদের ছিল, তাঁরা বেঁচে ছিলেন এবং সেখানে উপস্থিতও ছিলেন। অপরাধীদের গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ব্যাপারে সরকার সত্যিই জেনে শুনে শৈথিল্য প্রদর্শন করলে অন্যরা নিশ্চয়ই সরকারের নিকট ইনসাফের দাবী জানাতে পারতেন। কিন্তু সরকার কোন ব্যক্তির দাবী অনুযায়ী কর্মপন্থা গ্রহণ না করলে তিনি যে সরকারকে আদৌ কোন বৈধ সরকার বলে স্বীকারই করবেন না, কোন সরকারের কাছে ইনসাফ দাবী করার এটা কোন ধরনের পন্থা হতে পারে? শরীয়তের কোথাও কি এর কোন নজির আছে? হযরত আলী (রাঃ) যদি বৈধ খলীফাই না হবেন, তবে তাঁর কাছে অপরাদীদের গ্রেফতার এবং শাস্তি বিধান দাবী করার অর্থই বা কি? তিনি কি কোন গোত্রীয় সর্দার ছিলেন যিনি আইনগত অধিকার ছাড়াই যাকে খুশী পাকড়াও করবেন এবং যাকে খুশী শাস্তি দেবেন?

এর চেয়েও বেশী বিরোধী পন্থা ছিল প্রথম পক্ষের। তারা মদীনায় গিয়ে, যেখানে খলীফা, অপরাধী এবং নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী সকলেই উপস্থিত ছিলেন এবং অপরাধীর বিচার ও দণ্ড বিধান সম্ভবপর ছিল, নিজেদের দাবী পেশ করার পরিবর্তে বসরার পথে গমন করেন, এবং সৈন্য সমাবেশ করে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণের চেষ্টা করেন। তাদের এ দাবীর অবশ্যম্ভাবী ফল স্বরূপ এক খুনের পরিবর্তে আরো দশ হাজার খুন হওয়া এবং রাষ্ট্রের শৃংখলা বিপন্ন হওয়াই ছিল অবধারিত। শরীয়ত তো দূরের কথা, দুনিয়ার কোন আইনের দৃষ্টিতেই এটাকে বৈধ কার্যক্রম হিসাবে স্বীকার করা চলে না, যাবে না।
দ্বিতীয় পক্ষ, অর্থাৎ হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-র কর্মপন্থা ছিল এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশী আইন বিরোধী। আবু সুফিয়ান তনয় মুআবিয়া হিসাবে নয়, বরং শ্যাম প্রদেশের গভর্ণর হিসাবে তিনি হযরত ওসমান (রাঃ)-এর খুনের প্রতিশোধ গ্রহণের দাবী উত্থাপন করেন। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেন। নিজের উদ্দেশ্যের জন্য গভর্ণরীর ক্ষমতা প্রয়োগ করেন তিনি। হযরত আলী (রাঃ)- এর নিকট তিনি এ দাবী উত্থাপন করেননি যে, হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাদেরকে শাস্তি দান করতে হবে। বরং তার দাবী ছিল হস্তাদেরকে তাঁর হাতে সোপর্দ করতে হবে, যাতে তিনি নিজে তাদেরকে হত্যা করতে পারেন। —[তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩, ৪, ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৮, আল-বেদায়া, ওয়ান নেহায়া, পৃষ্ঠা- ২৫৭-২৫৮।] এসব কিছু ইসলামী যুগের সুশৃংখল সরকারের পরিবর্তে ইসলাম পূর্ব যুগের গোত্রীয় বিশৃংখলার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। প্রথমতঃ হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের দাবীর অধিকার ছিল হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-র পরিবর্তে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শরীয়ত সম্মত উত্তরাধিকারীদের। আত্মীয়তার ভিত্তিতে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর এ দাবী করার অধিকার থাকলেও তা ছিল ব্যক্তিগতভাবে, শ্যাম-এর গভর্ণর হিসাবে নয়। 

হযরত ওসমান (রাঃ)- এর আত্মীয়তা ছিল আবু সুফিয়ানের পুত্র মুআবিয়ার সাথে; শ্যাম-এর গভর্ণরী তাঁর আত্মীয়তার ভিত্তি ছিল না। ব্যক্তিগত মর্যাদায় তিনি খলীফার নিকট ফরিয়াদী হিসাবে যেতে পারতেন, দাবী করতে পারতেন অপরাধীদের গ্রেফতার করার এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার। যে খলীফার হাতে যথারীতি আইনানুগ উপায়ে বায়'আত সম্পন্ন হয়েছে, একমাত্র তাঁর প্রশাসনাধীন প্রদেশ ছাড়া অবশিষ্ট গোটা দেশ যাঁর খেলাফত মেনে নিয়েছে, [ঐতিহাসিকভাবে একথা প্রমাণিত যে, সিপফীন যুদ্ধের পর পর্যন্ত গোটা জাজিরাতুল আরব এবং শ্যাম-এর পূর্ব পশ্চিম উভয় দিকে ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রদেশ হযরত আলী (রাঃ)-এর বায়'আতের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। হযরত মুআবিয়ার প্রভাবাধীন হওয়ার কারণে কেবল শ্যাম প্রদেশ তাঁর আনুগত্য বহির্ভূত ছিল। এ জন্য এ অবস্থার সত্যিকার আইনগত মর্যাদা এই ছিল না যে, মুসলিম জাহানে নৈরাজ্য বিরাজ করছিল, সেখানে কেউ কারো আনুগত্য করতে বাধ্য ছিল না। বরং সঠিক আইনগত অবস্থা এই ছিল যে, রাষ্ট্রে একটি বৈধ, আইনানুগ কেন্দ্রীয় সরকার বিদ্যমান ছিল; অন্যান্য প্রদেশসমূহ তার আনুগত্য করছিল, কেবল একটি মাত্র প্রদেশ ছিল বিদ্রোহী- (আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬২-৪৬৩; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৩৭-১৪১; আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৯, ২৫১।) 

খলিফার আনুগত্য অস্বীকার করার গভর্ণর হিসাবে তাঁর কোন অধিকার ছিল না। অধিকার ছিল না নিজের প্রশাসনাধীন অঞ্চলের সামরিক শক্তিকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার। নিরেট প্রাচীন জাহেলিয়াতের পন্থায় এ দাবী করার অধিকারও তাঁর ছিল না যে, হত্যার অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরকে আদালতের কার্যক্রম ছাড়াই কেসাসের দাবীদারদের হাতে সোপর্দ করা হোক, যাতে তিনি নিজেই তাদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারেন।

কাযী আবুবকর আরাবী আহকামুল কুরআন-এ নিম্নোক্তভাবে এ বিষয়ের সঠিক শরীয়ত সম্মত মর্যাদা বর্ণনা করেছেন— 'হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর জনগণকে নেতাশূন্য ছেড়ে দেয়া সম্ভব ছিল না, তাই হযরত ওমর (রাঃ) শূরায় যাদের কথা উল্লেখ করেছিলেন, তাঁদের সামনে ইমামত (নেতৃত্ব) পেশ করা হয়। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। হযরত আলী (রাঃ) যিনি এর সবচেয়ে বেশী হকদার এবং যোগ্য ছিলেন তা গ্রহণ করেন, যাতে উম্মতের রক্তপাত এবং নিজেদের মধ্যকার অনৈক্য থেকে রক্ষা করা যায়। সে রক্তপাত এবং অনৈক্যের ফলে দ্বীন এবং মিল্লাতের অপূরণীয় ক্ষতির আশংকা ছিল। তাঁর হাতে বায়আত করার পর শ্যাম প্রদেশের জনগণ তাঁর বায়আত কবুল করার জন্য শর্ত আরোপ করে যে, প্রথমে হযরত ওসমান (রাঃ) এর হত্যাকারীদেরকে গ্রেফতার করে তাদের নিকট থেকে কেসাস (প্রতিশোধ) গ্রহণ করা হোক। হযরত আলী (রাঃ) তাদেরকে বলেন যে, 'আগে বায়আতে শামিল হয়ে যাও, পরে অধিকার দাবী করো, তোমরা অবশ্যই তা পাবে।' কিন্তু তারা বলে, ‘আপনি বায়আতের অধিকারীই নন। কারণ আমরা হযরত ওসমান (রাঃ)- এর হত্যাকারীদেরকে সকাল-বিকাল আপনার সঙ্গে দেখছি।’ এ ব্যাপারে হযরত আলী (রাঃ)-এর মত অধিক সত্য ছিল। তাঁর উক্তি ছিল একান্ত সঠিক। কারণ তিনি তখন হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের চেষ্টা করলে বিভিন্ন গোত্র তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতো। ফলে যুদ্ধের একটি তৃতীয় ফ্রন্ট খুলে যেতো। তাই তিনি অপেক্ষা করছিলেন, সরকার সুদৃঢ় হোক, গোটা দেশে তাঁর বায়আত প্রতিষ্ঠিত হোক, এরপর আদালতে যথারীতি নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের পক্ষ থেকে দাবী উত্থাপিত হবে, সত্য ও ন্যায়ানুযায়ী ফায়সালা করা হবে। যে অবস্থায় ফেতনা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার এবং বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টি হওয়ার আশংকা থাকে, সে অবস্থায় ইমামের জন্য কেসাসকে বিলম্বিত করা বৈধ এ ব্যাপারে ওলামায়ে উম্মতের মধ্যে কোন মতবিরোধ নেই।'
'হযরত তালহা ও যোবায়ের (রাঃ)- এর ব্যাপারও ছিল অনুরূপ। তাঁরা উভয়ে হযরত আলী (রাঃ)-কে খেলাফত থেকে বেদখল করেননি, তাঁরা তাঁর দ্বীনের ব্যাপারেও আপত্তি জানাননি। অবশ্য তাঁদের মত ছিল, সর্বপ্রথম হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদেরকে দিয়েই সূচনা করা হোক। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) তাঁর মতে অটল ছিলেন এবং তাঁর মতই সঠিক ছিল।’

আরও এক ধাপ এগিতে কাযী সাহেব লিখেছেন, 'এ পরিস্থিতিতে হযরত আলী (রাঃ) কোর'নের আয়াত অনুযায়ী কাজ করেছেন। যেসব বিদ্রোহী ইমামের উপর নিজেদের মত জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এমন দাবীকরার অধিকার এ বিদ্রোহীদের ছিল না। যারা কেসাসের দাবী করছিল তাদের জন্য সঠিক পন্থা ছিল, হযরত আলী (রাঃ)-এর কথা মেনে নিয়ে কেসাসের দাবী আদালতে পেশ করে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা। তারা এ পন্থা অবলম্বন করলে হযরত আলী (রাঃ) যদি অপরাধীদের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ না করতেন, তখন তাদের দ্বিধা-সংকোচেরও কোন প্রয়োজন হতো না। সাধারণ মুসলমানরা নিজেরাই হযরত আলী (রাঃ)-কে পদচ্যুত করতো। —[আহকামুল কুরআন, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৭০৬-১৭০৭, মিসরীয় সংস্করণ, ১৯৫৮।]
 
চতুর্থ পর্যায়—

খেলাফতে রাশেদার মধ্যে এ তিনটি ফাটল সৃষ্টি হবার পর হযরত আলি (রাঃ) দায়িত্বভার গ্রহণ করে কাজ শুরু করে দেন। তিনি সবেমাত্র কাজ শুরু করেছেন, দু’হাজার সন্ত্রাসবাদী তখনও মদীনায় উপস্থিত, এমন সময় হযরত তালহা (রাঃ) এবং হযরত যোবায়ের (রাঃ) অন্যান্য কয়েকজন সাহাবীকে নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাত করে বলেনঃ ‘হদ’ (শরীয়াতের দন্ড বিধি) কায়েম করার শর্তে আমরা আপনার হাতে বায়আত করেছি। যারা হযরত ওসমান (রাঃ)- এর হত্যায় শরীক ছিল, এবার আপনি তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করুন। হযরত আলী (রাঃ) জবাবে বলেনঃ ভাইয়েরা আমার! আপনারা যতটুকু জানেন, আমিও তা অনবগত নই। কিন্তু আমি তাদেরকে কি করে পাকড়াও করবো, যারা এখন আমাদের ওপর প্রতিপত্তি বিস্তার করে আছে, যাদের ওপর এখন আমাদের কোন প্রভাব ও প্রতিপত্তি নেই। আপনারা এখন যা করতে চান, তার কি কোথাও কোন অবকাশ আছে? তাঁরা সকলেই জবাব দেয়, না। অতঃপর হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ আল্লার কসম। আপনারা যা চিন্তা করেন আমিও তাই চিন্তা করি। পরিস্থিতি একটু শান্ত হতে দিন, গণমনে স্বস্তি ফিরে আসুক। চিন্তার বিভ্রান্তি দূরীভূত হোক, অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হোক। [আততাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৫৮। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১০০। আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৭-২২৮।]

অতঃপর এ বুযুর্গদ্বয় হযরত আলি (রাঃ)-এর অনুমতি নিয়ে মক্কা শরীফ চলে যান। সেখানে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ)- এর সাথে সাক্ষাৎ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, হযরত ওসমান (রাঃ)-এর খুনের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য কুফা ও বসরা থেকে, যেখানে হযরত তালহা ও হযরত যোবায়েরের বিপুল সংখ্যক সমর্থক ছিল, সেনাবাহিনীর সাহায্য গ্রহণ করা হবে। সুতরাং এ কাফেলা মক্কা থেকে বসরা রওয়ানা হয়ে যায়। বনী-উমাইয়ার সাঈদ ইবনুল আ’স এবং মারওয়ান ইবনুল হাকামও কাফেলার সাথে গমন করেন। মাররুয যাহরান (বর্তমান ফাতেমা উপত্যকা) পৌঁছে সাঈদ ইবনুল আ’স তাঁর দলের লোকদের বললেন, তোমরা যদি হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাও, তাহলে এদেরকে হত্যা করো, যারা এ বাহিনীতে তোমাদের সঙ্গে রয়েছে। [হযরত তালহা (রাঃ) ও যোবায়ের (রাঃ) ইত্যকার বুযুর্গদের প্রতি তাদের ইঙ্গিত ছিল। কারণ, বনী-উমাইয়াদের সাধারণ ধারণা ছিল এই যে, যারা হযরত ওসমান (রাঃ)-কে হত্যা করেছে, কেবল তাঁরাই তাঁর হন্তা নয়, বরং সময়ে সময়ে যারা তাঁর পলিসীর সমালোচনা করেছে, বা সন্ত্রাসকালে যারা মদীনায় উপস্থিত ছিল, কিন্তু হত্যা প্রতিরোধের জন্য লড়াই করেনি, তারাও তার হত্যাকারীদের অন্তর্ভূক্ত।] মারওয়ান বললেন— না, আমরা তাদেরকে [অর্থাৎ হযরত তালহা (রাঃ), হযরত যোবায়ের (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ)-কে] পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত করাবো। এদের মধ্যে যে পরাজিত হবে, সে এমনিতেই খতম হয়ে যাবে। আর যে বিজয়ী হবে, সে এতটা দুর্বল হয়ে যাবে যে, আমরা অতি সহজে তাকে কাবু করে ফেলবো। [তাবাকাতে ইবনে সা’আদ, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪, ৩৫। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট পৃষ্ঠা- ১৫৫।] এমনি করে এসব ব্যক্তিকে নিয়ে কাফেলা বসরায় পৌঁছে এবং তারা ইরাক থেকে তাদের সমর্থকদের এক বিশাল বাহিনী একত্র করে।

অপর দিকে হযরত আলী (রাঃ) মুয়াবিয়া (রাঃ)-কে খেলাফতের অনুগত করানোর জন্য শ্যাম যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বসরায় সৈন্য সমাবেশের কথা জানতে পেরে আগে এ পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে বাধ্য হন। কিন্তু বিপুল সংখ্যক সাহাবী এবং তাঁদের প্রভাবাধিন ব্যক্তিবর্গ, যারা মুসলমানদের গৃহযুদ্ধকে স্বাভাবিকভাবেই একটা বিপর্যয় বলে মনে করতেন, এ অভিযানে তাঁর সহযোগী হতে প্রস্তুত ছিলেন না। [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৩৩।] ফলে হত্যাকারীদের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য হযরত আলী (রাঃ) সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, তারা হযরত আলী (রাঃ)-এর সংগৃহীত ক্ষুদ্র বাহিনীতে ঢুকে পড়ে। এটা তাঁর জন্য দুর্ণাম এবং বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (রাঃ)-এর সৈন্যবাহিনীর বসরার অদুরে পরস্পর মুখোমুখী হলে দ্বীনের শ্রীবৃদ্ধি ও কল্যাণকামী ব্যক্তিদের এক বিরাট গ্রুপ ঈমানদারদের দুটি দলকে সংঘর্ষ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে সমঝোতার কথাবর্তা প্রায় সম্পন্নই হয়ে এসেছিল। কিন্তু একদিকে হযরত আলী (ঃ)-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে ছিল হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীরা তারা মনে করতো, এদের মধ্যে সমঝোতা হয়ে গেলে আমাদের রেহাই নেই; অপর দিকে উম্মুল মু’মিনীন-এর সেনাবাহিনীর মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও ছিল, যারা উভয়কে সংঘর্ষে লিপ্ত করে দুর্বল করে ফেলার আকাংখা পোষণ করছিল। তাই তারা নিয়ম বহির্ভূত পদ্ধতিতে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। অবশেষে উভয় পক্ষের কল্যাণকামীদের যুদ্ধ ঠেকাবার শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জামাল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। —[আল-বেদায়া- ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৩৭-২৩৯।]

জামাল যুদ্ধের সূচনাকালে হযরত আলী (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) ও হযরত যোবায়ের (রাঃ)-এর সাথে কথা বলার আকাংখা পোষণ করে এ মর্মে তাদের নিকট পয়গাম পাঠান তাঁরা উভযে হাজির হলে হযরত আলী (রাঃ) তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত থাকার উপদেশ দেন। ফলে হযরত যোবায়ের (রাঃ) যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করে চলে যান, আর হযরত তালহা (রাঃ) প্রথম সারি থেকে পেছনের সারিতে সরে যান। [আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪১৫। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২২-১২৩। আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪০, ২৪১, ২৪৭; আল-ইস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২০৭; ইবনে খালদুন, ২য় খন্ডের পরিশিষ্ট পৃষ্ঠা- ১৬২।] কিন্তু আমর ইবনে জারমুয নামক জনৈক জালেম হযরত যোবায়ের (রাঃ)-কে হত্যা করে এবং প্রসিদ্ধ ও একান্ত নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে মারওয়ান ইবনুল হাকাম হযরত তালহা (রাঃ)-কে হত্যা করে। [তাবাকাতে ইবনে সা’আদ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৩; ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৮; ইবনে হাজার, তাহযীবুত তাহযীব, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২০; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২৪; ইবনে আবদুল বার, আল-ইস্তীআব পৃষ্ঠা- ২০৭-২০৮; ইবনে আবদুল বার বলেন— মারওয়ান হযরত তালহা (রাঃ)-এর সেনাবাহিনীতে শামিল ছিলেন, আর তিনিই হযরত তালহা (রাঃ)-কে হত্যা করেছেন- নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই। আল্লামা ইবনে কাসীর আল-বেদায়া এ বর্ণনাকেই প্রসিদ্ধ বর্ণনা বলে স্বীকার করেছেন— আল-বেদায়া.......,৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৭।]

যাই হোক, সিফফীন যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এতে উভয় পক্ষের ১০ হাজার লোক শহীদ হয়। হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর এটা ইসলামের ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম দুর্ঘটনা। এ ঘটনা উম্মতকে স্বৈরাচারের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেয়। হযরত আলী (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে যে সেনাবাহিনী যুদ্ধ করেছিল, তার বেশীর ভাগ সংগৃহীত হয়েছিল বসরা এবং কুফা থেকেই। হযরত আলি (রাঃ)-এর হাতে এ এলাকার ৫ হাযার লোক শহীদ এবং হাজার হাজার লোক আহত হওয়ার পর কি করে এ আশা করা যেতে পারে যে, শ্যাম-এর জনগণ যে একাত্মতার সাথে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর সহযোগিতা করছিল, ঠিক একই পর্যায়ের একাত্মতার সাথে ইরাকের জনগণও হযরত আলী (রাঃ)-এর সহযোগিতা করবে? সিফফীন যুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী পর্যায়ে হযরত তুআবিয়া (রাঃ)-এর শিবিরের ঐক্য এবং হযরত আলী (রাঃ)-এর শিবিরের অনৈক্য মৌলিকভাবে এ জামাল যুদ্ধের পরিণতি ছিল। এ যুদ্ধ সংঘটিত না হলে পরবর্তীকালের সকল বিকৃতি সত্ত্বেও স্বৈরাচারের আগমন ঠেকানো সম্পূর্ণ সম্ভব ছিল। বস্তুত এটাই ছিল হযরত আলি (রাঃ) এবং তালহা (রাঃ) ও যোবায়ের (রাঃ)-এর সংঘাতের পরিণতি। এ পরিণতির অপেক্ষায় ছিলেন মারওয়ান ইবনুল হাকাম। সে জন্যেই তিনি হযরত তালহা (রাঃ) ও যোবায়ের (রাঃ)-এর সাথী হয়ে বসরায় যান। দুঃখের বিষয়, তাঁর এ অভিপ্রায় শতকরা একশ ভাগ পূর্ণ হয়।

হযরত আলি (রাঃ) এ যুদ্ধের ব্যাপারে যে কর্মপন্থা গ্রহণ করেন, তা একজন খলীফায়ে রাশেদ এবং একজন বাদশার পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। তিনি প্রথমে আপন সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘোষণা করেছেন, কোন পলায়নকারীর পেছনে ধাওয়া করবে না, কোন আহত ব্যক্তির ওপর আক্রমণ করবে না এবং বিজয়ী হয়ে বিরোধীদের গৃহে প্রবেশ করবে না। বিজয় শেষে তিনি উভয় পক্ষের শহীদদের জানাযার সালাত আদায় করান এবং সমান মর্যাদার সাথে তাদেরকে দাফন করান। বিরোধী বাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া অর্থ-সম্পদকে গণীমতের মাল সাব্যস্ত করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। বসরার জামে মসজিদে সংগৃহীত সম্পদ জড়ো করে তিনি ঘোষণা করেন, যে ব্যক্তি তার নিজের মাল চিনতে পারে সে যেন তা নিয়ে যায়। লোকেরা খবর রটায় আলি (রাঃ) বসরার পুরুষদের হত্যা করতে চান, আর চান স্ত্রীদের দাসীতে পরিণত করতে। হযরত আলি (রাঃ) তৎক্ষণাৎ এ অপপ্রচারের প্রতিবাদ করে বলেন— ‘আমার মতো লোক থেকে এ ধরনের আশংকা করা উচিত নয়, এ আচরণ তো কাফেরদের সাথে করার মতো। মুসলমানদের সাথে এহেন আচরণ করা যায় না।’ বসরায় প্রবেশ করলে স্ত্রীরা গৃহের অভ্যন্তর থেকে গালমন্দ এবং নিন্দাবাদে জর্জরিত করে। হযরত আলী (রাঃ) তাঁর সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘোষণা করে দেন— সাবধান! কারোর সম্ভ্রম নষ্ট করবে না, কারো গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করবে না, কোন নারীকে উত্যক্ত করবে না, – তারা তোমাদের আমীর এবং সৎ ব্যক্তিদেরকে গালমন্দ করলেও না। এরা যখন মুশরিক ছিল, তখনও তো এদের উপর হস্তক্ষেপ করা থেকে আমাদেরকে বারণ করা হয়েছিল। এখন তো এরা মুসলমান; তবে কি করে এখন এদের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারি? —[আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫০৬, ৫১০, ৫৪২, ৫৪৪। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২২, ১৩১, ১৩২। আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৪, ২৪৫। ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্টি, পৃষ্ঠা- ১৬৪, ১৬৫।] 

পরাজিত পক্ষের আসল পরিচালক হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সাথে অত্যন্ত সম্মানজনক আচরণ করেন এবং পরিপূর্ণ মর্যাদার তাঁকে মদীনা প্রেরণ করেন। [আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৫, ২৪৬; আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৪৭।] হযরত যোবায়ের (রাঃ)-এর হন্তা এনাম লাভের আশায় উপস্থিত হলে তিনি তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দান করেন, তার হাতে হযরত যোবায়ের (রাঃ)-এর তরবারী দেখে বলেন, কতোবার এ তরবারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হেফাযত করেছিল। [আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৯; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১২৫; ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্টি, পৃষ্ঠা- ১৬২।] হযরত তালহা (রাঃ)-এর পুত্র সাক্ষাৎ করতে এলে অত্যন্ত আদরের সাথে তাকে নিকটে বসতে দেন, তাঁকে তার সম্পত্তি ফেরত দিয়ে বলেন, আমি আশা করি, আখেরাতে তোমার পিতা এবং আমার মধ্যে যে ঘটনা ঘটবে, তাকে আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরীফে এভাবে বর্ণনা করেছেন— 'আমি তাদের অন্তরের কলুষ-কালিমা বিদূরীত করবো, আর তারা ভাইয়ের মতো একে অন্যের সম্মুখে উচ্চাসনে উপবিষ্ট হবে।' —[তাবাকাতে ইবনে সাআদ, পৃষ্ঠা- ২২৪, ২২৫।]
 
পঞ্চম পর্যায়—

হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের (৩৫ হিজরীর ১৮ই জিলহজ্জ) পর হযরত নোমান ইবনে বশীর তাঁর রক্তমাখা জামা, তাঁর স্ত্রী হযরত নায়েলার কাটা আঙ্গুল দামেশকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট নিয়ে যান এবং শামবাসীদের ভাবাবেগকে নাড়া দেয়ার জন্য তিনি এগুলো প্রকাশ্য রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখেন। [ ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৯৮; আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৭; ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৫২।] হযরত মুআবিয়া (রাঃ) ওসমান (রাঃ) হত্যার প্রতিশোধ আইনানুগ পন্থায় নয়, বরং বেআইনী পন্থায় গ্রহণ করতে চান, এটা ছিল তারই প্রমাণ। অন্যথায় এটা স্পষ্ট যে, হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের খবরই মানুষের মনে ক্ষোভ ও দুঃখ সঞ্চারের জন্য যথেষ্ট ছিল, জামা এবং আঙ্গুলের প্রদর্শনী করে মানুষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করার কোন প্রয়োজন ছিল না।
এ'দিকে হযরত আলি (রাঃ) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর সর্বপ্রথম যে সমস্ত কাজ করেন, তার মধ্যে একটি ছিল ৩৬ হিজরীর মহররম মাসে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে শ্যাম থেকে বরখাস্ত করে তাঁর স্থানে হযরত সাহাল ইবনে হানীফের নিযুক্তি। কিন্তু নবনিযুক্ত গবর্ণর সবেমাত্র তাবুক পৌঁছেছেন, এমন সময় শ্যাম-এর একটি পদাতিক বাহিনী তাঁর সাথে মিলিত হয়ে বলে, আপনি হযরত ওসমান (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে এসে থাকলে আপনাকে খোশআমদেদ জানাই। কিন্তু অন্য কারো পক্ষ থেকে এসে থাকলে ফেরত চলে যান। [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১০৩; আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৮; ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৫২।] 

শ্যাম প্রদেশ নতুন খলীফার আনুগত্য গ্রহণে প্রস্তত নয় এটা ছিল তারই স্পষ্ট নোটিশ। হযরত আলি (রাঃ) অপর এক ব্যক্তিকে পত্র দিয়ে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি সে পত্রের কোন জবাবই দেননি। বরং ৩৬ হিজরীর সফর মাসে জনৈক দূতের মারফত তাঁর নিকট একখানা খাম পাঠান। হযরত আলি (রাঃ) খাম খুলে দেখেন, ভেতরে কোন চিঠি নেই। তিনি জিজ্ঞেস করেন, একি ব্যাপার? দূত জানায়, ‘ওসমান হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য আমার পেছনে ৬০ হাজার লোক উন্মুখ হয়ে আছে।’ হযরত আলি (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, কার কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে চায়? সে জবাব দেয়, আপনার ঘাড়ের রগ থেকে। [আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬৪; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১০৪; আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৯; ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৫২-১৫৩।] এর স্পষ্ট অর্থ ছিল যে, শ্যাম-এর গভর্ণর কেবল আনুগত্য স্বীকার করতে চান না, তা-ই নয়, বরং আপন প্রদেশের সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিয়োজিত করতে চান, ওসমান (রাঃ)-এর হন্তাদের কাছ থেকে নয়; বরং তদানীন্তন খলীফার নিকট থেকে ওসমান হত্যার প্রতিশোধ গ্রহন করাই তার উদ্দেশ্য।

এসব কিছুই ছিল হযরত মুআবিয়া (রাঃ) একাধারে ১৬/১৭ বছর ধরে এমন একটি প্রদেশের গভর্ণরের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার ফল। যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে যে প্রদেশের অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে শ্যাম ইসলামী খেলাফতের একটি প্রদেশের তুলনায় অনেকাংশে তাঁর রাজত্বে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ঐতিহাসিকগণ হযরত আলি (রাঃ) কর্তৃক হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে পদচ্যুত করার ঘটনা অনেকটা এমনভাবে বর্ণনা করেছেন, যার ফলে পাঠক মনে করে বসে যে, হযরত আলি (রাঃ)-এর মধ্যে দূরদর্শীতা ও বিচক্ষণতার লেশমাত্রই ছিল না। মুগীরা ইবনে শোবা (রাঃ) তাঁকে বিজ্ঞতার সাথে এ কথা বুঝিয়েছিলেন যে, মুআবিয়া (রাঃ)-কে শুধু শুধু ক্ষেপিয়ে দিয়ে বিপদ ডেকে আনেন। অথচ সে'সব ঐতিহাসিকদের লিখিত ইতিহাস থেকে ঘটনার যে চিত্র সামনে ভেসে ওঠে, তা দেখে কোন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন ব্যক্তি এ কথা অনুভব না করে পারেন না যে, হযরত আলি (রাঃ) হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর পদচ্যুতির নির্দেশ দানে বিলম্ব করলে তা হতো বড় ভুল। তাঁর এহেন পদক্ষেপ থেকে শুরুতেই এটা স্পষ্ট হয়ে পড়ে যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ) কোথায় দাঁড়িয়ে তাঁর ভূমিকা প্রচ্ছন্ন থাকলে আসলে তা প্রতারণার আচ্ছাদন বৈ আর কিছুই হতো না। তা হতো আরও মারাত্মক।

