মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০

ওহাবীজমের গোড়ার কথা:

ওহাবীজমের ইতিহাস একটি ক্যানভাসের মতো, যার সমস্তটা জুড়েই রয়েছে উগ্র সহিংসতার বিচিত্র সব দৃশ্যপট; মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব নাজদী যে ইতিহাসের জনক। তার মৃত্যুর পর তার দুই পুত্র বাবার সেই সহিংস ধারা আরো চরমভাবে অব্যাহত রাখেন। প্রকৃতপক্ষে আজকের এই সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ বিন সউদের সন্তানরা ওহাবী মতবাদ প্রচারের মিশন সার্থক করেছেন এবং তাদের অধীনস্থ সমস্ত ভূখণ্ডে ওহাবী মতবাদের বিস্তার ঘটিয়েছেন; এক্ষেত্রে আব্দুল আজিজের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি এবং সর্বক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। 

আব্দুল আাজিজ ওহাবী মতবাদ বিস্তারে এমন কোন জঘন্যতম প্রন্থা নেই যা গ্রহণ করেননি, প্রয়োজনে  গণহত্যা চালিয়ে ব্যাপক ত্রাস সৃষ্টি করতেন। আব্দুল আজিজ ও তার ছেলে সাউদ জাজিরাতুল আরবের পবিত্র শহরগুলোতে নৃশংস রক্তপাত ঘটিয়েছিলেন এবং ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলো এবং সাহাবী (রাঃ)-দের মাজারসহ সকল ধর্মীয় নিদর্শনাদি একে একে নির্দয়ভাবে ধ্বংস করেছেন,  মক্কা-মদিনা ও কারবালার অসংখ্য স্মৃতিবিজড়িত মুসলিম স্থাপনা ধ্বংস করেছেন। প্রথম ধাক্কায় কারবালায় হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)-র মাজার ধ্বংস করার পর তারা ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পবিত্রতম ভূমি মক্কা দখল করতে চেয়েছিলেন।

পবিত্র কারবালা ও নাজাফ শহরে হামলা চালানোর পর ওহাবীরা ১২১৭ হিজরিতে হেজাজের গুরুত্বপূর্ণ শহর তায়েফে হামলা চালায়। আব্দুল আজিজের সময় তার ছেলে সাউদ ছিলেন ওহাবীদের সেনা অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে পরিচালিত সেই হামলা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংসতম একটি হামলা। এ সম্পর্কে ইরাকের বিখ্যাত মনীষী কবি জামিল যাহাভি লিখেছেন, 'ওহাবীদের নোংরাতম কাজগুলোর একটি হলো তায়েফের গণহত্যা। ছোটোবড়ো কারো উপরেই কোনোরকম দয়া করেনি তারা। এমনকি দুধের শিশুকেও মায়ের কোলে মাথা কেটে হত্যা করেছে। ঘরে যখন আর কেউ বাকি ছিলো না তখন মসজিদে, বাজারের দোকানে দোকানে গিয়ে লোকজনকে হত্যা করেছে। কোর'আন পড়া অবস্থায়, এমনকি নামাজরত অবস্থায়ও মানুষকে হত্যা করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বইপুস্তক কোর'আন শরীফ হাদিস গ্রন্থ বোখারী-মুসলিম শরিফসহ হাদিস ও ফিকাহর অন্যান্য কিতাবাদিও বাজারের অলিগলিতে ফেলে পদদলিত করেছে।'

তায়েফে এই গণহত্যা চালানোর পর ওহাবীরা মক্কার আলেমদের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখে ওহাবী মতবাদের প্রতি আনুগত্যের  আমন্ত্রণ জানায়। ‘হিন্দি’ নামে পরিচিত শাহ ফজলে রাসুল কাদেরি তাঁর 'সাইফুল জাব্বার' গ্রন্থে লিখেছেন, 'মক্কার আলেমগণ কাবার পাশে সমবেত হয়েছিলেন ওহাবীদের পত্রের জবাব দেওয়ার জন্যে। এরই মাধ্যে গণহত্যাদুর্গত তায়েফের একদল লোক মাসজিদুল হারামে এসে সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানালো। মক্কার জনগণের মাঝে তখন শোরগোল পড়ে গেল— ওহাবীরা খুব শীঘ্রই মক্কায় হামলা চালাবে। এতে করে তাদের মাঝে ভীতিকর এক অবস্থার সৃষ্টি হলো। 

অন্যদিকে হজ্ব পালনের জন্যে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা আলেমগণ, সুন্নিদের চার মাজহাবের মুফতীগণ তৎক্ষনাৎ ঘোষণা করলেন যে, ওহাবীরা কাফের এবং অমুসলিম, তাদের সাথে জেহাদ করা ওয়াজিব। তাঁরা মক্কার আমিরের প্রতি আহ্বান জানালেন ওহাবীদের মোকাবেলায় সবাই এক হয়ে লড়াই করার জন্যে। কিন্তু ওহাবীদের সাথে যুদ্ধ করতে আলেমসমাজ সম্মত হলেও মক্কাবাসীরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিল না। ওদিকে সাউদও মক্কায় একটি চিঠি লিখে হুমকি দেন, 'তিন দিনের মধ্যে কাবাঘর জিয়ারতকারী সবাইকে ওখানটা ছেড়ে চলে যেতে হবে, ত্যাগ করতে হবে অত্রদাঞ্চল।'

মক্কার গভর্নরসহ আরো অনেক আলেম সাউদের কাছে গিয়ে মক্কাবাসীদের নিরাপত্তা চাইলেন, সাউদও একটি চিঠিতে সবাইকে নিরাপত্তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। ১২১৮ হিজরিতে সাউদ বিনাযুদ্ধে মক্কায় প্রবেশ করেন এবং কাবা জিয়ারত করে লোকজনকে সমবেত করে তাদেরকে ওহাবী মতবাদের দাওয়াত দিয়ে বাইয়াত গ্রহণ করতে বলেন। সেইসাথে সবাইকে বলেন ওহাবী সিপাহীদের সাথে মক্কা শহরে যেতে এবং ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মূল্যবান সব নিদর্শন ধ্বংস করে দিতে। 

মক্কা দখল করার পর ওহাবীরা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের নিদর্শনগুলো একে একে ধ্বংস করে দেয়; নবী করীম (সাঃ)-এর জন্মস্থানের স্মৃতিবিজরিত স্থাপনা, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ)-র জন্মস্থানের স্মৃতিবিজরিত সবকিছু, হযরত খাদিজাতুল কোবরা (রাঃ)-এর স্মৃতিময় নিদর্শনগুলো ধ্বংস করে দিয়ে সবকিছু মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। ওহাবীরা এইসব পবিত্র স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার সময় তবলা বাজিয়ে গান গেয়ে নেচে নেচে উল্লাস করতো। ওহাবীদের এই জঘন্য কর্মকাণ্ডে তখন মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়; অনেকেই এ বিষয়ে বহু বইপুস্তক লিখেছেন।

কুয়েতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ডক্টর রেফায়ি 'ওহাবী ভাইয়ের প্রতি পরামর্শ' নামক বইয়ে ওহাবী আলেমদের উদ্দেশ্যে লিখেন, 'তোমরা নবীজী (সাঃ)-এর প্রথম হাবীবা সহধর্মিনী উম্মুল মু'মিনিন হযরত খাদিজাতুল কোবরা (রাঃ)-র ঘর ধ্বংস করার অনুমতি দিয়েছো এবং কোন রকম প্রতিক্রিয়া দেখাওনি। অথচ ঐ ঘরটি ছিলো কোর'আন, তথা ওহি অবতীর্ণ হওয়ার পবিত্রতম স্থান। ............কেন তোমরা আল্লাহকে ভয় করছো না এবং পয়গাম্বর কারীমের ব্যাপারে লজ্জা করছো না। ........তোমরা নবীজী (সাঃ)-এর জন্মস্থানটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে তাকে পশু বেচাকেনার স্থানে পরিণত করেছো; যাকে কিছু নেককার ও ভালো মানুষ ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে তোমাদের ওহাবীদের ছোবল থেকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, গ্রন্থালয়ে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করেছে…..'

ওহাবীদের ভয়াবহতম এবং ন্যক্কারজনক আরেকটি কাজ, যে কাজের ক্ষতি মুসলমানের জন্য সবসময়ই বহমান থাকবে; আর তা হলো— মক্কার 'আলমাকতাবুল আরাবিয়া' নামের বিশাল লাইব্রেরিটি আগুন দিয়ে ধ্বংস করা। এই কুতুবখানায় দুর্লভ ও মূল্যবান ষাট হাজার কিতাব ছিল এবং চল্লিশ হাজারেরও বেশি হাতে লেখা অনন্য অদ্বিতীয় পাণ্ডুলিপি ছিল; যেগুলোর মাঝে সেই জাহেলি যুগের, ইহুদিদের, কুরাইশ কাফেরদেরও হাতে লেখা বহু নিদর্শন মজুদ ছিল। বিশাল এই গ্রন্থাগারে আরো ছিল প্রাচীন কোর'আন, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), হযরত ওমর ফারুক (রাঃ), হযরত আলি (রাঃ), হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ), হযরত তারেক বিন যিয়াদ (রাঃ)-সহ নবীজী (সাঃ)-এর আরো বহু সম্মানিত সাহাবী (রাঃ)-গণের হাতে লেখা অনন্য সব নিদর্শন। 

'আলমাকতাবুল আরাবিয়া' লাইব্রেরিতে আরো যেসব মূল্যবান নিদর্শন মজুদ ছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র, ইসলাম আবির্ভাবকালে যেসব মূর্তির পূজা করা হতো (লাত, উযযা, মানাত, হুবাল) সেসব। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের বর্ণনায় এসেছে, ওহাবীরা কাফেরদের সাথে সংশ্লিষ্ট নিদর্শনগুলো এই গ্রন্থাগারে মজুদ থাকার অজুহাত দেখিয়ে তাতে আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে দেয়।

পূর্বপুরুষদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করা এবং প্রাচীন ইতিহাস সংরক্ষণ করা যে কোন সমাজের সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত হয়। কেননা এইসব নিদর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত থেকে করণীয় ঠিক করার জন্যে এসব সংরক্ষণ করার গুরুত্ব অপরিসীম। এ কারণেই বিভিন্ন দেশ ও সরকার এ ধরনের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে সংরক্ষণ করার জন্য বিশেষ বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে এবং কাউকে সেখানকার ছোট্ট একটি মৃৎপাত্রও কিংবা সামান্য একটি প্রস্তর লিখনও নিয়ে যেতে দেয়া হয় না। 

নিঃসন্দেহে ইসলামী সভ্যতা বিশ্বের উন্নত সভ্যতাগুলোর অন্যতম একটি এবং মুসলমানরা ইসলামী শিক্ষার আলোকেই এই সভ্যতার গোড়াপত্তন করেছিলেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীসাথীগণের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নিদর্শন সমৃদ্ধ এই সভ্যতার উত্তরাধিকার ও অংশ। তাই এইসব নিদর্শন সংরক্ষণ করা এবং সেগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করা ঐতিহ্যবাহী এই সংস্কৃতির গোড়াপত্তনকারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরই প্রতীক। পক্ষান্তরে এগুলোকে ধ্বংস করা মূর্খতা ও জাহেলি কুসংস্কার তথা গোঁড়ামির শামিল। ভ্রমণকাহিনী আর ইতিহাসের বহু গ্রন্থে বর্ণিত আছে ইসলামী দেশগুলোসহ ওহী'র দেশে পূণ্যবানদের শত শত মাজার ছিল, যেগুলোর অধিকাংশই ওহাবীরা শেরেক আর কুফরির অজুহাতে বিনষ্ট করে ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছে।

সাউদ বিন আব্দুল আজিজ মক্কা মোকাররমা দখল করার সময় বহু আলেম ওলামাকে বিনা কারণে শহীদ করেছে এবং মক্কার বহু সম্ভ্রান্ত লোককে কোনোরকম অভিযোগ ছাড়াই ফাঁসি দিয়েছে। মুসলমানদের যেকেউ যদি নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসের উপর স্থির থাকতে চাইতো, তাদেরকে বিভিন্নভাবে বাদশাহ শাস্তির হুমকি দিত। সে সময় হাটে-বাজারে অলিতে গলিতে সাউদের ঘোষকেরা হাঁক মেরে ঘোষণা করতো, 'হে লোকজন! সাউদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হও এবং তার বিস্তৃত ছায়ার নীচে আশ্রয় নাও!'

ওসমানী  সরকারের নৌ-বাহিনীর উচ্চতর প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক রিয়ার এডমিরাল আইয়ুব সাবুরি সে সময় লিখেন, 
'আব্দুল আজিজ বিন সাউদ বিভিন্ন গোত্রের শেখদের সমাবেশে দেওয়া তার প্রথম বক্তৃতায় বলেন— আমাদের উচিত সকল শহর নগরকে আমাদের অধীনে নিয়ে আসা। আমরা আমাদের আকিদা বিশ্বাসগুলো তাদেরকে শিক্ষা দেবো। আমাদের এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যে নিরুপায় হয়ে নবীজীর সুন্নাত তথা মুহাম্মাদি শরিয়াতের অনুসরণের দাবিদার আহলে সুন্নাতের আলেমদেরকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে...… বিশেষ করে নামকরা আলেমদেরকে; কেননা এরা যতদিন বেঁচে থাকবে ততোদিন আমাদের আকিদা বিশ্বাস হাসির মুখ দেখবে না। তাই যাদেরকে আলেম বলে মনে হবে প্রথমে তাদেরকে নির্মূল করতে হবে।'

সাউদ বিন আব্দুল আজিজ মক্কা দখল করার পর আরব উপদ্বীপের অন্যান্য শহরও দখল করার চিন্তাভাবনা করেন, তাই এবার হামলা চালায় বন্দর নগরী জেদ্দার উপর। ওহাবী লেখক ইবনে বুশর তাঁর 'নাজদীর ইতিহাস' নামক বইয়ে লিখেন— সাউদ মক্কায় বিশ দিনেরও বেশি ছিলেন; তারপর জেদ্দা দখল করার জন্যে মক্কা ত্যাগ করেন। সাউদ জেদ্দা অবরোধ করে ঠিকই, কিন্তু জেদ্দার শাসক গোলা নিক্ষেপ করে বহু সংখ্যক ওহাবীকে হত্যা করে এবং তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়। ওহাবীরা এভাবে পরাজিত হওয়ার পর মক্কায় ফিরে না গিয়ে বরং তাদের মূল ভূখণ্ড নজদে ফিরে চলে যায়; কেননা তারা শুনতে পেয়েছিল ইরান থেকে একদল সেনা নজদে হামলা করেছে। এই পরিস্থিতির কারণে সুবর্ণ একটি সুযোগ এসে যায় ওহাবীদের হাত থেকে মক্কা শহরকে পুনরায় উদ্ধার করার। 

মক্কার গভর্নর শারিফ গালিব ওহাবীদের হামলার পর জেদ্দায় লুকিয়েছিলেন, তিনি এখন জেদ্দার শাসকের সহযোগিতায় প্রচুর সেনা নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। তাদের সেনাদের কাছে কামান-গোলার মতো অস্ত্রশস্ত্র ছিল, যার ফলে তারা ওহাবী সেনাদের উপর হামলা চালিয়ে পুনরায় মক্কা বিজয় করতে সক্ষম হয়।

কিন্তু ওহাবীরা এরপরেও বিশ্বমুসলমানের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান মক্কাকে পুনরায় দখল করার পাঁয়তারা করে। শেষ পর্যন্ত ১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দে ওহাবীদের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক হিসেবে পরিচিত সাউদের আদেশে পবিত্র মক্কা শহরটিকে আবারো অবরোধ করে দখল করে নেয়। দখল করার পর সাউদ মক্কার জনগণের ওপর এত কঠোর আচরণ করতে থাকে যে, শহরের বহু লোক ক্ষুধা তৃষ্ণায় মারা যায়। সাউদের আদেশে মক্কা শহরের প্রবেশদ্বার এবং বের হবার পথ সবই বন্ধ করে দেয়। সে সময় যে-ই মক্কা থেকে পালাতে চেয়েছিল তাকেই হত্যা করা হয়েছিল; তাদের হাত থেকে শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পায়নি। অবস্থা ভীষণ বেগতিক দেখে শেষ পর্যন্ত মক্কার গভর্নর শারিফ গালিব ওহাবীদের সাথে হাত না মিলিয়ে পারেননি।

ওহাবীরা মক্কা অবরোধ করার সময় গভর্নর  তাদের সাথে ভালো আচরণ করেছিল, এমনকি ওহাবী আলেমদেরকে মূল্যবান সব উপঢৌকনও দিয়েছিল প্রাণে বেঁচে থাকার জন্যে। মক্কা দখল করার পর ওহাবীরা ইরাকি হজ্বযাত্রীদের জন্যে চার বছর, সিরিয়ানদের জন্যে তিন বছর এবং মিশরীয়দের জন্যে দুই বছর হজ্বের মতো আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ সকল ইবাদাত ও আনুষ্ঠানিকতার উপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে।

সাউদ তখন কেবল হজ্বের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেই ক্ষান্ত হয়নি, এরপর সে নজর দিয়েছে মদিনাতুন্নাবীর দিকে। মদীনা শহরও সে অবরোধ করে ফেলে। কিন্তু মদিনাবাসীরা যেহেতু ওহাবী আকিদা এবং তাদের সহিংসতা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন, সেহেতু তাঁরা ওহাবীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। প্রায় বছর খানেক এই প্রতিরোধ সংগ্রামের পর অবশেষে ১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে সাউদ মদিনা শহরটিকেও দখল করে নেয়। ওহাবীরা নবীজী (সাঃ)-এর হেরেমের মূল্যবান সকল জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। তবে মুসলমানদের গণবিরোধিতার ভয়ে না-কি অন্য কোন কারণে রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর পবিত্র রওজা ধ্বংস করতে গিয়েও কেন যেন তা আর করতে পারেনি। 

সাউদ বিন আব্দুল আজিজ মদিনা মনোয়ারা দখল করার পর সকল শহরবাসীকে মাসজিদুন নববীতে সমবেত করান, এবং তাদের উদ্দেশ্যে একটি বক্তৃতা দেন; সেদিনের দেওয়া সেই বক্তব্যটি তিনি শুরু করেন এভাবে— 'হে মদিনার জনগণ! আল কোর'আনের পবিত্র আয়াত- আল ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দীনাকুম অর্থাৎ আজ তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্যে পরিপূর্ণ করে দিলাম এর ভিত্তিতে তোমাদের ধর্ম ও বিধিবিধান আজ পূর্ণতায় পৌঁছেছে, ইসলামের নিয়ামতে তোমরা মর্যাদাবান হয়েছো, একক অদ্বিতীয় সত্ত্বা আল্লাহ তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট ও খুশি হয়েছেন। তোমাদের পূর্বপুরুষদের বাতিল ধর্মগুলো ছেড়ে দাও এবং কক্ষনো তাদেরকে ভালো মানুষ হিসেবে মনে করো না। তাদের ওপর দরুদ বা রহমত প্রেরণ করা কঠোরভাবে পরিহার করবে, কেননা তাদের সবাই শেরেকি নীতির মধ্যেই মারা গেছে।' পর্যায়ক্রমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর মুসলিম সাম্রাজ্যের মূল ভূখণ্ডের নাম 'জাজিরাতুল আরব' পাল্টিয়ে সাউদের নামানুসারে 'সাউদি আরব' নামকরণ করা হয়।  

সাউদ তার সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে বহু গণহত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। সে সময়ে তার এবং তার অনুসৃত ওহাবী ফের্কার ভয়াবহ সহিংসতা আরবের জনগণকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে মৃত্যুর ভয়ে হজ্ব এবং জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করতেও কেউ সাহস করতো না। মক্কার শাসক নিজের জীবনের ভয়ে সাউদের ইচ্ছায় আদেশ দিতে বাধ্য হয়েছিল, মক্কা ও মদিনায় সাহাবী (রাঃ)-দের ও ইমামদের যতো মাজার আছে এবং এ ছাড়াও আরো যতো পবিত্র স্থাপনা আছে সকল স্থাপনা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। ওহাবী ফের্কাকে তখন মাজহাব হিসেবে হেজাজে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ওহাবীদের চাওয়া অনুযায়ী আজান থেকে ইসলামের মহান নবী হুজুর পাক (সাঃ)-এর উপর দরুদ সংক্রান্ত অংশটিও বাদ দেওয়া হয়েছিল। 

এখন জানা যাক আদ্দুরারুস সানিয়্যাহ— পৃষ্ঠা - ৪২ ও ৪৭; আত্তাওয়াস্সুল বিন্নাবিয়্যি— পৃষ্ঠা-১ কৃত- আবূ হামিদ মারযূক; ওহাবী মাযহাবের হাক্বীক্বত— পৃষ্ঠা - ১১১ও ১২৫ মতে কে এই মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নাজদী? খ্রিষ্ট্রিয় অষ্টাদশ শতাব্দির গোড়ার দিকে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে, তথা ১১১১ হিজরীতে আরবের নজদে- হাদীসের ভাষায় ‘শয়তানের শিং’ এবং ইসলামী জগতে ‘ভূমিকম্প’ স্বরূপ জন্মগ্রহণ করেছিল মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী। 

কৈশোরে, কুখ্যাত খারেজী সম্প্রদায়ের অনুসারী শায়খ ইবনে তাইমিয়া ও তার শিষ্য ইবনে ক্বাইয়্যূম জৌজী-র কয়েকটি মাত্র কিতাব পড়ে যৌবনে পদার্পণ করে তাদেরই অনুসরণে ‘ওহাবী মতবাদ’ প্রতিষ্ঠা করেছিল তথাকথিত শায়ক খ্যাত এই নাজদী; দ্বিতীয় সুলতান মাহমূদ খানের শাসনামলে তার জন্ম। 

আক্বীদা ও কর্মকাণ্ডের দিক দিয়ে নিঃসন্দেহে মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব তার সকল অনুসারীসহ খারেজী সম্প্রদায়েরই অনুসারী। তার আক্বীদা, কথা ও কাজ তাকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দিয়েছে। নবী-রাসূল, অলি-আওলিয়া ও আল্লাহর  নেককার বান্দাদের বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য দেয়াই ছিল তার মূল কাজ; আর এই বদচিন্তা থেকেই সে ওহাবী মতবাদ প্রবর্তন করে। অথচ তাঁদের মানহানি করা ইমাম চতুষ্ঠয়ের মতে কুফর; এর উপর ইজমাও প্রতিষ্ঠিত। 

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক গোলাম আহমদ মোর্তজা রচিত 'চেপে রাখা ইতিহাস' বইয়ের ১৮০ নং পৃষ্ঠায় লেখা আছে— 'প্রথমে ওহাবী জিনিসটা কি সে সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করছি- আরবদেশে ১৭০৩ খ্রীষ্টাব্দে আব্দুল ওহাবের ছেলে মুহাম্মদের জন্ম। আরব দেশের নিয়মানুযায়ী এ নাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব বলে বর্ণিত হয়। তার জন্মস্থানের নাম ছিল নজদ। ওহাবী আন্দোলনের নায়কের নাম আসলে মোহাম্মদ।'

নাম বা জন্মসাল যা-ই হউক যে'টাই হউক না কেন এই নাজদী যে ইসলামের নামে দুনিয়াতে এক মহা ফেতনার বীজ রোপণ করে গেছে তা নিশ্চিত; এক কথায় জঘন্য! নাজদী সম্বন্ধে জানার জন্য অসংখ্য বই পড়েছি, ইসলামের ইতিহাস নিয়ে অনেক ঘাটাঘাটি করেছি;  যা বুঝতে ও জানতে পেরেছি— মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নাজদী আরবের নাজদ প্রদেশের (বর্তমান রিয়াদ) অধিবাসী। সেখানকার 'হুরাইমিলা' নামক স্থানে ১১১১ হিজরী সনে (১৬৯৯ খ্রি) জন্ম গ্রহন করেন, এবং ১২০৬ হিজরী (১৭৯২ খ্রি.) সনে মারা যান। নজদ প্রদেশটির প্রতি রাসূল (সাঃ) খুবই অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি অন্যান্য এলাকার জন্য দোয়া করেছেন বটে, কিন্তু নজদ এলাকার জন্য কখনো দোয়া করেননি। 'হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্নিত আছে যে, রাসূল পাক (সাঃ) বলেন - হে আল্লাহ! আমাদের শাম (সিরিয়া) ও ইয়েমেন দেশে বরকত দান কর। উপস্থিত সাহাবাগণ 'নজদ' দেশের জন্য পর পর ৩ বার দোয়া করতে আবেদন করলেন, রাসূল পাক (সাঃ) বললেন,  নজদ দেশে নবতর ফেতনা রয়েছে এবং নজদ হতে শিংযুক্ত শয়তান বের হবে।' –(বোখারী )

রাসূল পাক (সাঃ)-এর হাদীস কিছুতেই মিথ্যা হতে পারে না। পরবর্তীকালে 'নজদ' প্রদেশ হতে মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নামে এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে, যিনি বিধর্মীদের চক্রান্তের শিকার হয়ে ইসলামের মধ্যে এক চরম বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে গেছেন। আসলে, ওহাবী মতবাদের জনক ইবনে আব্দুল ওহাব নাজদী ব্রিটিশ গোয়েন্দা অফিসার 'হামফ্রে'-র সৃষ্টি এবং তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু। 'হামফ্রে' তুরস্কের শায়খ আফিন্দির নিকট ছদ্মবেশী মুসলমান সেজে কোর'আন ও হাদীস চর্চা করে, পরে ইবনে আব্দুল ওহাব নাজদীর একান্ত বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে পরিগণিত হয়। ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে যে আলোচনা হয় তা 'হামফ্রে' তার 'হামফ্রেজ মেমোরিজ' নামক ডায়েরিতে বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করে রেখে গেছেন।

 ব্রিটিশ গোয়েন্দা অফিসার 'হামফ্রে'-র ডায়েরিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন জার্মানীর হস্তগত হয়, তখন জার্মান পত্রিকা 'ইসপগিল' তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে; এতে ব্রিটিশদের বিশ্ব সমাজে অনেক লজ্জিত হতে হয়। ডায়েরিটি সেসময় ফরাসী পত্রিকায়ও ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল; জনৈক লেবাননী বুদ্ধিজীব তখন তা আরবীতে অনুবাদ করেন। আরবী থেকে পরে বাংলা করেন জনাব লোকমান আহমদ আমিনী। আগস্ট-সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ সংখ্যায় মাসিক তরজুমান পত্রিকায় আব্দুল ওহাব নাজদী এই প্রসংগটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়। নিবন্ধটি তখন 'হামফ্রেজ মেমোরিজ' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। তা থেকে আজ আমি এর কিয়দাংশ হুবাহুব এখানে তুলে ধরছি। (তাছাড়া হামফ্রের ডায়েরিটি এখন বাংলা ভাষায়ও মুদ্রিত হয়েছে, বাজারেও পাওয়া যাচ্ছ।)

হামফ্রে লিখেছেন - আমি যখন তরখানের কাজে নিয়োজিত ছিলাম তখন একজন লোকের সাথে আমার সাক্ষাত হয়, তিনি সেখানে যাতায়াত করতেন এবং তুর্কী, ফারসী এবং আরবী ভাষায় কথা বলতেন। তিনি দ্বীনি তালেব ইলমের পোশাক পরিধান করতেন। তার নাম হলো মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব। তিনি উচ্চাভিলাষী, সম্মানাকাংখী এবং ধোপ দুরস্ত লোক ছিলেন। উসমানী সরকারের প্রতি তিনি অত্যন্ত ঘৃনা পোষণ  করতেন ও সর্বদা তার সমালোচনা করতেন। কিন্তু ইরান সরকারের সাথে তার কোন যোগাযোগ ছিলনা। 

তরখান আব্দুর রেজার সাথে তার বিশেষ সম্পর্কের কারণ হলো উভয়েই উসমানী খলিফাকে নিজের পরম শত্রু মনে করতেন। কিন্তু এটা আমার বোধগম্য হয়নি যে, তিনি কি কারণে আব্দুর রেজার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুললেন, কারণ দুজন ছিলেন দুই মতাবলম্বী (একজন শিয়া আরেকজন সুন্নী)। আমি এটাই জানতে পারিনি তিনি ফার্সী ভাষা কোথায় শিখলেন। অবশ্য বসরায় শিয়া সুন্নীরা এক ছিল। সেখানে আরবী ও ফার্সী উভয় ভাষার প্রচলন ছিল।

আব্দুল ওহাবের সাথে মেলামেশা ও সাক্ষাতে বুঝতে পারলাম যে, ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্যাবলীকে কার্যকর করার জন্য এ ব্যক্তি অত্যন্ত উপযোগী হবে। তার উচ্চ বিলাস , খ্যাতি কামনা, অহংকার দ্বারা উলামায়ে কেরাম, মাশায়েখে ইসলাম ও সাহাবায়ে কেরামের এমনকি খোলাফায়ে রাশেদিন পর্যন্ত সমালোচনায় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। কোর'আন হাদীস থেকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসীলই তার উদ্দেশ্য ছিল।

আমি চিন্তা করলাম কোথায় এ অহংকারী যুবক আর কোথায় ইস্তাম্বুলের সেই আহামদ আফেন্দী। হানাফী মাযহাবের অনুসারী সে বৃদ্ধ ইমাম আবু হানীফা (রঃ)-র নাম নেওয়ার আগে ওযু করে নিতো। আর আব্দুল ওহাব আবু হানিফা (রঃ)-কে তুচ্ছ জ্ঞান করে। তিনি বলতেন আমি আবু হানিফার চেয়ে বেশী জানি, এবং সহীহ বোখারী বেহুদা কিতাব বৈ কিছু নয়।

আব্দুল ওহাবের সাথে হামফ্রের বন্ধুত্ব লাভ— হামফ্রে বলেন, যাহোক আমি আব্দুল ওহাবের সাথে গভীর সম্পর্ক করে নিলাম এবং আমি বার বার তাকে এ কথা শুনাতাম, আল্লাহ আপনাকে হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত উমর (রাঃ)-এর চাইতে বেশী উপযুক্ত করে বানিয়েছেন। আপনি যদি রাসূল (সাঃ)-এর সমসাময়িক লোক হতেন, তাহলে রাসূল (সাঃ)-এর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারতেন। আমি সবসময় আশা ভরা সুরে তাকে বলতাম, আমি চাই ইসলামে যে বিপ্লব সাধিত হবে তা আপনার দ্বারাই হোক। আপনি এমন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোক যে, আপনিই ইসলামকে অবনতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন।

আমি ইবনে আব্দুল ওহাবের সাথে ঠিক করলাম যে আমরা দুজন মজলিসে বসে উলামা, মুফাসিরীন, মাযহাব ও সাহাবাদের থেকে ভিন্ন পন্থায় নতুন চিন্তা ধারার ভিত্তিতে কোর'আন মজীদ নিয়ে আলোচনা করবো। আমি কোর'আন পড়তাম আর আয়াতের অর্থ নিয়ে মতামত প্রকাশ করতাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল, যে কোন প্রকারে তাকে ইংরেজ উপনিবেশবাদী সংস্থার ফাঁদে জড়িয়ে দেয়া। আমি ক্রমে ক্রমে এ উচ্চাভিলাষী লোকটিকে জড়িয়ে ফেলতে লাগলাম, এমনকি তিনি বাস্তবতার উপর স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন।

একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম জেহাদ করা কি ওয়াজিব? তিনি বললেন অবশ্যই। আল্লাহতায়ালা বলেছেন - কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর। আমি বললাম - আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, কাফের ও মুনাফেক উভয়ের সাথে যুদ্ধ করা ওয়াজিব; তাহলে রাসূল (সাঃ) কেন মুনাফিকদের সাথে যুদ্ধ করেন নি? আব্দুল ওহাব - জেহাদ শুধু যুদ্ধের ময়দানে নয় বরং রাসূল (সাঃ) নিজ চলাফেরা কথাবার্তার দ্বারা মুনাফেকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। আমি বললাম - তাহলে এ অবস্থায় কাফেরদের সাথেও কথাবার্তা ও চলাফিরার দ্বারা যুদ্ধ করা ওয়াজিব। তিনি বললেন - না, রাসূল (সাঃ) যুদ্ধের ময়দানে তাদের সাথে যুদ্ধ করেছেন। আমি রাসূল (সাঃ) কাফেরদের সাথে প্রাণ বাঁচাতে যুদ্ধ করেছেন; কেননা কাফেরগণ তার জানের দুশমন ছিল। আবদুল ওহাব এ কথার উপর মাথা নাড়লেন, আমি বুঝতে পারলাম আমার কাজে আমি সফল হতে চলেছি।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা হামফ্রে আরো বলেন, আমি একদিন মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীকে একটি মিথ্যা স্বপ্নের কথা বয়ান করলাম, তা হলো এই— আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লামকে কুরসীর উপর বসা অবস্থায় দেখলাম। বড় বড় আলেম ও বুজুর্গানে দ্বীন যাঁদেরকে আমি চিনি না, তাঁর চারদিক থেকে তাঁকে তারা ঘিরে রেখেছেন। তখন আমি দেখলাম আপনি সেই মজলিশে প্রবেশ করছেন। আপনার চেহারা থেকে রৌশনি বের হচ্ছে। যখন আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম এর সামনে পৌঁছলেন, তখন মাথা নাড়িয়ে আপনাকে সম্মান প্রদশর্ন করলেন। আপনার মাথায় চুমু খেলেন এবং বললেন, হে আমার একই নামের অধিকারী মোহাম্মদ! তুমি আমার এলেমের ওয়ারিশ মুসলমানদের দ্বীন দুনিয়াকে সামাল দেওয়ার জন্য তুমি আমার যথার্থ খলিফা। এ কথা শুনে আপনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! লোকের কাছে এলেম জাহির করতে আমার ভয় হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, মনের মধ্যে ভয়কে স্থান দিও না।
 
হামফ্রে বললেন, মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী আমার মনগড়া স্বপ্ন শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তিনি আমাকে বার বার জিজ্ঞেস করছিলেন, ভাই! তোমার স্বপ্ন কি সত্য হয়? আমি তাকে এই ব্যাপারে সান্তনা দিতে থাকি। আমি লক্ষ্য করলাম স্বপ্নের আলোচনার পর তার মনোভাব এক নতুন মাজহাব সৃষ্টির জন্য দৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে কাজ শুরু করে দিল। 

এই হলো ওহাবী নাজদীদের আসল ইতিহাস ও প্রকৃত পরিচয়ের আসল খবর। ব্রিটিশ গোয়েন্দা অফিসার মিষ্টার হামফ্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এককভাবে ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা নিযুক্ত ছিলেন তুরস্ক, ইরাক, ইরান ও অন্যান্য আরব দেশসমূহে; আর তার ডাকবাংলা ছিল বসরার তরখানে। এক গভীর  ব্রিটিশ চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের ফসল এই ওহাবীজম। বর্তমান মুসলিম দুনিয়ায় যা মুসলমানদের মহামূল্যবান সম্পদ ঈমান নষ্ট করার কাজে অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলছে। না জেনে না বুঝে অনেকেই শুধুমাত্র দুনিয়ার লোভে সে দলের সদস্য হয়ে অনন্ত জীবনের পরম সুখকে পদদলিত করছে। 

ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার লক্ষ্য ছিল ইসলাম ধর্মের উপর আঘাত হেনে মুসলিম জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। সার্থক ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র, সার্থক হয়েছে হামফ্রে এবং মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নাজদী! আজকের ওহাবী সালাফি নামধারীরা এসবের কতটুকু কি জানে??

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২০

হাইব্রিড প্রজন্ম!

বেশ কিছুদিন আগে ক্লাশ সিক্সের একটি ছোট্ট বাচ্চার কিছু অসংগতির কথা তুলে ধরেছিলাম রুদ্র নামের এক প্রতীকী চরিত্রের মাধ্যমে; প্রকৃতপক্ষে চরিত্রটি ছিল এদেশের বাচ্চাদের বেড়ে উঠার সময়কার সামগ্রিক চিত্রের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি। রুদ্রর মায়ের ভাষ্য অনুুযায়ী সে  কথা শুনতো না, মিথ্যা বলতো, এমন কি মায়ের টাকাও চুুরি করত! লেখাটি যারা পড়েছেন তাঁদের মধ্য থেকে অনেকেই আমাকে বেশ কিছু জটিল এবং কঠিন  প্রশ্ন করেছেন। আমি সহজসরল একজন মানুষ, ভব সংসারের এসব জটিল সমীকরণ তেমন একটা ভালো বুঝি না, তাই ভালভাবে মিলাতেও পারিনি জীবনের অনেক হিসাবনিকাশ। কালক্ষেপণ না করে না ভেবে বুদ্ধির জোরে হটাৎ উত্তর দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না, অর্থাৎ উপস্থিত বুদ্ধির জোর বেশিরভাগ সময়ই তেমন একটা ভালো দেখাতে পারি না; তাই আজকে এই বিলম্বিত উত্তর। অবশ্য অনেক বিষয়েই আমি তেমন একটা ভালো বুঝি না, অনেকের মতো অতটা গুছিয়ে কখনো লিখতেও পারি না। বাস্তবতার আলোকে দু'চোখে দৃষ্টিকটু কিছু পড়লে শুধু তা তুলে ধরতে চেষ্টা করি মাত্র। 

নিশ্চয় আপনারা ভুলে যাননি রুদ্র নামের সেই ছোট্ট ছেলেটির কথা? বাচ্চা ছেলেটি কি করে কেমন ভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল মিথ্যা বলা এবং হাত টানের মতো এমনতর জঘন্য সব বদঅভ্যাসে? অনেক দিন ধরেই ভাবছি রুদ্রকে নিয়ে বিস্তারিত কিছু লিখবো, কিন্তু কেন যেন হয়ে উঠেনি উঠছে না। কোন বাচ্চার নেতিবাচক দিক তুলে ধরে কিছু লিখতে গেলে অনেক কষ্ট হয়। আচ্ছা, ওরা কেন এমন হয়? নৈতিক অসংগতি নিয়ে কোন বাচ্চাই তো জন্মায় না; পরিবার পরিজন ও আশপাশ থেকেই তারা এসব শিখে শিখছে। রুদ্র'র মতো শত শত বাচ্চা আজ এদেশে প্রতিনিয়ত কেমন করে যেন অস্বাভাবিক আর অপ্রকৃতস্থ হয়ে যাচ্ছে! 

কিন্তু কেন? একটি শিশুরও-তো এমন হওয়ার কথা না? তারা জাতির আগামীর ভবিষ্যৎ। ওরা নষ্ট হয়ে গেলে দেশের ভবিষ্যৎ কি হবে? শিশুরা সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করে তার মা'কে। সত্য হলো, কোন মা বা বাবা যদি তার সন্তানের সামনে অনৈতিকতার আশ্রয় নেন, মিথ্যা বলেন, প্রতারণা করেন— বাচ্চাটি তৎক্ষণাৎ তা শিখে ফেলে এবং অনুসরণ, অনুকরণ ও বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করে। ভাল বা মন্দের পার্থক্য তারা মোটেও বুঝে না বা বুঝতে পারার কথাও নয়। তাই বাচ্চাদের সামনে কারো এমন কিছু করা উচিত নয় যা তাদের মনে খারাপ বা বিরুপ প্রভাব ফেলতে পারে। মনে রাখতে হবে, অনৈতিকতায় অভ্যস্ত কোন বাবা-মায়ের সন্তান কখনো নৈতিকতার উপাসক হতে পারে না। তাই, প্রত্যেক অভিভাকেরই উচিত এ ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকা, সচেতন হওয়া; নিজ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনৈতিকতার সকল পাঠ ও বাস্তব অনুশীলন পরিহার করা।

একজন শিক্ষক হিসেবে সামাজের অনেক অসংগতিই চোখে পড়ে, সব কিছুতে সবসময় তেমন একটা নাক গলাই না বা গলানোও সম্ভব হয়ে উঠে না। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা মনের অজান্তেই কেমন করে যেন বিবেকে নাড়া দিয়ে উঠে, বিশেষ করে বাচ্চাদের ব্যাপার হলে আমি তা কখনোই এড়িয়ে যেতে পারি না। রুদ্রের কথায় আসা যাক; সেই রুদ্রের সাথে আমার এখন মাঝে মধ্যেই কথা হয়— ভাল-মন্দ সত্য-মিথ্যা নিয়ে তার সাথে বেশ হাসি-তামশাও হয়। মিথ্যা বলা তার রন্ধ্রে যেন মিশে গেছে! এতোটুকো ছোট্ট বাচ্চা, কেমন করে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলতে পারে, ছল করতে পারে, তা তাকে না দেখলে হয়তো আমি বিশ্বাসই করতে পারতাম না। বাচ্চারা হবে মাছুম, সৎ সুন্দর ও পবিত্রতার অমুর্ত প্রতীক; এমনই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সে মিথ্যা বলবে কেন?  প্রশ্নটি আমাকে বেশ ভাবিয়ে তোলে। তাই জানার উৎগ্রীবতায় ওর সাথে মিশতে শুরু করি এবং অন্য বাচ্চাদের সাথেও ইদানীং অনেক বেশি মিশতে শুরু করেছি।

বাচ্চারা ভরসা পেলে, নির্ভয় ও ভালবাসার গন্ধ খুঁজে পেলে খুবই আন্তরিক অমায়িক ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে, উচ্ছাসে মনের সব কথা গরগর করে বলতে থাকে। রুদ্র'র নানার সাথে আমার বেশ ভাল সম্পর্ক ছিল, সেই সুবাদে সে আমাকে নানাভাই বলে ডাকে। প্রথম দেখায় তাকে সবারই  মনে হবে বেশ শান্তশিষ্ট গোবেচারা; কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে খবই চালাকচতুর। রুদ্রর বাবা বিদেশে থাকার সুবাদে তারা নানা বাড়িতেই বসবাস করে। ওরা দু ভাই-বোন; শুনেছি বোনটি নাকি ক্লাশ ফাইভে পড়ে। বাবার সংসার ও নিজের সংসারের মাতাব্বরি করতে করতে রুদ্র'র মা বাচ্চাদের প্রতি ঠিকমতো খেয়াল রাখতে পারছেন না হয়তো। তাছাড়া লক্ষ্য করেছি একদিন আমার সামনে বসে থেকেও তিনি ফোনে অন্য আরকজনকে বলছেন, আমি বাসায়! পরবর্তীতে আমি অনেকবার তার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলবো বলে ভেবেছি, কিন্তু হয়ে উঠেনি। কি বলবো, কেমন করে তার নিজের দোষত্রুটি তাকেই শুধরানোর কথা বলবো? 