হযরত আলি (রাঃ) অতঃপর শ্যাম আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করেন। তখন শ্যামকে আনুগত্যে বাধ্যকরা তাঁর জন্য তেমন কষ্টকর ছিল না। কারণ জাজিরাতুল আরব, ইরাক এবং মিসর তাঁর আদর্শানুগত। শ্যাম প্রদেশ একা তাঁর মুকাবিলায় বেশীক্ষণ টিকতে পারতো না। উপরন্তু একটি প্রদেশের গভর্ণর খলীফার বিরুদ্ধে তরবারী উন্মুখ করে দাঁড়াবে- মুসলিম জাহানের সাধারণ জনমতও কিছুতেই তা পসন্দ করতো না। বরং এ পরিস্থিতিতে শ্যামের জনগণের পক্ষেও এক জোট হয়ে খলীফার বিরুদ্ধে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে সাহায্য করা সম্ভব হতো না। কিন্তু একই সময়ে হযরত আয়েশা (রাঃ), হযরত তালহা (রাঃ) ও হযরত যোবায়ের (রাঃ)-এর পদক্ষেপ- যা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি-পরিস্থিতির চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে দেয় এবং হযরত আলি (রাঃ)-কে শ্যাম অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে ৩৬ হিজরীর রবিউস সানী মাসে বসরা অভিমুখে রওয়ানা হতে হয়। —[ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১১৩।]

হিজরী ৩৬ সালের জমাদিউস সানী মাসে জামাল যুদ্ধ শেষ করে হযরত আলি (রাঃ) পুনরায় শ্যাম-এর দিকে মনোনিবেশ করেন এবং হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ আল-বাজালীকে একখানা পত্র দিয়ে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট পাঠান। এর মাধ্যমে তাঁকে বুঝাবার চেষ্টা করা হয় যে, উম্মত যে খেলাফতের ব্যাপারে একমত হয়েছে, তাঁর উচিত তার আনুগত্য করা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভেদ সৃষ্টি না করা। কিন্তু তিনি দীর্ঘ সময় হযরত জারীরকে হ্যা বা না, কোন উত্তরই দেননি। বরং দিচ্ছি দিচ্ছি করে সময় কাটাতে থাকেন। হযরত আমর ইবনুল আ’স-এর পরামর্শক্রমে তিনি ফায়সালা করেন যে, হযরত আলী (রাঃ)-কে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যার জন্য দায়ী সাব্যস্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে। তাঁদের উভয়ের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, যুদ্ধের পরে হযরত আলি (রাঃ)-এর বাহিনী পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে তাঁর পতাকা তলে লড়তে সক্ষম হবে না; শ্যামবাসীদের মধ্যে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর পতাকাতলে যুদ্ধ করার জন্য যে মনোবল দেখা যায়, ইরাক সে মনোবল নিয়ে হযরত আলি( রাঃ)-এর সাহায্য করতে সক্ষম হবে না। [আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৬১; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪১-১৪২; আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫৩।] হযরত মুআবিয়া (রাঃ) যখন টালবাহানা করছিলেন সে সময় হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ দামেস্কে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাতে মিলিত হয়ে তাদেরকে এ কথা বলতে থাকেন যে, ওসমান (রাঃ) হত্যার সাথে হযরত আলি (রাঃ)-এর কোন সম্পর্ক নেই এবং এ ব্যাপারে তিনি দায়ীও নন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এতে শংকিত হন, হযরত আলি (রাঃ)-ই হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যার জন্য দায়ী-এ মর্মে শ্যামবাসীদের সামনে সাক্ষ্য দেয়ার নিমিত্ত কতিপয় সাক্ষী তৈরী করার জন্য তিনি এক ব্যক্তিকে নিয়োজিত করেন। কাজেই ঐ ব্যক্তি পাঁচ জন সাক্ষী সংগ্রহ করে আনে। তারা জনগণের সামনে সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত আলি (রাঃ)-ই ওসমান (রাঃ)-কে হত্যা করেছেন। —[আল-ইস্তীয়াব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৮৯।]

এরপর হযরত আলি (রাঃ) ইরাক থেকে এবং হযরত মুআবিয়া (রাঃ) শ্যাম থেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে পরস্পরের দিকে অগ্রসর হন এবং ফোরাতের পশ্চিম প্রান্তে ‘আর-রাক্কার নিকটে অবস্থিত ‘সিফফীন’ নামক স্থানে উভয়পক্ষ মুখোমুখী হয়। হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর বাহিনী পূর্বেই ফোরাতের পানির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে বসে। তিনি প্রতিপক্ষ বাহিনীকে পানি ব্যবহারের অনুমতি দেননি। হযরত আলি (রাঃ)-এর সৈন্যরা যুদ্ধ করে তাদেরকে সেখান থেকে বেদখল করে। হযরত আলি (রাঃ) নিজের লোকদেরকে নির্দেশ দেন নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি নিতে থাকো এবং অবশিষ্ট পানি থেকে প্রতিপক্ষ সৈন্যদলকে উপকৃত হতে দাও। —[আত-তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৬৮, ৫৬৯; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৫, ১৪৬; ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭০।]
জিলহজ্জ মাসের প্রথম দিকে যথারীতি যুদ্ধ শুরু করার আগে হযরত আলি (রাঃ) হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি জবাব দেন, আমার নিকট থেকে চলে যাও, আমার এবং তোমাদের মধ্যে তরবারী ব্যতীত কিছুই নেই। [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬; ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭০।]

কিছুকাল যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পর হিজরী ৩৭ সালের মহররম মাসের শেষ পর্যন্ত তা মুলতবী রাখার চুক্তি সম্পাদিত হলে হযরত আলিআঁতকে  (রঃ) হযরত আদী ইবনে হাতেম (রাঃ)-এর নেতৃত্বে পুনরায় একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন। প্রতিনিধি দলটি হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে বলেন যে, সকলেই হযরত আলি (রাঃ)-এর ব্যাপারে একমত; কেবল আপনি এবং আপনার সঙ্গীরাই তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) জবাব দেন, হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদেরকে যদি তিনি আমাদের হাতে সোপর্দ করেন, যাতে আমরা তাদেরকে হত্যা করতে পারি, তাহলে এর পরই আমরা তোমাদের কথা শুনবো এবং আনুগত্য গ্রহন করে জামায়াতের অন্তর্ভূক্ত হবো। অতঃপর তিনি হযরত আলি (রাঃ)-এর নিকট একটি প্রতিনিধি দল পাঠান। এ দলের নেতা ছিলেন হাবীব ইবনে মাসলামা আল-ফিহরী। তিনি হযরত আলি (রাঃ)-কে বলেন, আপনি হযরত ওসমান (রাঃ)-কে হত্যা করেননি, এ যদি আপনার দাবী হয়ে থাকে, তবে যারা হত্যা করেছে তাদেরকে আমাদের হাতে সোপর্দ করুন। আমরা হযরত ওসমান (রাঃ)-এর রক্তের বদলে তাদেরকে হত্যা করবো। অতঃপর আপনি খেলাফতের পদে ইস্তফা দিন, যাতে মুসলমানরা পারস্পরিক পরামর্শক্রমে যার ব্যাপারে একমত হয়, তাকে খলীফা বানাতে পারে। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩, ৪; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৭, ১৪৮; আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫৭, ২৫৮; ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭১।]
মহররম মাস শেষ হওয়ার পর হিজরী ৩৭ সালের সফর মাস থেকে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের সূচনাতেই হযরত আলি (রাঃ) নিজের বাহিনীর মধ্যে ঘোষণা করেন, সাবধান! তারা আক্রমণ চালাবার আগে নিজেদের পক্ষ থেকে যুদ্ধের সূচনা করবে না। অতঃপর তোমরা তাদেরকে পরাজিত করলে কোন পলায়নকারীকে হত্যা করবে না, কোন আহত ব্যক্তির ওপর হাত তুলবে না, কাউকে নগ্ন করবে না, কোন নিহিত ব্যক্তির লাশ বিকৃত করবে না, কারো গৃহে প্রবেশ করবে না, তাদের অর্থ সম্পদ লুণ্ঠন করবে না, নারীরা তোমাদেরকে গালি দিলেও তাদের গায়ে হাত লাগাবে না। —[তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৬। ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৪৯।]

এ যুদ্ধের সময় এমন একটি ঘটনা সংঘটিত হয়, যা স্পষ্টত প্রমাণ করে দেয় যে, পক্ষদ্বয়ের মধ্যে কে সত্যের ওপর আছে, আর কে মিথ্যার ওপর। ঘটনাটি ছিল এই যে, হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসের, যিনি হযরত আলি (রাঃ)-এর সেনাবাহিনীতে ছিলেন, হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর বাহিনীর সাথে যুদ্ধে শহীদ হন। একটি বিদ্রেহী দল তোমাকে হত্যা করবে, হযরত আম্মার সম্পর্কে নবী করীম (সঃ)-এর এ উক্তি সাহাবীদের মধ্যে বহুল পরিচিত এবং প্রসিদ্ধ ছিল। মুসনাদে আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসায়ী, তাবরানী, বায়হাকী, মুসনাদে আবুদাউদ তায়ালেসী ইত্যকার হাদীসগ্রন্থে হযরত আবু সাঈদ খুদরী, আবু কাতাদা আনসারী, উম্মে সালমা, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ’স, আবু হুরায়রা ওসমান ইবনে আফফান, হুযায়ফা, আবু আইয়ুব আনসারী, আবুরাফে, খোযায়মা ইবনে সাবেত, আমর ইবনুল আ’স, আবুল ইউসর, আম্মার ইবনে ইয়াসের রাযিয়াল্লাহু আনহুম এবং আরও অনেক সাহাবী থেকে এ ধরনের রেওয়ায়াত বর্ণীত হয়েছে। ইবনে সাআদ তাঁর তাবাকাত-এর কয়েক সনদে এ হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। —[ইবনে সা’আদ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫১, ২৫৩, ২৫৯।]

বিভিন্ন সাহাবা এবং তাবেয়ী হযরত আলি (রাঃ) এবং মুআবিয়া (রাঃ)-এর যুদ্ধে যারা সন্ধিহান ছিলেন, এ যুদ্ধে হক-এর ওপর রয়েছেন আর কে বাতিল-এর ওপর এ কথা জানার জন্য তাঁরা হযরত আম্মার (রাঃ)-এর শাহাদাতকে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন। —[ইবনে সাআদ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫৩, ২৫৯, ২৬১; আত-তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৭; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৫৭, ১৬৫।]
আবুবকর আল-জাসসাস তার আহকামুল কুরআন গ্রন্থে লিখেছেন, 'আলী ইবনে আবু তালেব (রাঃ) বিদ্রোহী দলের বিরুদ্ধে অস্ত্রের সাহায্যে যুদ্ধ করেন। তাঁর সাথে ছিলেন এমন সব বড় বড় সাহাবী এবং বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীগণ যাঁদের মর্যাদা সবার জানা আছে। এ যুদ্ধে তিনি ‘হক’-এর ওপর ছিলেন। যে বিদ্রোহী দল তাঁর সাথে যুদ্ধ করেছে তারা ব্যতীত এ ব্যাপারে আর কেউ দ্বিমত পোষণ করে না। উপরন্ত নবী করীম (সাঃ) নিজে হযরত আম্মার (রাঃ)-কে বলে ছিলেন যে, একটি বিদ্রোহী দল তোমাকে হত্যা করবে। এটা এমন এক হাদীস, যা বিভিন্ন সূত্রের বর্ণিত হয়েছে এবং সাধারণ্যে সর্বসম্মতভাবে বিশুদ্ধ বলে গৃহীত হয়েছে। এমনকি, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ’স হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট এ হাদীস বর্ণনা করলে তিনিও অস্বীকার করতে পরেননি। অবশ্য তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, আম্মারকে তারা হত্যা করেছে, যারা তাকে আমাদের বর্শার সামনে ঠেলে দিয়েছে। কুফা, বসরা, হেজায এবং শ্যাম-এর বাসিন্দাগণ সবাই এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। —[আহকামুল ‘কুরআন, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৮৯২।]

ইবনে আবদুল বার 'আল ইস্তীআব'-এ লিখেন— ‘বিদ্রোহী দল আম্মার ইবনে ইয়াসেরকে হত্যা করবে- নবী করীম (সঃ) থেকে অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমে এ কথা বর্ণিত হয়েছে; আর এ বর্ণনাটি বিশুদ্ধ হাদীসমূহের অন্যতম। [আল-ইস্তীআব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪২৪।]
হাফেজ ইবনে হাজার ‘আল-এসাবায়’ এ কথাই লিখেছেন। [আল-এসাবা, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫০৬।] অন্যত্র তিনি লিখেছেন, ‘আম্মার হত্যার পর এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ‘হক’ হযরত আলি (রাঃ)-এর পক্ষে; আহলে সুন্নত এ ব্যাপারে একমত। অথচ ইতিপূর্বে এ ব্যাপারে মতবিরোধ ছিল। [আল-এসাবা, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫০২। তাহাযীবুত তাহযীব-এ ইবনে হাজার লিখেন— নবী (সাঃ) হযরত আম্মার(রাঃ)-কে বলেছিলেন, বিদ্রোহী দল তোমাকে হত্যা করবে, এ হাদীস উপর্যুপুরী বর্ণনায় তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে।]

হাফেজ ইবনে কাসীর আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়ায় হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসের হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে লিখেন, এ থেকে বিদ্রোহী দল কর্তৃক হযরত আম্মারের নিহত হবার যে খবর রাসূলুল্লাহ (সঃ) দিয়েছিলেন তার রহস্য উন্মেচিত হয়েছে, এ থকে এ কথাও স্পষ্ট হয়েছে যে, হযরত আলি (রাঃ) ‘হক’-এর উপর আছেন, আর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বিদ্রোহী। [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৭০।]
জামাল যুদ্ধ থেকে হযরত যোবায়ের (রাঃ)- এর সরে দাঁড়াবার অন্যতম কারণ এও ছিল যে, নবী করীম (সঃ)-এর এ উক্তি তাঁর স্মরণ ছিল। তিনি দেখতে পান যে, হযরত আলি (রাঃ)-এর সেনাবাহিনীতে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসেরও রয়েছেন। [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪১; ইবনে খালদুন, ২য় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৬২।]

কিন্তু হযরত আম্মারের শাহাদাতের খবর হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর সেনাবাহিনীতে পৌঁছিলে এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) তাঁর পিতা এবং হযরত মুআবিয়া (রাঃ) উভয়কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বাণী স্মরণ করিয়ে দিলে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তৎক্ষণাৎ এর ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমরা কি আম্মারকে হত্যা করেছি? তাঁকে তো সে-ই হত্যা করেছে, যে তাঁকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিয়ে এসেছে। [আত-তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৯; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৫৮; আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৬৮, ২৬৯]° হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর এ ব্যাখ্যা এ ব্যাখ্যা সম্পর্কে আল্লামা ইবনে কাসীর বলেন, তিনি যে ব্যাখ্যা পেশ করেছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। মোল্লা আলী কারী ফিকহে আকবর-এর ভাষ্যে এ বর্ণনা উল্লেখ করেন যে, তাঁর এ ব্যাখ্যা সম্পর্কে হযরত আলি রা জানতে পেরে বলেনঃ এ ধরনের ব্যাখ্যা থেকে এ কথাও তো বলা চলে যে, নবী করীম (সাঃ) নিজেই হযরত হামজা (রাঃ)-এর হত্যাকারী ছিলেন। – ফিকহে আকবর-এর ভাষ্য, পৃষ্ঠা-৭৯; দিল্লীর মুজতাবায়ী প্রেস সংস্করণ দ্রষ্টব্য। অথচ নবী করীম (সাঃ) এ কথা বলেননি যে, বিদ্রোহী দল হযরত আম্মারকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিয়ে আসবে; বরং তিনি বলেছিলেন যে, বিদ্রোহী দল তাঁকে হত্যা করবে, এ কথা সুস্পষ্ট যে, তাঁকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর দল হত্যা করেছে, হযরত আলি (রাঃ)- এর দল নয়।

হযরত আম্মার (রাঃ)- এর শাহাদাতের দ্বিতীয় দিন, ১০ই সফর তুমুল যুদ্ধ হয় হযরত মুআবিয়া (রাঃ)- এর সেনাবাহিনী পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। এ সময় হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে পরামর্শ দেন, এখন আমাদের সেনাবাহিনীর বর্শার অগ্রভাগে কুর'আন বেঁধে ঘোষণা করা উচিত— আল-কুর'আনই তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে ফায়সালা করবে। হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) নিজে এর স্বপক্ষে যুক্তি দেখান যে, এতে হযরত আলি (রাঃ)-এর বাহিনীর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হবে। এক দল বলবে, তা মেনে নেয়া হোক, আর এক দল বলবে, না, তা মানা যায় না। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবো, আর তাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হবে। তারা মেনে নিলে আমরা হাতে সময় পেয়ে যাবো। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪; ইবনে সাআদ, ৪র্থ খন্ড, ২৫৫ পৃষ্ঠা; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, ১৬০ পৃষ্ঠা; আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, ২৭২ পৃষ্ঠা; ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭৪।] এর স্পষ্ট অর্থ এই ছিল যে, এটা ছিল নিছক একটি সামরিক কৌশল। কুরআনকে ফায়সালাকারী হিসেবে গ্রহণ করা আদৌ এর লক্ষ্য ছিল না।

পরামর্শ অনুযায়ী মুআবিয়া (রাঃ)-এর সৈন্যবাহিনী কুরআনকে বর্শার তুলে ধরে। এর ফলে হযরত ইবনুল আ’স (রাঃ) যা আশা করেছিলেন তাই হয়। হযরত আলি (রাঃ) ইরাকের লোকদেরকে হাজারো বুঝাতে চেষ্টা করেন যে, তোমরা এ চক্রান্তে পড়ো না, যুদ্ধকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছিলে দাও। কিন্তু তাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ করে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর সাথে তাহকীম-এর চুক্তি করতে হযরত আলি (রাঃ) বাধ্য হন। হাকাম বা সালিস নিযুক্ত করার সময়ও এ অনৈক্য দেখা দেয়। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাঁর পক্ষ থেকে হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ)-কে হাকাম নিযুক্ত করেন। হযরত আলি (রাঃ)-এর ইচ্ছা ছিল, তাঁর পক্ষ থেকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে হাকাম নিযুক্ত করার। কিন্তু ইরাকের লোকেরা বলে উঠলো যে, তিনি তো আপনার চাচাত ভাই। আমরা নিরপেক্ষ লোক চাই। শেষ পর্যন্ত তাদের পীড়াপীড়িতে পড়ে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে হাকাম নিযুক্ত করতে বাধ্য হন। অথচ তাঁর ব্যাপারে তিনি নিজে নিশ্চিন্ত ছিলেন না। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৪, ৩৫, ৩৬; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৬১, ১৬২; আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৭৫, ২৭৬; ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭৫।]
 
ষষ্ঠ পর্যায়—

এখন খেলাফতকে রাজতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত রাখার সর্বশেষ সুযোগটি মাত্র অবশিষ্ট ছিল। তা ছিল-এই যে, যে চুক্তি অনুযায়ী সালিসদ্বয়কে ফায়সালা করার ইখতিয়ার দেয়া হয়েছিল তারা যথাযথ ফায়সালা করবেন। চুক্তির যে, বিবরণী ঐতিহাসিকরা উদ্ধৃত করেছেন, তাতে ফায়সালার ভিত্তি ছিল এই— ‘উভয় সালিস আল্লাহর কিতাব অনুসারে কাজ করবেন আর আল্লার কিতাবে যে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে না সে ব্যাপারে সত্যাশ্রয়ী এবং ঐক্য সংহতকারী সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ করবো। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৮; আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৭৬; ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭৫।]

কিন্তু ‘দুমাতুল জান্দাল’-এ উভয় সালিস যখন বসেন, তখন কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে এ বিরোধের মীমাংসা হতে পারে এ বিষয়টি আদতে আলোচনার অন্তর্ভূক্ত হয়নি। কুরআনে সুষ্ঠু নির্দেশ রয়েছে যে, মুসলমানদের দুটি দল পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়লে বিরোধ মীমাংসার সঠিক উপায় হচ্ছে বিদ্রোহী দলকে সত্যপথে আসতে বাধ্য করা। [আল-হুজুরাতে ৯ আয়াত— “মুমিনদের দুটি দল যদি পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তবে তাদের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করো। একদল যদি অপর দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তাহলে বিদ্রোহী দল আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো।” হযরত আম্মার-এর শাহাদাতের পর নবী করীম (সাঃ)-এর সুস্পষ্ট হাদীস দ্ব্যর্থহীনভাবে চিহ্নিত করে দিয়েছিল যে, এ বিরোধে বিদ্রোহী দল কোনটি। একজন আমীরের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর আনুগত্য অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধেও স্পষ্ট হাদীস বর্তমান ছিল। রক্তের প্রতিশোধ দাবী করারও স্পষ্ট বিধান বর্তমান ছিল শরীয়তে। এ বিধানের আলোকে বিচার করা যেতো যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হযরত ওসমান (রাঃ)-এর খুন সম্পর্কে তাঁর দাবী সঠিক পন্থায় উত্থাপন করেছেন, না অন্যায় পন্থায়। সালিস চুক্তিতে উভয় সালিসের উপরে আসলে এ দায়িত্ব অর্পণই করা হয়নি যে, তাঁরা নিজেদের ইচ্ছা মতো খেলাফত সম্পর্কে একটি ফায়সালা করে দেবেন। বরং তাদের সামনে উভয় পক্ষের বিরোধ দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরা হয় এবং প্রথমে আল্লার কিতাব অতঃপর রাসূলের ন্যায়ানুগ সুন্নতের ভিত্তিতে এর মীমাংসা করার দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পিত হয়। কিন্তু উভয় বুযুর্গ যখন আলোচনা শুরু করেন তখন এ সমস্ত বিষয় বেমালুম ভুলে গিয়ে খেলাফতের ব্যাপারে কিভাবে একটা সমাধানে পৌঁছানো যায় এ নিয়ে তারা মাথা ঘামাতে থাকেন।

হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনার মতে এ ব্যাপারে কোন পন্থা সমীচীন? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার মত এই যে, আমরা এ ব্যক্তিদ্বয়কে (আলি এবং মুআবিয়া) বাদ দিয়ে খেলাফতের ব্যাপারটি মুসলমানদের পারস্পরিক পরামর্শের উপর ছেড়ে দেই, যাতে তারা যাকে খুশী নির্বাচিত করতে পারে।’ 
হযরত আমর (রাঃ) বললেন, 'আপনি যথার্থ চিন্তা করেছেন।'

অতপর উভয়ে এক গণসমাবেশে উপস্থিত হন। এ গণসমাবেশে উভয় পক্ষ থেকে ৪শত করে সমর্থক এবং কয়েকজন নিরপেক্ষ বুযুর্গও উপস্থিত ছিলেন। হযরত আমর (রাঃ) হযরত আবু মূসা (রাঃ)-কে বলেন, ‘আমাদের উভয়ের ঐক্যমতে পৌছার কথাটা আপনি এদেরকে বলে দিন।’ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত আবু মূসা (রাঃ)-কে বলেন, ‘আপনারা উভয়ে ঐক্যমতে উপনীত হয়ে থাকলে হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ)-কে তা ঘোষণা করতে দিন। কারণ আমার আশংকা হচ্ছে, আপনি প্রতারিত হয়েছেন।' হযরত আবু মূসা (রাঃ) বলেন, ‘আমি এ রকম কোন আশংকা করছি না। আমরা একমত হয়ে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি।’ অতঃপর তিনি ভাষণ দিতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, ‘আমি এবং আমার এ বন্ধু (অর্থাৎ আমর ইবনুল আ’স) একটি বিষয়ে একমত হয়েছি। তা এই যে, আমরা আলি (রাঃ) এবং মুআবিয়া (রাঃ)-কে বাদ দেবো, অতঃপর জনগণ পরামর্শক্রমে যাকে খুশী আমীর নিযুক্ত করবে। সুতরাং আমি আলি (রাঃ) এবং মুআবিয়া (রাঃ)-কে বরখাস্ত করছি। এখন নিজেদের ব্যাপার আপনারা নিজেদের হাতে নিয়ে নিন এবং যাকে যোগ্য মনে করেন, আমীর নিযুক্ত করুন।’ 
অতঃপর হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ইনি যা বলেছেন, আপনারা শুনলেন। তিনি নিজের লোক (হযরত আলি)-কে বরখাস্ত করেছেন। তাঁর মতে আমিও তাঁকে বরখাস্ত করছি এবং আমার নিজের লোক (হযরত মুআবিয়াকে) বহাল রাখছি। কারণ তিনি ওসমান ইবনে আফফান (রাঃ)-এর বন্ধু এবং তাঁর রক্তের দাবীদার। উপরন্তু তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি।’ 

হযরত আবু মূসা (রাঃ) এ কথা শুনেই বলে ওঠেন— “তুমি এ কি করলে? আল্লাহ তোমাকে সুযোগ দেবেন না। তুমি প্রতারণা করেছো এবং চুক্তির বিরোধিতা করেছো।” হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) বলেন, 'আবু মূসা! তোমার জন্য আফসোস হয়। আমরের চক্রান্তের মুকাবিলায় তুমি অনেক দুর্বল প্রতিপন্ন হলে।’ হযরত আবু মূসা (রাঃ) জবাবে বলেন, 'এখন আমি কি করবো? তিনি আমার সাথে একটি বিষয় একমত হয়েছিলেন পরে তা থেকে মুক্ত করে নিলেন নিজেকে।’ হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবুবকর (রাঃ) বলেন, “এর পূর্বে আবু মূসা মারা গেলে তা তার জন্য অতি উত্তম হতো।”
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, ‘দেখো, এ উম্মতের অবস্থা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। এমন দু ব্যক্তির ওপর উম্মতের ভবিষ্যত ন্যস্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে একজন কি করেছেন তার কোন পরওয়া করেন না, আর অন্যজন দুর্বল। [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫১; ইবনে সাআদ, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-২৫৬, ২৫৭; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৬৮; আল বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৮২, ২৮৩; ইবনে খালদুন, ২য় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭৮।] 
হযরত আবু মূসা (রাঃ) তাঁর ভাষণে যা বলেছিলেন, সে সম্পর্কে যে উভয়ের মধ্যে ঐক্যমত হয়েছিল-এ বিষয়ে সেখানে উপস্থিত কোন ব্যক্তির সন্দেহ ছিল না। হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) যা কিছু করেন, তা ছিল স্থিরকৃত সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অতঃপর হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে খেলাফতের সুসংবাদ দেন। হযরত আবু মূসা (রাঃ) লজ্জায় হযরত আলি (রাঃ)-কে মুখ দেখাতে না পেরে সরাসরী মক্কা চলে যান। —[আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৮৩; ইবনে খালদুন, দ্বিতীয় খন্ডের পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা- ১৭৮।]

হাফেজ ইবনে কাসীর হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ)-এর এ কার্যের ব্যাখ্যা দিয়ে লিখেছেন, তিনি জনগণকে সে মুহুর্তে নেতা বিহীন অবস্থায় ছেড়ে দেয়া সমীচীন মনে করেননি। কারণ তখন জনগণের মধ্যে যে মতানৈক্য বিরাজ করছিল, তা দেখে তাঁর আশংকা হয় যে, এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় দেখা দেবে। তাই, তিনি প্রয়োজনের তাগিদে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে বহাল রাখেন; ইজতিহাদ নির্ভুলও হয়, ভুলও হয়। —[আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৮৩।]

কিন্তু যে কোন ইনসাফপ্রিয় ব্যক্তি বর্শার মাথায় কুরআন বাঁধার প্রস্তাব থেকে শুরু করে এ পর্যন্তকার সমস্ত বিবরণী পাঠ করবেন, এসব কিছুকে ‘ইজতিহাদ’ বলে মেনে নেয়া তার পক্ষে বড়ই কঠিন হয়ে পড়বে। সন্দেহ নেই, আমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সকল সাহাবীই সম্মানার্হ। যে ব্যক্তি তাঁদের কোন ভুলের কারণে তাঁদের সকল খেদমত অস্বীকার করে বসে এবং তাঁদের উচ্চতর মর্যাদা বিস্মৃত হয়ে গালি দেয়ার পর্যায়ে নেমে আসে, সে সত্যিই শত-সহস্র বার জুলুম করে। কিন্তু তাঁদের কেউ কোন ভুল করলে নিছক সাহাবীদের মর্যাদার কারণে তাকে ‘ইজতিহাদ’ বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করাটাও কম জুলুম ও অন্যায় নয়। বড় লোকদের ভুল যদি তাদের মহত্বের ফলে ইজতিহাদ হয়ে যায়, তবে পরবর্তীকালের লোকদেরকে কি বলে এমন সব ইজতিহাদ থেকে আমরা নিবৃত্ত করবো? ইজতিহাদের অর্থই তো হচ্ছে সত্য বিষয় অবগত হওয়ার জন্য সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করা। এ চেষ্টা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোন ভুল হয়ে গেলেও সত্য জানার চেষ্টা অবশ্যি প্রতিদান লাভের অধিকারী হবে। কিন্তু জেনে শুনে সুপরিকল্পিত উপায়ে কোন ভুল করার নাম কিছুতেই ইজতিহাদ হতে পারে না। বস্তুত এ সকল ব্যাপারে বাড়াবাড়ি একান্তই বর্জনীয়। কোন ভুল কাজ নিছক সাহাবী হওয়ার ফলে মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে না; বরং সাহাবীর মহান মর্যাদার ফলে সে ভুল আরও উৎকট হয়ে ওঠে। তবে সে ব্যাপারে মন্তব্যকারীকে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ভুলকে ভুল মনে করা এবং ভুল বলা পর্যন্তই মন্তব্য সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। আরও অগ্রসর হয়ে সাহাবীদের ব্যক্তিসত্ত্বাকে সামগ্রিকভাবে অভিযুক্ত ও দোষারোপ করা যাবে না। নিঃসন্দেহে হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) বিরাট মর্যাদা সম্পন্ন বুযুর্গ। তিনি ইসলামের বহু মূল্যবান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। কিন্তু তিনি এ দুটি ভুল কাজ করেছেন, যাকে ভুল না বলে গত্যন্তর নেই।