আমাদের সমাজের এ এক জটিল সমস্যা। অনেক বাবা-মা শত প্রতিকুলতার মাঝেও বাচ্চাদের সৎ ও সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন, অথচ রুদ্র'র মা'য়ের মতো মায়েরা সব থেকেও শুধুমাত্র কিছু বদঅভ্যাসের দোষে বাচ্চাদের নষ্ট করে ফেলছেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এই ধরনের মায়েরা বাচ্চা সম্পর্কে একটু বেশিই আবেগপ্রবণ হন, মনে হয় কিছুটা বেশি দরদ দেখান; বাচ্চারাও এ সব বুঝতে পারে। মায়ের কিছু বদঅভ্যাস, অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও বেখেয়ালিপনায় রুদ্র ছোট্টটি থেকেই সম্পূর্ণ অন্য রকম হয়ে যায়। অনেক কিছু জানতে পেরেছি রুদ্রর কাছ থেকেই। সময় ও সুযোগ পেলেই চুপিচুপি সে তার মামার ল্যাপটপে বসে পড়ে। তার মা হয়তো এসব খবর রাখেনই না বা জানেনও না। কয় দিনেই আমি তার সাথে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ভাব জমিয়ে তার কাছ থেকেই তার সম্বন্ধে অনেক অদ্ভুত কিছু খবর জেনেছি। 

এই বয়সেই রুদ্র অবলিলায় ফেসবুক চালায়, ফেসবুকের সব খবর  নিয়ে অকপটে কথা বলতে পারে; ষ্টেটাস করা, এসএমএস লেখা ও সেন্ড করা, ছবি আপলোড করা সব কিছুই সে জানে এবং অনায়াসে করতে পারে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ইন্টারনেট সম্পর্কিত অনেক কিছুতেই সে যথেষ্ট অভিজ্ঞ। পড়ালেখায় তেমন একটা ভাল না হলেও, বিজ্ঞান সমন্ধে তেমন একটা ভাল জ্ঞান না থাকলেও প্রযুক্তির ব্যবহার সে যে খুব ভালভাবেই রপ্ত করেছে তা আমি বেশ বুঝতে পেরেছি। ওর কথা শুনে প্রথম প্রথম কিছুটা চমকে গেলেও এখন আর চমকাই না। সমাজে এমন রুদ্রদের সংখ্যা এখন নেহায়েত কম নয়, বরং অনেক। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতায় মৌলিকত্ব বঞ্চিত এসব রুদ্রদের সংখ্যা আমাদের সমাজে  দিনদিন বেড়েই চলছে। বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে আমরাও না বুঝে তাদের সাময়িক ও সামগ্রিক সাপোর্টও দিয়ে যাচ্ছি; যা মোটেও উচিৎ নয়।
 
বেশ কিছু বাচ্চার সাথে ইদানীং আমি খুব আন্তরিকতার সাথে মিশেছি, তাদের জানার ও বুঝার চেষ্টা করেছি। তাতে করে একটি ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছি— এখনকার বাচ্চারা আমাদের সময়ের বাচ্চাদের চেয়ে অনেক বেশি চালাকচতুর, অনেক বেশি অগ্রগামী। জন্মের পর থেকেই তারা বিভিন্ন ধরনের ইলেক্ট্রিক ও ইলেক্ট্রোনিক ডিভাইস দেখছে, তাই ওসবের প্রতি তাদের আগ্রহ জন্মানো খুবই স্বাভাবিক এবং উৎগ্রীবতাও সহজাত; তবে অতিরিক্ত আসক্তি ভয়ানক খারাপ। বর্তমানে জন্ম থেকেই প্রতিটি বাচ্চা বিভিন্ন প্রকার ডিভাইসের সাথে পরিচিত হয় এবং হচ্ছে, সেগুলোর ব্যবহারও শিখে যাচ্ছে অনেকটা মাতৃভাষা শিক্ষা বা হাটাচলা শিক্ষার মতো করে; তাই এসব ব্যাপারে তাদের মাঝে এক ধরনের আসক্তি কাজ করছে। উৎগ্রীবতা ও সহজলভ্যতা থেকে এখনকার বাচ্চাদের মাঝে এ নিয়ে এ ধরনের আসক্তির উন্মেষ ঘটেছে এবং ঘটছে। এতে করে লেখাপড়ার প্রতি তাদের আকর্ষণ একেবারেই কমে গেছে বা যাচ্ছে; ডিভাইস ও সাইটগুলোর বাহ্যিক চাকচিক্যই তাদেরকে আকর্ষিত করছে বেশি। তাই, আমাদের উচিৎ বাচ্চাদের লেখাপড়ার প্রতি আকৃষ্ট করার মতো ওয়েবসাইট বেশি বেশি তৈরী করা এবং ওসব তাদের সামনে ব্যাপকভাবে তুলে ধরা।

তা না করে এক শ্রেণীর অভিভাবকদের দেখা যায় ইচ্ছা করেই তারা তাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে ফেসবুকের মতো বড়দের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, আইডি খুলে দিচ্ছেন। এটি কতটুকো যুক্তিযুক্ত বা যুক্তিসংগত তা আমি মোটেও  বুঝে উঠতে পারি না, এসব চিন্তা করতেও কষ্ট হয়। তবে কোনভাবেই মনে হয় না কাজটি তারা ঠিক করছেন। ফেসবুক একটি বড়দের মাধ্যম এবং এমন একটি যোগাযোগ মাধ্যম যেখানে ভালর চেয়ে খারাপের আধিক্যই বেশি। তাছাড়া উন্মুক্ত চিন্তা ও স্বাধীন মতামতের নামে ওখানে বেশিরভাগ সময়ই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নোংরামির বহ্নিপ্রকাশ ঘটে। নিষিদ্ধ যে কোন জিনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সহজাত, তাই বাচ্চাদের তা আরো আনেক অনেক বেশি আকর্ষণ করে। আর এ কারণেই ফেসবুকে তারা বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে এবং ওখানে সময়ও ব্যয় করছে অনেক বেশি। 

বাচ্চারা ফেসবুকে  আসলে কি করে? তাদের কাছ থেকেই জেনেছি— বিভিন্ন অশ্লীল উত্তেজক ছবি, নায়ক/নায়িকার ছবি ও বাজে নামসর্বস্ব পেইজগুলো তাদের কাছে খুব প্রিয়। তাছাড়া বন্ধুরা মিলে চ্যাট করে, ছেলে হলে মেয়েদের হাই লিখে এসএমএস করে - মেয়ে হলে ছেলেদের, সব ধরনের ছবিতেই  লাইক করে, ভালো লাগলে শেয়ার দেয়, স্টিকার কমেন্ট করে, লেখা কমেন্ট করে কম; এ'সবের আসক্তিতে ফেসবুক তাদের কাছে এখন এক ধরনের নিষিদ্ধ নেশার মতো। অবশ্য ফেসবুক একাউন্ট বন্ধুদের কাছে তাদের অহংকারের প্রতীক, যার নাই সে নাকি বলদা (তাদের ভাষা)! তাই, বাচ্চারা বায়না ধরলেও ওদের ভালভাবে বুঝিয়ে ইন্টারনেটের খারাপ দিকগুলোকে না বুঝতে দিয়ে কৌশলে এসব বিষয় এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করুন। 

তাছাড়া যে সময়টা একটি বাচ্চা ফেসবুক আসক্তিতে কাটাচ্ছে বা কাটাবে সে সময়টা সে যদি লেখাপড়া বা অন্য কোন ব্রেনগেইমে ব্যয় করে, তাতে ব্রেনের অনেক অনেক বেশি উৎকর্ষতা সাধিত হবে এবং লেখাপড়ায় অনেক ভাল করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। ব্যক্তিগতভাবে জানাশোনা কারো বাচ্চাকে আমি ইন্টার পাশ না করা পর্যন্ত তাদের হাতে মোবাইল এবং কম্পিউটার দিতে দেইনি। আমার হাতে গড়া অনেক ছেলেমেয়েই বর্তমানে সফল মানুষ। কেমন করে তারা তৈরি হলো? অনেক ছাত্রছাত্রীকে তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কিত জ্ঞান দান করা সত্ত্বেও তাদের বুঝিয়ে ইন্টারের আগে ব্যক্তিগত মোবাইল/কম্পিউটার সম্পৃক্ততা থেকে বিরত রেখে আমি দেখেছি তারা অনেক ভাল করেছে। তাই, আমার ব্যক্তিগত অভিমত— বাচ্চাদের আগে মৌলিক শিক্ষা দিন, বইপুস্তক থেকে পাঠের মাধ্যমে এ শিক্ষা ভালভাবে পেলে সে জীবনের সব ক্ষেত্রে সব কিছুতে অল্পতেই বিশেষত্ব অর্জন করতে পারবে, বিশেষজ্ঞ হতে পারবে। একটি কথা স্মরণ  রাখবেন— দেখে দেখে শিখা যায়, কিন্তু বিশেষজ্ঞ হওয়া যায় না।  

জানি, মৌলিক বিষয় নিয়ে এসব লেখা পড়ার মত লোকের বড় অভাব আজকালকার এই সমাজে; তবু লিখতে ইচ্ছে হয়, লিখি। সবার কথা সবার কাছে ভাল লাগে না লাগবে না, গ্রহণযোগ্যও হবে না; এটাই তো স্বাভাবিক। হয়তো আমার এ লেখাও অনেকের কাছে ভাল লাগছে না বা লাগবে না। তদুপরি সামাজিক সচেতনতার জন্য নিজের বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে বাচ্চাদের মঙ্গল কামনান্তে লিখেই যাবো। যদি নূন্যতম পক্ষে একজনও এই লেখাগুলো পড়ে এ থেকে কোন উপকার পান তাতেই এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা সার্থক হবে বলে আমি মনে করি এবং বিশ্বাস রাখি এই ঘুণেধরা সমাজ একদিন পরিবর্তিত হবেই। তাই এই মুহুর্তে এদেশে অভিভাবক সচেতনতা ছাড়া অন্য আর কোন বিকল্প নেই, পথই দেখছি না।  

এ দেশের স্কুল-কলেজগুলোতে এখন কি শিক্ষা দেয়া হয় তা প্রতিটি অভিভাবক মাত্রই বেশ অবগত আছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধুই বাধ্যবাধকতা; ছাপানো রুটিন আর সিলেবাস ছাড়া অন্য কিছু নয়, আর কয়দিন পরপর শুধু পরীক্ষা! পড়ানোর নামে ঠনঠন ফাঁকাআওয়াজ, আর প্রয়োজন অপ্রয়োজনে উফরী নীতিবহির্ভূত বাড়তি ফি আদায়; এসব ছাড়া স্কুল-কলেজে আর কিছুই যেন হয় না, হচ্ছে না! এ দেশে এখন হয়তো এমন কোন বাচ্চা আর খুজে পাওয়া যাবে না যার দু/চার জন গৃহশিক্ষক নেই বা প্রাইভেট কোচিং-এ যেতে হয় না। যে বাচ্চাটি বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় জন্ম নিয়েছে, তার বেড়ে উঠাটিও বিজ্ঞান সম্মত ও বিজ্ঞান ভিত্তিক হওয়া উচিত ছিল, আর এটাই বাঞ্চনীয়। কিন্তু বাস্তবতায় ঘটছে ঠিক অন্য রকম কিছু— পারিবারিক বলয় এক রকম হলেও স্কুলের পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা এখনো সম্পূর্ণ আগেরই মতন রয়ে গেছে। এখনো এ দেশের স্কুল-কলেজে শিক্ষায় সেই পুরোনো মানদাতার পদ্ধতিই প্রচলিত এবং প্রয়োগ ও অনুশিলন করানো হয়; বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবস্থার উন্নতির চেয়ে অবনতিই ঘটেছে বেশি। 

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে, সেই তুলনায় স্কুল-কলেজের অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা বেড়েছে অনেক কম। তাই সীমিত পরিসরে বেড়ে উঠা বাচ্চাদের অবস্থা এখন অনেকটা হাইবীড ফার্মের মুরগীর মতো; একটি ছোট্ট রুমে ৬০/৭০/৮০ জনের অমানবিক ক্লাশ। একদিকে ওদের মুল্যবোধ সৃষ্টি না করে, মেধার বিকাশ না ঘটিয়ে ক্লাশের পর ক্লাশ উত্তীর্ণ করা হচ্ছে বা এ প্লাসের নোট ধান্ধায় টাকার ছড়াছড়ি করা হচ্ছে মেধার বিকাশ না ঘটিয়েই, অন্যদিকে আধুনিক নতুন নতুন প্রযুক্তির সম্পৃক্ততা তাদের চোখের নেশা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাহ্যিক চাকচিক্য প্রকৃত সত্যটাকেই আড়াল করে দিচ্ছে তাদের কাছে। স্কুল, বাসা, কোচিং করতে করতে বাচ্চারা  হাঁপিয়ে উঠছে, তাই তারা অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে। 

স্কুল-কলেজে নেই কোন খেলার মাঠ, নেই কারো কোন উৎসাহ উদ্দীপনা, নেই কোন শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ব্যবস্থা। তাই স্কুল-কলেজ থেকে ঘরে ফিরে বসে থাকা, টিভি দেখা বা ট্যাব/ল্যাপটপ/মোবাইল নিয়ে খেলা করা ছাড়া আজকের শহুরে বাচ্চাদের অন্য কোন গত্যন্তরই নেই। এ কেমন জীবন? প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে আশির্বাদ, কিন্তু তা হতে হবে বয়স ও সময়ের সাথে সংগতিপূর্ণ। অসংগতিপূর্ণ যে কোন বিষয় থেকে প্রতিটি  বাচ্চাকে দুরে রাখা উচিত এবং উত্তম। আর বেশি করে বাচ্চাদের উদ্ভুদ্ধ করা উচিত মৌলিক শিক্ষার দিকে। ঠিক মতো যদি একবার মৌলিক শিক্ষা দিয়ে একটি বাচ্চার বিবেক-বুদ্ধি-বিবেচনা জাগ্রত করা যায়, মস্তিষ্কের নিউরনের বিকাশ ঘটানো যায়,  আমার বিশ্বাস সে বাচ্চা আর পিছু ফিরবে না, সে-ই হবে জাতির আগামীর কর্ণধার।

প্রযুক্তি নির্ভরতা বা নির্ভরশীলতা মানুষের চিন্তাশক্তিকে কুক্ষিগত করে দেয়, আর কায়িকশ্রম বা শারীরিক কসরত মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটায় সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভর এই পৃথিবীতে শিশুরা অনেকটা আর্টিফিশিয়াল প্লাস্টিক  ফাইবারের মত হয়ে গেছে। আমাদের দেশে বর্তমানে যে প্রজন্ম জাগরণ উঠেছে তা ভালর চেয়ে খারাপের দিকেই বেশি ধাবিত হচ্ছে। এক জেনারেশন সম্পূর্ণভাবে প্রাচীন ধ্যান ধারনা পোষণ করছে, আর অন্য আরেক জেনারেশন আধুনিকতার চরম উৎকর্ষতায় পৃথিবীর সমগ্র খোঁজখবর জেনেরেখে বেড়ে উঠছে। এতে করে সামাজিক সম্পর্ক ও আত্মিক বিশ্বাস বন্ধনে বিশাল দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। কিছুই না বুঝা যেমন এক ধরনের অভিশাপ, অনেক বেশি বুঝাও ঠিক তেমনই- এক ধরনের পাপ; দু'টোই খারাপ। অভিভাবক ও বাচ্চার মধ্যে তাই দূরত্ব দিনদিন বেড়েই চলছে; অনেক অভিভাবকই এখন বাচ্চাদের মানসিকতার সাথে তাল মিলাতে পারছেন না। তাই অযথা ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি  হচ্ছে এবং বাচ্চারা পর্যায়ক্রমে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। আর সেসব বাচ্চাদের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্যতার বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রযুক্তি নির্ভর বিনোদনের প্রতি আকর্ষিত হয়ে দিনদিন তারা তাদের সব প্রাণশক্তিই হারিয়ে ফেলছে।
 
উন্নত বিশ্বে বয়স ও ক্লাশ নির্ধারণ করে প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারিত থাকলেও আমাদের দেশে এ সবের কোন বাধ্য-বাধকতা নেই। একটি বাচ্চা জন্মেই মোবাইল, কম্পিউটার, ক্যালকুলেটর দেখে দেখে তা ব্যবহার করতে শিখে যাচ্ছে, চালাতেও পারছে। মৌলিক শিক্ষার প্রতি জোর না দিয়ে শুধু দেখে দেখে শিখায় মস্তিষ্কের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন হয় না, এতে স্নায়ুতন্ত্রে কোন ধরনের স্থায়ী ছাপ পারে না, যার ফলে বাচ্চাদের সৃজনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। একটু বড় হলেই দেখা যায় বাচ্চাদের লেখাপড়া মনে থাকছে না, ভালো লাগে না পড়াশোনা! অনেক বাচ্চাকেই লক্ষ্য করেছি তারা সাধারণ বিষয় সহজভাবে শিখতে পারলেও জটিল বিষয় বুঝার জন্য কোন ধরনের চেষ্টাই করে না। পড়ালেখার চেয়ে বরং মোবাইল গেম বা অন্যান্য ডিভাইসের প্রতিই তাদের আকর্ষণ বেশি বেড়ে যাচ্ছে। 

প্রতিদিন নতুন নতুন ডিভাইসের সাথে পরিচয়ের পরিপ্রেক্ষিতে মৌলিক পাঠের প্রতি তাদের খেয়াল একেবারেই কমে যাচ্ছে। লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহের চেয়ে তারা বেশি আগ্রহান্বিত হয়ে পরছে ইলেক্ট্রোনিক ডিভাইস ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি; অনেকটা মোহগ্রস্তও হয়ে পরছে। এই সব বিষয়গুলো নিয়ে আজকাল কেউই তেমন একটা ভাবছে না। স্যারেরা তো এ সব ব্যাপারে গুরুত্বই দেন না, অভিভাবকরাও এড়িয়ে চলেন। ফলোশ্রুতিতে সবকিছুতেই কেমন যেন হযবরল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। আমার মনে হয় এ ব্যাপারে অভিভাবকদের আরো অধিক মনোযোগ ও  গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।  

আমি এমন অনেক বাচ্চাকে দেখেছি এবং চিনিজানি যাদের পারিবারিক বলয় বেশ সুসংহত; তাদের অভিভাবক শুধু তাদের লেখাপড়ার দিকেই খেয়াল রাখছেন না বরং চালচলন, পছন্দ অপছন্দ ও সামগ্রিক সব কিছুতেই দৃষ্টি দিচ্ছেন, বাচ্চাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করছেন। বাচ্চা বুঝের না হওয়া পর্যন্ত নিজেদের প্রযুক্তি নির্ভর বিনোদনও বিসর্জন দিচ্ছেন অনেক পরিবার। আমার মনে হয় এসব পরিবারের সন্তানদের মেধার বিকাশ সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা অনেক ভাল করছে এবং করবে। প্রতিটি বিষয় সার্বিক  বিবেচনায় নিয়ে নিজ বাচ্চার জীবন গড়ার অভিপ্রায়ে প্রত্যেক অভিভাকেরই উচিত  পরিবেশ পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতার সাথে সামাজস্য রেখে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বাংলাদেশে বসবাস করে আমেরিকান মায়ের মত ছেলেকে পর্ণো শিক্ষায় সহযোগীতা করার উদ্ভট চিন্তা আদৌও আমাদের সমাজ ও সামাজিকতায় সম্ভব কিনা তা একবার গভীরভাবে চিন্তা করে দেখা উচিত; অন্যথায় পদে পদে সমূহ বিপদ। 

আমাদের দেশীয় কৃষ্টি-কালচার ও সামাজিক বলয়ে থেকেই আমাদেরকে আমাদের মতো করেই ভাবতে হবে বাঁচতে হবে; আমার বিশ্বাস তবেই প্রজন্ম উন্নত হবে, জাতি মুক্তি পাবে।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
 ২২ জুলাই, ২০১৪. 

শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২০

নামাজের নিয়ত বিভ্রান্তি:

'বিদ'আত   আর   শিরক'- এ   শব্দ   দু'টো আজকাল তথাকথিত এক শ্রেণীর আলেম ও তাদের অনুসারীদের মুখে  খইয়ের মতো ফুটছে! মৃত বাবা-মা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, আত্বীয়-স্বজন, মুমিন-মুমিনাতের কবর জিয়ারতও তারা শিরক বলে কবর পুজার সাথে সামিল করছে! অলি-আউলিয়ার মাজার জেয়ারতকে মাজার পুজা বলে শিরকের সাথে তুলনা করছে! এমন কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম-এর  পবিত্র রওজা মোবারক জেয়ারতকেও শিরক বলছে! 