উভয় সালিসের মধ্যে কে কি করেছেন, সে আলোচনার প্রবৃত্ত না হয়েও এ কথা বলা চলে যে, দুমাতুল জানদালে যা কিছু ঘটেছে, তার সবটুকুই ছিল সালিসী চুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এভাবে নিঃসন্দেহে চুক্তির সীমালংঘন করা হয়েছিল। তাঁরা অন্যায়ভাবে এ কথা ধরে নিয়েছিলেন যে, হযরত আলি (রাঃ)-কে বরখাস্ত করার ইখতিয়ার তাঁদের রয়েছে। অথচ হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর তিনি যথারীতি আইনানুগ পন্থায় খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলেন। সালিসী চুক্তির কোন শব্দের এমন অর্থ করা যায় না, যা থেকে বুঝা যায় যে, তাঁকে বরখাস্ত করার ইখতিয়ার তাদেরকে দেয়া হয়েছে। উপরন্তু তাঁরা এ কথাও অন্যায়ভাবে ধরে নিয়েছেন যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হযরত আলি (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে খেলাফতের দাবী নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। অথচ এ পর্যন্ত তিনি কেবল মাত্র হযরত ওসমান (রাঃ)-এর রক্তের দাবীদার ছিলেন, খেলাফতের দাবীদার ছিলেন না। সর্বোপরি তাদের এ ধারণাও ভুল ছিল যে, তাদেরকে খেলাফত সমস্যার সমাধানের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে। সালিসী চুক্তিতে এহেন ভ্রান্ত ধারণার কোন ভিত্তি ছিল না। এ কারণে হযরত আলি (রাঃ) তাঁদের ফায়সালা প্রত্যাখ্যান করেন এবং এক সমাবেশে বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘শোন! তোমরা যে দুজনকে সালিস নিযুক্ত করেছিলে, তারা কুরআনের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেছে। আল্লাহর নির্দেশ ব্যতিরেকেই তাদের সকলেই স্ব স্ব ধারণার অনুসরণ করেছে। তারা এমন ফায়সালা দিয়েছে, যা সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ এবং অতীত রীতির ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এ ফায়সালায় তাদের কেউই একমত হতে পারেনি। কেউই পারেনি কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে। —[তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৭।]

অতঃপর হযরত আলি (রাঃ) কুফায় পৌঁছে পুনরায় শ্যাম আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করেন। এ সময় তিনি যেসব ভাষণ দেন, তা থেকে স্পষ্ট জানা যায়, তিনি মিল্লাতের ওপর স্বৈরতন্ত্র আরোপিতা হওয়ার আশংকা কতো তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন এবং খেলাফতে রাশেদার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কিভাবে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এক ভাষণে তিনি বলেন, 'আল্লার শপথ, এরা যদি তোমাদের শাসক হয়ে বসে, তাহলে তোমাদেরকে কাইজার এবং হেরাক্লিয়াসের ন্যায় শাসন করতে থাকবে। —[ আত-তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৮; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৭১।]
অপর এক ভাষণে তিনি বলেন, 'যারা আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজেদের গোলাপে পরিণত করার জন্য এবং স্বৈরাচারী শাসক হবার জন্য তোমাদের সাথে লড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তোমরা প্রস্তুত হও।' [তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৫৯; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৭২।]

কিন্তু ইরাকের লোকেরা মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল এবং অন্যদিকে খারেজিদের বিপর্যয় হযরত আলি (রাঃ)-এর জন্য এক নতুন মাথা ব্যাথার সৃষ্টি করে। এ ছাড়া হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এবং হযরত আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) এমন কৌশল অবলম্বন করেন, যার ফলে মিসর এবং উত্তর আফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চলও তাঁর হাতছাড়া হয়ে যায় এবং মুসলিম জাহান কার্যত দুটি সংঘর্ষশীল সরকারে বিভক্ত হয়ে পড়ে। অবশেষে হযরত আলি (রাঃ)-এর শাহাদাত (৪০ হিজরী) রমজান মাসের এবং হযরত হাসান (রাঃ)-এর সমঝোতা (৪১ হিজরী) ময়দানকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেয়। এরপর যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা দেখে যেসব লোক ইতিপূর্বে হযরত আলি (রাঃ) এবং তাঁর বিরোধীদের মধ্যকার যুদ্ধকে নিছক ফেতনা বলে উল্লেখ করে নির্লিপ্ত ছিলেন, তাঁরাও ভালভাবে বুঝতে সক্ষম হন যে, হযরত আলি (রাঃ) কোন বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত রাখার এবং উম্মতকে কোন পরিণতি থেকে বাঁচাবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে আসছিলেন। 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) তাঁর জীবনের শেষ সময়ে বলেছিলেন, ‘আমি আলি (রাঃ)-এর সঙ্গে কেন যোগ দেইনি, এ জন্য যত অনুতাপ হয়েছে, তা আর কিছুর জন্য হয়নি।’ [ইবনে সাআদ, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৮৭; ইবনে আবদুল বার, আল-ইস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩০-৩৭।]
ইবরাহীম নাখঈর বর্ণনায়; ‘মাসরুক ইবনে আজদা’ হযরত আলি (রাঃ)-এর সাথে যোগ না দেয়ার জন্য তাওবা ও এস্তেগফার করেন। [আল-ইস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩০।] 
হযরত আলি (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর পক্ষ অবলম্বন করার জন্য হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ’স (রাঃ) সারা জীবন ভীষণ লজ্জিত ও অনুতপ্ত ছিলেন। [আল-ইস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৭১।]

হযরত আলি (রাঃ) এ বিপর্যয়কালে যেভাবে কাজ করেছেন, তা একজন খলীফায়ে রাশেদের সম্পূর্ণ উপযোগী ছিল। কেবল একটি বিষয়ে এমন দেখা যায়, যার সমর্থন করা অত্যন্ত কঠিন মনে হয়। তা হচ্ছে, যুদ্ধের পর হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদের ব্যাপারে তিনি নিজের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করেন। জামাল যুদ্ধের পূর্বপর্যন্ত তিনি তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদেরকে সহ্য করতেন, তাদেরকে কাবু করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হযরত তালহা (রাঃ) ও যুবায়ের (রাঃ)-এর সাথে আলাপ আলোচনার জন্য তিনি যখন হযরত কা’কা’ ইবনে আমরকে প্রেরণ করেন, তখন তাঁর প্রতিনিধিত্ব করে কা’কা’ বলেছিলেনঃ ‘হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হন্তাদের পাকড়াও করার ক্ষমতালাভের পূর্ব পর্যন্ত হযরত আলি (রাঃ) তাদের বিরুদ্ধে হস্ত উত্তোলন থেকে বিরত রয়েছেন। আপনারা বায়াত গ্রহণ করলে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর খুনের প্রতিশোধ গ্রহণ সহজ হয়ে যাবে। [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৩৭।] 

অতঃপর যুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে হযরত তালহা (রাঃ) এবং যুবায়ের (রাঃ)-এর সাথে তাঁর কথাবার্তা হয়েছে। তাতে হযরত তালহা (রাঃ) তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, আপনি ওসমান (রাঃ)-এর হত্যার জন্য দায়ী। জবাবে তিনি বলেন, 'ওসমান হন্তাদের ওপর আল্লার অভিসম্পাত।' [আল-বেদায়া, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪০।] কিন্তু হযরত ওসমান (রাঃ)-এর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে অবশেষে তাঁকে হত্যার জন্য যারা দায়ী, অতঃপর এবং মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর (রাঃ)-কে গবর্ণর পদে নিয়োগ করেন। অথচ ওসমান (রাঃ)-এর হত্যায় এদের যে ভূমিকা ছিল, তা সকলেরই জানা। হযরত আলি (রাঃ)-এর সমগ্র খেলাফত আমলে এ একটি কাজই আমরা এমন দেখতে পাই, যাকে ভুল না বলে উপায় নেই।

কেউ কেউ বলে থাকেন যে, হযরত ওসমান (রাঃ)-এর মতো হযরত আলি (রাঃ)-ও তাঁর অনেক আত্মীয়-স্বজনকে বড় বড় পদে নিয়োগ করেছেন। যেমন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ওবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত কোসাম ইবনে আব্বাস (রাঃ) ইত্যাদি। কিন্তু এ যুক্তি পেশ করার সময় তারা ভুলে যান যে, হযরত আলি (রাঃ) এমন এক পরিস্থিতিতে এ কাজ করেছিলেন, যখন উন্নতমানের যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের একটি অংশ তাঁর সাথে সহযোগিতা করছিল না, অন্যদিকে অপর একটি অংশ বিরোধী শিবিরে যোগ দিয়েছিল এবং তৃতীয় অংশটি থেকেও প্রতিদিন লোকেরা বের হয়ে ভিন্ন দিকে চলে যাচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে তিনি এমন সব লোককে কাজে লাগাতে বাধ্য হন, যাদের ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা ছিল। হযরত ওসমান (রাঃ)-এর আমলের পরিস্থিতির সাথে এ পরিস্থিতির কোন মিল নেই। কারণ তিনি এমন এক সময় এ কাজ করেন, যখন উম্মাতের সমস্ত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির সম্পূর্ণ সহযোগিতা তিনি লাভ করেন। আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য-সহযোগিতা গ্রহণে তিনি বাধ্য ছিলেন না।
 
শেষ পর্যায়—

ক্ষমতার চাবিকাটি মুআবিয়া (রাঃ)-এর হস্তগত হওয়াই ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের খেলাফত থেকে স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের দিকে প্রত্যাবর্তনের অন্তবর্তীকালীন পর্যায়। দুরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিরা এ পর্যায়েই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, এখন তারা রাজতন্ত্রের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্মুখীন। তাই দেখি, হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর বায়আতের পর হযরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়ে— রাজা! আপনার প্রতি সালাম বলে সম্বোধন করেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেন, আপনি আমীরুল মুমিনীন বললে কি অসুবিধা ছিল? জবাবে তিনি বলেন, আল্লার কসম, যে পন্থায় আপনি ক্ষমতা লাভ করেছেন, আমি সে পন্থায় কিছুতেই তা গ্রহণ করতাম না। [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪০৫; এ ব্যাপারে হযরত সাআদ (রাঃ) এর দৃষ্টিভঙ্গী কি ছিল, একটি ঘটনা থেকে তার ওপর আলোকপাত হয়। বিপর্যয় কালে একদা তাঁর ভ্রাতুষপুত্র হাশেম ইবনে ওতবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস তাঁকে বলেন, আপনি খেলাফতের জন্য দাঁড়ালে অসংখ্য তরবারী আপনার সমর্থনের জন্য প্রস্তুত। জবাবে তিনি বলেন, এসব লক্ষ তরবারীর মধ্যে আমি কেবল একখানা তরবারী চাই, যা কাফেরের ওপর চলবে, চলবে না কোন মুসলমানের বিরুদ্ধে (আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৭২)।] 
হযরত মুআবিয়া (রাঃ) নিজেও এ'কথা জানতেন। একবার তিনি নিজেই বলেছিলেন, 'আমি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম রাজা।' [আল-ইস্তীআব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৫; আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৩৫।] বরং হাফেজ ইবনে কাসীর-এর উক্তি অনুযায়ী তাঁকে খলীফা না বলে বাদশাহ বলাই সুন্নত। কারণ, মহানবী (সঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘আমার পর খেলাফত ৩০ বৎসর থাকবে, অতঃপর বাদশাহীর আগমন হবে।’ হিজরী ৪১ সালের রবিউল আউয়াল মাসে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর পক্ষে হযরত হাসান (রাঃ)-এর খেলাফত ত্যাগের মাধ্যমে এ মেয়াদ সমাপ্ত হয়েছে। —[আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৬।]

এখন খেলাফত আল মিনহাজিন নবুয়াত (মহানবী প্রদর্শিত পথে খেলাফত) বহাল করার একটি মাত্র উপায়ই অবশিষ্ট ছিল, তা ছিল হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাঁর অবর্তমানে কাউকে এ পদে নিয়োগ করার ভার মুসলমানদের পারস্পরিক পরামর্শের ওপর ছেড়ে দিতেন; অথবা বিরোধ নিরসনের উদ্দেশ্যে তাঁর জীবদ্দশায়ই স্থলাভিষিক্তের ব্যাপারটি চূড়ান্ত করা প্রয়োজনীয় মনে করলে মুসলমানদের সৎ ও ইসলামী জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমবেত করে উম্মতের মধ্য থেকে যোগ্যতম ব্যক্তিকে বাছাই করার স্বাধীনতা ক্ষমতা দান করতেন। কিন্তু স্বীয় পুত্র ইয়াজীদের স্বপক্ষে ভয়-ভীতি ও লোভ-লালসা দেখিয়ে বায়আত গ্রহণ করে তিনি এ সম্ভাবনারও সমাপ্তি ঘটালেন।

হযরত মুগীরা ইবনে শো’বা (রাঃ) এ প্রস্তাবের উদ্ভাবক। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাঁকে কুফার গবর্ণরে পদ থেকে বরখাস্ত করার কথা চিন্তা করছিলেন; তিনি এ বিষয়ে অবহিত হলেন। তৎক্ষণাৎ কুফা থেকে দামেশকে পৌছে ইয়াজিদের সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন, ‘শীর্ষ স্থানীয় সাহাবী এবং কুরাইশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমি বুঝতে পারছি না আমীরুল মুমিনীন তোমার পক্ষে বায়আত গ্রহণের কেন বিলম্ব করছেন।’ ইয়াজীদ তাঁর পিতার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি হযরত মুগীরা (রাঃ)-কে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ইয়াজিদকে কি বলেছো? হযরত মুগীরা (রাঃ) জবাব দেন, ‘আমিরুল মুমিনীন! হযরত ওসমান (রাঃ)-এর হত্যার পর যতো মতবিরোধ এবং খুন-খারাবী হয়েছে, তা আপনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। কাজেই এখন আপনার জীবদ্দশায়ই ইয়াজীদকে স্থলাভিষিক্ত করে বায়আত গ্রহণ করাই আপনার জন্য উত্তম। ফলে আল্লাহ না করুন যদি আপনার কখনো কিছু হয়ে যায়, তাহলে অন্তত মতবিরোধ দেখা দেবে না।’ হযরত মুআবিয়া (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ কাজ সমাপ্ত করার দায়িত্ব কে নেবে?' জবাবে তিনি বললেন, আমি কুফারবাসীদের সামলাবো; আর যিয়াদ বসরাবাসীদেরকে। এরপর বিরোধিতা করার আর কেউ থাকবে না।’ 

এ কথা বলে হযরত মুগীরা (রাঃ) কুফা গমন করেন এবং দশজন লোককে ৩০ হাজার দেরহাম দিয়ে একটি প্রতিনিধি দলের আকারে হযরত মুআবিয়ার নিকট গমন করে ইয়াজীদের স্থলাভিষিক্তের জন্য তাঁকে বলতে সম্মত করেন। হযরত মুগীরা (রাঃ)-এর পুত্র মুসা ইবনে মুগীরার নেতৃত্বে এ প্রতিনিধি দল দামেস্কে গমন করে তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করে। পরে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) মুসাকে একান্তে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার পিতা এদের নিকট থেকে কত মূল্যে এদের ধর্ম ক্রয় করেছেন?' তিনি বললেন, '৩০ হাযার দিরহামের বিনিময়ে।' হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেন, 'তাহলে তো এদের ধর্ম এদের দৃষ্টিতে নিতান্ত নগন্য।' [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৯; আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৭৯ এবং ইবনে খালদুন, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ১৫-১৬ তে এঘটনার অংশ বিশেষের উল্লেখ আছে।]

অতঃপর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বসরার গবর্ণর যিয়াদকে লিখেন, এ ব্যাপারে তোমার মত কি? তিনি ওবায়েদ ইবনে কাআব আন নুমাইরকে ডেকে বলেন, আমিরুল মুমিনীন এ ব্যাপারে আমাকে লিখেছেন। আমার মতে ইয়াজীদের মধ্যে অনেকগুলো দুর্বলতা রয়েছে। তিনি দুর্বলতাগুলো উল্লেখ করেন। অতঃপর বলেন, তুমি আমীরুল মুমিনীনের কাছে গিয়ে বলো যে, এ ব্যাপারে যেন তাড়াহুড়ো না করা হয়। ওবায়েদ বলেন, আপনি হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-এর মতামত নষ্ট করার চেষ্টা করবেন না। আমি গিয়ে ইয়াজীদকে বলবো যে, আমীরুল মুমিনীন এ ব্যাপারে আমীর যিয়াদের পরামর্শ চেয়েছেন। তিনি মনে করেন, জনগণ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করবে। কারণ, তোমার কোন কোন আচার-আচরণ জনগণ পসন্দ করে না। তাই আমীর যিয়াদের পরামর্শ এই যে, তুমি এ সব বিষয় সংশোধন করে নাও, যাতে কাজটি ঠিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে। যিয়াদ এ মত পসন্দ করেন। ওবায়েদ দামেস্ক গমন করে এক দিকে ইয়াজীদকে তাঁর ব্যক্তিগত আচার-আচরণ সংশোধনের পরামর্শ দেন, আর অপর দিকে হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে বলেন, আপনি এ ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবেন না। [আত-তাবারী, ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা- ২২৪, ২২৫; ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৪৯-২৫০; আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৭৯।] ঐতিহাসিকরা বলেন, এরপর ইয়াজীদ তাঁর বহু আচরণ সংশোধন করে নেন, যা লোকেরা আপত্তিকর মনে করতো। কিন্তু এ বিবরণ থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়। এক). ইয়াজীদের স্থলাভিষিক্তের প্রাথমিক আন্দোলন কোন সুষ্ঠু ভাবধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না; বরং একজন বুযুর্গব্যক্তি তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থে অপর বুযুর্গের স্বার্থকে চাঙ্গা করে এ প্রস্তাবের জন্ম দিয়েছিলেন। এভাবে তাঁরা উম্মাতে মুহাম্মদীকে কোন পথে ঠেলে দিচ্ছেন, তা কোন বুযুর্গই চিন্তা করেননি। দুই). ইয়াজীদ নিজে এমন মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন না যে মুআবিয়া (রাঃ)-এর পুত্র হবার বিষয়টি বাদ দিলে কেউ এ কথা বলতে পারেন যে, হযরত মুআবিয়া (রাঃ) এর পরে উম্মতের নেতৃত্বের জন্য তিনি যোগ্যতম ব্যক্তি ছিলেন।

যিয়াদের মৃত্যুর (৫০ হিজরী) পর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) ইয়াজীদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রভাবশালী লোকদের সমর্থন লাভের চেষ্টা শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-এর নিকট এক লক্ষ দেরহাম পাঠিয়ে ইয়াজীদের বায়আতের জন্য তাঁকে সম্মত করাবার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘ওহো, এ উদ্দেশ্যে আমার জন্য এ টাকা পাঠান হয়েছে। তা হলে তো আমার দ্বীন আমার জন্য খুবই সস্তা।’ এ বলে তিনি টাকা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫০; আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৮৯।]

এরপর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) মদীনার গভর্ণর মারওয়ান ইবনুল হাকামকে লিখেন, ‘আমি বৃদ্ধ হয়ে পড়িছি, আমার জীবদ্দশায়ই কাউকে স্থলাভিষিক্ত করে যেতে চাই। ………….স্থলাভিষিক্ত মনোনয়নের ব্যাপারে জনগণের মতামত জিজ্ঞেস করো।’ মারওয়ান বিষয়টি মদীনাবাসীদের সামনে উত্থাপন করেন। সকলেই বলেন, এটা একান্ত অসমীচীন। এরপর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) আবার মারওয়ানকে লিখেন, ‘আমি স্থলাভিষিক্তির জন্য ইয়াজীদকে মনোনীত করেছি।’ মারওয়ান পুনরায় বিষয়টি মদীনাবাসীদের সামনে উত্থাপন করে মসজিদে নববীতে ভাষণ দান করেন। তিনি বলেন, ‘আমীরুল মুমিনীন তোমাদের জন্য যোগ্য ব্যক্তি সন্ধান করার ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেননি। তিনি নিজে পুত্র ইয়াজীদকে তার স্থলাভিষিক্ত করেছেন। এটা একটা চমৎকার সিদ্ধান্ত। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি নিজ পুত্রকে স্থলাভিষিক্ত করেছেন, এটা কোন নতুন কথা নয়। আবুবকর (রাঃ) এবং ওমর (রাঃ)-ও স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করেছিলেন।’ এতে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবুবকর উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘মারওয়ান! তুমি মিথ্যা বলেছো। আর মিথ্যা বলেছে মুআবিয়াও। তোমরা কখনো উম্মাতে মুহাম্মদীয়ার কল্যাণের কথা চিন্তা করোনি। তোমরা একে ‘কায়সরতন্ত্রে’ রূপান্তিরত করতে চাও। একজন কায়সর মারা গেলে তার পুত্র তার স্থান দখল করে। এটা আবুবকর ও ওমরের নীতি নয়। তাঁরা আপন সন্তানকে স্থলাভিষিক্ত করেননি।’ মারওয়ান বলেন, 'ধরো একে’। এ ব্যক্তি সম্পর্কেই তো কুরআনে বলা হয়েছে— "যে ব্যক্তি তার মাতা-পিতাকে বলেছে, দুঃখ তোমাদের জন্য।" 

হযরত আবুদর রহমান (রাঃ) পলায়ন করে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর হুজরায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) চীৎকার করে বলেন, ‘মিথ্যা বলেছে মারওয়ান। আমাদের খান্দানের কারো প্রসঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়নি। বরং যার প্রসঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, আমি ইচ্ছা করলে তার নাম বলতে পারি। অবশ্য মারওয়ান যখন পিতার ঔরসে, তখন রাসুলুল্লাহ (সঃ) তাঁর পিতার ওপর লানৎ বর্ষণ করেন।’ মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবুবকর (রাঃ)-এর মতো হযরত হুসাইন ইবনে আলি (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-ও ইয়াজীদের স্থলাভিষিক্ততা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। [বুখারী শরীফে সুরায়ে আহকাফের তাফসীরে এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। হাফেজ ইবনে হাজার ফতহুল বারীতে নাসায়ী, ইসমাঈলী, ইবনুল মুনযের, আবু ইয়া’লা এবং ইবনে আবী হাতেম হতে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। হাফেয ইবনে কাসীরও তাঁর তাফসীরে ইবনে আবী হাতেম এবং নাসায়ীর উদ্ধৃতি দিয়ে এর আনুসাঙ্গিক বিবরণ উল্লেখ করেছেন। আরও বিস্তারিত বিবরণের জন্য আল-ইস্তীআব, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৯৩; আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৮৯ এবং ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫০ দেখুন। ইবনুল আসীর লিখেছেন, কোন কোন বর্ণনা মতে হিজরী ৫৩ সালে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবুবকর ইন্তেকাল করেন। এটা সত্য হলে তখন তিনি উপস্থিত ছিলেন না।’ কিন্তু নির্ভরযোগ্য হাদীসের বর্ণনা এর বিপক্ষে। হাফেজ ইবনে কাসীর আল-বেদায়ায় লিখেছেন, হিজরী ৫৮ সালে তার ইন্তেকাল হয়েছে।]

এ সময়ে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিদের তলব করে বিষয়টি তাদের সামনে উত্থাপন করেন। জবাবে সকলেই তোষামোদমূলক বক্তব্য পেশ করে। কিন্তু হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস নীরব থাকেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আবু, বাহর, তোমার কি মত?’ তিনি বলেন, ‘সত্য বললে আপনার ভয়, আর মিথ্যা বললে আল্লাহর ভয়। আমীরুল মুমিনীন, আপনি ইয়াজীদের দিন-রাত্রির চলাফেরা ওঠা-বসা, তার ভিতর-বাহির সবকিছু সম্পর্কে ভালভাবেই জানেন। আল্লাহ এবং এ উম্মতের জন্য সত্যিই তাকে পসন্দ করে থাকলে এ ব্যাপারে আর কারো পরামর্শ নেবেন না। আর যদি তাকে এর বিপরীত মনে করে থাকেন, তাহলে আখেরাতের পথে পাড়ি দেবার আগে দুনিয়া তার হাতে দিয়ে যাবেন না। আর বাকী রইলো আমাদের ব্যাপার; যা কিছু নির্দেশ দেয়া হয়, তা শোনা এবং মেনে নেয়াইতো আমাদের কাজ।’ —[,ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫০-২৫১। আল-বেদায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৮০।]

ইরাক, শ্যাম এবং অন্যান্য এলাকা থেকে বায়আত গ্রহণ করে হযরত মুআবিয়া (রাঃ) হেজাজ গমন করেন; কারণ, হেজাজের ব্যাপারটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম জাহানের যে সকল প্রভাবশালী ব্যক্তির পক্ষ থেকে বিরোধিতার আশংকা ছিল, তাঁরা সকলেই ছিলেন সেখানে। মদীনার বাইরে থেকে হযরত হুসাইন (রাঃ), হযরত ইবনে যুবায়ের (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবুবকর (রাঃ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) তাদের সাথে এমন কঠোর আচরণ করেন যে, তাঁরা শহর ত্যাগ করে মক্কা চলে যান। এভাবে মদীনার ব্যাপারটি সহজ হয়ে যায়। এরপর তিনি মক্কা গমন করে ব্যক্তি চতুষ্টয়কে শহরের বাইরে ডেকে এনে তাঁদের সঙ্গে মিলিত হন। মদীনার অদুরে তাঁদের সাথে যে আচরণ করেছিলেন এবারের আচরণ ছিল তা থেকে ভিন্ন। তাদের প্রতি বিরাট অনুগ্রহ করেন, তাঁদেরকে সাথে করে শহরে প্রবেশ করেন। অতঃপর তাঁদেরকে একান্তে ডেকে ইয়াজীদের বায়আতে তাদেরকে রাযী করাবার চেষ্টা করেন। হযরত আবুদল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) জবাবে বলেন, ‘আপনি তিনটি কাজের যে কোন একটি করুন। হয় নবী করীম (সঃ)-এর মতো কাউকে স্থলাভিষিক্ত-ই করবেন না, জনগণ নিজেরাই কাউকে খলীফা বানাবে, যেমন বানিয়েছিল হযরত আবুবকর (রাঃ)-কে। অথবা আবুবকর (রাঃ) যে পন্থা অবলম্বন করেছিলেন সে পন্থা অবলম্বন করুন। তিনি স্থলাভিষিক্তের জন্য হযরত ওমর (রাঃ)-এর মতো ব্যক্তিকে মনোনীত করেছিলেন, যাঁর সাথে তাঁর দুরতম কোন আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিল না। অথবা হযরত ওমর (রাঃ)-এর পন্থা অবলম্বন করুন। তিনি ৬ ব্যক্তির পরামর্শ সভার প্রস্তাব দেন। এ পরামর্শ সভায় তাঁর সন্তানদের কেউ ছিলেন না।’ 

হযরত মুআবিয়া (রাঃ) অবশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনারা কি বলেন?’ তাঁরা বলেন, ‘ইবনে যুবায়ের (রাঃ) যা বলেছেন, আমাদের বক্তব্যও তাই।’ এরপর হযরত মুআবিয়া (রাঃ) বলেন, এতক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে এসেছি। এবার আমি আল্লার কসম করে বলছি, ‘আমার কথার জবাবে তোমাদের কেউ যদি একটি কথাও বলে, তাবে তার মুখ থেকে পরবর্তী শব্দটি প্রকাশ করার অবকাশ দেয়া হবে না। সবার আগে তার মাথায় তরবারী পড়বে।’ অতঃপর তাঁর দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধান কর্মকর্তাকে ডেকে নির্দেশ দেন, ‘এদের প্রত্যেকের জন্য একজন লোক নিয়োগ করে তাকে বলে দাও যে, এদের কেউ আমার মতের পক্ষে বা বিপক্ষে মুখ খুললে তার মস্তক যেন উড়িয়ে দেয়া হয়।’ তারপর তিনি তাঁদেরকে নিয়ে মসজিদে গমন করে ঘোষণা করেন, ‘এরা মুসলমানদের স্থলাভিষিক্তে সন্তুষ্ট এবং এঁরা বায়আত (আনুগত্যের শপথ) করেছেন। সুতরাং তোমরাও বায়আত করো।' এক্ষেত্রে লোকদের পক্ষে অস্বীকার করার কোন প্রশ্নই ছিল না; কাজেই মক্কাবাসীরও সবাই বায়আত করে। [ইবনুল আসীর, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ২৫২।]

এমনি করে খেলাফতে রাশেদার চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি ঘটে। খেলাফতের স্থান দখল করে রাজকীয় বংশধারা; প্রতিষ্ঠা হয় রাজতন্ত্র। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম জনতার ভাগ্যে ইপ্সিত খেলাফত আর কোন দিনও জোটেনি। হযরত মুআবিয়া (রাঃ) যথার্থই বিপুল গুণের অধিকারী ছিলেন; তাঁর সাহাবী হওয়ার মর্যাদাও সম্মানার্থ; তিনি মুসিলিম জাহানকে পুনরায় এক পতাকাতলে সমবেত করেছেন এবং বিশ্বে ইসলামের বিজয়ের গতি পূর্বের চাইতেও দ্রুত করেছেন; তাঁর এসব খেদমত অনস্বীকার্য। যে ব্যক্তি তাঁকে গালাগালি করে, সে নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি করে। কিন্তু, তাঁর অন্যায় কাজকে অন্যায়ই বলতে হবে; তাঁর অন্যায় কাজকে ন্যায় বলার অর্থ হবে, ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ডকে আশংকার মুখে ঠেলে দেয়া। তবে, স্পর্ষকাতর এসব বিষয়ে আমাদের যথেষ্ট সচেতনতা অবলম্বন করা আবশ্যক।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২. 

রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২

এবারের ঈদ ও কিছু এলোমেলো ভাবনা:


রোজার ঈদের বাংলা একাডেমির ভেল্কি ছিল বাংলা অভিধানে শব্দ পরিবর্তন  'ঈদ' মুছে 'ইদ' সংযোজন; শেষ পর্যন্ত আমরা তা রুখে দিয়েছি। এদেশের বেশির ভাগ মানুষ ঈদেই থাকতে চেয়েছি, থেকেও গেছি; কারণটি তো অত্যন্ত স্পষ্ট, ইদ আমাদের মোটেও প্রাণ জুড়াতে পারে নি, মনকে শান্ত তৃপ্ত করতে পারে নি। কিছু কিছু শব্দ কিছু কিছু অভিব্যক্তি বাঙালীর রক্তের সাথে এমন ওতপ্রোত ভাবে মিশে গেছে, যা কোন ভাষা পণ্ডিতের বা কারোর প্রচেষ্টায় হুট করেই পরিবর্তন হওয়ার মতো নয়। কেউ পারবেও না হয়তো বাঙালীর সহজাত স্বভাবগত মূল বিষয় বিশ্বাসে চির ধরাতে। ঈদ তেমনই একটি উৎসব যা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশের নাম; প্রতিটি বাঙ্গালির জীবনে ঈদের আনন্দ উচ্ছাস সম্পূর্ণই আলাদা অন্য রকম এক অনুভূতি।

এবারের কোরবানি ঈদ এলো আমাদের সামনে অনেকগুলো কষ্ট নিয়ে; একদিকে চোখের সামনে বানবাসী মানুষের অসহায় রুগ্ন ব্যথিত মুখ, পাশবর্তী রাষ্ট্র মায়ানমারে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দ্বারা মুসলিম গনহত্যায় কয়েক লাখ নির্যাতিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর হৃদয় বিদারক কান্না ও হাহাকার সর্বস্ব জীবন। অপরদিকে ঢাকা ময়মনসিংহের ব্যস্ততম মহাসড়কে চলমান বাসে ঘটল দেশের সবচেয়ে নেক্কারজনক ও জাতির জন্য লজ্জাষ্কর দুঃখজনক ঘটনাটি ঈদের ঠিক কয়েক দিন আগে - চলন্ত বাসে  কিছু নরপশু রূপা নামের প্রাণঞ্চল কর্মদ্বীপ্ত উচ্ছল একটি মেয়েকে ধর্ষণের পর মুখ থেতলে ঘাড় মটকে মেরে বাস থেকে রাস্তার পাশে ফেলে দিলো; সেই রূপা'র অপূর্ণ অতৃপ্ত আত্মার অভিশম্পাত নিয়ে শুরু হলো আমাদের এবারের ঈদ যাত্রা। 

এত কিছুর পরও ঈদ এসেছিল, ঈদ আসে ঈদ আসবে, ঈদ চলেও যায় এবং যাবেও। যত কিছুই হউক যত কিছুই ঘটুক; হউক তা শব্দে বা বাক্যে বা মহা দুঃখ মহা কষ্ট নিয়ে আসুক কারো জীবনে, তারপরও এসবের মাঝেই এদেশের মানুষ ঈদ আনন্দ উপভোগ করবেই এবং প্রতিটি ঈদে নাড়ীর টানে আপনজন পরিবারের সংস্পর্শে গিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার অন্যরকম এক উদ্যম সঞ্চিত করে নিয়ে আসবেই। মোবাইল যেমন করে বিদ্যুতের সংস্পর্শে কিছুক্ষণ রাখার পর চার্জ পায়, ঠিক তদ্রুপ সারা বছর প্রিয়জন থেকে বহু দূরে থেকেও ঈদের ছুটির এই কয় দিনেই ভালোবাসার মানুষদের সান্নিধ্যে অনেকটা সারা বছরের চার্জ নিয়ে পুনঃ উদ্যোমে আবারও আমরা শুরু করবো দেশকে গড়ার কাজ, এগিয়ে নিয়ে যাবো আমাদের যার যার কর্মযজ্ঞ দিয়ে।

অনেক বছর পর এবার সপরিবারে আমিও ঈদ করতে এলাম আমার প্রিয় জন্মস্থান জন্মভূমি ও বেড়ে উঠা সেই গ্রামে। ভাই বোন ও তাদের সবার ছেলেমেয়েসহ আমারা এবার গ্রামে বৃদ্ধা মা'কে নিয়ে একসাথে ঈদ করলাম; তাই এবারের ঈদের মজাটাই আমাদের কাছে আলাদা, সম্পূর্ণ অন্য রকম। আজ যদিও-বা এখানে শহুরে ছোঁয়া লেগেছে, আমাদের সেই চীর চেনা গ্রামের পরতে পরতে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, তাও বেশ ভালোই লাগছে। চারদিকে এখনো এখানে আছে সবুজের এক অপূর্ব সমাহার, জলাশয়; নতুন করে নতুন আঙ্গিকে পাশাপাশি গড়ে উঠছে পরিকল্পিত রাস্তাঘাট বাড়িঘর সব কিছু।

এক সময় ঢাকার এতো কাছের আমাদের এই এলাকাটিও ছিল খুবই অবহেলিত, সম্পূর্ণ একটি অজপাড়া গাঁ। মহানগরের এতো সন্নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা থেকে বাড়ি পৌঁছতে আমাদের প্রায় সারা দিন চলে যেতো; কমলাপুর থেকে ট্রেনে চড়ে আড়িখোলা স্টেশনে নেমে সেখান থেকে রিক্সায় এবং পায়ে হেঁটে অথবা ডেমরা থেকে লঞ্চে দেবই নেমে পায়ে হেঁটে অথবা বর্ষায় রামপুরা ব্রীজের পাশ থেকে নৌকা করে হরদী নাওটানা খাল বেয়ে বাড়ি পৌঁছতে হতো। 

যন্ত্রনাদায়ক সেইসব ভ্রমনের কথা বর্তমান প্রজন্মের কাছে বললে, তাদের কাছে মনে হবে এসব শুধুই অলীক বানানো গল্প! আমার বিয়ের পরে প্রথম বছর ঈদে কমলাপুর থেকে আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজন ট্রেনে উঠি, সাথে ছিল বিরাট এক লাগেজ, যা মাথার উপর কেরিয়ারে রেখেছিলাম। ট্রেন আড়িখোলা থামতেই ঝটপট ষ্টেশনে নেমে দেখি লাগেজ পুরোটাই খালি! বিয়ের স্মৃতিমাখা সব কাপড়চোপড় ও মা-বাবা সহ ছোটছোট ভাইবোন আমাদেরও সবার সেবারের ঈদের সব আনন্দ ছিল সেই লাগেজে। আমাদের ঈদটাই সে বছর মাটি হয়ে গিয়েছিল।

সেই অজপাড়া গাঁ এখন আজকের নিউ টাউন পূর্বাচল। বাড়ির নাম্বার রোড নাম্বার হোল্ডিং নাম্বার সেক্টর নাম্বার সবই নতুন করে বাড়িতে লেগেছে; ঈদের আগের দিন বাড়ি পৌঁছে আমার কাছে মনে হলো, এখনো এলাকাটি আমার সেই চীর চেনা গ্রামই রয়ে গেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার এতোটাই উন্নতি ঘটেছে যে, তিনশ ফিট ধরে ঢাকা থেকে বাড়ি পৌঁছা এখন মাত্র মিনিট ত্রিশের ব্যাপার। দুটো ফ্রাই ওভার পেরিয় মাত্র বারো/তেরো কিলোমিটার পথ পেরোতেই আমাদের গ্রাম, বাড়ি। পথে কোথাও জ্যাম নেই, নেই কোন আঁকাবাঁকা। 
তারপরও আজকাল কেন যেন গ্রামে আসা আমার খুব কমই হয়। কারণ, গ্রামে স্থায়ী বসবাস করা লোকগুলোকে মাঝেমধ্যে আমার খুবই অচেনা মনে হয়। ছোট থেকেই গ্রাম্য পলিটিক্সকে আমি এড়িয়ে চলতাম, খুবই নোঙরা মনে হতো; এখন তো এইসব আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আগের সেই  আঁকাবাঁকা পথগুলো, ক্ষেতের সেই বাঁকগুলো যেন এখন গ্রামে থাকা মানুষের চরিত্রের সাথে মিশে গেছে! 

আজকের গ্রাম আর সেই আগের মতো  নেই, নগরায়নের ছোঁয়া গ্রামের পরতে পরতে লেগেছে। রাস্তঘাট পথ প্রান্তর সহ গ্রামের ঘরগুলোও পাল্টে যাচ্ছে দিন দিন। মাটির ঘরের জায়গায় গড়ে উঠছে ইটের দালান, গ্রামের মাটির মসজিদটি ইটের দালান হয়েছে, এখানেও শীততাপ নিয়ন্ত্রিত মেশিন লাগানো হয়েছে। অনেকের বাড়ির সামনে প্রাইভেট কার, মটর সাইকেলও শোভা পাচ্ছে। মানুষের চেহারা দেখেও বুঝা যায় তাদের ভাগ্যের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। এসব পরিবর্তন চোখে পরলো গ্রামের পথে পথে; গ্রামে ডুকেই জানতে পারলাম ভোলার স্ব-নামধন্য এক মন্ত্রীর মেয়ে-জামাই আমাদের গ্রামে জায়গা কিনে ডাকবাংলা হাঁকিয়েছেন; প্রতি শুক্রবার তাঁরাও নাকি সারা দিন এখানে সময় কাটান। 

এখনো আমাদের এলাকার বাড়িঘরগুলো একটা থেকে আরেকটা বেশ দূরে দূরে। দেশের বেশ পুরনো একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সদস্য আমরা; শতাব্দী ধরে বাড়ির বেশ প্রতাপ প্রতিপত্তিও আছে; এক নামেই বহু দূর থেকেও মানুষজন আমাদের নামেই চেনে। আগে সবাই আমরা এক বাড়িতেই তিন ভিটায় বসবাস করতাম; সেই স্থানটি এখন আমাদের কাছে স্মৃতিময় পুরোন বাড়ি। ঐ বাড়িতেই আমার জন্ম। অবশ্য আমাদের আগের প্রজন্মই বিশাল জয়গা সমেত পাশের গ্রামে এসে প্রত্যেকেই বসতি গড়েছেন। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন বড়রা ঢাকায় চাকুরী করলেও প্রতিটি পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বাড়িতেই স্থায়ী বসবাস করতাম; তাই সব সময় লোকজনে পুরো বাড়ি ঘমঘম করতো। কালের পরিবর্তনে উন্নত শিক্ষা ও উন্নত নাগরিক সুবিধার তাগিদে আমাদের প্রজন্মের অনেকেই শহরে স্থায়ী নিবাস গড়তে শুরু করে। তাই সেই বিখ্যাত বাড়িটিরও আগের সেই জৌলুস অনেকটা হারিয়ে গেছে। 

বাড়ির দু এক জন মুরুব্বী যদিও এখনো বেঁচে আছেন, তাঁরাও সন্তানের সাথে এখন স্থায়ীভাবে ঢাকায়ই বসবাস করেন। তাছাড়া বাড়ির বেশিরভাগ ময়মুরুব্বী এখন আর বেঁচে নেই, ভাইব্রাদার অনেকেও চলে গেছেন না ফেরার দেশে, তাই আগের মতো সেই প্রাণ চাঞ্চল্য ও প্রাণের স্পন্দন বাড়িতে এখন আর নেই। তাই কারোরই বাড়ি আসার তেমন নাড়ির টান আত্মার তাগিদও নেই। যেমন - আমাদের বাবা বেঁচে থাকতে অন্য সময় বাড়িতে আসি বা না আসি, প্রতি ঈদে ছুটিতে অবশ্যই হৃদয়ের উচছাস নিয়ে আগে আগে বাড়িতে ছুটে আসতাম। বাবার মৃত্যুর পরও অবশ্য বেশ কয়েক বছর নিয়মিত এসেছি, কিন্তু ছেলে মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে আস্তে আস্তে জীবনটা কেমন যেন অন্য রকম হতে শুরু করলো; ফেরা আর তেমন একটা হয়ে উঠে না।

প্রজন্ম পরিক্রমায় আমার দেখা তিন পুরুষের মধ্যে আমাদের পূর্বপূরুষরা যথেষ্ট কায়িক পরিশ্রমী ছিলেন; তাঁরা যেমন ক্ষেতেও কাজ করতে পারতেন, অফিসেও সফল ছিলেন। মাইলের পর মাইল তাঁরা পায়ে হেটে বেড়াতেন, পুকুরে গা হাত মুখ ধুইতেন, পরিশ্রান্ত হলে গাছ তলায় মুক্ত বাতাসে বিশ্রাম নিতেন; আমরাও এসব দেখে এসব করেই প্রকৃতির সাথে মিশে প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নিয়েই বেড়ে উঠেছি, বড় হয়েছি। তাই আমাদের রোক-শোক-যন্ত্রনাও অনেকটা কম। আজকের আমাদের হাইবীড প্রজন্ম অনেকটাই ডিজিটার সেল্ফি প্রজন্মে পরিনত হয়েছে; কায়িক পরিশ্রম তারা মোটেও করতে চায় না, কিছুটা হাটাহাটি করতেই ক্লান্ত হয়ে ঘরে ঢুকে বৈদ্যতিক পাখা চালিয়ে স্মার্টফোন বা টিভির দিকে মুখ করে বসে থাকে। প্রকৃতির সাথে মেশার, দৃষ্টি দেয়ার বা প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নেয়ার মোটেও কোন ইচ্ছা তাদের জাগে বলে মনে হয় না।

আজকালকার ছেলে-মেয়েরা প্রকৃতির  প্রয়োজনীয়তার কথা মোটেও আসলে চিন্তা করে না; তাই স্মার্টফোন, সেল্ফি আর ফেসবুক নিয়েই তারা এখন ব্যস্ত থাকতে, সময় কাটাতে পছন্দ করে। কয়েকটা ছবির জন্য গ্রামের প্রাকৃতিক দৃশ্য তারা লোকেশনাল আউটফিট হিসেবে বাছাই করে, অতপর ক্লিক ও আপলোড টু ফেসবুক! গ্রাম তারা মোটেও পছন্দ করে না, গ্রামে থাকতে অভ্যস্তও নয় তারা, তাই দু'দিনের বেশি থাকতেও চায় না। দুই রাত থাকলেই ঢাকায় ছুটে যেতে ব্যস্ত হয়ে উঠে। এসবের জন্য অবশ্য আমরাই দায়ী। ওদেরকে প্রকৃতি ও গ্রাম প্রেমী করে আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। ১০০০/১২০০ বঃফিটের ছোট্ট ঘরে হাইব্রীড মুরগীর মতো ফিড মুখে তুলে তাদেরকে আমরা বড় করেছি! বুঝতে দেইনি জীবনের আঁকাবাঁকা কত কি গতি।

 এক সময় এই গ্রামই ছিল আমাদের সবার শিকড়, প্রাণের স্পন্দন। কোন জাতি যদি শিকড়কে অস্বীকার করে, অবহেলা করে, সে জাতি যতই উন্নত হউক, কখনো শান্তির অগ্রদূত হতে পারে না, পারবে না। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় শহরের বসবাস করা লোকজনের চেয়েও গ্রামের একজন কৃষক অনেক বেশি সরকারের সুযোগ সুবিধা ভোগ করে; ইউরোপে ফসল ফলানো একজন কৃষক যেসব কার ব্যবহার করে নগরের অনেকে তাতে চড়ারও চিন্তা করতে পারে না। কো-অপারেটিভ সোসাইটি করে কৃষিপণ্য কৃষকরাই সরাসরি শহরে পৌঁছে দেয়; তাই সেসব দেশে তৃতীয় পক্ষ ফঁইড়া বলা কোন সুবিধাভোগি সৃষ্টি হয় না।

দুঃখজনক হলেও সত্য স্বাধীনতার এত বছর পরও এদেশের কৃষক এখনো অনেক অবহেলিত। তুলনামূলক নগরের চেয়ে গ্রামের উন্নয়ন অনেকটা মন্থর গতির।  গ্রামে গড়ে উঠেনি তেমন কোন ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার প্রতিষ্ঠান। যার ফলে এখনো গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ শহরে ছুটছে। বিগত কয়েক বছর ধরে গ্রামে যান্ত্রিক সভ্যতার সাথে সাথে শিল্পায়ন, নগরায়ন কিছুটা হলেও হয়েছে, হচ্ছে। তবে, এমন অপরিকল্পিত নগরায়ন আমাদের হয়তো দিয়েছে অল্প কিছু, কিন্তু কেঁড়ে নিয়েছে নিচ্ছে অনেক কিছু। তাই আজ হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে পুরো নগরবাসী। ছোট্র যে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগেও নগরবাসীর জীবনে নেমে আসে চরম ভোগান্তী। আমাদের গ্রামেও নতুন করে নগরায়নের ছোঁয়া লেগেছে, বেঁচে থাকলে হয়তো কয়েক বছরেই দেখবো পুরো এলাকাটি শহরে পরিনত হয়ে গেছে। তাই হয়তো সবাই এখন আমরা আবার ফিরে আসতেও চাইছি গ্রামে, এবার এসে সব কিছু দেখে শুনে তাই মনে হচ্ছে। ঈদ গাঁ-তে অনেককেই দেখলাম।

আমরা যখন ছোট ছিলাম নিরবে নিবৃতে ক্ষেতের আইলে বাড়ির ঘোঁপে বা পুকুড় পাড়ে একা আনমনে বসে কত কি ভাবতাম। নগরে বসবাস করে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের অনেকটা ভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্টে গড়ে তুলেছি। তারা এখন অন্য রকম জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাদের জীবনে ঈদের কোন আলাদা উচ্ছাস নেই; অন্যান্য ছুটির দিনের মতোই যেন একটি দিন! আমরা যখন ছোট ছিলাম তখনকার ঈদ ও ঈদের আনন্দটা ছিল সম্পূ্র্ণরূপে অন্য রকম এক আবেগ অন্য রকম এক অনুভূতির একটি ব্যাপার, এখনকার ছেলে-মেয়েরা যা কল্পনাও করতে পারে না পারবে না। 

কেমন ছিল আমাদের ছোট বেলার সেই ঈদ? সূর্য উঠার অনেক আগে, বলতে গেলে সুবেহ সাদিকের অনেক আগে আমরা সবাই ঘুম থেকে জেগে উঠতাম, দল বেঁধে পাশের গ্রামে (বর্তমান বসতি) কলা পাতা কাটতে যেতাম। কলা পাতা কেটে বাড়ির পুকুরে ধুয়ে ছোট  সাইজ করে বাঙলা ঘরের বারান্ধায় রেখে নিজেরা গোসল সেরে নতুন কাপড়চোপড় পড়ে পাটি ও চাদর নিয়ে ঈদগার দিকে ছুটতাম। আমাদের ঈদগাটি সম্পূর্ণরুপে আমাদের পারিবারিক। অবশ্য এখানে আশেপাশের বেশ কয়েক বাড়ির লোকজন ঈদ জামাতে শরীক হতেন, হন; সেই হিসেবে আমাদের  একটা আলাদা সমাজও গড়ে উঠেছে।
নামাজ শেষে কোলাকোলি করতে করতে গ্রামের সবাইকে নিয়ে আগে আমরা বাড়ি ফিরতাম। সমাজের প্রত্যেকে ঈদগা থেকেই হাসি মুখে প্রথমে আমাদের বাড়ি আসতেন এবং কলা পাতায় ফুল পিঠা পাতা পিঠা ক্ষীর (মিষ্টান্ন) ও ডাল খিচুরী  খেয়ে শেষে মুখে পান নিয়ে সবাই যার যার বাড়ির দিকে রওনা দিতেন। আমরা বাড়ির সবাই মিলে মেহমানদারী করতাম। এটাই ছিল আমাদের বাড়ির ঈদগার ঈদের দিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। 

আমরা বেশির ভাগই এখন আর বাড়িতে স্থায়ী নই; তাই বাড়িঘরের অবস্থাও সেই আগের মত নেই, ঘরগুলোও অযত্ন অনাদর অবহেলায় অনেকটা বুড়ো হয়ে গেছে। সেই সব সামাজিক আচার অনুষ্ঠানগুলোও তাই এখন আর বলবৎ নেই। আমাদের বাড়ির বেশিরভাগই গ্রামে এখন দু'দিনের অতিথি! 
তবে, শেষ বিদায়ের পর কিন্তু আমাদের বাড়ির সবাইকেই ঈদগা-র পাশের আমাদের পারিবারিক গোরস্থানেই সবার শেষ বিছানা হয়। এই জন্য বাড়ির সবাই মিলে শেষ ঠিকানা ও ঈদগাটাকে বেশ উন্নত করেছি শুধু। বাড়িঘরে মানুষ না থাকলে যেমনটি হওয়ার তেমনই হয়েছে! পুরোন বাড়ির পুকুড়টিকে মনে হলো অস্তিত্বহীন! আমি যে ঘরে জন্মেছিলাম সে ঘরটি যেন কঙ্কালসার দেহ নিয়ে কোন রকম দাঁড়িয়ে আছে।

নাড়ির স্পন্দন থেমে গেলে জীবন যেমন বাঁচে না, নাড়ির টান না থাকলে তেমন গ্রামও কারো কাছে ভাল লাগবে না। গ্রাম ভালোবাসতে পারলেই বাংলাদেশকে হৃদয়ে ধারণ করা সহজ হবে। নাড়ির স্পর্শ গ্রামের ছোঁয়া যার হৃদয়কে প্রকম্পিত করে না, আমি জানি না সে জন কেমন মানুষ? একমাত্র সেইসব হৃদয়হীন অমানুষরাই পারে মানুষের স্বপ্ন এক নিমিষে ধুলিস্যাত করে দিতে, রূপাদের মেরে ফেলতে।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭.

রবিবার, ১ মে, ২০২২

জামাতে কাতারের গুরুত্ব :


মুসলিম উম্মাহর এ কি হাল? কেনইবা তারা আজ ভীরু-কাপুরুষের দলে পরিণত হয়েছে? একদল একবিচিওয়ালা বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী মোল্লার ঠুটোঁ জগন্নাথ মার্কা চিল্লাচিল্লি আর চাপাবাজী দেখে বিবেকবান মানুষ মাত্রই লজ্জায় মুখ লুকায়। বুদ্ধিদীপ্ত কোন কাজেই আজ আর মুসলমান সন্তানদের সন্তোষজনক কোন অগ্রগতি নেই, নেই কোন কৃতিত্ব; কারণ তো সেই একই, গবেষণাহীন শিক্ষা। তাই তো মুসলিম আজ শতধা বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে! আমি মনে করি এসবের মূলে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি কাজ করছে তা হলো মুসলমানের জামাতে কাতারের বিচ্ছিন্নতা ও এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর উদাসীনতা। একটু লক্ষ্য করলেই আবিষ্কার করা যায়, হেরেম শরীফের নামাজের কাতারে যেমন কোন শ্রী নেই, (ধনী-গরিব চিহ্নিত কাতার ও অজ্ঞের ইচ্ছেমতো কাতারবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা), শহর বা গ্রামের মসজিদে নামাজের কাতারেও সেই একই ত্রাহি অবস্থা!   

ইহুদি চক্রান্তে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার করোনাকালীন ফতোয়া — নামাজের কাতারে তিনফিট দূরে দাঁড়ানো এবং এর অনুশীলন প্রাকটিস বর্তমানেও বহাল তবীয়তে মসজিদে মসজিদে বলবত আছে বলেই মনে হচ্ছে! প্রায় প্রতি ওয়াক্তেই কারো না কারো তীর্যক কটাক্ষ বা কপাট দৃষ্টির মুখামুখি হতে হচ্ছে আমাকে; সামনের কাতারে ফাঁক দেখে ডুকতেই বা নিজের পাশের ফাঁকে দাঁড়ানোর জন্য পিছন থেকে অন্যকে ডাকতে গেলেও তীর্যক চোখ দেখতে হয় পাশের জনের; আফসোস! বাজারে গিজগিজ অবস্থায় অন্যের ঘামের গন্ধ নিতে কোন সমস্যা নেই, অথচ যত সমস্যা মসজিদে, নামাজের কাতারে! জামাতের কাতারের এই হালের জন্যই আজ মুসলিমের পরস্পর বিশ্বাস-ভ্রাতৃত্ব উবে গেছে বলে আমার বিশ্বাস। গোড়ায় গলদ রেখে আগায় পানি দিয়ে কি লাভ? জান্নাতের প্রশান্তি প্রত্যাশা সে তো অলীক চিন্তা! আমাদের উপর থেকে আল্লাহর রহমত যে উঠে গেছে বা যাচ্ছে তা কি আমরা অনুধাবন করতে পারছি?  একবার কি ভেবে দেখেছি  মুসলিম সমাজে পরস্পরের মধ্যে আজ এতো অবিশ্বাস এতো মতভেদ আর এত্তো মতানৈক্য কেন??

কোন সন্দেহ নেই মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে পাচ্ছে, কিন্তু সৌহার্দ্য-শিষ্টাচারের কি অবস্থা? কাবা'য় তাওয়াফকারীর আজ অভাব নেই, মসজিদে  মসজিদে মুসুল্লির কমতি নেই, কমতি মুসলমানের শিক্ষায়; বিশ্বাস-ভক্তি ও শিষ্টাচারে। ইসলামের অন্যতম রোকন হলো সালাত, যা ইসলাম ও কুফ্‌রের মধ্যে পার্থক্য বিধান করে, আর এই বিধানের অন্যতম দিক হলো জামাতবদ্ধ হয়ে সালাত। ইসলামী জীবন বিধানের প্রতিটি বিধি-বিধানেই নিহিত রয়েছে অসংখ্য হিকমত; আমরা বেশিরভাগ মুসলমান হয়তো আজকাল এসবের তোয়াক্কাও করি না। স্বল্প ও সীমিত জ্ঞান দ্বারা আমরা অনেকেই  বুঝতে সক্ষম নই বা জেনে বুঝেও পালন করি না বা বাস্তবায়নে উদাসীনতা অবলম্বন করি; সব কিছুতেই গড্ডালিকাপ্রবাহে গাঁ ভাসিয়ে চলতে চাই। জীবনের সর্বাবস্থায় ইসলামকে ধারণ ও পালন কারার মাঝেই যে নিহিত রয়েছে সত্যিকার শান্তি স্বস্থি ও প্রগতি, ইহকাল ও পরকালের মুক্তি ও কল্যাণ, তা আমরা বুঝে উঠতে পারি না; অবশ্য অনেকেই মুখে বলি কিন্তু নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করতে মোটেও চেষ্টা করি না। 

প্রত্যেক মুসলমান পুরুষের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত জাম‘আতের সাথে আদায় করার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এই বিধানটির মূলে রয়েছে  অসংখ্য হিকমত; পারস্পরিক ভেদাভেদ, অনৈক্য ও হিংসা-বিদ্ধেষ দূর করার এবং মানুষের মধ্যে সাম্য, মৈত্রী, ভালোবাসা, ঐক্য, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি সৃষ্টির এক অনন্য প্রশিক্ষণ, তেমনি এটি হলো মুসলমানের ঐক্যের প্রতীক। সাদা-কালো, ধনী-গরীব, বাদশাহ-ফকির, আশরাফ-আত্বরাফ বা জাত-বংশের কোন তারতম্য ও ভেদাভেদ নেই একমাত্র ইসলামে; এবং নামাজের কাতার হলো এই অনুশীলনের অনন্য জায়গা। আমরা সকলেই আল্লাহ্‌র বান্দাহ এবং পরস্পর ভাই ভাই, আল্লাহ্‌র পথে আমরা সকলেই ঐক্যবদ্ধ— গোঁটা বিশ্বকে এই নিরব বার্তা পৌঁছে দেয়ার এবং এর বাস্তব চিত্র প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম হলো পাঁচ ওয়াক্ত জাম‘আতে সালাত। আর এই জাম'আতে সালাতের অন্তর্ভুক্ত অন্যতম একটি বিষয় হলো সফ বা কাতার ঠিক করা।

নু‘মান ইবনে বশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত,  সাহীহ্‌ বুখারী ও সাহীহ্‌ মুসলিম শরীফের একটি হাদীস; তিনি  বলেন— রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সালাতে আমাদের কাতারগুলো এমনভাবে সোজা করাতেন যেন তিনি এর দ্বারা কামানের কাঠ সোজা করছেন, যতক্ষণ না তিনি উপলব্ধি করতেন যে, আমরা তাঁর থেকে বিষয়টি পুরোপুরি বুঝে গেছি। অতঃপর একদিন তিনি বেরিয়ে এসে সালাতে দাঁড়িয়ে তাকবীর দিতে যাবেন (তাকবীরে তাহ্‌রীমাহ বলে নামায শুরু করতে যাবেন) এমন সময় দেখলেন যে, এক ব্যক্তির বক্ষ কাতার থেকে এগিয়ে আছে; তখন তিনি বললেন, 'হে আল্লাহ্‌র বান্দাগণ! অবশ্যই তোমরা তোমাদের কাতারগুলো সোজা-সঠিক করে নেবে, অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের পরস্পরের চেহারায় (পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গি বা চিন্তাধারার মধ্যে) বিভেদ-মতানৈক্য সৃষ্টি করে দেবেন।'

মুসনাদে আহমদ, সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে নাসায়ীতে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন— রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, "তোমরা নামাজে কাতারগুলো সোজা-সঠিক করো, পরস্পরের কাঁধ সমান্তরাল রেখো, ফাঁক-ফোঁকর বন্ধ করো, তোমাদের ভাইদের জন্য হাত নরম করো (কেউ যদি কাতারে প্রবেশ করতে চায় তাহলে হাত শক্ত করে রেখোনা যাতে সে ঢুকতে না পারে, বরং হাত নরম করে তাকে কাতারের ফাঁকে প্রবেশের সুযোগ দাও) এবং শয়তানের জন্য ছোট ছোট ফাঁকা জায়গা ছেড়ে দিও না। যে ব্যক্তি (নামাজে) কাতার মিলিয়ে রাখে (কাতারের ফাঁকা জায়গায় প্রবেশ করে ফাঁক বন্ধ করে কাতার মিলিয়ে রাখে) আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তাকে তাঁর (রহমতের) সাথে মিলিয়ে রাখেন, আর যে ব্যক্তি কাতার বিচ্ছিন্ন করে (কাতারের মধ্যে ফাঁকা জায়গা রেখে দেয়, যদ্দরুন দু’জন মুসাল্লী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তদ্বারা কাতারও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়) আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তাকে তাঁর (রহমত) থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন।"

আমাদের দেশের প্রায় মাছজিদেই সম্মানিত ইমাম সাহেবরা খুব বেশি হলে বলেন, 'কাতার সোজা করুন, মোবাইল ফোন বন্ধ করুন', অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজের কাতার সোজা করতে সময় নিতেন এবং বেলাল (রাঃ)-র হাতে লাঠি দিয়ে কাতার সোজা করতে পাঠাতেন। আর বর্তমান ইমাম সাবরা গোলামী করছেন যেন সমাজের! ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে তারা হুজরায় আসেন, তাকবীর দেন; কাতার ঠিক হোক বা না হোক এ দিকে তাদের কোন দৃষ্টি নেই; অন্যের তো আর কোন দায়ই থাকলো না! অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে মসজিদের নির্দিষ্ট সময়ে কেবল নামায শুরু করে দেয়াটাই যেন তাদের উপর ওয়াজিব; জুমু‘আর সালাত এবং ঈদের সালাতের কাতারের তো আরো করুণ অবস্থা। ইমাম সাব দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রথমে বাংলা খুৎবা দিতে থাকেন, অন্যদিকে জুমু‘আ পূর্ববর্তী সুন্নত নামাজের জন্য এতই সংক্ষিপ্ত সময় দেয়া হয় যে, ধীরে-স্থিরে চার রাকাত সালাত আদায় করাও খুবই কঠিন হয়ে পড়ে; ইতোমধ্যে আবার ইমাম সাব আরবী খুতবা দিতে শুরু করে দেন। ঈদের সালাতেও যেখানে খুতবা সালাতের পরে দেয়া ওয়াজিব, সেখানে দেখা যায় যে, ইমাম সাব সালাতের আগেই বাংলায় খুতবা (ভাষণ) দিতে থাকেন, সালাত শুরু হওয়ার এক মিনিট পূর্ব পর্যন্ত তার ভাষণ চলতে থাকে, এবং হঠাৎ করেই 'নামায শুরু হচ্ছে, কাতার সোজা করুন' বলে মানুষের বিরাট দল কিছু বুঝে উঠার আগেই তাকবীর বলে নামায শুরু করে দেন! এদিকে দেখা যায় কাতার সোজা হওয়া তো দূরের কথা অসংখ্য মুসুল্লি কাতারের বাইরেই এলোমেলোভাবে যে যেভাবে পারছেন নামাজে অংশগ্রহণের চেষ্টা করছেন; অনেকের হয়তো দু’তিনটি তাকবীরই বাদ পড়ে যায়। ওদিকে ইমাম সাব যথাসময়ে সালাত শুরু করতে পেরে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন!