ওদের নটরাজ দলনেতা নাসির উদ্দিন আলবানী তো আরো কয়েক ধাপ উপরে উঠে দুনিয়াতে রাসুল (সাঃ) বিদ্ধেষী হিসেবেই বেশ খ্যাতি অর্জন করে ১৯৯৯ সালে কবরে গেছেন। হোজ্জা আলবানীর পূর্বসূরি  নুরুদ্দীন জঙ্গীর শাসনামলে চুরি করে হুজুর পাক (সাঃ)-এর পবিত্র  দেহমোবারক রওজা শরীফ থেকে তুলে নিয়ে যেতে সুরঙ্গ পথ খুড়েছিল; আর এই বজ্জাত হোজ্জা আলবানী ফতোওয়া দিয়েছিল, মদিনা মনোয়ারার হুজুর পাক (সাঃ)-এর রওজা খুড়ে তাঁর পবিত্র দেহাবশেষ কিছু পাওয়া গেলে তা সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে, ফেলে দিতে (নাউজুবিল্লাহ!)। এতে নাকি কবর পুজা(!)-র মতো শিরক বন্ধ হয়ে যাবে! 

বর্তমান মুসলমানদের মাঝে যে বিভেদ তা এই শিরকগুরু বজ্জাত আলবানী রোপিত বীজ। মুসলমানদের মাঝে এমন দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার জন্যই এসব করে গেছে, যা এখন ভাইরাস হয়ে সমগ্র মুসলিম জাহানে ছড়িয়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত তার অনুসারিরা মুসলমানের মৌলিক এবাদত নামাজেও হাত দিয়েছে, ঢুকে পড়েছে। 'নামাজে নিয়ত করা ফরজ; কিন্তু নিয়ত মুখে পড়া বিদ'আত!'- এই হলো তাদের বক্তব্য। তাদের যুক্তি, নাওয়াইতুআন নামক শব্দগুলো কোন দিন নবীজি (সাঃ) পড়েন নাই, তার সাহাবা (রাঃ)-গণও পড়েন নাই, তাবেঈরা পড়েন নাই, কেউই পড়েন নাই; কায়েদা বোগদাদী নামক এক ব্যক্তি নাকি এগুলো সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছেন! নামাজকে নাকি তিনি যান্ত্রিক বানিয়ে ফেলেছেন। 

তাদের বক্তব্য— 'নিয়ত হলো ইচ্ছা বা আকাংখা, যখন সন্ধা বেলা মসজিদের দিকে যায় সেটাই মাগরিবের নামাজের নিয়ত। হ্যাঁ, অবশ্যই নামাজ শুরুর আগে কোন নামাজ শুরু করতেছি সেটা লক্ষ করা দরকার। কারণ ফরজ সালাতে দাঁড়িয়ে সুন্নত পড়ছি এমন নিয়ত করলে হবে না। নিয়ত করা ফরজ, নিয়ত মুখে পড়া না। মানে অন্তরে নিয়ত করা ফরজ, মুখে নিয়ত করা বিদ'আত।' - ইত্যাদি ইত্যাদি….... আরো কত কি যুক্তি!

আচ্ছা, ঠিক আছে— আমি যদি মনে মনে নিয়ত করি মুখেও বলি এতে কার কি ক্ষতি? মনে করেন আপনি আসরের নামাজ পড়ার জন্য বাসা থেকে বের হলেন, মসজিদে এসে দেখলেন জামাত দাঁড়িয়ে গেছে, তখন আপনি আল্লাহু-আকবার বলে দাঁড়ালেই তো হয়ে যাবে, কারণ আপনি বাসা থেকে নামাজের জন্যেই (নিয়তে) বের হয়েছেন; এতে কোনই সমস্যা নেই। আবার আরেকজন পাওনাদার বা কাউকে দেখে তাকে এরানোর জন্য তারাতারি অজু করে নাওয়ায়তুয়ান....  বলে জামাতে শরিক হলেন; তার টার্গেট হচ্ছে ঐ লোককে এরানো। এখন সেই ব্যক্তির মনে নামাজের এরাদা না হলে তার নামাজ কি হবে? কোন ভাবেই এতে নামাজ পরিপূর্ণভাবে আদায় হবে না।  নামাজে নিয়ত করা সুন্নত বলে উল্লেখ আছে ইমামে আজম আবু হানিফা (রঃ)-র কিতাবে। আর হোজ্জা আলবানীর যত শ্লেষ তা তো ইমামে আজমের সাথেই! কিন্তু কেন? উত্তর তো অনেক সোজা। দুনিয়াতে হানাফী মাজহাবের অনুসারি বেশিরভাগ; ওদের বিভ্রান্ত করা। 
  
শুধু নামাযের ক্ষেত্রেই নয়, বরং যে কোন কাজের ক্ষেত্রেও নিয়ত করা জরুরি। কারণ নিয়ত সঠিক না হলে তা আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। কিন্তু প্রচলিত নিয়মে মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত পাঠ করার মতো কোন দু‘আ সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়; বরং আপনি মনে মনে যে কাজটি করবেন তার উদ্দেশ্য ঠিক করে নেওয়াটাই নিয়ত হিসেবে গণ্য হয় এবং হবে।

নামাযে আহকাম- আরকান ১৩ ফরজ; আহকাম ৭টি, আরকান ৬টি। এর একটিও অসম্পূর্ণ থাকলে নামাজ সহিহ হবে না। আহকামের ৭টি হলো : ১). শরীর পাক; ২). কাপড় পাক; ৩). নামাযের জায়গা পাক; ৪). সতর ঢাকা; ৫). কিবলামুখী হওয়া; ৬). ওয়াক্ত চিনা; ও ৭). নিয়ত করা। 
অতএব, দেখা যাচ্ছে নিয়ত করা একটি ফরজ কাজ। এটা আরবীতে না করতে পারলেও সমস্যা নেই, তবে অবশ্যই মুখে ফরজ, নফল, সুন্নত যে নামাজই হোক না কেন নিয়ত করতে হবে।
নামাজের ভেতরের ছয়টি ফরজ হলো - ১). তাকবিরে তাহরিমা; ২). কিয়াম করা; ৩). কেরাত পড়া; ৪). রুকু; ৫). সেজদা; ও ৬). শেষ বৈঠক।
 
নামাজ শুরুর পূর্ব থেকে শুরু করে নামাজের শেষ পর্যন্ত মোট এই তেরটি কাজ ফরজ। কোনো নামাজে এগুলোর কোনো একটিও যদি ছুটে যায় তাহলে নামাজ হবে না। সেই নামাজ তখন পুনরায় আদায় করতে হবে।
 
নামাজে এসব ফরজ ছাড়াও কিছু ওয়াজিব আছে এবং সান্নতও আছে। নামাজের ওয়াজিবগুলো হলো—
 ১). ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে এবং অন্যান্য নামাজের প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহা পড়া। 
২). উপরোক্ত রাকাতগুলোতে সুরা ফাতেহার পর অন্য কোনো সুরা কিংবা কমপক্ষে ছোট তিন আয়াত অথবা বড় এক আয়াত পড়া। বড় একটি আয়াতের অংশ যদি ছোট তিন আয়াত সমান হয় তাহলে ততটুকু দিয়েও নামাজ হয়ে যাবে। 
৩). রুকুর পর সোজা হয়ে দাঁড়ানো। 
৪). দুই সেজদার মাঝে সোজা হয়ে বসা। 
৫). তাদিলে আরকান অর্থাৎ ধীরস্থিরতার সঙ্গে রুকু-সেজদা আদায় করা। 
৬). প্রথম বৈঠক অর্থাৎ তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজে দুই রাকাতের পর বসা। 
৭). প্রথম ও শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু পড়া। 
৮). বেতের নামাজে দোয়ায়ে কুনুত পড়া। 
৯). আস্তের জায়গার আস্তে পড়া, জোরের জায়গার জোরে পড়া। ফজর মাগরিব ও ইশার নামাজের প্রথম দুই রাকাতে ইমাম জোরে কেরাত পড়বেন। একাকী নামাজ আদায়কারী জোরেও পড়তে পারেন, আস্তেও পড়তে পারেন। আর জোহর ও আসর নামাজে ইমাম ও একাকী নামাজ আদায়কারী সকলেই আস্তে আস্তে কেরাত পড়বেন। মাগরিবের শেষ রাকাত এবং ইশার শেষ দুই রাকাতেও সকলকেই কেরাত আস্তে পড়তে হবে। 
১০). জুমার নামাজ, ঈদের নামাজ এবং রমজান মাসে বেতের ও তারাবির জামাতে জোরে কেরাত পড়তে হবে। 
১১). নামাজের শেষে ডানে-বামে সালাম ফেরানো। 
১২). ঈদের নামাজের অতিরিক্ত ছয় তাকবির বলা। ও 
১২). নামাজের আমলগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।

নামাজের সুন্নতগুলো হলো— দাঁড়ানো অবস্থায়:- 
১). পরিপূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়ানো; মাথা সামনে বা পেছনে ঝুঁকানো যাবে না। 
২). তাকবিরে তাহরিমার সময় কান বরাবর দুই হাত তুলুতে হবে। 
৩). হাত তোলার সময় হাতের তালু এবং আঙ্গুলগুলো কেবলামুখী করে রাখতে হবে। 
৪). হাত তোলার সময় হাতের আঙ্গুলগুলো স্বাভাবিকভাবে রাখতে হবে; একেবারে মিলিয়েও নয়, আবার পুরোপুরি ছড়িয়েও নয়। 
৫). জামাতের নামাজে ইমাম সাহেবের জন্যে উচ্চস্বরে তাকবির বলা সুন্নত। 
৬). নাভির নীচে হাত বাঁধতে হবে (হানাফী মাজহাব মতে)। 
৭). ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও কনিষ্ঠাঙ্গুলি দিয়ে বাম হাতের কব্জি বৃত্তাকারে ধরতে হবে; অবশিষ্ট তিন আঙ্গুল বাম হাতের পিঠের সোজা বিছিয়ে দিনে হবে। 
৮). তাকবিরে তাহরিমার পর আস্তে আস্তে ছানা পড়তে হবে। 
৯). এরপর আস্তে আস্তে আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়তে হবে। 
১০). সুরা ফাতেহা শেষে আস্তে আস্তে আমীন বলতে হবে। 
১১). বিতির নামাজের তৃতীয় রাকাতে দোয়ায়ে কুনুত পড়ার পূর্বে তাকবির বলতে হবে। ও 
১২). দোয়ায়ে কুনুত পড়ার পূর্বে তাকবিরে তাহরিমার মতো দুই হাত উঠিয়ে তাকবির বলতে হবে।

রুকুতে:- 
১). রুকুতে যাওয়ার সময় তাকবির বলতে হবে। 
২). রুকুতে দুই হাত দিয়ে দুই হাঁটু ধরে রাখতে হবে এবং হাতের আঙ্গুলগুলো ছড়িয়ে রাখতে হবে। 
৩). রুকুতে হাটু পিঠ ও কোমর সোজা করে রাখতে হবে। 
৪). রুকুতে পায়ের নলা ও হাঁটু সোজা করে রাখতে হবে; ওজর ছাড়া হাঁটু সামনের দিকে বাকিয়ে রাখা সঠিক নয়। 
৫). উভয় বাহু পার্শ্বদেশ থেকে পৃথক রাখতে হবে। 
৬). কমপক্ষে তিনবার রুকুর তাসবিহ পাঠ করতে হবে। 
৭). রুকু থেকে উঠার সময় সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ এবং ওঠার পর রাব্বানা লাকাল হামদ পড়তে হবে। একাকী নামাজ আদায়কারীর উভয়টিই পড়তে হবে; আর জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়লে ইমাম সাহেব শুধু সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ পড়তে পারেন, উভয়টিও পড়তে পারেন; আর মুকতাদি শুধু রাব্বানা লাকাল হামদ পড়বেন।

সেজদায়:- 
১). সেজদায় যাওয়ার সময় তাকবির বলতে হবে। 
২).  প্রথমে হাঁটু, পরে হাত, পরে নাক ও এরপর কপাল মাটিতে রাখতে হবে। 
৩). সেজদার সময় চেহারা দুই হাতের মাঝে রাখতে হবে; দুই হাত রাখতে হবে কান বরাবর। 
৪). সেজদার সময় দুই বাহু মাটিতে না বিছিয়ে মাটি থেকে পৃথক রাখতে হবে। 
৫). দুই হাতের বাহু পার্শ্বদেশ থেকে পৃথক রাখতে হবে। 
৬). উরু থেকে পেটকে পৃথক রাখতে হবে। ৭). হাতের আঙ্গুলগুলো মিলিয়ে রাখতে হবে। 
৮). হাতের আঙ্গুলগুলো কেবলামুখী করে রাখতে হবে। 
৯). পায়ের আঙ্গুলগুলো যথাসম্ভব কেবলামুখী করে রাখতে হবে। 
১০). সেজদায় কমপক্ষে তিনবার তাসবিহ পড়তে হবে। 
১১). সেজদা থেকে ওঠার সময় তাকবির বলতে হবে। 
১২). সেজদা থেকে ওঠার সময় প্রথমে কপাল পরে নাক এরপর হাত তুলতে হবে। 
১৩). দুই কিংবা চার রাকাতবিশিষ্ট সকল নামাজের প্রথম ও তৃতীয় রাকাতে সেজদা থেকে ওঠার সময় হাঁটুতে ভর করেই সোজা উঠে দাঁড়াতে হবে; হাত দিয়ে মাটিতে ভর দেয়া কিংবা বসা যাবে না।

বসার সময়:- 
১). দুই সেজদার মাঝে এবং আত্তাহিয়্যাতুর সময় দুই হাত দুই উরুর উপর রাখতে হবে। 
২). ডান পা খাড়া রাখতে হবে এবং বাম পা বিছিয়ে দিয়ে এর উপর বসতে হবে। 
৩). ডান পায়ের আঙ্গুলগুলো কেবলামুখী করে রাখতে হবে। 
৪). হাতের আঙ্গুলগুলো স্বাভাবিক করে রাখতে হবে। 
৫). শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরুদ শরীফ পড়তে হবে। 
৬). দোয়ায়ে মাছুরা পড়তে হবে। 
৭). নামাজ শেষে সালাম ফেরানোর সময় প্রথমে ডান দিকে এবং পরে বাম দিকে চেহারা ঘুরাতে হবে।

এখন বলছি নামাজের কিছু আদবের কথা— 
১). দাঁড়ানোর সময় সেজদার স্থানে দৃষ্টি রাখতে হয়। 
২). রুকুর সময় দৃষ্টি পায়ের পাতায় রাখতে হয়। 
৩). সেজদার সময় নাকের ডগায় দৃষ্টি রাখতে হয়। 
৪). বসা অবস্থায় কোলের দিকে দৃষ্টি রাখতে হয়। 
৫). ডান দিকে সালাম ফেরানোর সময় ডান কাঁধে এবং বাম দিকে সালাম ফেরানোর সময় বাম কাঁধে দৃষ্টি দিতে হয়। 
৬). হাই এলে প্রথমত নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করতে হয়, না পারলে বাম হাতের পিঠ দিয়ে মুখ ঢেকে দিতে হয়; আর যদি হাত বাঁধা অবস্থায় হয় তাহলে ডান হাতের তালু দিয়ে মুখ ঢাকতে হয়। 

নিয়ত আসলে কি? নিয়ত আরবী শব্দ (نية বা نيَّة) অর্থ:  اَلْقَصْدُ وَ الْاِرَادَة উদ্দেশ্য, অভিপ্রায়, অভিলাষ, মনোবাঞ্ছা, মনের ঝোঁক, কোনো কিছু করার ইচ্ছা, কোনো কাজের প্রতি মনকে ধাবিত করা ইত্যাদি; ইংরেজিতে যাকে বলা হয় Intension। আর সংজ্ঞায়িত করতে গেলে এমন করে বলা যায়— Niyyah is an Islamic concept; the intention in one's heart to do an act for the sake of Allah.    
 
ভাষাতত্ত্ববিদদের মতে, মনের মধ্যে কোনো ভাবের উদয় হলে, সে ভাব অনুযায়ী আমল করা কিংবা না করার কোনো দিকেই মন ধাবিত না হলে, মনের ভেতরে ঘুরপাক খাওয়া সে ভাবকে বলা হয় হাদসুন-নাফস বা ওয়াস্ওয়াসা। আর সে ভাবকে বাস্তবে রূপদানের জন্য মনকে ধাবিত করার নাম ‘হাম্ম’ বা নিয়ত (অভিপ্রায়) এবং মজবুত নিয়তকে বলা হয় ‘আযম তথা সংকল্প। 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ মুখে উচ্চারণ করে নামাজের নিয়ত করেছেন বলে  তেমন কোনো প্রমাণ নেই, তাই এটা সুন্নত বলা ঠিক হবে না; তবে অন্তরের সংকল্পের পাশাপাশি মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করায়ও আবার কোনো সমস্যা নেই। অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, উচ্চারণসহ প্রচলিত আরবি বা বাংলা নিয়ত করতে গিয়ে যেন ‘তাকবিরে উলা’ ছুটে না যায় এবং অন্য মুসল্লির মনোযোগে ব্যাঘাত না ঘটে। 

বর্তমান সময়ে অনেকেই বলে থাকেন, ‘মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করা বৈধ নয়; কারণ হাদীসে তো মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করার কথা নেই।’ তাদের এই কথাটিও সঠিক নয়। কারণ, হাদীসে শুধু নিয়ত করার কথা আছে, মনে মনে না মুখে উচ্চারণ করে– এমন কোনো কথা নেই। মুখে উচ্চারণ করার কথাও নেই, মনে মনে পড়ার কথাও নেই। তবে হজ্জের সময় মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করার বিষয়টি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তাই হজ্জের মতো নামাজের মধ্যেও মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করা যেতে পারে; তবে এটি জরুরি কিংবা সুন্নত পর্যায়ের কোনো আমল নয়।

আবার অনেকে মনে করেন, আরবিতে নিয়ত না করলে নামাজ যেন পরিপূর্ণ হয় না। তাই তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফরজ, সুন্নত, বেতের নামাজ, ঈদের নামাজ, জানাজার নামাজ, তারাবির নামাজ, তাহাজ্জুদ নামাজ, ইশরাকের নামাজ, আওয়াবিনের নামাজ বা যে কোন নফল নামাজের ভিন্ন ভিন্ন নিয়ত মুখস্থ করেন; অথচ আরবিতে এভাবে নিয়তের সাথে নামাজ পূর্ণ হওয়া না  হওয়ার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।

মূল কথা হলো, ইবাদত-আমল নিয়ে বাড়াবাড়ি করা মোটেও উচিত নয় বা ঠিক নয়, আবার সবকিছুতে  ছাড়াছাড়িও অত ভালো কিছু নয়। আচ্ছা বলুন তো আপনাদের পূর্ব-পুরুষ বাপ-দাদারা যে মুখেও নিয়ত করে নামাজ আদায় করে কবরে গেছেন, তারা কি তাহলে সবায় জাহান্নামী (নাউজুবিল্লাহ!)? আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং অতি বাড়াবাড়ি থেকে হেফাজত করুন॥

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
১১ জুলাই, ২০২০.   

শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০

মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও ইসলাম অভিন্ন ও এক:

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার ডিজিটাল যুগে এসে নিঃসন্দেহে অবারিতভাবে আমরা আমাদের নিজেদের স্বাধীন মত প্রকাশ করার অনেক সহজ সুযোগ পেয়েছি; যা হওয়া উচিত ছিল ইসলাম প্রচারে একটি অতিব উত্তম মাধ্যম। কিন্তু তা না করে, না জেনে না বুঝে অনেকেই আমরা ধর্মের মত বলে নির্দ্বিধায় নিজের মতকে ইসলাম-এর উপর চাপিয়ে দিচ্ছি এবং নানাবিধ ধারণা ও মত প্রকাশ করে যে যার মতো করে তা প্রচার করছি। কেউ যদি ধর্ম নিয়ে কিছু বলেন বা বলতে চান, লিখেন বা লিখতে চান, আমার মনে হয় সেই ব্যক্তিটিকে অবশ্যই আগে তা বলা বা লিখার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে, নয়তো সমস্যা। 

এরই মধ্যে এদেশের মুসলমানদের মাঝে অনবরত অদ্ভুত ও উদ্ভট একটি ঘটনা ঘটেই চলছে - প্রায় প্রত্যেকেই ইসলাম সম্পর্কে ব্যক্তিগত যে ধারনা তা-ই ফেইজবুকসহ বিভিন্ন ব্লক বা অনলাইন মিডিয়ায় উগলে দিচ্ছেন এবং দিয়েছেন; এসব নিয়েই বর্তমানে এদেশের বেশিরভাগ মুসলিম তর্কবিতর্কে মেতে আছেন। এমনকি, মতের মিল না হলে বড় বড় সব বুজুর্গানে দ্বীন-কেও তারা বিশ্রি ভাষায় খিস্তি-খেউড় করছেন। ধর্ম কিসের জন্যে? নিশ্চয় শান্তির জন্যে, ঐক্যের জন্যে; আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা-কে রাজি খুশি করার জন্যে, সর্বপরি ইহ ও পরকালীন মুক্তির জন্যে। তা-ই যদি হয়ে থেকে থাকে, তবে এসব হচ্ছে কেন?