সাধারণ মুকতাদী কিংবা মাসজিদ পরিচালনা কমিটির কথা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু ইমাম সাহেবরা কি জানেন না জাম'আতের অর্থ ও তাৎপর্য? সফ বা কাতার সোজা করার অর্থ ও গুরুত্ব?:জাম'আতে সালাত আদায় করার পিছনে কি হিকমাত বা প্রজ্ঞা নিহিত? জাম'আতে সালাত আদায়কালীন তাদের কি করণীয়? হাদীসে এসময় কী করার নির্দেশ রয়েছে তারা কি তা জানেন না? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কিরাম রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহুমাগণ তখন কি করতেন? তারা কি নির্দিষ্ট সময় হলেই 'আল্লাহু আকবার' বলে নামাজ শুরু করে দিতেন, নাকি সর্বাগ্রে তাঁরা সফ বা কাতার সোজা করতেন? যদি এসব মৌলিক বিষয় কারো জানা না থাকে, কিংবা জানা থাকলেও তা পালন ও বাস্তবায়নের মত সৎসাহস না দেখায় তবে তার ইমাম হওয়ার দরকার কি? লা'নত এমনসব ইমামদের উপর। আর নির্দ্ধিধায় বলা উচিত এমন গর্দভ কোনভাবেই ইমাম হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।

বহু গবেষণার ফল, অজ্ঞতার কারণে আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মুকতাদী আজ উপরোক্ত বিষয়ে চরম উদাসীন। প্রায় প্রতিটি মসজিদে জাম'আতকালীন কাতারের (সফ বা লাইনের) অবস্থা দেখলে সহজেই বুঝা যায় যে, তাদের মধ্যে পারস্পরিক হৃদ্যতা, আন্তরিকতা ও ঐক্যের বড় অভাব; বিশৃঙ্খল অবস্থা। অনেকের কাতারে দাঁড়ানোর অবস্থা দেখলে বুঝার কোন উপায়ই থাকে না তারা কি নামাজের জন্য দাঁড়িয়েছেন না কি অন্য কোন কাজের জন্য? পায়ের অবস্থান- সে তো এক পা আগে, আরেক পা পিছনে; যেখানে নামাজে দাঁড়ানো কিংবা বসা সর্বাবস্থায় উভয় পায়ের অগ্রভাগ ক্বিবলামুখী থাকা আবশ্যক, সেখানে দেখা যায় যে, অধিকাংশেরই ডান পা উত্তরমুখী আর বাম পা দক্ষিণমুখী হয়ে থাকে। এই যদি হয় প্রত্যেক মুকতাদীর দাঁড়ানোর অবস্থা, তাহলে সমবেত নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় সফ বা লাইনের চিত্র কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

প্রত্যেক মুকতাদীর অবশ্যই জানা উচিত, জাম‘আতে সালাত আদায়কালীন পরস্পর কাঁধ সমান্তরাল রেখে এবং একে অপরের পায়ের গোড়ালির সাথে গোড়ালি মিলিয়ে মধ্যবর্তী ফাঁক-ফোঁকর বন্ধ করে সোজা-সঠিকভাবে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; আর এটাই মূলত মুকতাদীর কাজ। ইমাম সাহেবের দায়িত্ব হলো- বিষয়টি নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে কঠোরতা আরোপ করা এবং কাতার সোজা ও পুরোপুরি ঠিকঠাক না হওয়া পর্যন্ত সালাত শুরু না করা। শুধু তাই নয় বরং সালাত শুরুর পূর্বে, জুমু‘আর খুতবায় কিংবা ধর্মীয় বিভিন্ন আলোচনা সভায় এতদ্বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে কোর'আন ও সুন্নাহর আলোকে বিশুদ্ধ দালীল-প্রমাণসহ সাধারণ মুসলমানকে অবহিত করা। কিন্তু হায়! বর্তমান মুসলিম সমাজের তথাকথিত আলেম-ওয়ালামা ওয়াজেরীয়ানদের একি হাল? ইমাম সাবদেরই-বা এ কি অবস্থা?? নামাজের কাতারেরই-বা কি হাল??? আফসোস!!

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
৩০ এপ্রিল, ২০২২.

শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২২

সুস্থতা সবচেয়ে বড় নেয়ামত:


রক্ত মাংস আর হাড্ডি দিয়ে গড়া মানুষ নামের এই অদ্ভুত সৃষ্টি আসলে একটি জটিল মেশিন; পরিণত অবস্থায় মানবদেহের কোষের সংখ্যা থাকে গড়ে প্রায় ৩৭.২ ট্রিলিয়ন। এ মেশিনের কলকব্জা সব ঠিকঠাক থাকলে আমরা বলি— ভালো আছি সুস্থ আছি, না থাকলে— অসুস্থ।  কিন্তু রক্ত-মাংস--হাড্ডি ছাড়াও তো এ মেশিনে আরও একটি জিনিস আছে, যা না থাকলে হয়ে যায় লাশ। ওই জিনিসটার কদর আমরা কতটা কি করি? তার সুস্থতা নিয়ে-ইবা আমরা কতটা ভাবি? সেই জিনিসটা সুস্থ  না থাকলে শারীরিক সুস্থতার কি-ইবা দাম আছে? শুধু শরীর ভালো রেখে কি হবে? বা ওটা ভালো না রেখে শুধু শরীর ভালো রাখা কি আদৌ সম্ভব? হলেওবা কতটা কি?? এসব কি কখনও ভেবে দেখেছি?? কত জন কত কি করে সম্পদ করেছি করছি, প্রাসাদ গড়েছি গড়ছি; কিন্তু শান্তি কই?? সুখ কই?? সুস্থতা কই??

সুখ-শান্তির মূল উৎস হলো সুস্থতা, সুস্থতা আসলে কি? শুধুমাত্র শরীরে রোগের অনুপস্থিতিই কি সুস্থতা?? সুস্থতা আসলে মানুষের আত্মিক, মানসিক, শারীরিক, পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক ভালো থাকার একটি নির্দেশ; যা সার্বজনীন। আবার, অসুস্থতা বলতে সাধারণভাবে আমরা শুধুমাত্র শারীরিক চিকিৎসার অংশটুকুই বুঝে নেই; রোগ-শোক বুঝি। আসলেই কি তাই? প্রকৃত সুস্থতা নির্ভর করে মানুষের শারীরিক-মানসিক, রাষ্ট্রীয়-  আন্তর্জাতিক পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও সার্বিক পরিস্থিতির ওপর; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ ধারণাকেই সমর্থন করে। 

সুস্থতা আসলে এক মহামূল্যবান সম্পদের নাম; সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাওয়া মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত। তা যে কত মূল্যবান অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা কেউই বুঝতে বা অনুধাবন করতে পারি না। অসুস্থতা বা রোগ-বালাই এ জগতে কেউই কামনা করি না, তবুও নানা সময়ে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি; উদাসীনতা, বেখেয়ালিপনা, জীবন ও স্বাস্থ্য সম্বন্ধে অসচেতনতাই অনেকের সার্বিক দুর্বলতা ও রোগ-বালাইয়ের প্রধান কারণ। জ্ঞান ও সচেতনতা মানুষকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে; আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলাও তাদের সুস্থ রাখেন যারা স্বাস্থ-সচেতন। 

সাধারণত সুস্থতার জন্য মানুষের প্রয়োজন পরিমিত খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম, আর ঐশী কৃপা; এসব প্রতিটি জিনিসই এবাদতের মাধ্যমে হাসিল করা যায়। খাদ্যের জন্য দরকার সুষম খাদ্য, আর বিশ্রামের জন্য গভীর ঘুম। আর ঘুমের জন্য সবচেয়ে উত্তম ও উপযোগী সময় হলো রাত; কেননা আল্লাহ তা'আলা রাতকে বিশ্রামের উপযোগী করেই সৃষ্টি করেছেন; মহান রাব্বুল ইজ্জত বলেন, ‘আমি তোমাদের বিশ্রামের জন্য নিদ্রা দিয়েছি, তোমাদের জন্য রাত্রিকে করেছি আবরণস্বরূপ আর দিনকে বানিয়েছি তোমাদের কাজের জন্য।' —(সুরা : নাবা : ৯-১১) 

কি এক কঠিন জামানায় এসে উপনীত হলাম, হাতের দুই আঙুলের মাঝে চলে এসেছে এখন সমগ্র বিশ্ব; বিছানায় শুয়ে শুয়ে জগৎ দেখছি, পড়ছি, লিখছি। কোন দিক দিয়ে রাত চলে যায় আর সূর্য উঠে টেরই পাই না! অথচ সূর্য উঠা-ডুবার সাথে সকল সৃষ্টির রয়েছে গভীর সব সম্পর্ক। অবশ্য রাত জাগা কিছু মানুষের জন্য খাস, সবার জন্য নয়; আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার রহমত প্রাপ্ত একান্ত খাস বান্দারা এবাদত-বন্দেগীতে রাত জাগেন,  সে এক অন্য রকম খেলা; আশিক-মাশুকের খেলা। অথচ বর্তমান দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষই রাতকে বানিয়েছে দিন, দিনকে রাত! সারারাত জেগে তারা ফজরের আগে আগে ঘুমায়, জাগে দুপুরে! 

ফজরে ঘুমিয়ে যারা জাগছেন দুপুরে - ঘুমিয়ে কাজা যারা করছেন ফজর, তখনো জাগেননি যখন যোহর — ওনাদের সুস্থতার জিম্মা কে নেবেন? অথচ একজন ঈমানদার মুসলিমের জন্য ফজরের নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম; সকল মু'মিনের দিনের শুভক্ষণ শুরু হয় ফজরের মাধ্যমে। যে ব্যক্তি যথা সময়ে ফজরের নামাজ আদায় করার মাধ্যমে দিনের সূচনা করেন রবং অতঃপর দুনিয়া শুরু করেন, ওই ব্যক্তির সুস্থতার জিম্মাদার তো স্বয়ং রাব্বুল ইজ্জত। ওই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম আর কে হতে পারে? তাছাড়া সকালে ঘুমিয়ে থাকার কুফল বলে শেষ করা যাবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যান্সারবিষয়ক গবেষণা বিভাগ ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের তথ্য মতে, যখন সূর্যের আলো থাকে না তখন শরীরকে কাজ করতে বাধ্য করা বা জাগিয়ে রাখা শরীরে মেলাটনিন হরমোন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে সত্য, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে সুস্থতা; প্রকৃতির  প্রতিকূলে চলে উপহার পেয়েছি একটি রোবটিক জীবন, আর রোগশোক।  

'সুস্থতা' আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের দেয়া একটি মহা মূল্যবান নেয়ামত। একজন মানুষ কতটা সময় সুস্থ থাকবেন আর কতটা সময় অসুস্থ, তা একমাত্র গাফুরুর রাহীম-ই জানেন; এখন যে সুস্থ কিছুক্ষণ পরই হয়তো তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। তাইতো হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্থতা নামের এই মহা নেয়ামতের কদর করতে জোরালো তাগিদ দিয়েছেন ; হাদিসে বর্ণিত, ‘তোমরা পাঁচটি অবস্থায় পতিত হওয়ার পূর্বেই জিনিসগুলোকে কদর করো, মূল্য দাও— ১). বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বে যৌবনকে, ২). রোগ আক্রমণের পূর্বে সুস্থতাকে, ৩). কর্মব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে, ৪), মৃত্যু আসার পূর্বে জীবনকে, এবং ৫). দারিদ্রতা আসার পূর্বে স্বচ্ছলতাকে।' বোখারী শরীফের অন্য আরেক হাদিসে এসেছে, ‘দুটি নেয়ামতের বিষয়ে মানুষ ক্ষতির মাঝে থাকে— ১). সুস্থতা, ও ২). অবসর।'

সুস্থ থাকতে থাকতে নেক আমলের প্রতি মনোযোগী হতে বলেছেন হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম; ইসলামি স্কলারগণও শারীরিক সুস্থতার জন্য ইসলামি নির্দেশিত পন্থায় জীবন পরিচালনার পাশাপাশি আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার দরবারে বেশি বেশি দোয়া করতে বলেছেন। হজরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত— আমি আমার পিতাকে বললাম, আব্বাজান! আমি আপনাকে প্রতিদিন ভোরে ও সন্ধ্যায় তিনবার বলতে শুনি যে আপনি এই দোয়া "আল্লাহুম্মা আ-ফিনি ফি বাদানি, আল্লাহুম্মা আ-ফিনি ফি সাম-ই, আল্লাহুম্মা আ-ফিনি ফি বাসারি, লা-ইলাহা ইল্লা আনতা" পাঠ করছেন। তিনি বলেন, আমি হুজুরপাক (সাঃ)-কে এ বাক্যগুলো দ্বারা দোয়া করতে শুনেছি। সে জন্য আমিও তাঁর (সাঃ) নিয়ম অনুসরণ করতে ভালোবাসি। —(সুনানে আবু দাউদ : ৫০৯০)

মানব-আত্মার সুস্থতার জন্য সুস্থ ও সুঠাম দেহ একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; শারীরিক সুস্থতা মানুষের আত্মিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির সোপান। দেহ ও মনকে প্রফুল্ল রাখতে সুস্বাস্থ্যের ভূমিকা অপরিসীম। আর এ জন্য শারীরিক কসরত বা ব্যায়ামের কোন বিকল্প নেই। শরীরে কোন রোগ-বালাই না থাকলেও সুস্থতা ধরে রাখতে নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মত হলো, কায়িক পরিশ্রম না করা মানুষের প্রত্যেকের উচিত প্রতিদিন অন্ততঃ ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে কমপক্ষে পাঁচ দিন ব্যায়াম করা। ইসলামও তাই বলে।

অনেকের মনেই প্রশ্ন— শরীরচর্চার আদর্শ সময় আসলে কোনটি, সকাল, দুপুর নাকি বিকেল? ইসলামি জীবন বিধান বলে— সকাল; ফজরের পর হাটাহাটি করা সবচেয়ে উত্তম। একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা যায়, দিনের যে কোনো সময়ের পরিবর্তে সকালে ব্যায়াম করলে অনেক বেশি কাজ হয়; সকালে ব্যায়াম করলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক এবং কিছু কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস পায়।

সকালবেলা শরীর কার্বোহাইড্রেটের বদলে ফ্যাট বা চর্বিকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে; কেননা বেশির ভাগ কার্বোহাইড্রেট বা গ্লুকোজ রাতের বেলা শরীরকে সাপোর্ট দিতেই ব্যবহার হয়ে যায়। তাই মেদ বা ফ্যাট কমাতে চাইলে সকালের দিকে ব্যায়াম করা সবচেয়ে উত্তম। যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, তাদের উচিত প্রতিদিন সকালে শরীরচর্চা করা।সকালের শরীরচর্চায় দেহে এন্ডোরফিন নামক হরমোনের নিঃসরণ ঘটে; এই এন্ডোরফিনগুলো মস্তিষ্কের রিসেপ্টরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি ইতিবাচক অনুভূতির সৃষ্টি করে। ফলে দিনভর মন ভালো থাকে, হতাশা থেকে মুক্তি মেলে।

সকালে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা বাড়ে; এ সময় ব্যায়াম করলে পেশিগুলো শক্তিশালী হয়। সকালে ব্যায়াম করলে রাতে ভালো ঘুম হয়; যাদের ঘুমের সমস্যা রয়েছে তারা সকালে ব্যায়াম করতে পারেন। দেহের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রেখে ডায়াবেটিসের মাত্রা কমায় সকালের ব্যায়াম। সকালে জগিং করলে বা দ্রুত হাঁটলে হার্টে বেশি পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ হয়, এতে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়। সকালে হাঁটলে রক্তের লোহিত কণিকা থেকে চর্বি ঝরে, হাঁটার সময় রক্তের ইনসুলিন ও গ্লুকোজ ক্ষয় হয়। ফলে ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। সকালের স্নিদ্ধ বাতাস থেকে অক্সিজেন হৃৎপিণ্ডে পৌঁছে রক্ত বিশুদ্ধ করে এবং অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত মস্তিষ্কে সরবরাহ করে। ফলে মস্তিষ্ক সচল থাকে, ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করে, স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে, মস্তিষ্কের নিউরনের কার্যক্ষমতা বাড়ায়।

সকালে হাঁটাহাঁটির ফলে শরীর থেকে যে ঘাম বের হয় তাতে ত্বকের লোমকূপগুলো খুলে যায় এবং শরীরের দূষিত পদার্থগুলো ঘামের মাধ্যমে দ্রুত বের হয়ে যায়; ফলে ত্বক উজ্জ্বল ও লাবণ্যময় দেখায়। তারুণ্য ধরে রাখতে সকালের ব্যায়াম বিশেষ উপযোগী। দৌড়, জগিং, ফ্রি হ্যান্ড বা জিমে গিয়ে যা-ই হোক না কেন, সকালে ৩০ মিনিটের ব্যায়াম পুরো দিনের ব্যায়ামের চাহিদা মেটায়; সারা দিনের কর্মক্ষমতা বজায় থাকে। 

 তাই বলি কি— সকাল সকাল ঘুমাতে চেষ্টা করুন এবং শেষ রাতে জাগার অভ্যাস করুন, জীবন পালটে যাবে ইনশাআল্লাহ। ফজরের নামাজের পর পবিত্র কুর'আন তেলাওয়াতে অনেক বেশি ফজিলত;  তাই নামাজ আদায় করে কুর'আন পড়ে কোলাহলমুক্ত সকালে বেরিয়ে পরুন, বেহেশতের বাতাসে গা শীতল করুন। এ বাতাসে হাটাহাটি বা ব্যায়াম করলে শরীর ও মন উভয়ই ভালো থাকবে ইনশাআল্লাহ।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
২১ জানুয়ারি, ২০২২.

শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আতাউল্লাহ বুখারী ও মির্জা কাদিয়ানীর তথাকথিত ডিবেট :



'সৈয়দ আতাউল্লাহ বুখারী ও মির্জা কাদিয়ানীর ডিবেট' নামের একটি কল্পকাহিনী আমাদের দেশের তথাকথিত কিছু বিবেকহীন মোল্লা/মৌলুভী একসময় প্রচার করেছে, না জেনে না বুঝে গবেষণা ছাড়া সেসব বয়ানের সূত্র ধরে বর্তমানে একশ্রেণীর তরুণ ওয়াজেরীয়ানও ওয়াজের মঞ্চে তা চাউর করছে; যা ইউটিউবসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে হচ্ছে এবং বলা যায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। দেশের বেশিরভাগ তথাকথিত ইসলামিক বক্তাই এই কাল্পনিক ডিবেটের কথা তুলে ধরে কাদিয়ানীদের নাজেহাল করতে চেষ্টা করছে; ঘটনাটি আসলে কি, তা কি তারা একেবারও চিন্তা করেছে? বাস্তবতায় তারা নিজেরাই হাসির পাত্র হচ্ছে। একবারের জন্যও কেন তারা চিন্তা করে দেখে না মিথ্যা দিয়ে সত্য কখনও প্রতিষ্ঠা করা যায় না; বরং সমালোচিত হতে হয় এবং প্রকৃত সত্যটাও ধামাচাপা পড়ে যায়।  

কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে কেন? ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতে খামাখা কেনইবা মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে? গবেষণা করে সত্যটা জেনে বুঝে নিলেই তো হয়। মির্জা কাদিয়ানী মারা গেছে ১৯০৮ সালে, তখন আতাউল্লাহ বুখারীর বয়স কত?    

 সৈয়দ আতাউল্লাহ শাহ বুখারী (রঃ), জন্ম: সেপ্টেম্বর ২৩, ১৮৯২ — মৃুত্যু: আগস্ট ২১, ১৯৬১; যিনি ছিলেন একজন মুসলিম হানাফী পণ্ডিত, ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় ও সিনিয়র রাজনৈতিক নেতা। তিনি ছিলেন মজলিস-ই-আহরার-ই ইসলাম এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম একজন।  আতাউল্লাহ বুখারীর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান ছিল ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে শক্তিশালী ব্রিটিশ-বিরোধী অনুভূতির অঙ্কুরোদগম সৃষ্টি করা। আর মির্জা গোলাম আহমেদ কাদিয়ানী, জন্ম: ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৫ — মৃত্যু: ২৬ মে ১৯০৮; একজন ভারতীয় ধর্মীয় নেতা, এবং আহমদিয়া মুসলিম জামাত নামক এক ধর্মের প্রবর্তক। তাঁর দাবীসমূহ— ১৪ শতাব্দীর  মুজাদ্দিদ  (আধ্যাত্মিক সংস্কারক), প্রতিশ্রুত মসিহ, মাহাদি, নবী এবং খলীফা; তিনি অবশ্য  ইসলামের পরিপূর্ণতা দানকারী একজন উম্মতি নবী হিসেবেও নিজেকে দাবী করেন। মুসলিম উম্মাহ যাকে একজন ভণ্ড নবী হিসেবে চিনে।

ভন্ডনবী মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী ১৮৯১ সালের ২২শে জানুয়ারী যখন নিজেকে ‘প্রতিশ্রুত মাসীহ’ দাবী করে, তখন মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী ছিলেন একজন ছাত্র, আতাউল্লাহ বুখারীর জন্মই হয়নি।  এই দাবীর দেড় বছর পর সানাউল্লাহ অমৃতসরী ফারেগ হন এবং উলূম ও ফুনূনে ঋদ্ধ হয়ে ১৮৯২ সালে নিজ জন্মভূমি অমৃতসরে ফিরে আসেন, আতাউল্লাহ বুখারী তখন সবে জন্মগ্রহণ করেন। অতএব আতাউল্লাহ বুখারীর সাথে মির্জা কাদিয়ানী ডিবেট কতটা যৌক্তিক?? 

মির্জা কাদিয়ানীর বিরুদ্ধে সে সময়কার সব বড় বড় আলেম-ওলামাই সোচ্চার হয়েছিলেন, তন্মধ্যে মাওনা সানাউল্লাহ অমৃতসরী অন্যতম; মাওলানা মুহাম্মাদ হুসাইন বাটালভী (মৃঃ ১৯২০ খৃঃ), সৈয়দ নাজীর হুসাইন মুহাদ্দিছ দেহলভী, মাওলানা আব্দুল হক গযনভী, মাওলানা মুহাম্মাদ বাশীর সাহসোয়ানী (১৮৩৪-১৯০৮ খৃঃ), মাওলানা কাজী মুহাম্মাদ সুলাইমান মানছূরপুরী, মাওলানা আব্দুল জববার গযনভী, মাওলানা আহমাদুল্লাহ অমৃতসরী, মাওলানা গোলাম আলী কাছূরী, মাওলানা হাফেজ আব্দুল মান্নান ওয়াজীরাবাদী (১৮৫১-১৯১৫ খৃঃ), মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী, মাওলানা মুহাম্মাদ আলী মুঙ্গেরী, মহাকবি ড. মুহাম্মাদ ইকবাল, ‘জমীনদার’ পত্রিকার সম্পাদক জাফর আলী খান (১৮৭৩-১৯৫৬ খৃঃ) প্রমুখ কাদিয়ানীদের মুখোশ উন্মোচনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন; পরবর্তীতে সে দলের অন্যতম একজন সৈনিক হন সৈয়দ আতাউল্লাহ বুখারী। যার ফলে জনসম্মুখে গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর স্বরূপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠে। মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী ভণ্ড নবী বিরুদ্ধে প্রচণ্ডভাবে ময়দানে নেমে পড়েছিলেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেন; তাঁদের প্রচারণার ফলেই পৃথিবীর অন্যসব হাক্কানী ওলামায়ে কেরামগণও তখন চতুর্দিকে সোচ্চার হন। 

সৈয়দ আতাউল্লাহ বুখারীর সাথে মূলতঃ বাহাস হয়েছিল মির্জাপুত্র বশির উদ্দিন মাহমুদের; ভুল করে যা মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর নামে প্রচার করা হয়! সৈয়দ আতাউল্লাহ বুখারীর জ্ঞানগর্ভ সেই বক্তব্য প্রায়ই আমাদের দেশের বক্তাদের বয়ানে শুনতে পাই, কিন্তু অধিকাংশ বক্তা  তখনকার সৈয়দ আতাউল্লাহ বুখারীর প্রতিপক্ষ ভুল করে মির্যা কাদিয়ানীকে করে ফেলে; যা চরম ভুল। মির্জা কাদিয়ানী যখন কলেরায় মারা যায়, তখন সৈয়দ আতাউল্লাহ বুখারীর বয়স মাত্র ১৬ বছর।

তবে কি উক্ত ঘটনাটি পুরোপুরি মিথ্যা? মোটেও না! সঠিক ঘটনাটি হলো, আতাউল্লাহ বুখারীর প্রতিপক্ষের ডিবেটার ছিল মির্জা বশির উদ্দিন মাহমুদ; মির্জা কাদিয়ানীর পুত্র ও কাদিয়ানী জামাত (একাংশ, রাবওয়া গ্রুপ)'র দ্বিতীয় খলিফা, যার মৃত্যু ১৯৬৫ সালে।

ঐতিহাসিক সেই মজার ঘটনাটি এখন আমি অতি সংক্ষেপে তুলে ধরতে যাচ্ছি। ১৯৫৩ সালের ঘটনা; সমগ্র পাকিস্তান জুড়ে তখন খতমে নবুওত আন্দোলনে উত্তাল জনতা। 'খতমে নবুওত' এর শরয়ী অবস্থা, যুক্তিকতা এবং গুরুত্ব উঠিয়ে ধরার উদ্দেশ্যে তখন গঠিত হয় 'Monir Enquire Tribunal' (মুনির ইনকোয়ারি ট্রাইব্যুনাল); দেশের শীর্ষস্থানীয় সকল ওলামায়েকেরাম এই ট্রাইব্যুনালে যোগদান করেন। কাদিয়ানীদের প্রতিনিধিত্ব করতে যোগ দেয় মির্জাপুত্র মির্জা বশির উদ্দিন মাহমুদ, এদিকে খতমে নবুওত আন্দোলনের বীর সিপাহশালার সৈয়দ আতাউল্লাহ বুখারী ট্রাইব্যুনালে যোগ দেন। 

দুই পক্ষ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে— সত্যের পক্ষে সৈয়দ আতাউল্লাহ বুখারী, আর অন্য পক্ষে শানে রেসালতের বিদ্রোহীপক্ষ কাদিয়ানী জামাতের দ্বিতীয় খলিফা মির্জা বশির উদ্দিন মাহমুদ। বক্তব্যের  এক পর্যায়ে মির্জা বশির বলে, সূরা আস সাফফ ৬ নং আয়াতের মধ্যে 'ইসমুহু আহমদ' হতে 'আহমদ' দ্বারা গোলাম আহমদ-ই উদ্দেশ্য। জবাবে সৈয়দ আতাউল্লাহ বুখারী বলেন, এই আয়াতে তো শুধুই 'আহমদ' আছে। কিন্তু তোমার বাপের নাম তো 'গোলাম আহমদ'! 
মির্জাপুত্র : 'গোলাম' শব্দ কেটে দিন তথা 'গোলাম' শব্দটি নামের শুরু থেকে বাদ দিয়ে দিন।
তখন সৈয়দ আতাউল্লাহ বুখারী : তাই নাকি! তাহলে তো আমার নামের শুরু থেকে 'আতা' বাদ দিতে পারি! তো 'আতা' শব্দ বাদ দিলে আমি হই 'আল্লাহ'। (তারপর সৈয়দ সাহেব বললেন)— لہذا میں نے اس الو کے پٹھے کو نبی بنا کر بھیجا ہی نہیں অর্থাৎ আমি এই উল্লুক পাঠাটিকে নবী বানিয়ে পাঠাইনি!

এমন বক্তব্যে মির্জাপুত্রের লম্বা জিহ্বা খামোশ বনে গেল, তার বাগাড়ম্বর আর সামনে এগোয়নি;  উপস্থিত দর্শকদের হাসি তামাশা তখন দেখে কে!!!

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১.

শুক্রবার, ৯ জুলাই, ২০২১

জাগো মুসলমান জাগো!


সভ্যতা ও সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জীবন ও জীবিকা, উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে মুসলমানদের শিক্ষা জাগরণ ও এর উৎকর্ষতার ইতিহাস অনস্বীকার্য; ৭ম শতাব্দীর ২য় দশকে আইবেরীয় উপদ্বীপ, তথা বর্তমান স্পেন এবং পর্তুগাল বিজয় ছিল মুসলমানদের এক গৌরবোজ্জ্বল স্বর্ণালী ইতিহাস। সভ্যতা, সৌন্দর্য ও শিক্ষার লীলাভূমি ও কীর্তিমন্দির হিসেবে যেসব মহানগরী পৃথিবীতে খ্যাতি লাভ করেছিল, স্পেনের কর্ডোভা মহানগরী ছিল তাদের অন্যতম। কর্ডোভা পরিচিতি পেয়েছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার  প্রাণকেন্দ্র হিসেবে। তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে সারা ইউরোপ থেকে দলে দলে শিক্ষার্থীরা এসে জড়ো হতো মুসলিম শিক্ষা জগরণের প্রাণকেন্দ্র থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে।
 
যেখানে যাকিছু শিক্ষাউপকরণ হিসেবে পেত, সেখান থেকেই তার ভালটা তারা শিক্ষাব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করত; ৭৫১ খ্রিষ্টাব্দে তালাসের যুদ্ধে চাইনিজরা যখন বন্দী হয় তখন তাদের কাছ থেকে মুসলিমরা কাগজ তৈরির পদ্ধতি শিখে নেয়। বিজ্ঞান, তথা তথ্য ও প্রযুক্তির উন্নতি সাধনই ছিল ইসলামের স্বর্ণালী যুগের সূচনার উদ্দেশ্য এবং সে যুগের উত্থানের পেছনের এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। জ্ঞান বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা তখন ছিল না যে শাখায় মুসলমানের উন্নতি অগ্রগতি ও পদচারণা ছিল না। আজকের এই যন্ত্র সভ্যতার ডিজিটাল যুগে এসে কেউ যদি আধুনিক শিক্ষাকে পাশকেটে শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে পরে থাকতে চায় তবে তা হবে সবচেয়ে বড় মূর্খতা; অন্ধকারের গহীনে নিজে নিজে তলিয়ে যাওয়া। 

রসায়ন, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিম গবেষক ও বিজ্ঞানীদের একসময় যথেষ্ট দখল ছিল। মুহাম্মদ ইবনে মূসা আল খোয়ারিজমি, আবু রায়হান আল বিরুনি, মুসা বিন সাকির, ওমর খৈয়াম, আবুল কাশেম ফেরদৌসী, আল-মাসুদী, আত-তাবারি, ইবনে খালদুন এমন আরো অনেক মুসলিম জ্ঞানতাপস যুগে যুগে জ্ঞান চর্চা করে বিশ্বে যে আলোকবর্তিকা উড্ডীন রেখে গেছেন তা আজও পাশ্চাত্য সভ্যতার অমূল্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত ও বিবেচিত। মুসলিমদের জ্ঞানচর্চা চলছিল ৫৫০ বছর; আর ঐসময়টা ছিল ইউরোপের ইতিহাসের এক অন্ধকার যুগ; একই সময়ে ভারতবর্ষ অবনত ছিল প্রতিক্রিয়াশীল ব্রাহ্মণাত্যের অধীনে, যা বৌদ্ধধর্মকে বিধ্বস্ত কিংবা বিকৃত করেছিল।

দার্শনিক আল-কিন্দি, আল-ফারাবি, ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদ নামের তৎকালীন মুসলিম মনীষীরা পৃথিবীর ‘জ্ঞানভাণ্ডার’ নামে পরিচিত ছিলেন; অবশ্য বিশ্বব্যাপী আজও তাঁরা তা-ই আছেন। আল-কিন্দি রসায়ন, চক্ষুরোগসহ চিকিৎসা ও দর্শনে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন; তিনি শতাধিক পুস্তক প্রণয়ন করে গেছেন। আবু আলী হোসাইন ইবনে সিনা মাত্র ১৮ বছর বয়সে চিকিৎসাশাস্ত্রের ব্যুৎপত্তি সৃষ্টি করে বিশ্বজোড়া অনন্য এক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন; চিকিৎসাবিজ্ঞানে যে দুটি বিশ্বকোষ তিনি রচনা করেছিলেন তা দ্বাদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতো, সেসব পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত ১৬ বার পুনঃমুদ্রিত হয়।

মোটামুটিভাবে ৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ১৩তম শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত সময়কে ইসলামের স্বর্ণালী যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; এই আলোকিত যুগেই আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগের অগ্রদূত হিসাবে কাজ করেছেন অসংখ্য মুসলিম বিজ্ঞানী ও জ্ঞানতাপস। সাম্রাজ্যবাদের গভীর চক্রান্তে আজকের পৃথিবীর অনেকে মধ্যযুগকে অন্ধকার ও বর্বর যুগ হিসাবে আখ্যা দিয়ে থাকে, বিজ্ঞানময় ধর্ম ইসলামকে জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রগতির পথে অন্তরায় হিসাবে বিবেচনা করে; প্রকৃত সত্য কিন্তু তা নয়। মধ্যযুগে পৃথিবীর অগ্রগতি উন্নতিতে একমাত্র ইসলামই ছিল মূল চালিকাশক্তি; ইসলামের স্বর্ণালী যুগে মুসলমানরাই ছিল পৃথিবীর সর্বক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ।

University বা বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটির উদ্ভব হয়েছে লাতিন Universitas Magistrorum et  Scholarium, which roughly means "community of teachers and scholars: যার অর্থ - শিক্ষক ও পণ্ডিতদের সম্প্রদায়। বিদ্যালয় শব্দটির সাথে বিশ্ব শব্দটি যোগ করার অর্থ হলো - এই বিদ্যাপীঠ শুধুমাত্র কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ বা জাতির জন্য নয়, বরং এটি সারা বিশ্বের সব মানবজাতির জন্য। এখানে সারা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যেকোন দেশের যেকোন মানুষ পড়তে ও পড়াতে পারবে। বর্তমানে পৃথিবীতে এমন লাখো ইউনিভার্সিটি আছে, কিন্তু কোনটি পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় তা নিয়ে বেশ কয়েকটি ভিন্ন অভিমত থাকলেও জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization) বা ইউনেস্কো (UNESCO)-এর ঘোষনানুযায়ী কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়।
 
[Ref : A History of the University in Europe. Vol. I : Universities in the Middle Ages, Cambridge University Press, 2003, ISBN 978-0-521-54113-8, pp. 35–76]

অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের কোল ঘেঁষে আফ্রিকার সবচেয়ে পশ্চিমের একটি দেশ মরোক্কো; ইউরোপের খুব কাছে হলেও দেশটি ইউরোপীয় নয়। বর্তমানে রাজধানী রাবাত ছেয়ে গেছে বিদেশি গাড়িতে, অথচ সেখানেই এখনও উট ছাড়া কোথাও ভ্রমণ অকল্পনীয়৷ মরক্কোর ফেজ নগরীতে পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয়টির ১১০০তম বর্ষপূর্তি ঘটে আরম্বর এক জাতীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয় চালুর সময় ছিল ইসলামের স্বর্ণালী যুগ। নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে ফেজ নগরী ছিল অনেকটা গ্রামসদৃশ। তখন মরক্কোর শাসক আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন - ‘হে আল্লাহ! আপনি এ নগরীকে আইন ও বিজ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে কবুল করুন।’ 

সে স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ফেজ নগরীর এক বিধবা ধনাঢ্য মহীয়সী নারী চালু করেন কারাওইন মসজিদ; কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় সেই মসজিদের অংশ হিসেবেই ৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ফাতিমা আল ফিহরি নামের এক মুসলিম মহীয়সী নারী; তাঁর বাবা ছিলেন ফেজ নগরীর ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মুহাম্মদ আল ফিহরি। আল ফিহরি পরিবার ফেজে আসেন নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে; তাঁরা এখানে আসেন তিউনিসিয়ার কারাওইন থেকে। সে সূত্রে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখা হয় কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের সঙ্গে কারাওইন থেকে তাঁদের সমাজের বেশ কিছু লেখক ফেজে এসে নগরীর পশ্চিমের অংশে বসবাস করতে শুরু করেন। ফাতিমা আল ফিহরি ও তাঁর বোন মরিয়ম আল ফিহরি উভয়েই ছিলেন সুশিক্ষিত। তাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার কাছ থেকে প্রচুর অর্থসম্পদ পেয়েছিলেন। ফাতিমা তাঁর অংশের সবটুকো অর্থ খরচ করে তাঁর সমাজের লেখকদের জন্য একটি মসজিদ তৈরি করে দেন।

ধীরে ধীরে এটি মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়। মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্ব ও ইউরোপের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও জ্ঞান-বিজ্ঞান বিনিময়ে কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বা শিক্ষক ছিলেন ইবনে মাইমুন (১১৩৫-১২০৪), আল-ইদ্রিসি (মৃত ১১৬৬), ইবনে আরাবি (১১৬৫-১২৪০), ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৩৯৫), ইবনে খতিব, আল-বিতরুজি (অ্যালপে ট্রেজিয়াম), ইবনে হিরজিহিম ও আল ওয়্যাজ্জেন আরো অনেকে। ১৩৪৯ সালে সুলতান আবু ইনান ফ্যাবিস বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন; অসংখ্য মূল্যবান পাণ্ডুলিপি রাখা হয় ওখানে। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব মূল্যবান পাণ্ডুলিপি রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আছে - হরিণের চামড়ার উপর ইমাম মালেক (রহ.)-এর লেখা মুয়াত্তার পাণ্ডুলিপি, ১৬০২ সালে সুলতান আহমাদ আল মনসুরের দেওয়া কোরআনের কপি, সিরাতে ইবনে ইসহাক, ইবনে খালদুনের বই ‘আল-ইবার’-এর মূল কপি। 

কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হতো কোরআন ও ফিকহ (ইসলামী আইনশাস্ত্র), ব্যাকরণ, বক্তৃতাদানবিদ্যা বা অলংকারশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, ইতিহাস, ভূগোল ও সংগীতবিদ্যা। শুরুতে এটি একটি ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র হলেও, অচিরেই এর ছাত্রসংখ্যা দাঁড়ায় আট হাজারে; যারা সেখানে চিকিৎসাবিদ্যা থেকে শুরু করে ভূগোল পর্যন্ত অনেক বিষয়েই উচ্চশিক্ষা লাভ করতেন। আরব শক্তির সোনালি দিনগুলোতে মুসলমানরাই ছিল বিশ্বের জ্ঞানবিজ্ঞান জগতের অভিজাত সম্প্রদায়। মুসলমানরাই পরিপূর্ণতা দিয়েছিল অ্যালজাবরা-র; আরবি ‘আল-জাবর’ থেকে এসেছে অ্যালজাবরা-র নাম। মুসলমানরাই বিশ্লেষণ জ্যামিতি, সমতলীয় ত্রিকোণোমিতি ও গোলকীয় ত্রিকোণোমিতির জনক; জ্যোতির্বিদ্যার অগ্রদূত। ফেজ নগরীতে তখন বিশ্বের সকল পণ্ডিতবর্গের সমাবেশ ঘটতো। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এক ফরাসি তরুণ, যিনি পরে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন পোপ দ্বিতীয় সিলভারস্টার (৯৯৯-১০০৩) নামে।

ইউরোপের জাগরণের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের স্বর্ণালী যুগের অবসান ঘটে; সাম্রাজ্যবাদের নতুন ইতিহাস শুরু হয়। মধ্য-অষ্টাদশ শতাব্দীতে কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কূটকৌশলে নেমে আসে এক কালো অধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যায় জ্ঞানী-গুণী আর বিজ্ঞানীরা; সেখানে অবশেষ পরে থাকে শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নেয়া আলেম-ওলামারা। ১৯১২-৫৬ সময়ে মরক্কো ছিল ফ্রান্সের প্রটেক্টরেট। সাম্রাজ্যবাদের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে সেই সময়টায় এ বিশ্ববিদ্যালয় একদম ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল; তখন সেখানে পরীক্ষা ও ডিগ্রি দেয়া বলতে গেলে বন্ধ হয়ে যায়, শুধু ধর্মশিক্ষা কোনোমতে  চালু থাকে।  ছাত্রদের তখন থাকতে হতো অনুপযুক্ত আলোহীন ও বায়ুহীন প্রকোষ্ঠে, জানালাহীন কক্ষে; ঘুমাতে হতো মেঝেতে,  রান্না করতে হতো কয়লার চুলোতে।

১৯৫৬ সালে মরক্কো পুনরায় স্বাধীন হয়; জাতিকে বিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে গড়ে তোলার দৃঢ়তা নিয়ে বাদশাহ পঞ্চম মোহাম্মদ আরেকবার কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে ধর্মীয় পাঠপরিধি কমিয়ে চালু করেন গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, বিদেশী ভাষাবিষয়ক পাঠক্রমসহ নানাবিধ বিষয়। ১৯৫৭ সালেই তিনি সেখানে চালু করেন মহিলা শাখা; এর মাধ্যমে তিনি রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে একটি ঝাঁকুনি দিয়ে দেন। এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্রীও লেখাশোনা করছে। ১৯৬৩ সালে কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় মরক্কোর আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতির সাথে যুক্ত হয়ে বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম একটি ধর্মীয় ও জাগতিক শিক্ষা কেন্দ্র।

শিক্ষাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মৌলিকভাবে একে দুই ভাগে ভাগ করা যায়; জাগতিক শিক্ষা ও দ্বীনী শিক্ষা। মানুষের জাগতিক প্রয়োজন পূরণের উপযোগী জ্ঞান ও বিদ্যা হচ্ছে জাগতিক শিক্ষা; পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির জ্ঞান হচ্ছে দ্বীনী শিক্ষা। প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনগুলো পূরণে এবং দুনিয়াতে অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে মানুষকে দান করা হয়েছে পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও বিবেক-বুদ্ধি-বিবেচনা; এগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য ইসলামে পূর্ণমাত্রায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে জাগতিক শিক্ষার। আর মানুষ হিসেবে উৎকর্ষতা লাভ ও পরকালের মুক্তিতে দ্বীনী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম, এর কোন বিকল্প নেই।

আর আমরা? বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর এই ডিজিটাল যুগে এসেও এক দল মেতে উঠেছে যথসব অসম প্রতিযোগীতায়; কওমী মাদ্রাসাতে আধুনিক জাগতিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত রাখতে উঠেপড়ে লেগেছে তারা। কে কাকে কিভাবে দোষারোপ করতে পারে, কার উপর কি চাপিয়ে দেয়া যায়, কি করে অন্ধকার যুগকে আলিঙ্গন করা যায়, ভাস্কর্য নিয়ে নোঙড়া মাতামাতি - এইসব নিয়েই মেতে আছে। সেকেলে ধ্যানধারণা পরিহার করে মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সময়োপযোগী শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে চলমান বিশ্বের সাথে সমতালে এগিয়ে যাওয়াই একজন খাঁটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ্
২৫ এপ্রিল, ২০১৭.

বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, ২০২১

আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরকে নিয়ে কিছু কথা :


কুপি-হারিকেনের আলোতে লেখাপড়া শিখা মানুষ ভাইরালের জামানায় উপনীত হয়ে কত কি যে দেখলাম আর দেখছি শিখলাম আর শিখছি তা ভাষায় বর্ণনা করতে পারবো না! ইমামে আজম আবু হানিফা (রঃ)-এর বিখ্যাত কিতাব আল-ফিকহুল আকবর-এর হার্ডকপি আমার কাছে আছে; এ'টা মূলতঃ আকিদার কিতাব। যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের জন্য অন্যন্য ও অদ্বিতীয় একটি  আকিদার কিতাব; ঈমানের মূল দিকনির্দেশনা। অনলাইনে এর পিডিএফ কপি খুঁজতে যেয়ে পড়লাম এক মহা বিপদে! সার্চ দিতেই গুগল যে ফিকহুল আকবর লিঙ্ক সাপ্লাই দিল তা দেখে আমি হতবাক! এ'টা এতো বড় কেন? ইমামে আজমের ৪৯ ধারা গেল কই?? যে বইটা অনুবাদ করেছে ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, সে বইটা পড়ার পর জেনে বুঝেই মন্তব্য করছি— ঈমানদারকে বেইমান করার জন্য বইটি তৈরী করা হয়েছে, এবং ইমামে আজমের নাম ব্যবহার করে কূটচালে বাংলাভাষী মুসলমানদের ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে এতো ব্যাপকভাবে অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। 

আমি যে অনুবাদ খুঁজছি তা ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান অনুদিত ও সম্পাদিত 'আল-ফিকহুল আকবর'। যে বইয়ের সাথে আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের বইয়ের কোন মিল নেই; বিশ্বাস না হলে মিলিয়ে দেখুন। দশবারের চেষ্টায়ও আসল বই পেলাম না, বারবার গুগল ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর কতৃক সম্পাদিত বইটিই দিল। অবশেষে আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের বইটিই ডাউনলোড করে এটার পরিসর দেখে অবাক হলাম; এটি একটি বিশাল বই। বইটি ডাউনলোড করে বেশ কয়দিন লাগিয়ে পড়লাম। এ বইটিতে মূলতঃ ইমামে আজমের প্রতি অবিশ্বাসের তীর ছোড়া হয়েছে; নিশ্চিত একটি জঘন্য কাজ, প্রতারণা! ইমামে আজম আবু হানিফা (রঃ)-র নাম করে আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর যে অকাজ-আকাম করে গেছে এবং পৃথিবীতে স্বাক্ষী রেখে গেছে, যা হাজার হাজার মানুষকে পথভ্রষ্টতার অতলে তলিয়ে দিচ্ছে; নিশ্চয় তার প্রতিদান সে ওপারে পাচ্ছে। 

খোঁজ নিয়ে জানতে পাড়লাম মৃত্যুর পর অনলাইন বাজারে আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর প্রচণ্ড রকমের ভাইরাল! কিন্তু ওপারে তিনি কেমন আছেন? হায়রে মুসলমান! মরে নেন, সবই টের পাবেন! আসল আর নকল না দেখে না চিনে না বুঝে জাহান্নামের রসদ আর কত কিনবেন? ভাইরাল মিজান, মামুনুল, ত্বহা....  তারপর কে এবং কি?? ইসলামের নামে তথাকথিত আলেমদের এসব ভণ্ডামি আর কত? ভণ্ডামিপূর্ণ এসব কর্মকাণ্ডে পুরো জাতি আজ হতবাক হতভম্ব! তারপরও মুসলমানের জ্ঞানোদয় হয় না, হবে না; কারণ সেই একই— অন্ধত্ব। মুসলমান যতদিন পর্যন্ত 'ইকরা' বা পড়ায় অভ্যস্ত না হবে, ততদিন এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে না।

'রব্বুল আ’লামীন সর্ব প্রথম কি সৃষ্টি করেছেন?'— এ প্রশ্নটি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে আমাদের বর্তমান সমাজে; কারণ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর নামের এই তথাকথিত আলেমই উস্কে দিয়ে গেছে ইস্যুটিকে। তার মতো আলেমরাই সৃষ্টি করে গেছে জগতে এতো মতপার্থক্য। 'সর্বপ্রথম সৃষ্টি  কি কলম, না কি নূরে মুহাম্মাদী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম?'— এ নিয়ে বর্তমান মুসলমানরা পুরাপুরি দুইভাবে বিভক্ত। এমন কেন? আমার গবেষণা বলছে— যারা মনে করে প্রথম সৃষ্টি কলম, তাদের চোখে নিশ্চিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদ্বেষী একটি পর্দা আছে। এ কথায় হয়তো অনেকে রাগ করবেন বা করতে পারেন। দুঃখিত! এক কথায় এর চেয়ে আর ভালো কিছু লিখতে পারলাম না। তারপরও আপনাদের অনুরোধ করবো লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়তে।  

হযরত উবাইদা ইবনে ছামিত (রাঃ) থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত; 'নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা সর্বপ্রথম ‘কলম’ সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর কলমকে বললেন, লিখ। কলম বললঃ হে প্রভূ! কি লিখবো? আল্লাহ বললেনঃ লিখ ইতিপূর্বে যা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত যা কিছু হবে।' 
হাদিসটি যেসব কিতাবে উল্লেখ আছে— মুসনাদে আবু দাউদ তায়লাসী : হাদিস নং— ৫৭৮; মুসনাদে ইবনে জা’দ : হাদিস নং— ৩৪৪৪; মুসনাদে আহমদ : হাদিস নং— ২২৭০৭; তিরমিযী শরীফ : হাদিস নং — ২১৫৫; মান : সনদ সহীহ।

উক্ত হাদিসের প্রথম অংশ দ্বারা বুঝা যায় 'কলম' প্রথম সৃষ্টি। কিন্তু শেষ অংশটি দ্বারা কি বুঝা যায়?  নিশ্চয় 'কলম' প্রথম সৃষ্টি নয়; কারণ হাদিসটির শেষ অংশে রয়েছে 'আল্লাহ তা'আলা বললেন, 'লিখ ইতিপূর্বে যা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত যা কিছু হবে।' যা দ্বারা স্পষ্টতই বুঝা যায়, কলম সৃষ্টির পূর্বেও অনেক কিছু ছিল; কারণ, আরবি এবারতে 'মা কানা' আছে, যা দ্বারা অতীতকালের ঘটনা বুঝায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই বুঝা যায় 'কলম'-কে প্রথম সৃষ্টি বলা হয়েছে কলমের সম্মানার্থে; মূলত প্রথম সৃষ্টি ‘কলম’ নয়। আমাদের দেশের কিছু আলেম আছে যারা হাদিসের শেষের অংশ বাদ দিয়ে শুধু প্রথম অংশ বর্ণনা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে, এবং বলে— দেখ প্রথম সৃষ্টি কলম! অথচ হাদিসের পরের অংশ পড়লেই বুঝা যায় প্রথম সৃষ্টি কলম নয়; অন্য কিছু। 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মর্তবা, শা'ন-মান ও মু'জেজা সম্পর্কিত যে কোন হাদিস আলবানী মেশিনে ফেলে আজকাল একদল জাল/জয়ীফ বলছে; ওই মেশিনে পড়লেই যে কোন হাদিস জাল/জয়িফ হয়ে যায়; কোন সনদের প্রয়োজন পড়ে না! এই মেশিনের স্রষ্টা নাসিরুদ্দিন আলবানীকে আমাদের দেশের মানুষ তেমন একটা ভালো চিনে-জানে না, কিন্তু এক্সিডেন্টে মৃত তথাকথিত বিশিষ্ট আলেম ফেসবুক/ইউটিউব মাওলানা মরেও যে অনবরত জগতে ঘুরছে, সেই ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর তার বিতর্কিত কিতাব— 'হাদীসের নামে জালিয়াতি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিষয়ক জাল হাদীস'-এ নূরে মুহাম্মাদীই (সাঃ) প্রথম সৃষ্টি নয় বলে যে ব্যাখ্যা দাঁড় করেছেন, তা পড়ে ও জেনে-বুঝে এ দেশের মুসলমান আজ গোমড়াহীতে ডুবে যাচ্ছে। অথচ পূর্ববর্তী বিখ্যাত সব আলেম এ হাদিসটি সহীহ্ বলেছেন; যা পরে তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ। একজন মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমি কলম ধরেছি শুধুমাত্র ঈমানি দায় থেকে। ইমামে আজমের ফিকার কিতাব 'ফিকাহুল আকবর'কে তিনি বিকৃত করেছেন এবং 'হাদিসের নামে জালিয়াতি' বলে মুসলিম সমাজকে খণ্ডিত করেছেন, তাই তার বিরুদ্ধে আজকের কলম ধরা। 

আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর সাহেবের লেখা অনলাইন কিতাব থেকে কিয়দংশ আমি হুবহু তুলে ধরছি — "নূর মুহাম্মাদী প্রথম সৃষ্টি" অর্থে নিম্নের হাদীসটি সমাজে বহুল প্রচলিত:

أّوَّلُ مَا خَلَقَ اللهُ نُوْرِيْ

‘‘আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন’’। সুদীর্ঘ হাদীসটির সার সংক্ষেপ হলো, জাবির (রা) রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে প্রশ্ন করেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম কী সৃষ্টি করেন? উত্তরে তিনি বলেন:

أوَّلُ مَا خَلَقَ اللهُ نُوْرَ نَبِيِّك مِنْ نُوْرِهِ....

‘‘সর্বপ্রথম আল্লাহ তোমার নবীর নূরকে তাঁর নূর থেকে সৃষ্টি করেন।’’ এরপর এ লম্বা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ নূরকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে তা থেকে আরশ, কুরসী, লাওহ, কলম, ফিরিশতা, জিন, ইনসান এবং সমগ্র বিশ্বকে সৃষ্টি করা হয়।....

এ হাদীসটির অর্থ ইতোপূর্বে উদ্ধৃত সহীহ মুসলিমের হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ, তাতে বলা হয়েছে: ফিরিশতাগণ নূর থেকে, জিনগণ আগুন থেকে এবং মানুষ মাটি থেকে সৃষ্ট। আর এ হাদীসে বলা হচ্ছে যে, ফিরিশতা, জিন, ইনসান ও মহাবিশ্বের সব কিছুই নূর থেকে সৃষ্ট। তারপরও এ হাদীসটির বক্তব্য আমাদের কাছে আকর্ষণীয়। যদি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নামে মিথ্যা বলার বা যা শুনব তাই বলার অনুমতি থাকতো তবে আমরা তা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতাম ও বলতাম। কিন্তু যেহেতু তা নিষিদ্ধ তাই কুরআন ও সুন্নাহ-এর নির্দেশ অনুসারে আমরা সনদ অনুসন্ধান করতে বাধ্য হই এবং নিম্নের বিষয়গুলি জানতে পারি:
(ক) বিশ্বে বিদ্যমান কোনো হাদীস গ্রন্থে হাদীসটি সনদ-সহ পাওয়া যায় না। আমরা বলেছি, একটি হাদীস সাধারণত অনেকগুলি হাদীসের গ্রন্থে সনদ-সহ সংকলিত থাকে। কিন্তু এ হাদীসটি কোনো হাদীস গ্রন্থেই সংকলিত হয় নি।

(খ) আমরা দেখেছি যে, ইতিহাস, সীরাত, আকীদা, তাসাউফ, ওয়ায ইত্যাদি বিষয়ক গ্রন্থগুলিতেও বহুসংখ্যক সহীহ, যয়ীফ ও জাল হাদীস সনদবিহীন বা সনদ-সহ সংকলিত। ইসলামের প্রথম ৫০০ বৎসরের মধ্যে এ সকল বিষয়ক কোনো একটি গ্রন্থেও এ হাদীসটির কোনো উল্লেখ নেই।

(গ)..............
সবগুলো পয়েন্ট তুলে ধরতে গেলে লেখা বিশাল হয়ে যাবে, তাই ওদিকে না গিয়ে.......... 

ইনিয়েবিনিয়ে আরও অনেক ব্যাখ্যা আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর দাঁড় করেছে উক্ত হাদিসটি জাল সাব্যস্ত করার উদ্দেশ্যে; অথচ তাবে-তাবেঈন যুগের ইমাম— ইমাম আব্দুর রাজ্জাক (রঃ) এবং হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মুজাদ্দেদ ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-সহ আরও ৩৬ জন জগৎবিখ্যাত মনীষী তাঁদের কিতাবে সহীহ্ সনদে উক্ত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। একজন আলেম কি করে এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করতে পারে? কাকে বিশ্বাস করবো/করবেন??  