ভুলভ্রান্তি ধরিয়ে দেয়া আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পক্ষের একটি খাস নিয়ামত। ব্যক্তিগত ভাবে কেউ যদি আমার ভুল ধরিয়ে দেন, আমি মনে করি তা আমার উপর রহমত; যিনি তা করেছেন তিনি আমাকে আশির্বাদ করেছেন। কিন্তু আজকাল অন্যের ভুলভ্রান্তি ধরার কথা বাদই দিলাম কিছু বলতে গেলেও দেখা যায় অনেকেই অনেক সময় বেশ ক্ষেপে গিয়ে তীর্যক কটাক্ষ করে বসেন। অনেকে আবার কথায় কথায় কোর'আন ও হাদিস টানার তালে বা প্রতিটি লেখার দলিল বা রেফারেন্স খোঁজেন। সুরা কামার-এর ১৭ নং আয়াত - وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ  অর্থাৎ - 'আমি কোর'আনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে; অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?' - (সূরা কামারা - ৫৪:১৭) -এর উদ্বৃতি দিয়ে কত জন কত সময় কত কি যে বলেন, তার কোন ইয়ত্তা নেই। তাদের বেশিরভাগেরই যুক্তি হলো - আল্লাহ যেখানে বলেছেন কোর'আন সহজ করে নাজিল করেছেন, তবে এটা বুঝতে কঠিন কি আছে? তারা হয়তো একবারের জন্যও ভাবেন না, উক্ত আয়াতের পরের অংশের 'চিন্তাশীল' শব্দটির কথা।  

চিন্তাশীল ব্যক্তিই হলেন জ্ঞানী। জ্ঞান আসলে কি? এক কথায় জ্ঞান হলো পরিচিত থাকা, কোন কিছু সম্পর্কে বা কারো বিষয়ে জানা বা বুঝা; হতে পারে তা কোন কিছুর প্রকৃত অবস্থা, তথ্য, বিবরণ, বা গুনাবালী সম্পর্কে, যা অর্জিত হয় উপলব্ধির মাধ্যমে, অনুসন্ধানের মাধ্যমে বা শিক্ষা গ্রহণের ফলে অভিজ্ঞ হওয়ায় বা পড়াশুনা করার মাধ্যমে। ইংরেজীতে Knowledge, বাংলায় যা জ্ঞান; Knowledge-এর  সংজ্ঞা দেয়া যায় এ'ভাবে - Knowledge is a familiarity, awareness, or understanding of someone or something, such as facts, information, descriptions, or skills, which is acquired through experience or education by perceiving, discovering, or learning. Knowledge can refer to a theoretical or practical understanding of a subject. 

ভাষাগত সংজ্ঞা যা-ই হউক না কেন, তা অর্জন করতে গেলে অবশ্যই প্রয়োজন পরে শিক্ষার; হতে পারে তা প্রকৃতি থেকে, বা কোন প্রাতিষ্ঠান থেকে। এই পৃথিবীতে অদ্যবধি এমন কোন মানুষ পাওয়া যায়নি যিনি কিনা একই সাথে সর্বজ্ঞানে জ্ঞানী। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানেই প্রতিটি মানুষ বিশেষ জ্ঞানী হয়ে থাকেন; যিনি যে বিষয় নিয়ে চর্চা করেন তার জ্ঞান সে বিষয়ের উপর ততো বেশি হয়ে থাকে। একজন এমবিবিএস ডাক্তারকে যদি পাওয়ার স্টেশন নির্মানের কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়, কেমন হবে?

তবে আমাদের দেশে অনেকেই জীব বিজ্ঞানে মাস্টার্স করে জজসাব হন, বাংলা সাহিত্যে লেখাপড়া করে ইংরেজী বিভাগের প্রধান হন, বিজ্ঞানে লেখাপড়ে শেষ করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি হন। তাই হয়তো এদেশে এখন বেশিরভাগ মুসলমানই মনে করেন ইসলাম জানতে এবং বুঝতে এখন আর বিশেষ কোন শিক্ষার প্রয়োজন নেই, কারো কাছে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই! কোর'আন ও হাদিস বাংলায় অনূদিত হয়েছে; গুগোল সার্চ দিলেই অনলাইনে থাকা সেসব ধর্মীয় জ্ঞান ছোট স্কিনে চোখের সামনে এসে হাজির হয়ে যায়, সেগুলো দেখলে জানলেই হয়। অতএব, সমস্যা কি? ইহ ও পরকাল তো ফকফকা! তাই হয়তো সবাই একেকজন এখন কোর'আন ও হাদিস বিশেষজ্ঞ সেজে সোজা সরাসরি অন্যকে বলে বসেন - দলিল দে!

মাসরুক বর্ণিত একটি হাদিস - আমরা আব্দুল্লাহ বিন আমর এর নিকট গমন করতাম ও কথাবার্তা বলতাম। একদা ইবনে নুমাইর তার নিকট আব্দুল্লাহ বিন মাসুদের নাম উল্লেখ করলো। তখন তিনি (আমর) বললেন - তোমরা এমন একজন ব্যক্তির নাম বললে যাকে আমি অন্য যে কোন মানুষের চেয়ে বেশী ভালবাসি। আমি আল্লাহর রাসুল (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি - চারজন ব্যাক্তির কাছ থেকে কোর'আন শিক্ষা করো; অত:পর তিনি ইবনে উম আবদ (আব্দুল্লাহ মাসুদ)-এর নাম থেকে শুরু করে মুয়াদ বিন জাবাল, উবাই বিন কাব ও শেষে আবু হুদায়ফিয়ার নাম উল্লেখ করলেন। - (সহিহ মুসলিম- ৩১ : ৬০২৪)

সহিহুল বুখারীতে হাদিসটি এভাবে এসেছে- মাসরুক বর্ণিত - আমি রাসুল (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি- চারজন ব্যক্তির কাছ থেকে কোর'আন শিক্ষা করো, তারা হলো - আব্দুল্লা বিন মাসুদ, সালিম, মুয়াদ ও উবাই ইবনে কাব। - (সহি বুখারি, ভলিউম-৬, বই -৬১, হাদিস-৫২১) এখন আর এ কথাটি বলতে  অবশ্যই কোন দ্বিধা নেই, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-ই সেই সময়ও বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে দিয়েছেন। অতএব, সারে চৌদ্দশ বছর পর এসে আমরা নিজেরাই অনলাইন ঘেটে যদি একা একাই সর্বজ্ঞানে জ্ঞানী সেজে যাই, তবে কেমনে কি?

আমার ধারণা, কোর'আনের আয়াত বিচ্ছিন্ন ভাবে পড়লে আয়াতের সঠিক অর্থ বুঝা খুবই কঠিন। আয়াতের অর্থ বুঝতে গেলে অবশ্যই আগে পিছের আয়াতগুলো ভালভাবে পড়তে হবে জানতে হবে। আয়াতের পটভূমিকা বা শানে নুযুল জানাও অত্যন্ত জরুরী; অর্থাৎ কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে কোন আয়াত নাজিল হয়েছিল তা জানতে হবে। তা না হলে আয়াতের সঠিক অর্থ বুঝা কঠিন বা মোটেও বুঝা যাবে না। এবং পুরোপুরি সঠিক অর্থ জানতে হলে অবশ্যই আরবী ভাষা জ্ঞানও থাকতে হবে, অর্থাৎ আরবী বুঝে কোর'আন পড়তে হবে। তাছাড়া কোর'আন ও হাদিস-এর একটি ধারাবাহিকতা আছে; এর সার্বিক ইতিহাস ও ঘটনাপ্রবাহও ভালভাবে জানতে হবে। জীবনের সাধারণ বিষয়ে যদি শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার জন্য দক্ষ একজন শিক্ষক বা ওস্তাদের প্রয়োজন থেকে থাকে, তবে ধর্ম কর্ম শিক্ষা এমনি এমনিই হয়ে যাবে যারা ভাবেন, তাদের ভাবনাটি আমি বলবো সঠিক নয়, পুরোপুরি ভুল। তাই, সঠিক পথ অন্বেষণ করতে হবে, ওস্তাদের কাছে যেতে হবে। সঠিকতা যাচাই করে তা-ও নিজেকেই বুঝে নিতে হবে এবং তা করতে হবে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে।

হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত - আমি হাসিম বিন হাকিম-কে রসুলুল্লাহ (সাঃ)-র জীবনকালেই সুরা ফুরকান তেলাওয়াত করতে দেখলাম এবং লক্ষ্য করলাম ভিন্ন পদ্ধতিতে সে তা তেলাওয়াত করছে, যা রাসুল (সাঃ) আমাকে শিক্ষা দেন নি। আমি তার উপর ঝাপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করলাম। অতঃপর আমি তার ঘাড় ধরে তাকে জিজ্ঞেস করলাম - কে তোমাকে এই সূরা শিখিয়েছে, যা এই মাত্র আমি তোমাকে তেলওয়াত করতে শুনলাম? সে উত্তর দিল - আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আমাকে এটা শিখিয়েছেন। আমি তাকে বললাম - তুমি মিথ্যা কথা বলছো; কারণ রাসুল (সাঃ) আমাকে তোমার থেকে ভিন্ন পন্থায় এটা শিখিয়েছেন।

সুতরাং আমি তাকে টানতে টানতে রাসুল (সাঃ)-এর কাছে নিয়ে গেলাম এবং বললাম - এই লোক সুরা ফুরকান এমনভাবে তেলাওয়াত করেছে যা আপনি আমাকে শিক্ষা দেননি। তখন রাসুল (সাঃ) বললেন - তাকে মুক্ত করো হে হিসাম, তুমি আবার তেলাওয়াত করো। সে তেলাওয়াত করলো সেভাবেই যা আমি শুনেছিলাম। তখন আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বললেন - এটা এভাবেই নাজিল হয়েছিল এবং বললেন - ওমর, তুমিও তেলাওয়াত করো। আমি সেটা তেলাওয়াত করলাম যেভাবে রাসুল (সাঃ)   আমাকে শিখিয়েছিলেন। তিনি বললেন - এটা এভাবেই নাজিল হয়েছিল। কোর'আন সাতটি ভীন্ন উচ্চারণে নাজিল হয়েছিল , সুতরাং তোমরা যেভাবেই পারো, সেভাবে তেলাওয়াত করো। - (সহিহুল বুখারি, ভলিউম- ৬, বুক - ৬১, হাদিস- ৫১৪)

পবিত্র কোর'আন ও হাদিস আজ আমরা যেভাবে সহজে পাচ্ছি, আগের দিনে তা হাতের কাছে পাওয়া অত সহজ ছিল না। বর্ণনা ও ব্যাখ্যারও সঠিকতা, নির্ভরতা এবং একটি ধারাবাহিকতা আছে; সঠিকটা  আমাদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে -  মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও ইসলাম এক ও অভিন্ন। ইসলামের বৃহৎ স্বার্থে ব্যক্তিগত ইগো ও ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দুনিয়ার প্রত্যেক মুসলিম এক কাতারে দাঁড়ানোটা এখন খুবই জরুরি। সে ভুল আমি সঠিক, এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে।।       

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
৭ ডিসেম্বর, ২০১৭.

বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২০

স্মার্ট কার্ডধারী নয়, হতে হবে স্মার্ট মস্তিস্কধারী:

১. 
নগর জীবনের শত দূষণ, খাদ্যে ভেজাল ও শত প্রতিকূলতা থেকেই হয়তো ইদানিং মানুষের নানান সব নতুন নতুন রোগশোক হচ্ছে এবং শারীরিক মানসিক অসুবিধা বেড়ে যাচ্ছে, শরীরে গ্যাস আটকে অনেকের জীবনে মারাত্নক বিপদ নেমে আসছে। পাকস্থলিতে ভেজাল খাদ্যের বিষ জমে তা গ্যাস হচ্ছে, পরবর্তিতে সেসবে হৃদপিন্ড চেপে ধরছে এবং হটাৎ ষ্টোক করে মানুষ মারা যাচ্ছে। কয়দিন ধরে এমন সব মৃত্যুর দুঃসংবাদই বেশি পাচ্ছি। আমার শরীরেও এইরকম ভয়ানক ভয়াবহ এক ধরনের পাজি গ্যাস উৎপন্ন হয়েছিল - যা কয়দিন আগে বেশ ভাল করে টের পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল পুরো শরীরটা একটা গ্যাস চ্যাম্বারে পরিণত হয়েছে, যে কোন সযয় ফেটে যাবে। না পারতাম শুইতে, না পারতাম বইতে। অগত্যা ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হলাম। 

এক ছোটভাই ডায়াগনস্টিক ও ডক্টরস চেম্বারের ব্যবসা করে, তার কাছে বলতেই সে আমাকে একটা ট্যাবলেট খেতে বলল - তৎক্ষনাৎ খেয়ে বেশ আরাম পেলাম। কিছুটা সুস্থ্য হতেই বিকেলে তার কাছে ছুটলাম। নামিদামি সব বড় বড় ডাক্তার তার সেন্টারে বসেন। সব শুনে ভেবেচিন্তে ছোটভাই যে ডাক্তারের কাছে পাঠালো তিনি এদেশের একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের স্বনামধন্য একজন প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান। তাঁকে সব খুলে বললাম - আমার পেটে প্রচুর গ্যাস। মাঝেমধ্যেই মনে হয় তা সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পরছে, বিশেষ করে পায়ে ও পিঠে। যখন গ্যাস শরীরে ছড়ায় তখন কোমড়ের পিছন সাইট ও রান প্রচন্ড ব্যথা করতে থাকে।
 
কিছুটা শুনে এবং পেটেপিঠে দু-একটা টিপটাপ দিয়ে ডাক্তার সাহেব প্রেসকিপশনে লম্বা একগাদা টেস্ট লিখে দিয়ে বললেল - এইসব করে আসুন। তখন খেয়াল করিনি - প্রেসকিপশনে তিনি কোন ঔষধের নামই লেখেননি। সারা পৃষ্টা জুড়ে শুধু টেস্ট আর টেস্টের নাম। সেসবের মাঝে এমন একটা টেস্টও দিলেন যা তাঁর মনোনীত জায়গা থেকেই করাতে হবে। কোলনোস্কপি করতে বললেন তাঁর নিজেস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে - যা আমা হতে বেশ দূরে এবং তাঁর মেনশন করা নির্দিষ্ট ডাক্তার দিয়েই করাতে বললেন।

যাই হউক, ডক্টর ভিজিট দিয়ে ভাইয়ের ক্লিনিকেই অন্যসব টেস্টগুলো করতে দিলাম এবং দূরে হলেও গাড়ি টান দিয়ে কোলনোস্কপি করতে ডাক্তার মনোনীত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গেলাম। গিয়ে দেখি তা অতটা উন্নত নয়, সেখানকার পরিবেশ দেখে আমার মোটেও পছন্দ হলো না। তাও, যেয়ে যা জানলাম শুনলাম তাতে ঐ প্রফেসরের প্রতি আমার শ্রদ্ধাভক্তির পুরোটাই উবে গেল। শালার নটি প্রফেসর! মনে হয়, এই বেটা অযথা সব টেস্টফেস্ট দিয়ে শুধু শুধুই রোগিদের হয়রানি করেন। এত বড় শিক্ষিত ও বয়স্ক মানুষ(!) হয়েও কেন যে তাঁরা এইসব করেন বোধগম্য হলো না।

অবশ্য এরই মাঝে স্ত্রী-কে নিয়ে অন্য এক ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। স্ত্রী-র ডাক্তার তাঁর ডক্টরস ডাইগনসিস ও প্রেসকিপশন শেষে আমার শারীরিক সাময়িক অসুবিধার কথা শুনে একই প্রেসকিপশনের উল্টো পৃষ্টায় দু'টো ঔষধের নাম লিখে পনের দিন নিয়মিত তা খেতে বললেন (ডাক্তার সাহেব দশ বছর ধরে আমার স্ত্রী-র নিয়মিত চিকিৎসা করছেন)। ঐসব টেস্টফেস্টের কথা আমি আর তাঁর কাছে তুলিওনি তিনিও কিছু করাতে বলেননি। তাঁর সাজেশন মতো ঐ দু'টো ঔষধ খেতে শুরু করলাম। আল্লাহর অশেষ রহমত ও মেহেরবাণী - এখন অনেকটা সুস্থ্যবোধ করছি; সেই সমস্যা আর আপাতত নেই। ঐ নটি  প্রফেসরের কাছে আর যাওয়াই হয়নি।

খুব বেশি দুঃখ লেগেছিল তখন যখন দেখেছিলাম - নটি প্রফেসর আমার প্রেসকিপশনে একটা ঔষধের নামও লেখেননি। কমপক্ষে একটা এন্টাসিড প্লাস তো তিনি তৎক্ষনাৎ আমাকে দিতে পারতেন? তাও  শান্তনা থাকতো - প্রফেসর অতসব ডিগ্রী নিয়ে বুদ্ধি খাটিয়ে অন্তত রোগির ব্যাথার মুখে একটা ঔষধ দিয়েছেন; তাছাড়া আমার কাছ থেকে নেয়া তাঁর ফি-টার দাবিও নিঃশর্ত ছেড়ে দিতাম, মনে হয় তাতে তাঁর জন্য ফি-এর টাকাটাও হালাল হয়ে যেত। ভাবি - এইভাবে অনাচার করে এতসব সম্পদ কামিয়ে জমিয়ে কবরে গিয়ে কি লাভ? না কি, এরা সারাজীবন বেঁচে থাকবে, কখনো কবরে যাবে না? এমন সম্পদ দুনিয়াতে ছেলেমেয়ের জন্য রেখে গেলেই-বা লাভ কি? টেষ্ট করে যান্ত্রিক ডায়াগনসিস হলে ডাক্তারের এতসব পড়ালেখার কৃতিত্ব বা মূল্যটাই-বা কি?  

ডাক্তার মানেই ডাকাত নয়, সব ডাক্তারই খারাপ নয়। এদেশের অতি সাধারণ মানুষের মাঝে জনশ্রুত কিছু বাজে উদাহরন থাকতেই পারে।  সব জায়গায়ই ভাল মন্দ আছে, থাকবেও; আর থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই বলে ঢালাওভাবে সকল ডাক্তারকে দোষারোপ করা ঠিক না। এদেশে অনেক সৎ ও ভাল ডাক্তারও আছেন। এইসব সৎ, বুদ্ধিমান ও নিবেদিতপ্রাণ ডাক্তাররাই কিন্তু আমাদের এই ছোট্ট ভূখন্ডের বিশাল জনগোষ্টির  চিকিৎসা সেবা সামলাচ্ছেন, সূচারুভাবে সম্পন্ন করে যাচ্ছেন। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যেসব দেশে এখনো অন্য দেশ থেকে ডাক্তার ইমপোর্ট করতে হয় এবং তা করেই সেদেশের সরকারকে চিকিৎসা সেবা সামলাতে হয়। 

মহৎ এই সেবামূলক পেশাটার বদনাম হয়তো ঐ নটি প্রফেসরের মতো অতি অর্থলোভি লোকগুলোই করছেন। অসহায় যেসব রোগি চিকিৎসার জন্য তাঁদের কাছে আসে, তারা সবাই এইসব বাজে ডাক্তারের লালসার শিকার হন, টেস্টের নামে প্রতারিত হন। অসহায় কাতর রোগিদের অভিশাপ কিন্তু এইসব রোগীখেঁকো ধোঁকাবাজ ডাক্তারদের গায়ে লাগবেই লাগবে। সত্যমিথ্যা ডিগ্রির পান্ডুলিপি সাজিয়ে টোপ ফেলে এদেশের অতি সাধারণ অসহায় গরিব রোগিদের যারা জিম্মি করে ঠকাচ্ছেন, টেস্টের নামে হয়রানি ও নানাবিধ প্রতারণা করে টাকা কামাচ্ছেন, নিশ্চয় তারা কোন দিনও কোনখানে ভাল থাকতে পারবেন না, ব্যক্তিজীবনে সুখি হতে পারেন না। এমন অনেক মানুষকেই আমি চিনি ও জানি যারা পারিবারিক জীবনে খুবই অসুখি এবং বার্ধক্যে এসে সাহায্যহীন ও প্রচন্ড অসহায় হয়ে পরেছেন।

অবশ্য, প্রায় সব পেশায়ই আজকাল  বানিজ্যিকিকরণের হাওয়া লেগেছে এবং সমাজে অতি মুনাফাখোরদের সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেবা বা পূন্য মানসিকতায় এখন আর এদেশে অনেকেই কিছু করতে চায় না বা করেন না। কি চিকিৎসা, কি অন্য কোন সেবা বা ব্যবসা বানিজ্য - সবখানেই আজ অনিয়ম; কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিয়মই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার, উকিল, ব্যারিষ্টার, শিক্ষক, শ্রমজীবী, পেশাজীবী, দোকানদার, হকার, ভিক্ষুক সবার মাঝেই দেখা যায় কিছু লোকজন এখন প্রচন্ড এগ্রেসিভ বানিজ্যিক মানসিকতা সম্পন্ন, শুধু টাকা কামানোর ধান্ধা করছে; যা আমাদের কৃষ্টি কালচারের সাথে মোটেও যায় না। আমি মনে করি - কর্মের প্রতিটা ক্ষেত্রে প্রতিটা মানুষ আন্তরিকতার সাথে সাধ্যমত প্রচেষ্টা করলে শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন পাবেই, জীবনে চলার পথ মসৃণ হবেই। শুধু অর্থপ্রাচুর্য দিয়ে সুখ কেনা যায় না।

দেশ সেবকরা এখন দেশ সেবার নামে নেমেছে ভন্ডমিতে, পেশাজীবীরা ঐক্কের নামে দেশবাসিকে করছে জিম্মি, শ্রমজীবীরা দাবীর নামে করছে বাহানা, ভিক্ষুকরা ধরেছে ছদ্দবেশ। কোথায়, কার সাথে কি করবো কার কাছে কি বলবো? ভিক্ষুকরাও আজকাল বানিজ্যিক হিসাব মিলিয়ে চলে - দু টাকা দিলে আড়চোখে তাকায়। কেউ দশজন মিসকিন খাওয়াতে ইচ্ছে করলে, সম্ভব হবে না; তাদের পাওয়া গেলেও শুধুমাত্র খাওয়ার জন্য তারা আসবে না। শহরাঞ্চলে দিনমজুর কিছুটা মিললেও গ্রামে নাকি ক্ষেতে কাজ করানোর মত কোন লোকই পাওয়া যায় না। 

আপনি স্বীকার করুন আর নাই-বা করুন দেশ কিন্তু অনেক এগিয়েছে। কিছু রাজনৈতিক জটিলতা, কিছু তথাকথিত সুশীলের হীনমন্যতা-কূটচাল, বিচ্ছিন্ন কিছু সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও নানাবিধ প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমাদের জীবনযাত্রার মান কিন্তু ঠিকই বেড়েছে এবং প্রতিটি সূচকে দেশের উন্নতির ধাপ তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। শত প্রতিকূলতা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও উন্নয়ন অগ্রগতি কিন্তু থেমে নেই, ঠিকই চলছে। এদেশের খেটেখাওয়া সাধারণ মানুষ উন্নয়নের এই চাকা ঠিকই ঘুরাচ্ছে। মনে রাখতে হবে - রাতারাতি সব কিছু পাল্টে যায় না যাবে না, ইচ্ছে করলেও এমন কিছু হয় না হবে না। আমাদের ভাবতে হবে - এতো বিশাল জনগোষ্টির এই ছোট্ট ভূখন্ডটার কথা; এতো এতো মানুষের ভার বহন করা তার পক্ষে কতটা কঠিন।

২.
কয়বছর ধরে লক্ষ্য করছি নগর জীবনে রাস্তাঘাটে মারাত্মক এক উটকো ঝামেলা করছে নপুংসকরা। ওরা আগে এলাকা ভিত্তিক পাড়া মহল্লার সব দোকান থেকে দু-চার টাকা চেয়ে নিত। যে যা দিত তাই নিয়ে তারা খুশি মনে চলে যেতো, তেমন একটা গন্ডোগল পাকাত না। এখন তারা প্রতি রাস্তার মোড় দখল করে দলবলে দাঁড়িয়ে থাকে। স্ত্রী সন্তান এমন কি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে কোথাও বের হলেও ওদের খপ্পরে পরে লজ্জা পেতে হয়। কয়দিন আগে একটা বিষয় জানতে পারলাম - ওরা নাকি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। সুস্থ সবল কিছু পুরুষও নাকি আজকাল অপারেশন করিয়ে এই নিকৃষ্ট পেশায় যোগ দিচ্ছে, তৃতীয় লিঙ্গের 'ওঁরা' হয়ে জঘন্য সব অপরাধ করছে। এইসব 'ওঁরা'-দের বাড়াবাড়ি বর্তমানে সহ্যের চরম সীমা ছাড়িয়ে গেছে।  

আচ্ছা, আমরা সাধারণরা, অর্থাৎ সাধারণ জনগণ কি ওদের কোন কিছুই করতে পারি না? সব কিছুই কি সরকারকে করে দিতে হবে? মাঝেমাঝে ভাবি- '৭১-এ এদেশের সেই সহজসরল মানুষ, চাষাভূসা অশিক্ষিত দিনমজুর, আমাদের পূর্বপুরুষ একটা গোটা দেশ ও জাতিকে কি করে স্বাধীন করেছিলেন? এখন আমরা সব কিছুতেই ছুঁতো খুজি, সরকার খুজি, অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমরা কি আসলেই সেই বীর বাঙ্গালির বংশধর?    

একটু ঘার ত্যাড়া হয়ে দলবদ্ধভাবে এখন আর আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চাই না। ঘার ত্যাড়া করে গরম চোখে ঘুরে দাঁড়ালেই হয়তো অনেক ছোটখাটো সামাজিক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায় যাবে; উটকো কোন 'ওঁরা'-ই তখন আর আমাদের সামনে টিকে থাকতে পারবে না, জীবনযাত্রায় বাধা হতে পারবে না। সামাজিক এইসব ছোটখাটো অনাচার আমরা নিজেরাই অনেকটা দূর করতে পারি। গতকাল সোনারগাঁ মোড়ে আমি যখন ঘার ত্যাড়া করে 'ওঁরা'-র দিকে তাকিয়েছিলাম, সুবিধে হবে না বুঝে সে এমনিতেই সটকে পরে অন্য একজনের ধান্ধায়। চলতে চলতে দেখি আমার ড্রাইভারের মতো আশপাশের অন্যরাও সেইসব 'ওঁরা'-দের তামাশা দেখছে। হায়রে আমাদের অসুস্থ্য মানসিকতা!

আমাদের মূল্যবোধ, সামাজিক জীবন ও সমাজব্যবস্থার পুরো কাঠামোটাই এখন কেমন যেন ফিকে ও নড়বড়ে হয়ে গেছে, যে যার মতো ধান্ধা নিয়ে ব্যস্ত। লৌকিকতা বা লোক দেখানো বিষয়গুলো এখন কেমন যেন একটু বেশি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। অন্তঃসারশূন্য বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে বধ করে অনেকে চায় পুরো জাতিকে গ্রাস করতে। মোল্লা মৌলভী শিক্ষক বুদ্ধিজীবী চাকুরিজীবী ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ সমাজ বিজ্ঞানী সবাই - প্রায় সবাই এখন সমাজ নিয়ে যে যার মতো ধান্ধাবাজিতে মেতে আছে। দেশের সামগ্রিক কল্যাণের কথা কেউ মোটেও ভাবছে না। কখন কেমন করে সবাই যেন গন্ডালিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়ে এক ধরণের 'ওঁরা' হয়ে গেছে।

আগে বাবা, পিছে ছেলে। ছেলে লাঠি হাতে বাবাকে তাড়া করছে, দৌঁড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বড় ক্ষেত পাড় হয়ে বাবা থেমে গেলেন, 'থাম থাম বাবা, আর পারছি না। আমি আমার বাবাকে তিন ক্ষেত আগের ঐ লাইলে এনে ঠেকিয়েছিলাম। তুই আমাকে তার তিনগুণ বেশি নিয়ে এলি - বড় ক্ষেতের শেষ সীমানায়। নিশ্চয় তোর ছেলে তোকে আরো বেশি দৌঁড়িয়ে নিয়ে যাবে; প্রস্তুত থাকিস সেদিনের জন্য। আমাকে আরো বেশি দৌঁড়ালে সেদিন তোর অনেক বেশি কষ্ট হবে, সহ্য করতে পারবি না। তাই বলছি - আজ আর বাড়িস না বাবা, থেমে যা।'

এই দুনিয়াতে যে যা বা যতটুকো করবে, একদিন তার পুরোটাই তাকে এই ইহজগতেই ফিরে পেতে হবে, বরং তিনগুণ হয়ে ফিরে আসবে। আমি বিশ্বাস করি এটাই স্রষ্টার বিধান, মানুষের কর্মের আসল হিসাবনিকাষ। আসলে, হিসাবনিকাষ কি শুধুই পরকালে? - মোটেই না। উপরওয়ালা এপাড়েও অর্থাৎ পৃথিবীতেও সুদেআসলে তিনগুণ বুঝিয়ে দেন বা পাইয়ে দেন; ভালোর ফল তিনগুণ ভাল হয়, খারাপের ফল তিনগুণ খারাপ। খোলা চোখে সাময়িকভাবে আমরা হয়তো এসব বুঝি না বা বুঝেও স্বীকার করতে চাই না, চোখ বন্ধ করে অন্তর দিয়ে নিজের জীবনের অধ্যায়গুলো নিয়ে একটু ভাবুন - নিশ্চয় মিলে যাবে, জীবনের সহজসরল হিসাব অনায়াসে মিলাতে পারবেন।

এই ক্ষুদ্র জীবনেই তো আর কম কিছু দেখলাম না। অর্থের প্রাচূর্যে মাটিতে যাদের পা পরতো না তাদের দেখেছি  অন্যের করুণা ভিক্ষা করতে, সদগা যাকাতে জীবন কাটানো মানুষকেও দেখেছি অসীম সম্পদের মালিক হতে। এতো এতো ধনদৌলতের মালিক, কত কত ছিল তাদের প্রতিপত্তি ক্ষমতা - গাড়িতে কারো কারো জাতীয় পতাকাও উড়েছিল; বড় বড় সব দাগী আসামি - চিহ্নিত রাজাকার; আল্লাহর মাইর থেকে তারাও বাঁচতে পারেননি। অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পঁচেগলে শেষমেস ফাঁসিতে ঝুলে নিকৃষ্টের মতো তাদের মরতে হয়েছে। 

আগের দিনে ময়মুরুব্বিরা বলতেন - এমন একদিন আসবে যেদিন আঘাট ঘাট হবে, আরাস্তা রাস্তা হবে, আমানুষ মানুষ হবে। হ্যাঁ - সব আঘাটই ঘাট হয়েছে। এক সময় যেখান দিয়ে ভয়ংকর কোন প্রাণীও যেতে সাহস করত না আজ সেখান দিয়ে মানুষ নির্ভয়ে যাতায়াত করছে, অর্থাৎ সব আরাস্তাই আজ রাস্তা। কিন্ত কই, কোন আমানুষ-ই তো মানুষ হলো না? বরঞ্চ, দেশে আমানুষের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে, বেড়েই চলছে। দলেদলে নতুন নতুনভাবে মানুষ আমানুষে পরিবর্তিত  হচ্ছে, যুগের চাহিদানুযায়ি নতুন ধাচের সব আমানুষ হচ্ছে এবং ওই দল ভারি করছে।

আগের মানুষ ন্যায় অন্যায় নিয়ে খুব বেশি ভাবতেন, অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করতেন। একা না করতে পারলে সবাইকে নিয়ে একজোট হয়ে প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু এখন? দুই জন একজোট হলে তিন জন ষড়যন্ত্র করতে থাকে। সমাজে বেশিরভাগ লোক এইসব নিয়ে মোটেও এখন আর মাথা ঘামায় না। বরং কারো কারো ভাবনা এমন - করুক না, আমার তো কোন ক্ষতি হচ্ছে না। তারা চোখের সামনে অন্যায় হচ্ছে পাপচার হচ্ছে দেখেও না দেখার ভান করে। আজকের এই সামাজিক অবক্ষয় অধঃপতনের দায় থেকে তারা মোটেও নিষ্কৃতি পাবে না। আমি তাদেরকেই বড় দোষী এবং বড় অপরাধী মনে করি।

৩.
খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। কয়দিন আগে স্মার্টকার্ড তুলতে গিয়ে দেখি লম্বা লাইন। প্রথমবার ফিরে এলাম, দ্বিতীয়বার গিয়ে দেখলাম  মহল্লার ময়মুরুব্বীরা সবাই লাইনে দাঁড়ানো। অনেককে দেখলাম বয়সের ভারে ঠিকমত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেও পারছেন না, তাও অবৈধ সুযোগের প্রত্যাশা না করে নিরবে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন; লাইনের অনেক পিছনে আমিও দাঁড়িয়ে গেলাম। কত কি ভাবছি - এতো দিনে আমরা মানুষ হওয়ার পথে। আগের চেয়ে আমরা অনেক স্মার্ট হয়েছি; সরকারের এই স্মার্টকার্ড প্লানিং সার্থক মনে হলো।

চুপচাপ আনমনে এসব ভাবতে ভাবতে কতটা ক্ষণ পার করেছি খেয়াল করিনি। কিন্তু হটাৎ মনে হলো অনেকক্ষণ ধরে আমরা যেন ঠিক একই জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, লাইন একটুও আগাচ্ছে না। সামনের জনকে জিজ্ঞেস করতেই বুঝলাম বুথের মুখে বা ভিতরে কোন কিছু ঘটছে। লাইনে আমার অবস্থান ঠিক রাখার অনুরোধ অন্যদের করে আমি এগিয়ে গেলাম। দেখি পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকা সত্তেও লাইনে থাকা স্থানীয় এক উঁচবুক নিয়ম ভঙ্গ করে লাইন না ধরাদের ফাঁক দিয়ে স্লিপ পাইয়ে দিচ্ছে। কেউ কিছু বলছে না কারণ সে মহল্লার 'উঁচবুক'। এসব দেখে আমার আরো বেশি রাগ হলো, চুপ থাকতে পারলাম না। নির্দিষ্ট একটা ছোট্ট মহল্লার স্মার্টকার্ড বিতরণ করছে এখানে, কেউ কারো অপরিচিত নন। তারপরও এমন? 'উঁজবুক'-কে কিছু একটা বলতেই দেখলাম সে লজ্জা পেয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে। 

চোখের সামনে অন্যায় অনিয়ম ঘটতে দেখলেই আমাদের প্রত্যেকের তার প্রতিবাদ করা উচিত, করতে হবে; সামাজিক এইসব ছোটখাটো অনাচার দূর করতে হবে, অবক্ষয় রুখতে হবে। অন্যথায় অপরাধী অপরাধ করতেই থাকবে, এক সময় অপরাধী অপরাধে অভ্যস্ত হয়ে যাবে এবং অন্যকে অপরাধে উদ্ভুদ্ধ করবে। মনে রাখতে হবে, যে অন্যায় করে তার মন এমনিতেই ছোট হয়ে থাকে। অন্যায়কারী বাহ্যিকভাবে বুঝাতে চায় সে সবল; প্রকৃতপক্ষে অন্যায়কারী কখনো সবল হয় না, সব সময়ই দূর্বল থাকে। কেউ কিছুটা সাহস করে প্রতিবাদ করলেই দেখা যাবে - অপরাধী চুপসে গেছে। কোন বাধা না পেলে তারা লাই পায়, এক সময় মহাঅপরাধ করে বসে।

একজন শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে অত্যন্ত লজ্জার, ঘৃণার এবং খুবই পরিতাপের বিষয় - যারা প্রজন্ম তৈরি করবে সেইসব আদর্শের প্রতীক শিক্ষকরাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত এবং ধরাও পরেছে। আমার মতে এদের দৃষ্টান্তমূলক প্রত্যক্ষ শাস্তি হওয়া উচিত; আর যেন কোন শিক্ষক এমন দৃষ্টতা না দেখাতে পারে। না বুঝে কিছু  ছাত্রছাত্রী ফাঁকতালে গোল্ডেন পেয়ে যাবে। কিন্তু এতে লাভ কি হবে? প্রশ্নপত্র ফাঁস করা ও সেসব দেখে পরীক্ষা দেয়া যে মহা অন্যায়, মহাপাপ। এইসব করে জ্ঞান তো আর অর্জন করা যায় না, যাবে না। যারা এসব করছে তাদের কাছে তা সাময়িক অন্যায় অপরাধ না মনে হলেও হতে পারে, কিন্তু একটা কথা সবার মনে রাখা উচিত - জ্ঞান সৃষ্টিকর্তার এক অপার কৃপা। 

অপরাধ করে ধরা খেয়েছে, তারপরও অনেকের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয় - না তারা কোন পাপ করেছে, না তারা অপরাধ করেছে; তাদের যেন কোন অপরাধবোধ ও লজ্জাবোধ নেই। আসলেই এই শ্রেণির লোকদের মোটেও লজ্জা নেই, নেই কোন অনুসূচনা। এক কান কাঁটা গেলে নাকি ফিরে ফিরে চায়, দু কান কাঁটা পরলে উলঙ্গ হয়ে যায়। তখন আর তাদের কারো লজ্জাশরমের বালাই থাকে না। নিউজে জানলাম রাজধানির এক স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রশ্নপত্র ফাঁস করলেন স্কুলের সমগ্র ছাত্রছাত্রীকে গোল্ডেন জোয়ারে ভাসাতে; কথাটা ভাবতেও লজ্জা লাগছে। কিছু অথর্ব আবার বিজ্ঞাপন দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবার চোখের সামনে সেইসব ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র বিক্রি করেছে। ধিক্! এইসব জানোয়ার মার্কা লোকদের, শিক্ষক নামধারি দূর্বৃত্তদের।
 
নিজেকে চোরের সর্দার হিসেবে জাহির করাটা এখন আর তাদের কছে লজ্জা অপমানের কোন বিষয় নয়, বরং এটা এখন তাদের কারো কারো কাছে গর্বের ব্যাপার। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে গোল্ডেন পেতেও কেউ কেউ মরিয়া হয়ে উঠে। ওসব পাপ অন্যায় করতে তারা এতটুকো কুন্ঠাবোধ করে না, কোনরকম অপরাধবোধেও ভোগে না। কিন্ত এমন গোল্ডন পেয়ে লাভ কি? পথের ফকির থেকে দামি মন্ত্রী, সবখানেই কেউ কেউ এখন উল্টো পথে হাঁটতে চায়। তারা হয়তো ভাবে উল্টো পথে চলতে পারলেই দ্রুত ক্ষমতাবান হওয়া যায়, কূট-মন্ত্রনা দিয়ে মন্ত্রী হওয়া যায়। কিন্তু মনে থাকে যেন - আল্লাহর মাইর, দুনিয়ার বাইর।

৪.
আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন এদেশে শিক্ষিত লোকের সংখ্যা ছিল নেহায়েতই হাতেগোনা। দু-চার-দশ গ্রাম খুজলে দু-চারজন গ্রাজুয়েট পাওয়া যেতো, আর এখন গ্রাজুয়েশন করা লোকজন ডাল-ভাতের মতো। অথচ - নীতিনৈতিকতা আমাদের তলানিতে নেমেছে।

আমাদের বাপ-দাদার বেশির ভগেরই জীবন ও জীবিকা ছিল কৃষি। যার যত বেশি হাল ছিল তখনকার দিনে তাঁর ততো বেশি সম্মান ছিল। এক কথায় হাল দেখেই সেই সমজে একজনের প্রভাব প্রতিপত্তি বিবেচনা করা হতো। আর এখন চাষাদের অনেকে মানুষই মনে করে না; চাষা এখন কারো কারো কাছে গালি। ভূল, এখনো এদেশের অর্থনীতির অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছেন তাঁরা। এদেশের অর্থনীতির গাড়ির সবচেয়ে সচল চাকাটাও তাঁরা।  তাছাড়া শিকড়কে যে অস্বীকার করে বা অবহেলা করে সে কখনো কোন দিনও ভালো মানুষ হতে পারে না পারবে না।

আগের দিনে গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ, ক্ষেতভরা ফসল আর গোলাভরা ধান নিয়ে তাঁরা আজকের আমাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি সুখি ছিলেন। তাঁরা মোটা কাপড় পড়তেন, সাদামাটা সহজসরল জীবনযাপন করতেন। সারাদিন মাঠে কঠোর পরিশ্রয করে পেট ভরে ভাত খেতেন আর নিশ্চিন্তে নাক ডেকে ঘুমাতে পারতেন। 

মেকি সুখের ফাঁনুস উড়িয়ে যতই মুখে বুলি আওড়াই না কেন আজ আর আমরা আগের মত তেমন সুখে নেই, পেট ভরে ভাত খেতে পারি না, পিঠেও সয় না; ঘুমের ঔষধ খেয়েও ঘুমাতে পারি না। সব খানেই এখন কেমন যেন এক ধরণের অসহনীয় অস্থিরতা, গুমোট যন্ত্রণা।

আজকের মত অতশত ভোগবিলাস আগের দিনে ছিল না সত্য, কিন্তু অতসব রোগশোকও তখন কারো  ছিল না। অতঅত পাশকরা লোকজন ছিল না সত্য, কিন্তু আজকের মতো এত শিক্ষিত চোরও ছিল না। আগের মানুষের মনে অতশত প্যাঁচপোঁচ ছিল না, আজকের মত মানুষের অতো সন্ধেহবাতিকতাও ছিলনা; কিন্তু তখন তাঁদের সুখের এতটুকোও কমতি ছিল না। আজ আমরা যতই ভোগবিলাস অর্থবিত্ত আর প্রাচুর্যে আবৃত হচ্ছি, কেন যেন সুখ আমাদের কাছ থেকে সোনার হরিণ হয়ে যাচ্ছে।

নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাবই আজকের আমাদের এই সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ। আমরা কেউই এই দায় থেকে মুক্ত নই বা এতটুকোও মুক্ত হতে পারি না পারবো না। স্বাধীনতার এতো বছর পরও আমরা পারিনি আমাদের প্রজন্মকে একটা সুস্থ্য ও সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে, প্রায়ুরিটি বেসেজে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতে। তাই তো আমাদের আজকের সমাজের মানুষের এই দুরঅবস্থা। যে সমাজে নেই কারো প্রতি কারো নূন্যতম শ্রদ্ধাবোধ; সহমর্মিতা, স্পর্ষকাতরতা, আবেগ, অনুভূতি - সে সব তো অনেক আগ থেকেই সাত সমুদ্র তের নদী পাড় হয়ে চলে গেছে। তাই, ছেলেমেয়েরা এখন প্রযুক্তি নিয়ে পড়ে থাকছে। তারা এখন আর মা-বাবাকে আগের মতো বুঝে না বা বুঝতেও চায় না। তদ্রুপ মা-বাবাও সন্তানকে কোনভাবেই বুঝে উঠতে পারছেন না। অন্যসব বন্ধনের কথা নাই বা তুললাম। 

আগের দিনে পারিবারিক বন্ধন ছিল খুবই সৌহার্দপূর্ণ। এক একটা পরিবার ছিল বিশাল। সেখানে বড়দের কাছ থেকে ছোটরা পেত আদর সোহাগ, বড়রা পেত  শ্রদ্ধা-ভক্তি। এভাবেই সেসব শিখে প্রজন্ম বেড়ে উঠত। স্নেহ-মায়া-মমতা, প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা, শ্রদ্ধা-ভক্তির সেই বন্ধন ছিল খবই অটুট। প্রত্যেক সন্তানের কাছে তখন তার মা-বাবা ছিল স্বর্গ, নিজ ঘর ছিল মসজিদ মন্দির। এখন এইসব শুধুই স্বপ্নবিলাস আর গল্পস্বল্প। আজকের ছেলেমেয়েরা এসব এখন আর শুনতেও চায় না, বা শোনাবেই-বা কে? এখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে তাই এসব শুধুই ঠুনকো আবেগি ব্যাপারস্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোবাইল, ট্যাব, ল্যাবটপ, লাভরোড এখন তাদের কাছে মূখ্য। বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় নিওক্লিয়ার পরিবারের প্রত্যাশাই মূলতঃ এসবের জন্য দায়ী।

যান্ত্রিক সভ্যতা ও বিশ্বায়ন আমাদের আর কিছু দিতে পারুক আর না-ই-বা পারুক - লজ্জাহীন অসভ্য হৃদয়হীন করতে পেরেছে নিশ্চয়। বাস্তবতা বিবর্জিত আজকের তরুণ-তরুণীকে পথভ্রষ্টতার পাঠ ঠিকই দিতে পেরেছে। তাই তো, মা-বাবা ভাই-বোনের মায়ার বন্ধন ত্যাগ করে অনায়াসে নিঃসংকোচে আজকের সন্তানরা একাকি বেশ ভাল চলতে পারছে! ইহজগতের মায়া ত্যাগ করে পরজগতের মিথ্যে মোহমায়ায় জঙ্গি হতে পারছে। নির্দ্বিধায় মানুষ মারতে পারছে, মরতেও পারছে।

পরিশেষে- কাল আসছে সেই ভয়ঙ্কর কলো রাত। যে রাতে শুরু হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছিল। তা ঘটেছিল কিন্তু এদেশের মানুষের নিঃশর্ত আত্মত্যাগ ও তাজা রক্তের বিনিময়ে। 

২৫ মার্চ ১৯৭১, মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক ভেঙে গেলে ইয়াহিয়া গোপনে ইসলামাবাদ ফিরে গেলেন এবং গণহত্যা চালানোর পর সেই রাতেই পাকিস্তানি সেনারা বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পাঁচ বিশ্বস্ত সহকারীকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বে  বাঙ্গালি জাতির জনক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে যান; ঘোষণাটি - "এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।"

আমাদের এই যুদ্ধ আজও শেষ  হয়নি, হয়েছে কি? আসুন আমরা সবাই - স্মার্ট কার্ডের ছোয়ায় নিজ মস্তিষ্কটাকে এবং আশপাশটাকেও স্মার্ট করে গড়ে তুলি।।

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
২৪ মার্চ, ২০১৭।

বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২০

তাহাজ্জুদ মনকে সতেজ করে:

'হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রিতে দন্ডায়মান হোন কিছু অংশ বাদ দিয়ে; অর্ধরাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছু কম অথবা তদপেক্ষা বেশী এবং কুর'আন আবৃত্তি করুন সুবিন্যস্ত ভাবে ও স্পষ্টভাবে।' -(সূরা মুয্যাম্মিল‌ : ১-৪)

'নিশ্চয়ই মুত্তাকী লোক বাগ-বাগিচায় এবং ঝর্ণার আনন্দ উপভোগ করতে থাকবে এবং যে যে নিয়ামত তাদের প্রভূ পরোয়ারদিগার তাদেরকে দিতে থাকবেন সেগুলো তারা গ্রহণ করবে। (কারণ) নিসন্দেহে  তারা এর পূর্বে (দুনিয়ার জীবনে) মুহসেনীন (বড় নেক্কার) ছিল। তারা রাতের খুব অল্প অংশেই ঘুমাতো এবং শেষ রাতে ইস্তেগফার করতো। (কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে মাগফেরাত চাইতো)।' -(সূরা যারিয়াত : ১৫-১৮)

'এবং রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদের নামায পড়তে থাক। এ তোমার জন্যে আল্লাহর অতিরিক্ত ফযল ও করম। শীঘ্রই আল্লাহ তোমাকে উভয় জগতে বাঞ্ছিত মর্যাদায় ভূষিত করবেন।' -( সূরা বনি ইসরাইল : ৭৯)

'বস্তুতঃ রাতে ঘুম থেকে উঠা মনকে দমিত করার জন্যে খুব বেশি কার্যকর এবং সে সময়ের কুর'আন পাঠ বা যিকির একেবারে যথার্থ।' -(সূরা মুয্যাম্মিল : ৬)

তাহাজ্জুদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নত। তিনি এই নামাজ নিয়মিতভাবে পড়তেন এবং সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-দেরকে তা নিয়মিত পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। পবিত্র কুর'আনুল কারীমের অনেক জায়গায় তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য বিশেষভাবে তাকিদ করা হয়েছে । যেহেতু উম্মতে মুহাম্মদীকে নবী কারীম (সাঃ)-কে অনুসরণ করার হুকুম করা হয়েছে, সে জন্যে তাহাজ্জুদের এ তাগিদ পরোক্ষভাবে গোটা উম্মতের জন্যই করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ রাত্রে জাগ্রত হয় ও নিম্নের দো'আ পাঠ করে এবং আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, তা কবুল করা হয়। আর যদি সে ওযূ করে এবং ছালাত আদায় করে, সেই ছালাত কবুল করা হয়।

'লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহু লা শারীকা লাহু; লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর। সুবহা-নাল্লা-হি ওয়াল হামদু লিল্লা-হি ওয়ালা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াল্লা-হু আকবার; ওয়ালা হাওলা ওয়ালা ক্বুউওয়াতা ইল্লা বিল্লা-হ; রাব্বিগফির্লী'
অনুবাদ : আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। তাঁর জন্যই সকল রাজত্ব ও তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা এবং তিনিই সকল কিছুর উপরে ক্ষমতাশালী। মহা পবিত্র আল্লাহ। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ সবার চেয়ে বড়। নেই কোন ক্ষমতা, নেই কোন শক্তি আল্লাহ ব্যতীত; হে আামার প্রতিপাল! আামাকে ক্ষমা করুন।' -(বুখারী, মিশকাত হা/১২১৩; অনুচ্ছেদ-৩২)

হুজুর পাক (সাঃ) বলেন, 'রাতের শেষ সময়ে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার দিকে নাযিল হন এবং বলেন, “ডাকার জন্য কেউ আছে কি যার ডাক আমি শুনবো,  চাওয়ার জন্যে কেউ আছে কি যাকে আমি দেবো, গুনাহ মাফ চাওয়ার কেউ আছে কি যার গুনাহ আমি মাফ করবো?” -(সহীহ বুখারী)।

তাহাজ্জুদের অর্থ হল ঘুম থেকে জাগা বা উঠা। পবিত্র কুর'আনে রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদের যে তাকীদ করা হয়েছে তার মর্ম এই যে, রাতের কিছু অংশ ঘুমিয়ে থাকার পর জেগে উঠে নামাজ আদায় করা। তাহাজ্জুদের মসনূন সময় - এশার নামায পর ঘুমাবে এবং তারপর অর্ধেক রাতের পর উঠে নামাজ আদায় করবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো মধ্য রাতে, কখনো তার কিছু আগে অথবা পরে ঘুম থেকে উঠতেন এবং আসমানের দিকে তাকিয়ে সূরা আলে-ইমরানের শেষ রুকুর কয়েক আয়াত পড়তেন। তারপর মেসওয়াক ও অযু করে নামাজ আদায় করতেন।

তাহাজ্জুদ অন্ততপক্ষে দুই রাকাত এবং ঊর্ধতম আট রাকাত; তবে যার যা ইচ্ছে দুই দুই রাকা'আতে পড়া যায়।  রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেশিরভাগ সময়ের অভ্যাসগত তাহাজ্জুদ ছিল দুই দুই করে লম্বা তিলাওয়াত ও লম্বা সেজদাসহ আট রাকা'আত। অতঃপর তিন রাকা'আত বিতর; যা তিনি ইশার নামাজের সাথে পড়তেন না।

যদিও এই নামাজ বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু খুবই কার্যকর। ফরয, ওয়াযিব, সুন্নত ও বিতর নামাজে সাধারণ নিয়মের বাহিরে সিজদায় যেয়ে  নিজ থেকে কোন দোয়া করা কিংবা কোন কথা বলার নিয়ম নেই। তাহাজ্জুদ বা নফল সালাতে সিজদায় যেয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার কাছে প্রাণ খুলে দোওয়া করা যায়, চাওয়া যায়॥

তাহাজ্জুদ-এর ফযীলত সম্পর্কে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা স্বয়ং পবিত্র কুর'আনুল কারীমে বলেন - 'গভীর রাতে তারা শয্যা ত্যাগ করে আকাঙ্ক্ষা ও আশংকার সাথে তাদের প্রতিপালককে ডাকে এবং আমিতা দেরকে যে রুযী প্রদান করেছি,তা থেকে ব্যয় করে। কেউ জানে না তার কৃতকর্মের জন্য কি কি নয়ন প্রীতিকর প্রতিদান লুক্কায়িত আছে।' -(সূরা আস-সেজদা : ১৬-১৭)   

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ
৩ এপ্রিল, ২০১৮.

সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২০

জীবনের গল্প:

সামান্য জ্বর, তাই  বাবা-মাকে রাস্তায় ফেলে চলে গেছে তাঁর সন্তানরা; অথচ পরীক্ষায় দেখা গেছে ওদের কেউই  করোনা পজিটিভ নন!  ‘মা, তুমি এই বনে এক রাত থাকো, কাল এসে তোমাকে নিয়ে যাব।’ —এ কথা বলে ৫০ বছর বয়স্কা মাকে শাল-গজারির বনে ফেলে চলে যায় তাঁর সন্তানরা! জমি লিখে নিয়ে ঈদের দিনে বৃদ্ধা  মাকে রাস্তায় ফেলে চলে যায় তাঁর তিন ছেলে! করোনা আক্রান্ত সন্দেহে এক নারীকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় ফেলে রেখে উধাও হয়ে গেছে ছেলে! শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়ায় মাকে রাস্তায় ফেলে চলে গেছে এক সন্তান! আত্মীয়ের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে এক বৃদ্ধ বাবাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে গেছে তাঁর ছেলে ও ছেলের বউ! গত বাবা দিবসে ঘটেছে দেশের সবচেয়ে হৃদয় বিদারক ঘটনাটি কুমিল্লায়; অসুস্থ বাবাকে তাঁর সন্তানরা ডাস্টবিনের ময়লা আবর্জনার মধ্যে ফেলে রেখে চলে যায়! 

উপরোল্লিখিত শিরোনামগুলোর দু'একটির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তুলে না ধরলে হয়তো পাঠক বুঝে উঠতে পারবেন না অমানবিকতার কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে এ দেশের সন্তানদের মানসিকতা। জয়পুরহাট সদর থানার ওসি শাহরিয়ার খাঁন জানিয়েছেন, গত ঈদের দিন জয়পুরহাট-আক্কেলপুর সড়কে ছিরাতুন্নেছা (৮০) নামের এক বৃদ্ধা নারীকে আহাজারি করতে দেখে স্থানীয়রা ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করে। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে জয়পুরহাট কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সেফ হোমে রেখে আসে।

উদ্ধারকৃত ছিরাতুন্নেছা জয়পুরহাট পৌর শহরের জানিয়ার বাগান এলাকার মৃত নূর মোহাম্মদ মোল্লার স্ত্রী। এতে করে গ্রেপ্তার হয় তাঁর তিন ছেলে—  আব্দুর রাজ্জাক, মোয়াজ্জেম হোসেন ও মোজ্জামেল হক। ওসি বলেন, 'ছিরাতুন্নেছার তিন ছেলে কৗশলে তাদের মায়ের নামের সব জমিজমা নিজেদের নামে লিখিয়ে নেন। এরপর থেকে ছেলেরা মায়ের ভরণ-পোষণে অবহেলা, গালমন্দ ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। সোমবার সকালে বৃদ্ধা মাকে ফেলে রেখে চলে যায় তারা।'

এ ঘটনায় ওই নারীর চার ছেলের মধ্যে তিনজনকে আটক করা হয়। জেলা শহরের জানিয়ার বাগান মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, চার ছেলে ওই বৃদ্ধাকে সাত দিন করে পর্যায়ক্রমে নিজেদের বাড়িতে রাখার দায়িত্ব নিয়েছিল। সর্বশেষ তিনি  ছোট ছেলের কাছে ছিলেন। ছোট ছেলের কাছে থাকার সাত দিনের মেয়াদ শেষ হয় ঈদের দিন। ছোট ছেলে তাঁর মাকে অন্য ভাইদের কাছে নিয়ে যায়। অন্য তিন ভাইয়ের কেউই আর মাকে নিতে রাজি হয়নি। এ অবস্থায় মাকে রাস্তার ধারে নিয়ে গিয়ে ফেলে রেখে আসা হয়। বৃদ্ধাকে রাস্তায় আহাজারি করতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরা জাতীয় জরুরি সেবা নাম্বার ৯৯৯-এ কল করে বিষয়টি জানান। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। এ ঘটনায় ওই মায়ের তিন ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। পরে রাতেই বৃদ্ধা ছিরাতুন্নেছাকে সাময়িকভাবে জয়পুরহাট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সেফ হোমে পাঠানো হয়।

অন্য আরেকজন বৃদ্ধলোক হলিফ্যামিলি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। তিনি মারা গেলে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে জানানো হয়, তাদের কাছে একটি বেওয়ারিশ লাশ আছে তা দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। ফাউন্ডেশনের লোকজন হাসপাতালে ওই মৃত মানুষটির কোনো স্বজনের খোঁজ পায় না। এ সময় তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, 'এই দুর্দিনে যে লোক এখানে ভর্তি হতে পারেন, তিনি নিশ্চয় কোনো সাধারণ লোক নন; হয়তো তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তা না হলে এ হাসপাতালে আইসিইউ পাওয়ার কথা নয়।' এক পর্যায়ে ওই মৃত ব্যক্তির আত্মীয়দের খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। কেননা, স্বজন ছাড়া লাশ দাফন করা হলে আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। 

পরে জানা গেল, মৃত ব্যক্তি ইব্রাহিম কার্ডিয়াক মেডিক্যাল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মুহিউদ্দিন খান। গত ৩ জুন করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। এর আগে ১৪ দিন আইসিইউতে ছিলেন। এরও ২৪ দিন আগে তার করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। ঢাকা মেডিক্যাল থেকে আট বছর আগে অবসর গ্রহণ করে তিনি ইব্রাহিম কার্ডিয়াক মেডিক্যাল কলেজে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তার কোনো আত্মীয়স্বজনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকরা তার আত্মীয়দের আর পাওয়া যাবে না মনে করে দাফনের ব্যবস্থা নেন। 

বেওয়ারিশ হিসেবে কোন লাশ দাফন করতে গেলে স্বেচ্ছাসেবকদের একটি ডেথ সার্টিফিকেট নিতে হয়, এবং তা দিয়ে থানায় জিডি করে নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট নেয়ার প্রয়োজন পড়ে। সমস্ত প্রক্রিয়া সমাপ্ত করে অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন খাঁনের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এতো কিছুর পরও স্বেচ্ছাসেবকরা তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে মানতে রাজি ছিলেন না। তাই তারা লাশ দাফন স্থগিত রেখে পূণরায় হাসপাতালে যোগাযোগ করেন। 

স্বেচ্ছাসেবী দলটির একজন সদস্য বলেন, আমরা জানতে পারলাম, ইব্রাহিম মেডিক্যাল হাসপাতাল থেকে এসে তিনি হলিফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি হন। আমরা যখন সে হাসপাতালে ফোন করি তারা সাথে সাথেই ডা. মুহিউদ্দিন খাঁনকে চিনতে পারেন। তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃতের স্বজনদের নাম্বার দেয়। সে নাম্বারে কল করে স্বেচ্ছাসেবীরা জানতে পারেন মৃত ডা: মুহিউদ্দিনের ছেলে কানাডায় বসবাস করে। 

তার সাথে কথা হলে সে জানায়, দেশে তাদের অন্য কোন আত্মীয়স্বজন নেই, পরিবারের  অন্য কেউও এখন আর দেশে বসবাস করে না। তাই তিনি কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে তার বাবার লাশ দাফনের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করে! আর তার বাবার নামাজে জানাজা ও দাফনের ভিডিও আর ছবি তুলে যেন তাকে স্বেচ্ছাসেবীরা পাঠিয়ে দেন! তাঁর ছেলের সাথে কথা বলে ফোন রাখার পরই আরেকটি অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসে। চট্টগ্রাম থেকে কল দিয়ে একজন ডাক্তার বলেন, লাশের গোসল দিয়ে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন যদি পাঠাতে পারে তা হলে তারা মিরসরাইয়ে দাফন করবেন। 

কিছুক্ষণ পর আবার সেই একই ব্যক্তি কল করে বলেন, তারা সেখানে দাফন করতে পারবেন না। এমন পরিস্থিতিতে দোটানায় পড়ে যান স্বেচ্ছাসেবীরা। পরে ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই চট্টগ্রামের সেই লোক কল করে লাশ ঢাকাতেই দাফনের সিদ্ধান্ত জানায়। পরে রায়েরবাজার বধ্যভূমি গোরস্থানে মরহুম ডা. মুহিউদ্দিন খাঁনকে দাফন করা হয়। দাফনের পর তার ভাই যিনি নিজেও সরকারের পদস্থ একজন কর্মকর্তা, ফোনে জানান যে, তিনি তার এক কর্মচারীকে পাঠাচ্ছেন দাফনের সাক্ষী হিসেবে। এ দিকে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক মেডিক্যালের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি আমিও শুনেছি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনাটি ভাইরাল হয়েছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। একজন সহকর্মীর এমন পরিস্থিতি কেউ কামনা করে না।’ 

দাউদকান্দির সুফিয়া খাতুন; তাঁর বয়স ১০০ বা তার কাছাকাছি। ভিটামাটি কিছু নেই, ছেলে মেয়ে দু’জন। তারাও বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাদের সংসার চলে নিদারুণ কষ্টে। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের মাকে রাস্তায় ফেলে গেছে। সুফিয়া খাতুনকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে উপজেলা প্রশাসন। চিকিৎসার পাশাপাশি অন্য বন্দোবস্ত করেছে তারা। এখন তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হওয়ার চার মাস পরও সুফিয়াকে তার পরিবারের সদস্যরা কেউ নিতে আসেনি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সুফিয়া সেখানে চিকিৎসাধীন। তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। 

করোনা সংক্রমণকালে বৃদ্ধা সুফিয়া খাতুনের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকাটাও ঝুঁকিপূর্ণ। হাসপাতাল থেকে জানা যায়, তিনি চোখে দেখেন না, কানেও কম শোনেন। তাঁকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ফেলে যাওয়া হয় দাউদকান্দির গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। প্রথমে তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি। দীর্ঘ সময় আপন কাউকে কাছে না পেয়ে চিৎকার শুরু করেন। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধা সুফিয়াকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। 

১৮ ফেব্রুয়ারি উপজেলা প্রশাসন বৃদ্ধার ছেলের খোঁজ পায়। তাকে ডেকে এনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কথা বলা হয়। তখন পারিবারিক অসচ্ছলতার কথা সে জানায়। দাউদকান্দির নসরুদ্দি গ্রামে সুফিয়ার বাড়ি। স্বামী কালাই মিয়া ২০ বছর আগে মারা গেছেন। পরিবারটির এক শতক জমির ওপর বসতঘর ছাড়া আর কিছুই ছিল না; সেটিও এখন আর নেই। একমাত্র ছেলে মুখলেসুর রহমানও এখন বয়োবৃদ্ধ; সে ভিটার তার নিজের অংশটি পাঁচ বছর আগে বিক্রি করে দেয় বোনের কাছে। এরপর থেকে মুখলেসুর রহমান বসবাস করে মেয়ের বাড়িতে। 