সত্যতা যাচাই:

অনেক উদাহরণ দেয়ার দরকার নেই, সর্ব প্রথম আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা যে তাঁর প্রিয় হাবীব হুজুরপাক (সাঃ)-এর নূর সৃষ্টি করেন তার প্রমাণে নিন্মের হাদিসটিই যথেষ্ট—

عن جابر رصي الله عنه قال قلت يا رسول صلي الله عليه و سلم بابي انت و امي اخبرني عن اول شييء خلق الله تعالي قبل الاشياء قال يا جابر ان الله تعالي قد خلق قبل الاشياء نور نبيك من نوره فجعل ذالك النور يدور بالقدرة حيث شاء الله تعالي ولم يكن في ذالك الوقت لوح ولا قلم ولا جتة ولا نار ولا ملك ولا سماء ولا ارض ولا شمس ولا قمر ولا جني ولا انسي ….الي اخر
অর্থাৎ— হযরত জাবের (রাঃ) হতে বর্নিত; তিনি বলেন, আমি হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবানি হউক, আপনি আমাকে জানিয়ে দিন যে, আল্লাহ পাক সর্ব প্রথম কোন জিনিস সৃষ্টি করেছেন?
তিনি বলেন, হে জাবের! নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক সর্ব প্রথম সব কিছুর পূর্বে তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর সেই নূর আল্লাহ পাকের ইচ্ছা অনুযায়ী কুদরতের মাঝে ঘুরছিলো; আর সে সময় লওহে মাহফুজ, কলম, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, আসমান, জমিন, চন্দ্র, সূর্য, মানুষ ও জ্বিন কিছুই ছিলো না।

উল্লেখিত হাদিসটি নিন্মলিখিত কিতাবসমূহে নকল করা হয়েছে—

১. মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাক; ১/৯৯, হাদীস নং ১৮
২. দালায়েলুন নবুওয়াত ১৩/৬৩
৩. মাওয়াহেবুল্লাদুন্নিয়া ১/৯
৪. মাদারেজুন নবুওয়াত ২/২
৫. যুরকানী ১/৪৬
৬. রুহুল মায়ানী ১৭/১০৫
৭. সিরাতে হালবীয়া ১/৩০
৮. মাতালেউল মাসাররাত ২৬৫ পৃ:
৯. ফতোয়ায়ে হাদীসিয়া ১৮৯ পৃ:
১০. নি’মাতুল কুবরা ২য় পৃ:
১১. হাদ্বীকায়ে নদীয়া ২/৩৭৫
১২. দাইলামী শরীফ ২/১৯১
১৩. মকতুবাত শরীফ, ৩য় খন্ড, ১০০ নং মকতুব
১৪. মওজুয়াতুল কবীর ৮৩ পৃ:
১৫. ইনছানুল উয়ুন ১/২৯
১৬. নূরে মুহম্মদী ৪৭ পৃ:
১৭. আল আনোয়ার ফি মাওলিদিন নবী ৫ পৃ:
১৮. নশরুতত্বীব ৫ পৃ:
১৯. তারীখুল খমীস ১/২০
২০. নুজহাতুল মাজালিস ১ম খন্ড
২১. দুররুল মুনাজ্জাম ৩২ পৃ:
২২. কাশফুল খফা ১/৩১১
২৩. তারিখ আননূর ১/৮
২৪. আনোয়ারে মুহম্মদীয়া ১/৭৮
২৫. আল মাওয়ারিদে রাবী ফী মাওলীদিন নবী ৪০ পৃষ্ঠা 
২৬. মজমুয়ায়ে ফতোয়া ২/২৬০
২৭. দেওবন্দী আজিজুল হক অনুবাদ কৃত বুখারী শরীফ ৫/৩
২৮. আপকা মাসায়েল আওর উনকা হাল ৩/৮৩
২৯. শিহাবুছ ছাকিব ৫০
৩০. মুনছিবে ইছমত ১৬ পৃ :
৩১. রেসালায়ে নূর ২ পৃ:
৩২. হাদীয়াতুল মাহদী ৫৬পৃ :
৩৩. মা’ য়ারিফে মুহম্মদী
৩৪. আনফাসে রহীমিয়া
৩৫. আফদ্বালুল ক্বোরা
৩৬. তাওয়ারীখে মুহম্মদ

হাদিসের সনদ—
১. হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
২. হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু
৩. মুহাম্মাদ বিন মুনকাদার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি
৪. মা’মার বিন রাশীদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি
৫. আব্দুর রাজ্জাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি।

বর্ণিত হাদিসের রাবীদের সম্পর্কে মুহাদ্দীসগণের মন্তব্য—

ক) হাফেজে হাদিস, তাবে-তাবেঈন ইমাম আব্দুর রাজ্জাক রহমাতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে:
আহমাদ ইবন সালীহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, 'আমি একবার আহমাদ বিন হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি হাদিস শাস্ত্রে আব্দুর রাজ্জাক রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে নির্ভরযোগ্য আর কাউকে পেয়েছেন কি? আহমাদ বিন হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন— না'। —(তাহজিবুত তাহজিব লি হাফিয ইবনে হাজর আসক্বলানী; ২/৩৩১)

খ) অপর রাবী মা’মার বিন রাশীদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে:
ওনার সম্পর্কে আহমাদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, 'আমি বাসরার সকল হাদীস শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞের থেকে মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাকে মা’মার বিন রাশীদ এর সূত্রে পাওয়া হাদীসগুলো পছন্দ করি'।
ইবনে হাজর আসকলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহিও ওনাকে প্রখর স্মরণশক্তি সম্পন্ন এবং নির্ভরযোগ্য বলেন। —(তাহজিবুত তাহজিব; ১/৫০৫, আসমাউর রেজাল।)

উক্ত মা’মার বিন রাশীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি সূত্রে বর্ণিত বুখারী শরীফের হাদীস সংখ্যা প্রায় ২২৫ এবং মুসলিম শারীফে বর্ণিত হাদীস সংখ্যা প্রায় ৩০০।

গ) হাদিসটির আরেক রাবী মুহাম্মাদ বিন মুকদার রহমাতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে:
ইমাম হুমায়দি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুকদার রহমতুল্লাহি আলাইহি একজন হাফিজ, ইমাম জারাহ তাদীলের ইমাম ইবন মা’ঈন রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উনি নির্ভরযোগ্য।—(তাহজিবুত তাহজিব; ০৯/১১০৪৮,
আসমাউর রেজাল।)

হযরত মুকদার রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা বুখারী শারীফে ৩০টি এবং মুসলিম শারীফে ২২টি।

ঘ) আর মূল বর্ণনাকারী হলেন হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, যিনি একজন সুপ্রসিদ্ধ সাহাবী (রাঃ)। বুখারী ও মুসলিম শরীফে ওনার থেকে বর্ণিত অসংখ্য হাদিস আছে। 

দেখা যাচ্ছে যে, হাদিসটির সকল রাবীই নির্ভরযোগ্য এবং ওনাদের সূত্রে বোখারী ও মুসলিম শরীফেও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত আছে; সুতরাং এ কথাটি বলার এখন আর কোন অপেক্ষা রাখে না, দ্বিধাহীন ভাবেই বলা যায়— ইমাম বুখারী ও মুসলিম-এর সংজ্ঞা ও শর্তানুসারে হাদীসটি সহীহ্। পরিশেষে একটি প্রশ্ন— আমরা কি পূর্ববর্তী জামানার বিশ্ববিখ্যাত মোহাদ্দেসদের বিশ্বাস করবো, না কি শেষ জামানার দুনিয়াবি সুযোগ-সুবিধা নেয়া ঘড়ি মেকার নাসিরুদ্দিন আলবানী আর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরকে বিশ্বাস করবো??

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
২২ জুন, ২০২১.

বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন, ২০২১

দুই পূর্ব দুই পশ্চিমের ব্যাখ্যা :


'রাব্বুল মাশরিকাঈনি ওয়া রাব্বুল মাগরিবাঈন' নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে পবিত্র কুর'আনুল কারীমে এ ধরণের বেশ কিছু আয়াতের মুখামুখি হয়েছি; যেমন— '……রাব্বিল মাশরিকি ওয়াল মাগরিবি……' —(সুরা মুজাম্মেল : ৯), 'রাব্বুল মাশরিকাঈনি ওয়া রাব্বুল মাগরিবাঈন।' (সুরা আর রহমান : ১৭), ' ……বিরাব্বিল মাশরিকি ওয়াল মাগরিবি……' —(সুরা মা’আরিজ : ৪০)........। এমন সবগুলো আয়াত নিয়ে আলোচনা করতে গেলে লেখা বিশাল হয়ে যাবে। তাই আজ শুধুমাত্র 'রাব্বুল মাশরিকাঈনি ওয়া রাব্বুল মাগরিবাঈন' নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চেষ্টা করবো। 

'জ্ঞানার্জন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরয।'—(ইবনে মাজাহ : ১ম খণ্ড - ২২৪) আরেকটি প্রসিদ্ধ হাদিস— 'দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণ কর।' পবিত্র কুর'আনুল কারীমে 'তারা কি চিন্তা করে না', 'তারা কি গবেষণা করে না', 'তোমরা কি বোঝ না', 'তারা কি লক্ষ্য করে নাَ', 'তারা কি (সৃষ্টি প্রক্রিয়া) অবলোকন করে না?' এমনতর অসংখ্য বাক্য ব্যবহার করে মহান রাব্বুল আলামীন মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি- বিবেচনা ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর এতেই প্রমাণ হয়— জ্ঞানার্জন ছাড়া কখনই মুসলমান হওয়া যাবে না; ঈমানদার মু'মিন হওয়ার পথ তো বহু দূরের।

তাছাড়া মহাগ্রন্থ কুর'আনুল কারীম বুঝতে হলে অবশ্যই কিছু বিশেষ জ্ঞানের দরকার; যা সাধনার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। অন্যথায় গোমড়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শুধুমাত্র শাব্দিক অর্থ দিয়ে কুর'আন বুঝা যাবে না, অবশ্যই হিকমা অবলম্বন করে আয়াতের অভ্যন্তরীণ তাৎপর্য বুঝতে হবে।  সূর্য, সূর্যের উদয়স্থল এবং সূর্যের অস্তাচল নিয়ে পবিত্র কুর'আনুল কারীমায় অসংখ্য আয়াত রয়েছে; এদের কোনটা একবচনে, কোনটা দ্বি-বচনে, আবার কোনটা বহু-বচনে ব্যবহৃত। এসব বুঝতে হলে অবশ্যই খেয়াল বা দৃষ্টি প্রখর করতে হবে এবং ব্যাকারণ জ্ঞানও রাখতে হবে। 

 'উদয়াচল' এবং 'অস্তাচল' বলতে আসলে বুঝানো হয়েছে— সূর্য/নক্ষত্রের উদিত হওয়ার এবং অস্ত যাওয়ার স্থান; সেই অর্থে সুরা আর-রহমানে ব্যবহৃত 'মাশরিকাঈন'  ও 'মাগরিবাঈন' শব্দদ্বয় পুরোপুরি অর্থব্যঞ্জক। কি করে? আরবি ব্যাকরণে 'মাশরিক' ও 'মাগরিব' ব্যবহৃত হয় এক বচনে, 'মাশরিকাঈন' ও 'মাগরিবাঈন' ব্যবহৃত হয় দ্বি-বচন/ দুই বচনে, আর 'মাশরিকি'ও 'মাগরিবি' ব্যবহৃত হয় বহু বচনের ক্ষেত্রে; সুতরাং, উক্ত আয়াত দ্বারা  আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা  বলেছেন, 'তিনিই দুই উদয়াচল আর দুই অস্তাচলের মালিক'। 

'দুই উদয়াচল আর দুই অস্তাচল' কি করে সম্ভব? তা হলে কুর'আন কি অবৈজ্ঞানিক? মোটেও না। স্বনামধন্য মুসলিম মনীষীদের তাফসীরের উদ্ধৃত তুলে ধরার আগে আমি আপনাদের বিবেকের কাছে অতি সাধারণ কিছু প্রশ্ন করছি। আপনার কি কখনো মনে হয়নি দুনিয়াতে প্রতিদিন প্রতি ক্ষণে  দুইটা উদয়াচল দুইটা অস্তাচল হয় হচ্ছে? যদি না মনে হয়ে থাকেন, সমস্যা নেই, এখন একটু মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করুন, ঢাকায় যখন সকাল হয় ঠিক সেই ক্ষণেই পৃথিবীর অন্য আরেক প্রান্তে কি সন্ধ্যা হয় না? আমাদের সকাল হয় যে সময়ে মক্কায় কি সকাল সেই একই সময়ে হয়? এতেই তো বুঝা যায় দুই উদয়াচল আর দুই অস্তাচলের কনসেপ্ট সঠিক। আমার গবেষণা, উক্ত আয়াতের দ্বারা পৃথিবীর পর্যায়ক্রমিক দুই সকাল দুই সন্ধ্যার কথা বলা হয়েছে। এমন করে  মিলাতে চেষ্টা করলে দেখবেন পবিত্র কুর'আনুল কারীমের কোন আয়াতই বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে যায় না।

পদার্থবিজ্ঞানে শক্তির নিত্যতা সূত্র বলে যে, বিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ ধ্রুবক; শক্তি অবিনশ্বর, শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই, করা যায় না। এক রূপ থেকে শক্তিকে কেবলমাত্র অন্য রূপে রূপান্তরিত করা যায়; যেমন— একটি ডিনামাইট-এর বিস্ফোরণের ফলে রাসায়নিক শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় | যারা সত্যিকারার্থে বিজ্ঞান বুঝে না, তাদের জন্য শক্তির নিত্যতার সূত্রটা ভালো করে বুঝতে চেষ্টা করাটাই যথেষ্ট; এতেই বিজ্ঞানের অনেক কিছু ক্লিয়ার হয়ে যাবে। সারে চৌদ্দশ বছর আগে পবিত্র কুর'আনুল কারীম ঘোষণা দিয়েছে 'সূর্য পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্র তার নিজ অক্ষে আবর্তনমান'। বিজ্ঞান বলে, কোন বস্তু আবর্তন করে যদি বস্তুটি গোলাকার হয় এবং সেই বস্তুর শক্তি নিত্য হয়। আমরা জানি, পৃথিবী সূর্য বা যে কোন গ্রহ নক্ষত্রের আকৃতি গোলাকার। তাই প্রতিটি গ্রহ নক্ষত্রই অনবরত নিজ অক্ষে আবর্তনমান। আর আবর্তনমান সকল বস্তুতে পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া বিদ্যমান। সূর্যের আলো ঠিক এই মূহুর্তে পৃথিবীর যে অংশে পড়ছে, একটু পরেই তা আর সেখানে থাকবে না, সরে যাবে; আমেরিকায় এখন রাত, আমাদের এখন দিন। তাই বলা যায়, প্রতি মূহুর্তেই পৃথিবীতে উদয়াচল ও অস্তাচল ঘটছে; যা যুগপৎ ঘটনা। এ কি দুই উদয়াচল দুই অস্তাচল নয়? 

বিজ্ঞান বলে সূর্য ৩৬০ দিন ৩৬০টি রেখায় চলে, আর তার এ চলার প্রতিটি রেখা স্বাতন্ত্র্য; ফলে প্রতিক্ষণেই সূর্যের উদয়াচল ও অস্তাচলের পরির্বতন ঘটছে। গোলাকার পৃথিবীর সব অংশে কখনো কি এক সাথে রাত দিন হচ্ছে, না হওয়া সম্ভব? আামাদের এখানে যখন সকাল, আমেরিকায় তখন রাত; একই সময়ে দু স্থানে দুই রকম অবস্থা বিরাজমান; এটি একটি যুগপৎ ঘটনা, যা দিনে দুই দুই বার ঘটছে। পৃথিবীর এক স্থানে যখন সকাল, ঠিক সেইক্ষণেই পাশের আরেক অংশে ভোর হতে অনেক দেরি। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়— দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলে আয়াত শতভাগ সত্য ও বৈজ্ঞানিক। যারা ভাবেন অনেক বিষয়ে বিজ্ঞানের সাথে কোর'আনের বর্ণনা মেলে না বা যায় না; তাদের বলছি— আপনি আমার একটি স্পষ্ট কথা আজ শুনে যান— বিজ্ঞান সৃষ্টি করেছে কোর'আন, আর বিজ্ঞানী সৃষ্টি করেছে যে তাঁর বাণী হলো কোর'আন। বিজ্ঞান আলাদা কোন কিছু নয়, কোর'আনের অতি ক্ষুদ্র একটি নির্যাস।

বিজ্ঞান কি? ভৌত বিশ্বের যা কিছু পর্যবেক্ষণযোগ্য, পরীক্ষণযোগ্য ও যাচাইযোগ্য, তার সুশৃঙ্খল, নিয়মতান্ত্রিক গবেষণা ও সেই গবেষণালব্ধ জ্ঞানভাণ্ডারের নাম বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের ইংরেজি শব্দ Science মূলত ল্যাটিন Scientia থেকে এসেছে, যার মানে Knowledge, অর্থাৎ জ্ঞান। বিজ্ঞান-এর অর্থ বিশেষ জ্ঞান। ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ফলে কোন বিষয়ে প্রাপ্ত ব্যাপক ও বিশেষ জ্ঞানের সাথে জড়িত ব্যক্তি বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানবিদ কিংবা বৈজ্ঞানিক নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীরা বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে জ্ঞান অর্জন করেন এবং প্রকৃতি ও সমাজের নানা মৌলিক বিধি ও সাধারণ সত্য আবিষ্কারের চেষ্টা করেন। বর্তমান বিশ্ব এবং এর প্রগতি নিয়ন্ত্রিত হয় বিজ্ঞানের মাধ্যমে; তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যাপক অর্থে যে কোনো জ্ঞানের পদ্ধতিগত বিশ্লেষণকে বিজ্ঞান বলা হয়।

জ্ঞানের পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ না জেনে আজকাল তথাকথিত কিছু আলেম কোর'আন-হাদিসের সাথে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করতে গিয়ে এমন সব আবোলতাবোল কথা বলছেন যার কোন মাথামুণ্ডু নেই। আর এর খেসারত শুনতে হচ্ছে আমাদের; পুরো মুসলমান জাতিকে তারা হাসির পাত্র বানাচ্ছে! বিজ্ঞানের সাথে কম্পেয়ার বা তুলনা করে যারা পবিত্র কুর'আনুল কারীমের আয়াত বা হাদিসের ব্যাখ্যা করেন, তাদের অবশ্যই জানা ও বুঝা উচিত— বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা করতে গেলে অবশ্যই আগে আপনাকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে; নয়তো কাজী ইব্রাহীমের মতো হাসির পাত্র হতে হবে। অবশ্য ইদানীং লক্ষ্য করছি আমাদের দেশের বেশকিছু তরুণ আলেমে-দ্বীন বেশ গুছিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়াজ-নসীহত করছেন; এটা শুভ লক্ষ্মণ, খুবই ভালো। 

বিজ্ঞান না জানা এবং গবেষণাবিহীন অনভিজ্ঞ আলেমদের বিজ্ঞানভিত্তিক মিথ্যা ওয়াজ শুনে আজকাল অনেক মুসলমানের মনেই প্রশ্ন জাগে— কোর'আন-হাদিস সত্য, নাকি বিজ্ঞান সত্য? পবিত্র কুর'আনুল কারীম ও হাদিসের একজন সাধারণ অনুসারী এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের একজন শিক্ষক-গবেষক হিসেবে আমি আবিষ্কার করেছি— বিজ্ঞানের প্রতিটি সীদ্ধান্ত ক্ষণস্থায়ী, অস্থির, সাময়িক ও পরিবর্তনশীল; আর পবিত্র কুর'আনুল কারীম ও হাদিসের প্রতিটি বর্ণ-শব্দ-বাক্য চিরস্থায়ী, শ্বাশত, স্থির ও চিরসত্য। অতএব বিজ্ঞান দিয়ে একজন মুসলমানকে কোর'আন হাদিস  বুঝতে হবে না বুঝাতে হবে না, কোর'আন হাদিস দিয়ে বিজ্ঞান বুঝতে হবে বুঝাতে হবে। আপনারা যদি তা করতে পারেন, আমি নিশ্চিত— আবারও পৃথিবী মুসলমানদের পদানত হবে।

সূর্য ঘুরে না পৃথিবী ঘুরে? এ বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক মতানৈক ছিল; যেমন— একসময় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করতেন মহাবিশ্বের সব কিছুই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, অর্থাৎ পৃথিবী স্থির। এ ধারণাটি পরবর্তী বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে ভুল বলে প্রমাণিত হয়। পোল্যান্ডের জ্যোতিবিজ্ঞানী কোপানিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩) প্রথম বলেন— পৃথিবী সূর্যের চতুর্দিকে ঘুরে; কিন্তু তখনকার মানুষ  তার এ কথাটি বিশ্বাস করেনি। পরবর্তীযুগে বিজ্ঞানী নিউটন এসে যখন আবিস্কার করলেন— পৃথিবী সূর্যের চতুর্দিকে ঘুরে এবং পক্ষান্তরে সূর্যও তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরে; সূর্য কেন্দ্রিক এই মডেলটিই বর্তমানে প্রমানিত এবং বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষ এ কথাটি গ্রহনও করে নিয়েছে। এ থিওরীও  হয়তো একদিন পালটে যাবে, যেমন করে চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদের তত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তাই বলি কি— ক্ষণস্থায়ী বিজ্ঞান নিয়ে এতো বাড়াবাড়ি করার কিছু নেই; অস্থায়ী পৃথিবীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য শুধু জানতে ও বুঝতে হবে।

সাড়ে ১৪শত বছর আগে কোর'আন যা বলেছে বিজ্ঞান আজ তার কিয়দংশ মাত্র প্রমাণ করেছে; চন্দ্র, সূর্য ওপৃথিবীসহ মহাবিশ্বের প্রতিটি গ্রহ-নক্ষত্র-উপগ্রহই নিজ নিজ কক্ষপথে আবর্তনমান; সুরা আম্বিয়ার ৩৩ নং আয়াত— 'এবং তিনিই দিবা-নিশি এবং চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করেছেন। সবাই আপন আপন কক্ষ পথে বিচরণ করে।'  এ আয়াত বুঝাতে গিয়ে সেই সময় হুজুর পাক (সাঃ)-এর চাচাতো ভাই ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছিলেন, 'লাটিম যেমন তার কেন্দ্র বিন্দুর চার দিকে ঘুরতে থাকে, সূর্যও তেমনিভাবে ঘুরে।' এখন বুঝুন জ্ঞানী মুসলমানরা কতটা বুদ্ধিদীপ্ত ছিলেন।  

সুরা ইয়াসীনের ৩৮-৪০ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত বলেন, 'সূর্য তার নির্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটা, পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ। চন্দ্রের জন্যে আমি বিভিন্ন মনযিল নির্ধারিত করেছি। অবশেষে সে পুরাতন খর্জুর শাখার অনুরূপ হয়ে যায়। সূর্যের পক্ষে চন্দ্রকে নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। রাতের পক্ষেও দিনের অগ্রবতী হওয়া সম্ভব নয়। প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে।' সুরা যুমারের  ৫ নং আয়াতে রাব্বুল ইজ্জত বলেন, 'তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন। প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত জেনে রাখুন, তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।' এসব আয়াতে যে পৃথিবী ঘুর্নায়মানের ইঙ্গিত রয়েছে তা নিশ্চিত। সুতরাং পৃথিবীর ঘুর্নায়মান হওয়াটাই স্বাভাবিক। 

'রাব্বুল মাশরিকাঈনি ওয়া রাব্বুল মাগরিবাঈন' নিয়ে 'আল-কুরআনুল করীম', ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ— 'তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই অস্তাচলের নিয়ন্তা।' প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান সাহেবের অনুবাদও প্রায় একই রকম— 'তিনিই দুই উদয়াচল ও দুই আস্তাচলের নিয়ন্ত্রণকারী।' ইসরাইলী চক্রান্তের ফসল গুগল প্লে-স্টোরের মোবাইল অ্যাপের অনুবাদগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করুন; সেসবে দেখতে পাবেন কত ভিন্ন ওদের অনুবাদ। আমি যেটা পেলাম সেখানে  অনুবাদ করা আছে— 'তিনি দুই পূর্ব ও দুই পশ্চিমের রব।'  বর্তমান যুগের শর্টকাটে জান্নাত পাওয়ার প্রত্যাশা করা মুসলমানরাই এসব অনুবাদ ডাউনলোড করে। তারা হার্ডকপি কিনতে চায় না; গুগল প্লে-স্টোরের এইসব  মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করেই কোর'আন বুঝতে চায় জানতে চায়, বিজ্ঞ সাজতে চায়। আর এতেই ঘটছে যত বিপত্তি। তথাকথিত ইমামসাব মুফতিসাব মাওলানা সাবরা বুঝতেও পারে না এসব বিভ্রান্ত অর্থ বয়ান করে মুসলিম সমাজকে তারা কতটা ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। সমাজের সবখানে আজ এসব নিয়ে তর্কাতর্কি বিতর্ক চলছে, দুই লাইন পড়েই আবার কেউ কেউ চেহারা আর কণ্ঠকে পুঁজি করে মুফতীসাব/পীরসাব সাজছে, এবং দেদারছে লোক ঠকাচ্ছে। 

ইসরাইলী চক্রান্তের এ'সব ভ্রান্ত অর্থ পড়ে পড়ে নিজেরা তো গোমড়া হচ্ছেই, বলদরা বলদার মতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে আবার অন্যকেও ও'সব শোনাচ্ছে এবং পথভ্রষ্ট করছে। তাই, উপদেশ দেবো বাংলা অনুবাদের ইসলামিক কিতাব কিনতে বা পবিত্র কুর'আনুল কারীমের বাংলা অনুবাদ পড়তে অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এবং সচেতন হতে হবে। উপদেশ দেবো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ কেনা ও পড়ার জন্য; অথবা যাচাই-বাছাই করে সঠিক অনুবাদ কিনুন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা বাংলা একাডেমির অনুবাদকে আমি  প্রেফারেন্স করি, কারণ ওখানে অনুবাদকদের একটা বোর্ড থাকে।

যাই হউক, উক্ত আয়াতের তাফসিরে তাফসীরে মাযহারীতে কাযী সানাউল্লাহ পানিপথী (র) লিখেছেন, এখানে 'দুই উদয়স্থল' ও 'দুই অস্তস্থল' অর্থ গ্রীষ্ম ও শীতকালে সূর্যের পৃথক পৃথক উদয়স্থল ও অন্তস্থল। তাফসীরে তাবারী ও ইবনে কাসির-এ প্রায় একই ধরনের বিষয়  উল্লেখ্য— গ্রীষ্ম ও শীতকালে সূর্যের উদয়াচল এবং অস্তাচল পরিবর্তিত হয়। আলোচ্য আয়াতে 'মাশরিকাঈনি বলে এই শীত ও গ্রীষ্মের দুই উদয়াচল এবং মাগরিবাঈন বলে শীত ও গ্রীষ্মের দুই অস্তাচলকে বুঝানো হয়েছে। এখানে দ্বিবচন দ্বারা বহুবচন উদ্দেশ্য; যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি শপথ করছি উদয়াচল সমূহের ও অস্তাচল সমূহের প্রতিপালকের (মা'আরজি ৭০/৪০)। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত অন্যত্র বলেন, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর পালনকর্তা এবং পালনকর্তা উদয়াচল সমূহের (সাফফাত ৩৭/৫)। এসব আয়াতসমূহে আসলে সৌর বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস বর্ণিত হয়েছে। 

২০১১ সালে নাসা মহাকাশে এমন একটি গ্রহ আবিষ্কার করেছে যা দুটি সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে; সেখানে একই দিনে দুই সূর্যোদয় এবং দুই সূর্যাস্ত একটি গতানুগতিক বিষয়। নাসা জানিয়েছে, দূরবীক্ষণ যন্ত্র কেপলারের সহায়তায় পৃথিবী থেকে ২০০ আলোকবর্ষ দূরে কেপলার-১৬বি নামের এরূপ একটি গ্রহ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে; খোদ বিজ্ঞানী মহলের কাছে এটি একটি চমকপ্রদ বিষয়। শনি গ্রহের মতোই বিশাল শীতল এই গ্যাসীয় গ্রহটির দুটি সূর্য আমাদের সূর্যের চেয়ে ৬৯ ও ২০ শতাংশ ছোট ও তুলনামূলকভাবে শীতল। তাই কেপলার- ১৬বি এর ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা -৭৩ এবং -১০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি ২২৯ দিনে একবার দুই সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এখন একবার চিন্তা করে দেখুন আল্লাহর পুরো রাজত্ব 'সামাওয়াতি ওয়াল আর্দ' কতটা বিশাল। এই বিশাল সাম্রাজ্যের কতটা খবর আপনি রাখেন? 

কুর'আনুল কারীমের সঠিক বুঝ না থাকায় আজকের মুসলিম সমাজের অনেকেই বিজ্ঞানকে প্রাধান্য দেয়! অথচ বিজ্ঞান হলো নাম্বার 7 (সাত)-এর অসংখ্য  নির্যাসের মাত্র একটি। আল্লাহর বিশাল রাজত্বে সৌরজগত পরের কথা, সংখ্যা তত্ত্বের ছোট্ট একটি মৌলিক সদস্য 7 (সাত)-এর রহস্যই এখনো পর্যন্ত মানুষ বেধ করতে পারেনি, মহাকাশের দ্বার উন্মোচন— সে তো বহু দূর! 

তবে, এরই মাঝে ১১৮টি  মৌলিক পদার্থ আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা; যার মধ্যে ৯৮টি প্রকৃতিতে পাওয়া যায়, বাকী ২০টি কৃত্রিম উপায়ে তৈরী করা হয়েছে।  বিজ্ঞান এগিয়ে গেছে, যাচ্ছে;  হয়তো নতুন আরও অনেক কিছু আবিষ্কার করবে; ধাপে ধাপে মানুষ হয়তো রহস্যের অনেক দ্বারই উন্মোচন করবে। কিন্তু তা-ই-বা কতটুকু? নিশ্চয়  স্রষ্টার রাজত্বের এক কানাকড়িও নয়।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
১৪ জুন, ২০২১.

রবিবার, ৩০ মে, ২০২১

ভূমিকম্প:


ফের ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো সিলেট, খবরে জানানো হচ্ছে দুটো বাড়ি হেলে পড়েছে; গতকাল লাগাতারের পর আজও পর পর তিনবার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে গোটা সিলেট। বাংলাদেশের জন্য সিলেট বরাবরই একটি ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা; ওখানে ভূমিকম্প অনুভব হওয়া কিছুটা স্বাভাবিক ব্যাপারই। জাপানের বিভিন্ন শহরে এবং আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় প্রতি দিনই কয়েকবার করে ভূমিকম্প হচ্ছে; ওখানে এটা নাগরিক জীবনের খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। এ নিয়ে ওরা এতটুকুও চিন্তিত নয়, শুধু আর্থকোয়েক সক্ষমতা সম্পন্ন বাড়ি-ঘর/স্থাপনা নির্মাণ করে তারা বসবাস করছে। আর্থকোয়েক নিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার কিছু নেই; শুধু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

ভূমিকম্প আসলে কি? বিজ্ঞান কি বলে ভূমিকম্প নিয়ে?— ভূতত্ত্ববিজ্ঞান বলে, ভূ-অভ্যন্তরে শিলায় পীড়নের জন্য যে শক্তির সঞ্চয় ঘটে, সেই শক্তির হঠাৎ মুক্তি ঘটলে ভূপৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয়; এমন আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প (Earthquake) বলে। সাধারণত তিনটি কারণে ভূমিকম্পের উত্পত্তি ঘটে— ভূপৃষ্ঠজনিত, আগ্নেয়গিরিজনিত ও শিলাচ্যুতিজনিত কারণে; অর্থাৎ  ভূমিকম্পনের কারণ—ভূ-পৃষ্ঠের হঠাৎ পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরি সংঘটিত হওয়া ও ভূ-অভ্যন্তরে শিলাচ্যুতি। 

ইসলাম কি বলে? ভূমিকম্প নিয়ে পবিত্র কুর'আনুল কারীমে 'যিলযাল' নামে পূর্ণাঙ্গ একটি সুরা আছে। তাছাড়া প্রাকৃতিক দূর্যোগের উপর পবিত্র কুর'আনুল কারীমে অসংখ্য আয়াত আছে; যেমন— মহান রাব্বুল আলামীন বলেন, 'আমি ভয় দেখানোর জন্যই (তাদের কাছে আজাবের) নিদর্শনগুলো পাঠাই।' —(সুরা বনি ইসরাইল; ৫৯) তিনি আরও বলেন, 'বলে দাও, আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে অথবা তোমাদের পায়ের নিচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম।' —(সুরা আনআম; ৬৫) জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, 'যখন তোমাদের পায়ের নিচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম' আয়াতটি নাজিল হলো, তখন রাসুল (সা.) বললেন, 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।' —(বুখারি)

মহান রাব্বুল আলামীন বলেন  'যে বিপদ-আপদই তোমাদের উপর আসুক না কেন, তা হচ্ছে তোমাদের নিজেদের হাতের কামাই। আর আল্লাহ তোমাদের অনেক (অপরাধ) ক্ষমা করে দেন।' —(সুরা শুরা : ৩০) প্রকৃতপক্ষে প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলাম আমরা, অর্থাৎ মানুষ, মানুষের অপকর্ম। আর মানুষের অপকর্মের ধারাবাহিকতায়ই একদিন কিয়ামত নেমে আসবে; পৃথিবী সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে । এ প্রসঙ্গে আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী হুজুর পাক (সা.) বলেন, 'যখন অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হবে। কাউকে বিশ্বাস করে সম্পদ গচ্ছিত রাখা হবে, কিন্তু তা আত্মসাত করা হবে (অর্থাৎ যার সম্পদ সে আর ফেরত পাবে না)। জাকাত দেখা হবে জরিমানা হিসেবে। ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া বিদ্যা অর্জন করা হবে, একজন পুরুষ তার স্ত্রীর বাধ্যগত হয়ে মায়ের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করবে। বন্ধুকে কাছে টেনে নেবে, আর পিতাকে দূরে সরিয়ে দেবে। মসজিদে উচ্চস্বরে শোরগোল (কথাবার্ত) হবে। যখন সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিটি সমাজের শাসক রূপে আবির্ভূত হবে। সে সময় তোমরা অপেক্ষা করো— রক্তিম বর্ণের ঝড়ের (এসিড বৃষ্টি), ভূকম্পনের, ভূমিধসের, রূপ বিকৃতির (লিঙ্গ পরিবর্তন), পাথর বৃষ্টির এবং সুতো ছেঁড়া (তাসবিহ) দানার ন্যায় একটির পর একটি নিদর্শনগুলোর জন্য।' —(তিরমিজি; ১৪৪৭)

ভূমিকম্প আসলে কেয়ামতের অন্যতম আলামতের একটি; এ ব্যাপারে হুজুর পাক (সাঃ) এক দীর্ঘ হাদিসে বলেছেন, 'যে পর্যন্ত না ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং খুনখারাবি বাড়বে, তোমাদের সম্পদ এতো বাড়বে যে, উপচে পড়বে।..........' —(বোখারি; ৯৭৯)

করোনা ঘূর্ণিঝড় ভূমিকম্পসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দূর্যোগ একের পর এক ধেয়ে আসছে, বিধস্ত করে দিয়েছে মানুষের  জীবনের গতি; তারপরও আমাদের হুশ হচ্ছে না! সবার উচিত মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের কাছে অতি দ্রুত লুটিয়ে পড়া, তাওবা করা; মহান রাব্বুল ইজ্জত-কে বেশি বেশি স্মরণ করা এবং ক্ষণে ক্ষণে ক্ষমা প্রার্থনা করা। কালক্ষেপণ না করে নিজেদের শুধরে নেওয়া এবং একমাত্র রব-এর কাছে নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় চাওয়া।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
৩০ মে, ২০২১.

শনিবার, ১ মে, ২০২১

আলোর দীপাধার:


কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো।
বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো।
              রয়েছে দীপ না আছে শিখা,
              এই কি ভালে ছিল রে লিখা--
ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালো।
বিরহানলে প্রদীপখানি জ্বালো।

আলো নিয়ে মানুষের অনুসন্ধিৎসা চিরকালের; কত কি চিন্তা, কত কি সে কবিতা— যার কোন অন্ত ছিল না এবং নেই। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আলো হলো এক ধরনের শক্তি বা বাহ্যিক কারণ, যা চোখে প্রবেশ করে দর্শনের অনুভূতি জাগায়; বস্তুকে দৃশ্যমান করে, কিন্তু নিজে অদৃশ্য। আলোকে আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু যে কোন আলোকিত বস্তুকে সহজেই দেখতে পাই; যদি চোখে জ্যোতি থাকে। প্রকৃতপক্ষে আলো হলো এক ধরনের বিকীর্ণ শক্তি, যা তরঙ্গ হিসেবে প্রস্ফুটিত; তির্যক তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের আকারে আলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করতে পারে, মাধ্যমভেদে যার বেগের পরিবর্তন হয়। বৈজ্ঞানিক সত্য— মাধ্যম ভেদে আলোর বেগ মাধ্যমের ঘনত্বের ব্যস্তানুপাতিক। শুন্য মাধ্যমে আলোর বেগ সবচেয়ে বেশি, কিন্তু অসীম নয়; শূন্যস্থানে আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে ২৯,৯৭,৯২,৪৫৪ মিটার বা ১,৮৬,০০০ মাইল। আলোর গতিকে কোন ভাবেই স্পর্শ করা যায় না, সম্ভব নয়। তাছাড়া আলোর কোনো আপেক্ষিক বেগ নেই; এ বেগ সর্বদাই সমান। 

আলো আসলে কি? আমরা যা দেখি সেই দৃশ্যমান আলো মূলতঃ তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালির ছোট একটি অংশ মাত্র। সাদা আলো সাতটি রঙের মিশ্রণ, প্রিজম এর দ্বারা আলোকে বিভিন্ন রঙে (৭ রঙ) আলাদা করা যায়; যা আমরা রামধনু হিসেবেি দেখতে পাই। আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরন, আপবর্তন, ব্যাতিচার ইত্যাদি  হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো আলোর একই সাথে কণা ধর্ম ও তরঙ্গ ধর্ম বিদ্যমান। দীপ্তমান বস্তু থেকে আলো কীভাবে আমাদের চোখে আসে তা ব্যাখ্যার জন্য বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত চারটি তত্ত্ব প্রদান করেছেন— 
১). স্যার আইজ্যাক নিউটনের Corpuscular Theory বা কণা তত্ত্ব; 
২). বিজ্ঞানী হাইগেনের Wave Theory বা  তরঙ্গ তত্ত্ব; 
৩). ম্যাক্সওয়েলের Electromagnetic Theory বা তড়িতচৌম্বক তত্ত্ব; 
এবং 
৪). ম্যাক্স প্লাঙ্কের  Quantum Theory বা কোয়ান্টাম তত্ত্ব। কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে ১৯০৫ সালে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন আলোর ঘটনার একটি  বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করান, যার স্বীকৃতি স্বরুপ ১৯২১ সালে তিনি বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারও পান। 

পৃথিবীর পৃষ্ঠতলের আলোর এবং সকল শক্তির মূল উৎস হলো  সূর্য; সৌর ধ্রুবক নামে একটি পদের ব্যবহারই এই উৎসের প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে। সূর্যের দিকে সরাসরি মুখ করে থাকা পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রতি একক ক্ষেত্রফলের উপর সূর্য প্রদত্ত শক্তির পরিমাণকে সৌর ধ্রুবক বলে; এর আপাত মান হচ্ছে ১,৩৭০ ওয়াট/বর্গমিটার। এই মানটি সূর্য থেকে এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক দূরত্বে অবস্থানকারী যে কোন বস্তুর পৃষ্ঠের জন্য প্রযোজ্য। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বকেই এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দূরত্ব বলা হয়। পৃথিবীতে এতোটা শক্তি পৌঁছালেও তার পুরোটা পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠে পৌঁছে না। যখন আবহাওয়া সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে এবং সূর্য সর্বোচ্চ বিন্দুতে থাকে তখন ভূ-পৃষ্ঠে সরাসরি পতিত সৌর শক্তির পরিমাণ হয় প্রায় ১,০০০ ওয়াট/বর্গমিটার। এই শক্তিকে কাজে লাগানোর অনেকগুলো প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম উপায় আছে। উদ্ভিদ এই শক্তি ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া চালু রাখে, যা থেকে প্রাপ্ত শক্তি তারা রাসায়নিক শক্তি অক্সিজেন ও স্বল্প পরিমাণ কার্বন যৌগে পরিণত করে। আবার কৃত্রিমভাবে সৌর শক্তির মাধ্যমে সরাসরি উত্তপ্ত করে বা সৌর কোষ জাতীয় বৈদ্যুতিক পরিবর্তকের মাধ্যমে সৌর শক্তিকে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করে, যা আমাদের অনেক কাজে লাগে। পেট্রোলিয়ামসহ অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানীতে যে শক্তি নিহিত থাকে তা-ও উদ্ভিদ সৌর শক্তি থেকে লাভ করে। সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত শক্তিই নানাভাবে পরিবর্তীত হয়ে এ ধরনের জ্বালানীর দাহিকাশক্তির যোগান দেয়। তাছাড়া সূর্যের আলোর বেশ কিছু চমৎকার জীববৈজ্ঞানিক ধর্ম রয়েছে।

সৌর আলোর লুমেন ও ওয়াটের মধ্যে যে অনুপাত তা ভাল মানের প্রতিপ্রভ আলোর সাথে তুলনীয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায় সূর্য যে আলো দেয় তা তার উত্তপ্ত করার ক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং প্রদত্ত এই আলোর পরিমাণ বিপুল। এ থেকেই গ্রীষ্মকালে গৃহাভ্যন্তরের আলোকসজ্জার জন্য সূর্যের আলোর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়। কারণ এটি যত না উত্তপ্ত করে তার চেয়ে বেশি আলোকিত করে, আর গ্রীষ্মকালে উত্তাপ কমানো প্রয়োজন। অবশ্য সূর্যের আলোও কিছু উত্তাপ ছড়ায়। কিন্তু বৈদ্যুতিক বাতি একদিকে বেশি উত্তাপ তো ছড়ায়ই, আবার বিদ্যুৎও ব্যবহার করে। সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির কিছু প্রতিষেধক গুণ রয়েছে যা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্তকরণে কাজে লাগে। সূর্যের আলোতে ভিটামিন ডি তৈরি করে যা মানব শরীরের জন্য উপকারী। 

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আলোর প্রধান উৎস এই রবি বা সূর্য হলো আমাদের এই সৌরজগতের প্রধান নক্ষত্র; সকল শক্তির উৎস। লক্ষ তারার মাঝে প্রায় আদর্শ গোলক আকৃতির সূর্য নামের এই তারাটি প্রধানত প্লাজমা তথা আয়নিত পদার্থ দিয়ে গঠিত, যার মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে চৌম্বক ক্ষেত্র। এর ব্যাস প্রায় ১৩ লক্ষ ৯২ হাজার কিলোমিটার; যা পৃথিবীর ব্যাসের ১০৯ গুণ বেশি। আর ভর প্রায় ২×১০৩০ কিলোগ্রাম, তথা পৃথিবীর ভরের ৩ লক্ষ ৩০ হাজার গুণ বেশি; এই ভর সৌরজগতের মোট ভরের শতকরা ৯৯.৮৬ ভাগ। সূর্যের প্রধান গাঠনিক উপাদান হলো হাইড্রোজেন; মোট ভরের তিন চতুর্থাংশই হাইড্রোজেন। হাইড্রোজেনের পরেই সবচেয়ে প্রাচুর্য্যময় মৌলটি হলো হিলিয়াম। হিলিয়ামের চেয়ে ভারী মৌল সূর্যের মাত্র ১.৬৯% ভরের জন্য দায়ী; তারপরও এদের সম্মিলিত ভর পৃথিবীর ভরের ৫,৬২৮ গুণ। এই ভারী মৌলগুলোর মধ্যে রয়েছে অক্সিজেন, কার্বন, নিয়ন, লোহা ইত্যাদি।

সূর্যও একটি তারা; তারার শ্রেণীবিন্যাস করার একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে, সেই অনুসারে সূর্য জিটুভি (G2V) শ্রেণীর মধ্যে পড়ে। অনেক সময় একে হলদে বামন বলেও ডাকা হয়; কারণ তার তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি বর্ণালীর হলুদ-সবুজ অংশে। সূর্যের রঙ সাদা হলেও ভূপৃষ্ঠ থেকে একে হলুদ দেখাতে পারে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নীল আলোর বিচ্ছুরণের কারণে। বর্ণালী ধরন 'জিটু' বলে দেয় সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা আনুমানিক ৫৭৭৮ কেলভিন বা ৫৫০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস; আর 'ভি' দিয়ে বুঝায় আকাশগঙ্গার অধিকাংশ তারার মত সূর্যও একটি প্রধান ধারার তারা; অর্থাৎ যার কেন্দ্রভাগে নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে অবিরাম হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম উৎপাদন করে যাচ্ছে। কেন্দ্রে সূর্য প্রতি সেকেন্ডে ৬২ কোটি মেট্রিক টন হাইড্রোজেন পোড়ায়। 

আগের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যকে অনুজ্জ্বল ও বেশ তাৎপর্যহীন একটি তারা মনে করতেন, কিন্তু  বর্তমান বিজ্ঞান থেকে জানা যাচ্ছে আকাশগঙ্গার শতকরা ৮৫ ভাগ তারার চেয়ে সূর্যের উজ্জ্বলতা বেশি; প্রকৃতপক্ষে আকাশগঙ্গার অধিকাংশ তারাই লোহিত বামন। সূর্যের পরম মান +৪.৮৩; কিন্তু পৃথিবীর খুব কাছে হওয়ার কারণে আকাশে একে অন্য যেকোন বস্তুর চেয়ে অনেক উজ্জ্বল দেখায়, তাই আপাত মান অনেক কম; -২৬.৭৪। সূর্যের করোনা অবিরত মহাশূন্যে প্রসারিত হতে থাকে যে কারণে সৌরঝড়ের জন্ম হয়। সৌরঝড় মূলত আয়নিত কণার ধারা, যা হেলিওপজ তথা প্রায় ১০০ নভো-একক (সূর্য থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্বের ১০০ গুণ) পর্যন্ত ধেয়ে যায়। সৌরঝড়ের মাধ্যমে আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমে সৃষ্ট হেলিওস্ফিয়ার বা সৌরমণ্ডল সৌরজগতের বৃহত্তম অবিচ্ছিন্ন কাঠামো।

সূর্য বর্তমানে স্থানীয় বুদবুদ অঞ্চলের স্থানীয় আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করছে যা আকাশগঙ্গার কালপুরুষ বাহুর ভেতরের দিকে অবস্থিত। পৃথিবী থেকে ১৭ আলোকবর্ষ দূরত্বের মাঝে, তথা সবচেয়ে নিকটবর্তী ৫০টি তারার (সবচেয়ে নিকটবর্তী তারা প্রক্সিমা সেন্টরি ৪.২ আলোকবর্ষ দূরে) মধ্যে সূর্য ভরের দিক দিয়ে চতুর্থ। সূর্য আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে আনুমানিক ২৪ - ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এবং কেন্দ্রের চারদিকে ২২.৫ থেকে ২৫ কোটি বছরে একবার ঘুরে আসে। ছায়াপথীয় উত্তর মেরু থেকে দেখলে সূর্যের এই আবর্তন ঘড়ির কাঁটার দিকে। 

আমাদের ছায়াপথ যেহেতু মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণের (পটবিকিরণ) সাপেক্ষে হ্রদসর্প মণ্ডলের দিকে সেকেন্ডে ৫৫০ কিলোমিটার বেগে ধাবিত হচ্ছে সেহেতু পটবিকিরণের সাপেক্ষে সূর্যের বেগ কাংস্য বা সিংহ মণ্ডলের দিকে সেকেন্ডে প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার। পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব আনুমানিক ১৪.৯৬ কোটি কিলোমিটার যাকে ১ নভো-একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে পৃথিবীর কক্ষপথ যেহেতু উপবৃত্তাকার সেহেতু সূর্য থেকে তার দূরত্ব পরিবর্তিত হয়, জানুয়ারি মাসে সে সূর্যের সবচেয়ে কাছে (অনুসূর) আসে এবং জুলাইয়ে সবচেয়ে দূরে (অপসূর) সরে যায়। যাহোক, গড় দূরত্বে সূর্য থেকে আলো পৃথিবীতে আসতে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড সময় নেয়। এই সূর্যালোকের শক্তি পৃথিবীর প্রায় সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখে। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় এই আলো থেকে খাদ্য উৎপাদন করে, এবং প্রাণীরা খাদ্যের জন্য এসব উদ্ভিদ বা অন্য প্রাণীর উপর নির্ভর করে। পাশাপাশি জলবায়ু এবং আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণেও সূর্যালোক প্রধান ভূমিকা রাখে। 

পৃথিবীর উপর সূর্যের বিশাল প্রভাব সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ অনুধাবন করে আসছে। অনেক সংস্কৃতিতেই সূর্যকে দেবতা মনে করা হতো এবং এখনো হয়। প্রকৃতপক্ষে সূর্য তার কেন্দ্রভাগে সংঘটিত নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে অবিরাম হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম উৎপাদন করে তাপ-উত্তাপ সৃষ্টি করে সৌরজগতে বিকিরণ ঘটাচ্ছে, যার কিয়দংশ পৃথিবীতে আপতিত হচ্ছে। তবে সূর্যের প্রকৃত কাঠামো সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা গড়ে উঠতে অনেক সময় লেগেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত বিজ্ঞানীরাও সূর্যের গাঠনিক উপাদান এবং শক্তির উৎস সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতেন না। এখনও সূর্য নিয়ে গবেষণা চলছে কারণ তার কিছু ব্যবহার এখনও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি, যায় না।

সূর্যের আলোয় কত কি উপকার, কত কি হিসাব-নিকাশ, কত কি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা; কিন্তু সূর্য এলো কোত্থেকে, আলোই-বা পায় কোয়ায়? বিজ্ঞান কি এর কোন সঠিক ব্যাখ্যা দাঁড় করতে পেরেছে, না-কি পারবে? হাজার জীবনেও কি এর সমাধান সম্ভব??   

পবিত্র কুরআনুল কারিমে উল্লেখ্য— 'আল্লা-হু নূরুস্ সামা-ওয়া-তি অল্-আদ্ব্; মাছালু নূরিহী কামিশ্কা-তিন্ ফীহা-মিছ্বাহ্; আল্ মিছ্বা-হু ফী যুজ্বা-জ্বাহ্; আয্যুজ্বা-জ্বাতু কাআন্নাহা-কাওকাবুন্ র্দুরিইয়ুঁই ইয়ূক্বদু মিন্ শাজারতিম্ মুবা-রকাতিন্ ইতূনাতিল্লা-র্শাক্বিয়্যাতিঁও অলা-র্গবিয়াতিঁ ইয়াকা-দু যাইতুহা-ইয়ুদ্বী-য়ু অলাও লাম্ তাম্সাস্হু নার্-; নূরুন্ ‘আলা র্নূ; ইয়াহ্দিল্লা-হু লিনূরিহী মাই ইঁয়াশা-য়্; অইয়াদ্ব্রিবুল্লা-হুল্ আম্ছা-লা লিন্না-স্; অল্লা-হু বিকুল্লি শাইয়িন্ ‘আলীম্।' যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়— আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনের নূর। তাঁর নূরের উপমা একটি তাকের মতই। তাতে রয়েছে একটি প্রদীপ, প্রদীপটি রয়েছে একটি চিমনির মধ্যে। চিমনিটি উজ্জ্বল তারকার মতই। প্রদীপটি বরকতময় যাইতূন গাছের তেল দ্বারা জ্বালানো হয়, যা পূর্ব দিকেরও নয় এবং পশ্চিম দিকেরও নয়। এর তেল যেন আলো বিকিরণ করে, যদিও তাতে আগুন স্পর্শ না করে। নূরের উপর নূর। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন তাঁর নূরের দিকে। আর আল্লাহ মানুষের জন্য উপমাসমূহ উপস্থাপন করেন। আর আল্লাহ প্রতিটি বস্তু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।' 

নূর শব্দের বাংলা অর্থ হলো আলো বা জ্যোতি; প্রকৃত অর্থে এ শব্দটি দ্বারা 'দৃশ্যমান' আলো বুঝায়, রূপক অর্থে 'অদৃশ্যমান আলো' তথা হেদায়েত, জ্ঞান ইত্যাদি বুঝায়। জগৎ বিখ্যাত মনীষী হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রঃ) বলেছেন—আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলাই হলেন আলোর একমাত্র উৎস; আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর বেলায় আলো শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়, বাস্তব অর্থে নয়। জ্ঞানের তারতম্যানুসারে আলো শব্দটি এক এক জনের কাছে একেক রকম হয়; যেমন— ১). সাধারণের কাছে, ২). বিশেষ লোকদের কাছে, এবং ৩). বিশিষ্ট লোকদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়; যার আবার ভিন্ন ভিন্ন স্তরও রয়েছে। মূল কথা হলো আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলাই হলেন চরম আলো এবং পরম নূর। তিনিই সত্যিকার ও প্রকৃত একক জ্যোতি এবং অন্য কেউ বা কোনকিছু তাঁর মতো নয়, এর সাথে অন্য কোন কিছুর শরীকও নেই।

সাধারণের দৃষ্টিতে আলো মানে 'প্রকাশ' বা 'পরিদৃশ্যমান জগত'। আর এই প্রকাশ হচ্ছে একটি সম্বন্ধযুক্ত ক্রিয়া; কেননা এখানে প্রতিটি জিনিস অপরটির কাছে প্রকাশিত হয়, আবার অপরটি হতে লুকায়িতও থাকে। অতএব, প্রকাশ এবং গোপন উভয়ই সম্বন্ধযুক্ত। সাধারণের কাছে পঞ্চইন্দ্রিওয়ের মধ্যে দৃষ্ট শক্তির সাথে সম্পৃক্ত কোন একটা  অনুভূতিই আলো। সৌন্দর্যের দিক দিয়ে বস্তুকে তিনভাগে ভাগ করা যায়— 
১). যা দৃষ্টিগোচর হয় না; কালো বস্তু। 
২). যা দৃষ্টিগোচর হয়, কিন্ত তা দিয়ে অন্য কোন বস্তু দেখা যায় না; উজ্জ্বল বস্তু, নক্ষত্র, অনুজ্জ্বল অগ্নি। 
৩). যা দৃষ্টি গোচর হয় এবং তা দিয়ে অন্য বস্তুও দেখা যায়; চন্দ্র, সূর্য, স্ফুলিঙ্গ, অগ্নি, প্রদীপ ইত্যাদি;  এই তৃতীয় প্রকারই আলো নামে অভিহিত। কখনো কখনো আবার উজ্জ্বল বস্তু হতে বস্তুর উপর প্রতিফলিত আলোকেও 'আলো' বলা হয়। সংক্ষেপে বললে বলতে হয়— যে বস্তু দৃষ্টিগোচর হয় এবং তা দিয়ে অন্য বস্তুও দেখা যায় তাকেই আলো বলে।

আলোর বৈশিষ্ট্য হলো প্রকাশ ও দর্শন; আর এই প্রকাশ ও দর্শন নির্ভর করে দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন চোখের উপর। আলো প্রকাশ পেলে এবং অন্য বস্তুকে প্রকাশিত করলেও অন্ধ ব্যক্তির পক্ষে তাতে কোন উপকার হয় না। 'আলো' শব্দ দ্বারা প্রকৃত অর্থে আমরা আলো দেখার যন্ত্র চোখকেই বুঝি। এ কারণেই তত্ত্বানুসন্ধানীরা দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন চোখের আলোকেই 'আলো' বলে অভিহিত করেছেন। তাই চামচিকে সম্বন্ধে বলা হয় যে তার চোখের আলো ক্ষীণ, দূর্বল। 

মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয়  হাবীব হুজুর পাক (সাঃ)-কে জগতের আলো বা নূর হিসেবে সৃষ্টি করে সীমাহীন উজ্জ্বল মুনাওয়ার হওয়ার স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং নাম দিয়েছেন নূর এবং সীরাজুম্মুনীরা। এই নামকরণের যৌক্তিকতা ও স্বার্থকতা তো অবশ্যই আছে এবং থাকবে,  তাই নয় কি? যেহেতু জগৎবাসী তাঁর মাধ্যমেই আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের পথ পেয়েছে, এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামাল ও কামালের মাধ্যমেই জগৎবাসী দৃষ্টিশক্তি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। সেটা কোন সাধারণ ব্যক্তি বা মানুষের দ্বারা কি সম্ভব ছিল?

এ মর্মে আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুর'আনুল করীমে স্পষ্টতই উল্লেখ করেছেন, 'নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে আল্লাহর তরফ থেকে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি (নূর) এসেছে এবং একটি সমুজ্জ্বল গ্রন্থ।' —(সূরা মায়েদা : ১৫) উক্ত আয়াতের তাফসীরে তাফসীরে জালালাইন, তাফসীরে খাজেন, তাফসীরে ইবনে আব্বাস, তাফসীরে বায়জাবীসহ অনেক শ্রেষ্ঠ তাফসীরকারক এখানে এ 'নূর'-কে আমাদের প্রিয় নবী হুজুর পাক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কেই বুঝানো হয়েছে বলে মত দিয়েছেন এবং 'কিতাবুমমুবীন' দিয়ে কুর'আনুল কারীম-কে বুঝানো হয়েছে বলেছেন। উক্ত  আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে মাযহারীতে কাজী মুহাম্মদ ছানাউল্লাহ পানীপথী (রঃ) লিখেছেন, 'আলাহর নিকট থেকে তোমাদের নিকট এক জ্যোতি এসেছে' অর্থাৎ 'নূর' জ্যোতি দ্বারা উদ্দেশ্য মুহাম্মদ (সাঃ; 'এবং এক সুস্পষ্ট কিতাব' অর্থাৎ আহকাম ও বিধানকে সুস্পষ্টকারী কিংবা স্পষ্ট মু’জিযা বিশিষ্ট কিতাব, কিতাব দ্বারা উদ্দেশ্য 'কুরআন' বলেছেন।

আলোর সৃষ্টি ও এর উৎস-উৎপত্তির সারকথা জানতে হলে অবশ্যই সৃষ্টির গোড়ায় যেতে হবে, নয়তো এ রহস্য কোন মানুষের পক্ষে কোনভাবেই  ভেদ করা সম্ভব হবে না। স্রষ্টার সৃষ্টির ইতিহাসের শুরুটা সারসংক্ষেপে কিয়দংশ হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রঃ)-র কিতাব  'দাকায়েকুল আকবার' থেকে নকল করছি। বইয়ের শুরুতেই 'হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর  সৃষ্টি রহস্য' লিখতে গিয়ে তিনি একটি দীর্ঘ  হাদিস তুলে ধরেছেন— 

আল্লাহ পাক সর্ব প্রথম 'শাজ্বারাতুল ইয়াকীন' নামে চারি কাণ্ড বিশিষ্ট একটি বৃক্ষ সৃষ্টি করেন। তারপর নূরে মুহাম্মদীকে ময়ুরের আকৃতিতে শুভ্র মুক্তার আবরণের মধ্যে সৃষ্টি করিয়া উক্ত বৃক্ষের উপর রাখিয়া দেন। সত্তুর হাজার বৎসর তিনি এইরূপ অবস্থায় আল্লাহ পাকের তাসবীহ পাঠে নিবিষ্ট থাকেন।
অতপর আল্লাহ পাক লজ্জার আয়না তৈরী করিয়া তাঁহার সন্মুখে রাখেন। তিনি যখন স্বীয় সুন্দর লাবণ্যময় ও জাঁকজমকপূর্ণ ছবি আয়নার মধ্যে দেখিতে পান, তখন লজ্জিত হইয়া আল্লাহ তাআ'লাকে অবনত মস্তকে পাঁচবার সেজদা করেন। এই কারণেই হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর উম্মতের উপর দৈনিক নির্দিষ্ট সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হইয়াছে।
আল্লাহ পাক পূণরায় যখন উক্ত নূরের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, তখন ইহা আল্লার ভয়ে লজ্জিত ও ঘর্মাক্ত হইয়া যায়। আল্লাহ পাক তাঁহার মাথার ঘর্ম হইতে ফেরেশতাদিগকে এবং মুখমন্ডলের ঘর্ম হইতে আরশ-কুরসি, লৌহ-মাহফুজ, কলম,  চন্দ্র, সূর্য, পর্দাসমূহ, তারকারাজি এবং আকাশস্থিত যাবতীয় বস্তু সৃষ্টি করেন।........... 
একমাত্র চক্ষুষ্মান ব্যক্তির পক্ষেই উপরোক্ত হাদিসের মর্ম বুঝা সম্ভব। আত্মচক্ষু যার খোলা আছে তার পক্ষে আলোর উৎস খোঁজা ও বুঝা যেমন কঠিন নয়, তার জন্য তেমন কঠিন নয় জ্ঞানের মহাসাগরের ডুব দেয়াও। এই অনন্ত মহাসাগর হাতড়ে যারাই ঝিনুক কুড়াতে পারে তারাই সার্থকজন।   

পরিশেষে, গীতাঞ্জলি থেকে রবী ঠাকুরের 'কোথায় আলো' শুরুর কবিতার  শেষাংশ দিয়ে যবনিকা টানছি—
কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো।
বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো।
              ডাকিছে মেঘ, হাঁকিছে হাওয়া,
              সময় গেলে হবে না যাওয়া,
নিবিড় নিশা নিকষঘন কালো।
পরান দিয়ে প্রেমের দীপ জ্বালো।।
  
মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
১ মে, ২০২১.