মুখলেসুর বলেন, অভাবের কারণে ৯ বছর আগে তার স্ত্রী সৌদি আরব চলে গেছে। তার সাথে আর কোন যোগাযোগ রাখেনি। সে বাসে চানাচুর বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। এমন পরিস্থিতিতে মাকে নিজের কাছে রাখতে পারেনি। সুফিয়ার একমাত্র মেয়ে মিনারও বয়স হয়েছে। সে থাকে উপজেলার গঙ্গাপ্রসাদ গ্রামে। সে পৈতৃক ভিটা বিক্রি করে দিয়েছে। তার কাছেই এত দিন মা সুফিয়া ছিলেন। দারিদ্র্যের কারণে তিনি তার মাকে মহাসড়কের পাশে ফেলে গিয়েছিলেন। তার মেয়ে মিনারও বয়স হয়ে যাওয়ায় কোনো কাজ করতে পারে না। তার স্বামী আবদুল মান্নানও বৃদ্ধ। তাদের এক ছেলের আয়ে কোনো মতে সংসার চলে। 

ইউএনও জানান, সুফিয়া খাতুনের দায়িত্ব ছেলে মুখলেসুরের নেয়ার কথা থাকলেও সামর্থ্যের অভাবে কিছু করতে পারছে না। আবার এ মুহূর্তে সুফিয়াকে কুমিল্লা বা চট্টগ্রামের বৃদ্ধাশ্রমেও নেয়া যাচ্ছে না। ঢাকার আগারগাঁওয়ের বৃদ্ধাশ্রমে তার কথা হয়েছে। তবে এর আগে স্বেচ্ছায় তার দায়িত্ব কেউ নিতে চাইলে দেয়া হবে। সুফিয়া বেগমকে বয়স্ক-ভাতার কার্ড ও হুইল চেয়ার দেয়া হয়েছে। স্বেচ্ছায় কেউ তার দায়িত্ব নিতে চাইলে তাকে এক লাখ টাকার একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়াসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন ইউএনও।

সারা দেশজুড়ে এমন নির্মমতার ঘটনা যে কত, তা বলে শেষ করা যাবে না। সেসবের কয়টাই-বা আর পত্রপত্রিকা বা টিভি চ্যানেলে উঠে আসে? কিন্তু কোন বাবা-মা কি কখনও  তাঁদের সন্তানকে এভাবে ফেলে দিয়েছেন বা দেন? করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের পটিয়ার ৬ বছরের একটি বাচ্চা মারা যায়, বাবা নিজ  হাতে শেষ গোসল দিয়ে কাফন পড়িয়ে দাফন করতে নিয়ে গেলেন। জানাযায় অংশ গ্রহণকারি লোকজন যেখানে   পিপিই দ্বারা সুরক্ষিত, সেখানে বাবা ভুলেই গেছেন তিনি করোনাভাইরাস থেকে অরক্ষিত। তিনিও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারেন এ কথাটি একবারের জন্যও তাঁর মনে আসেনি। মৃত্যুর ভয়কে জয় করে বীরদর্পে নিজ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে দাফন করেন বাবা; বাবারা এমনই হয়।   

বিগত দিনে ঘটা বাংলাদেশের নির্মমতার ইতিহাস এগুলো, যা জনপ্রিয় সব জাতীয় পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে উঠে এসেছে; ফেসবুক ও বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায়ও প্রতিনিয়ত আমরা দেখতে পাই এমনতর আরো অনেক মানবতা বিপর্যয়কর সব খবরাখবর। তবে আমাদের আশেপাশে মানবতার চরম উৎকর্ষতার খবরও কিন্তু কম ঘটছে না, কম নেই। তবে করোনা পরিস্থিতিতে এ বিষয়টি অনেকটা স্পষ্টই হয়ে  উঠেছে— এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন বয়স্করা। নির্মমতার চরম পর্যায়ে উপনীত হয়ে ভয়াবহ ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন পৃথিবীর সব বয়োঃবৃদ্ধ মানুষ। 

একদিকে মৃতের সংখ্যা গণনায় দলেদলে শামিল হচ্ছেন, অন্যদিকে পারিবারিক নির্মম-নিষ্ঠুরতা বা নির্যাতনেরও স্বীকার হচ্ছেন এই বয়োঃবৃদ্ধরাই। করোনা মহামারীর মধ্যে যখন পরিবারের বয়স্ক সদস্যটির দিকে আরও একটু বেশি দৃষ্টি দেয়ার কথা, সরকার থেকেও আরো বেশি খেয়াল রাখার তাগিদ দেয়া হচ্ছে বার বার; ঠিক সেই সময়ই বৃদ্ধ বাবা-মাকে সন্তানরা রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে বা বাসা থেকে বের করে দিচ্ছে! অথচ পবিত্র কুর'আনুল কারীমে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, 'আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তার সঙ্গে কোন বস্তুকে শরীক করো না এবং মাতা-পিতার প্রতি উত্তম আচরণ কর।’ —(নিসা ৩৬) 

‘আর তোমার প্রতিপালক এ আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ভিন্ন অপর কারো ইবাদত করো না। আর মাতা-পিতার প্রতি উত্তম আচরণ কর। যদি তাঁদের একজন কিংবা  উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাঁদের উদ্দেশ্যে কখনো ‘উহ’ পর্যন্ত বলবে না। তাদেরকে ধমক দিও না, বরং তাদের সঙ্গে মার্জিত ভাষায় কথা বল। আর তাদের উদ্দেশ্যে অনুগ্রহে বিনয়ের বাহু অবনমিত কর। আর বল, হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়কে অনুগ্রহ কর, যেমন তাঁরা আমাকে শৈশবে প্রতিপালন করেছেন।’ —(বনী ইসরাঈল ২৩-২৪) 

‘আর আমি মানুষকে তার মাতা-পিতা সম্পর্কে আদেশ করেছি। তার মাতা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভধারণ করেছেন। দুই বছর পর্যন্ত তাকে স্তন্য দান করেছেন। এ মর্মে যে, তোমরা আমার এবং তোমাদের মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আমার দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।’ —(লোকমান ১৪)


পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে? কিয়ামত কি তবে আসন্ন? আগামীকাল আর আমরা পাবো কি-না জানি না। তবে যদি পৃথিবী টিকে যায় টিকে থাকে সে পৃথিবী কেমন হবে? জানি না তা কেউ বলতে পারে কি-না? কিন্তু জীবন যে দিনদিন কঠিন থেকে কঠিনতম হচ্ছে তা বেশ ভাল  করে  টের পাচ্ছি। একদিকে বাইরের করোনাবন্দী পৃথিবী, অন্যদিকে ঘরে ঘরে পারিবারিক অশান্তি, সম্পর্কের অবনতি। কোভিড-১৯  কি তাহলে পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে গেল এদেশের মধুর পারিবারিক  সম্পর্কের অনুষঙ্গ গুলোতেও? 

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও চাকুরি চ্যুতির ভয়ে অনেকেই প্রচণ্ড  মানসিক চাপে আছে, চাপে থাকছে। তাই বলে কি পারিবারিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে হবে? মানছি বাহিরে কাজ করা লোক ঘরে থাকলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।  তাই বলে কি বৃদ্ধ মা-বাবাকে ত্যাগ করতে হবে? আসলে ভোতা হয়ে গেছে আমাদের আবেগ-অনুভূতিসহ সমগ্র অনুভূতির বিষয়গুলো, সহনশীলতা সহমর্মিতা শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। হয়তো তাই সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটছে এমনসব নির্মমতা, বাড়ছে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বাড়ছে নৃশংসতা-নিষ্ঠুরতা। 

'মায়ের এক ধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম পাপোস বানাইলেও ঋণের শোধ হবে না'— এ ঋণ শোধ হওয়ার নয়। শোধ করার সাধ্য কার? দশ মাস দশ দিন যে মা তাঁর সন্তানকে গর্ভে নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেন; সেই মায়ের ঋণ শোধ করার সাধ্য কোন সন্তানের আছে কি?  প্রতিটি সন্তানের জন্য তার মা মানে মমতা, মা মানে নিশ্চয়তা, মা মানে নিরাপত্তা, মা মানে অস্তিত্ব, মা মানে আশ্রয়, মা মানে এক রাশ অন্ধকারের মাঝেও এক বুক ভালবাসা। প্রত্যেক মানুষের জীবনে মা হলো এই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় আর সবচেয়ে আপনজন। সেই মাকে কষ্ট দিতে পারে সে কেমন জন? বউয়ের জন্য যে মাকে দূরে ঠেলে দেয়, সে'জন কেমনে মানুষ হয়?   

আর বাবা মানে একটু শাসন একটু আদর, অনেক অনেক ভালোবাসা। বাবা মানে একটু কঠিন, তবে মাথার উপর ছায়া। বাবা মানে সকল চাওয়া, একটাও মিস না যাওয়া। বাবা মানে কাছের বন্ধু, দুঃসময়ের সাথী। বাবা মানে নির্ভরতার আকাশ আর একরাশ নিরাপত্তা। হ্যাঁ, বাবারা এমনই হয়। সন্তানদের চোখে বাবারা এমনিতেই একটু কেমন যেন হয়। কখনো একটু কঠোর, আবার কখনো একটু আদুরে; বাবারা আদরগুলো লুকিয়ে রাখেন শাসনের পর্দার আড়ালে। তাই হয়তো বাবাদের কেউ বুঝে না বা বুঝতে চায় না বা বুঝতে পারে না।     

জীবনের গল্প লিখবো বলে মনঃস্থির করেছিলাম, কিন্তু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না জীবনের গল্প কি করে কেমন করে লিখবো? তবে এতোক্ষণে এ কথাটি বেশ ভালো করেই বুঝতে পেরেছি জীবনের গল্প লেখা কোন সহজ কাজ নয়। কেউ যদি আমাকে বলতো  ক্রিকেট খেলার  সারা দিনের ধারাবিবরণী লিখতে,  তা-ও এরচেয়ে অনেক সহজ ছিল। কে বোলিং করলো আর কাকে করলো, কে রান করলো- আর কত রান করলো,  কে আউট হলো- কে করলো — এ যে রান আর আউটের এক অনবদ্য বর্ণনা! জীবনের ধারাবিবরণী কি  এতোই সোজা? জীবনের গল্প লেখা আসলেই কঠিন, অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ; গল্প-উপন্যাসের চেয়েও অনেক অনেক বেশি কঠিন। 

গল্প-উপন্যাসে লেখক ইচ্ছে করলে যখন-তখন কোনো চরিত্র বানিয়ে ফেলতে পারেন বা কোন চরিত্র বসিয়ে দিতে পারেন, পারেন ইচ্ছে মতো  মেরে ফেলতেও। খুবই আগ্রহ নিয়ে আমরা গল্প-উপন্যাস পড়ি অথবা নাটক দেখি। কিন্তু লেখকের হাতে যার জন্ম ও মৃত্যু, তা আর কতক্ষণ স্থির  রাখা যায় বা টিকিয়ে রাখা যায়? মানুষের জীবন তো প্রবাহমান নদীর মতো আঁকাবাঁকা। তা লেখার তুলিতে তুলে ধরা আসলেই অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। প্রত্যেক মানুষের জীবনই বিচিত্র, যা বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত; কখনো মানুষ সন্তান,  কখনো বাবা-মা, আর শেষ জীবনে পরনির্ভরশীল নির্জীব প্রাণী। তাই জীবনের  কোনো অধ্যায় হয় সুখকর, আবার কোনো অধ্যায় হতে পারে অসহনীয় এবং নিরবধি দুঃখে রচিত। এখানে  রচিত বলার কারণ হলো নিয়তিতে আমাদের কারো কোন হাত নেই, নিয়তি নির্ধারিত; তাই ঘটমান বর্তমানকে মেনে নেয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। 

এক জীবনেই একজন মানুষকে কত ভিন্ন পরিস্থিতির  মুখোমুখি হতে হয়, মোকাবিলা করতে হয় কত ঘাত-প্রতিঘাতের। জীবনের কোনো অধ্যায় হয় অনাবিল সুখের, আবার কোন অধ্যায় হয় অত্যন্ত দুঃখের। সুখ-দুঃখের এই অনুভূতিগুলো কখনও হয় তৃপ্তিদায়ক,  আবার কখনও-বা হয় অত্যন্ত বেদনাদায়ক, আবার অনেক সময় জীবন এতো বেশি ঘোলাটে হয়ে যায় যা মানুষের চিন্তায়ও কোনদিন আসে না। তাই তো জীবনের গল্পগুলো একই সাথে আনন্দ ও দুঃখ উভয়ই বয়ে নিয়ে আসে। পড়তে পড়তে কখনো মুখে হাসি আছে, আবার কখনো-বা চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু পানি জমে। কারণ,  অন্যের দুঃখে আমরা দুঃখিত হই, আবার পরবর্তী সময়েই আনন্দিত হই। কিন্তু কোন সন্তান দ্বারা যদি কোন বাবা-মা নির্যাতিত হন বা কোন সন্তান যদি মা-বাবাকে অবহেলা করে, তা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না রক্তে-মাংসে গড়া কোন মানুষ। 

প্রতিটি বাবা-মায়ের জীবনের পরম চাওয়া পাওয়া হলো তাঁর সন্তান। সন্তান কোলে এলে সে সন্তানের মুখ দেখলেই মা-বাবা ভুলে যান জীবনের দুঃসহ নিঃসহ সব যন্ত্রণা। সন্তানের জন্মে তার বাবা-মায়ের সে যে কি আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বা লিখে বুঝানোর মতো কোন বিষয় নয় ; বাবা-মা মাত্রই শুধু  এ আনন্দের উপলব্ধি অবগত। এক হতভাগ্য বাবা-মায়ের ঘরে এক সন্তান জন্ম নেয় ৮৮ সালের বন্যার বছর বন্যা শুরু হওয়ার ঠিক আগে আগে। জন্ম নেয়ার সময় তার মা মরতে বসেছিলেন; সে কি নিদারুণ করুণ অবস্থা! ডাক্তার বলেছিলেন গর্ভেই বাচ্চা স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি বড় হয়ে গেছে। সে কি কঠিন এক পরিস্থিতি! ভয়াবহ এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, যা আজ আর ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। 

এ-ক্লিনিক ও-ক্লিনিক করে করে শেষমেশ মেটারনিটিতে ভর্তি করা হলো মাকে; মায়ের ব্লাডপ্রেসার তখনও অনেক হাই। কোনভাবে কোন কিছুতেই তা কমানো যাচ্ছিলো না। একদিকে মেটারনিটিতে ভর্তি মা, অন্যদিকে  বাবা উদভ্রান্তের মতো পায়চারি করছেন হাসপাতালের বারান্দায়।  এক পর্যায়ে ডাক্তার আপা বের হলেন অপারেশন থিয়েটার থেকে; তাঁর হাতে একটা ফাইল। বাবাকে ডেকে বললেন, 'যে অবস্থা, বাচ্চা বা বাচ্চার মা দু'জনের যে কোন একজনকে বাঁচানো আমাদের পক্ষে সম্ভব হতে পারে। কিছুতেই রোগিণীর ব্লাড প্রেসার কমছে না কমানো যাচ্ছে না। আপনি ইচ্ছে করলে এখান থেকে রেফার্ড লেটার নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে বা অন্য কোন বড় হাসপাতালে যেতে পারেন। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে উভয়েরই এখন  সংকটাপন্ন অবস্থা। তবে, আপনি যদি এই বন্ডে সিগনেচার করেন, আমরা শেষ চেষ্টা করে দেখতে পারি।'   

কি করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না বাবা। অগত্যা বন্ডে সিগনেচার করেন মা বা সন্তান যে কোন একজনেকে বাঁচানোর শর্তে। সিগনেচার করেই তিনি চলে যান পাশের মসজিদে। সেজদায় পড়ে আল্লাহর কাছে কাকুতী-মিনতী করে কাঁদেন। চোখের পানির দাম আল্লাহ ঠিকই দিয়েছেন। মসজিদ থেকে হাসপাতালে যেয়েই জানতে পারেন মা ও শিশু উভয়েই বেঁচে আছে এবং ভালো আছে। শুনতে পান একটি ফুটফুটে ছেলে শিশুর জন্ম হয়েছে। বাবার সে কি আনন্দ! দৌঁড়ে বাহিরে চলে যান, মিষ্টি নিয়ে ফিরে আসেন। পুরো হাসপাতালের রোগি ডাক্তার ও নার্স সবাইকে মিষ্টি খাওয়ানো হয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বাসায় একা মা কি করে সন্তান ও সংসার সামলাবেন এই চিন্তা করে কয়দিন পরই বাবা তাদেরকে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন; যাতে দাদা-দাদী চাচা-ফুফুর আদরযত্ন পেয়ে বড় হতে পারে সন্তানটি। 

দেশের বাড়িতে মুক্ত বাতাসে  শুরু হয় ছেলেটির শৈশব; ওদিকে কর্মের খাতিরে বাবাকে থাকতে হয় ঢাকায়। প্রতি সপ্তাহের ছুটিতে বাবা বাড়ি যান।  এরই মধ্যে দেশে মহা প্লাবন শুরু হয়ে যায়। ৮৮-র সেই বন্যায় ঢাকা শহরসহ সারা দেশ প্রায় ডুবে যায়, পানিতে ভাসছিল সবকিছু। ঢাকা শহরের অনেক মহল্লার রাস্তায়ও সে বছর নৌকা চলত। তখন ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে যেতে হতো লঞ্চে করে। একবার- শিশুর দুধের কৌটা ও কিছু খাবার-দাবার নিয়ে বাবা ছোট্ট লঞ্চে চড়ে গ্রামে যাচ্ছিলেন। লঞ্চ কিছুদূর যেতেই ডুবতে শুরু করে,  শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি ডুবে যায়। যাত্রীরা সবায় সাঁতরিয়ে পাড়ে উঠে যায়। কিন্তু সেই বাবার হাতে দুধের কৌটা থাকায় সে সাঁতরাতে পারছেন না। পাড় থেকে সবায় বলতে থাকেন দুধের কৌটা ছেড়ে সাঁতরে উপরে উঠতে, কিন্তু তিনি তা ছাড়েন না। আবার ওটা নিয়ে সাঁতরাতেও পারছেন না, কষ্ট- অনেক কষ্ট! সেই অবস্থায়ও ভাবছেন, ওটা ছেড়ে দিলে আমার বাছাধন কি খাবে? বাড়ি যাবো কি নিয়ে বা যেয়ে লাভ কি??

আদর সোহাগে বড় হতে থাকে সেই সন্তানটি। নির্মল পারিবারিক পরিবেশে পরিবারের সবার আদর সোহাগ পেয়ে ছেলেটি বড় হয়েছে। বিশেষ করে মা ও বড় বোনের আদর তার জীবনকে করেছে ধন্য; যদিও আজ সে ভুলে গেছে সবকিছু। সংসারের কোন টানাপোড়ন আর জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখ কখনো  দেখতে হয়নি ছেলেটিকে। অভাব-অনটনে বাবা-মা আর বড় বোনের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাঝ দিয়ে সেই সংসারেই একমাত্র ছেলেটি বড় হয় সুখের পরশে। এক পোয়া কাঁচা মরিসও কোন দিন কিনতে তাকে যেতে হয়নি কোথাও, যেতে হয়নি কোন কাজে  বাজারে বা অন্যখানে। লেখাপড়া আর খেলাধুলা ছাড়া সংসারে তাকে আর কোন কাজই করতে হয়নি। 

এমন করে বেড়ে উঠে ছেলেটি আজ অনেক বড় হয়েছে। বাবা-মা অনেক কষ্ট করে তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। কিন্তু লেখাপড়া করার সময়ই সে একটা মেয়ের পাল্লায় পড়ে; বিয়েও করে তার পছন্দের সেই মেয়েটিকেই। বিয়ের পরই ছেলেটি ১৮০ ডিগ্রি এঙ্গেলে পাল্টে যায়। দূরত্ব বাড়াতে থাকে বাবা-মার সাথে, একমাত্র বোনটাকেও সহ্য করতে পারে না! যে ছেলেটি বড় হয়েছে সব ধরনের আদর্শ নিয়ে, সেই ছেলে এমন হয় কি করে? আজ যে মেয়ের পাল্লায় পড়ে সে বাবা-মা-বোনকে অস্বীকার করছে; অস্বীকার করে বসেছে তার ৩০ বছরের অতীত! সে কি জানে, সামনে তার জন্য এর চেয়েও কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে? তাছাড়া, কোন মানুষ কি এমন করতে পারে? আর যেসব মেয়েরা স্বামীর বাবা-মাকে সহ্য করতে পারে না, তাঁদের সাথে বসবাস করতে চায় না, তারা এতিমখানার ছেলেদের বিয়ে করে না কেন? ওদের বাবা-মা'ই-বা কেমন??          

মানুষ আসলে কে? — যার 'মান' ও 'হুশ' আছে সে-ই তো মানুষ। এখন আমাদের জানা-বুঝার বিষয় হলো 'মান' ও 'হুশ' কি? 'মান' একটি বিশেষ্য পদ; যার অর্থ— মাপবার উপযোগী মাত্রা বা যা দ্বারা মাপা যায় এমন বা যোগ্যতাসূচক শ্রেণীর কোন কিছু। আর 'হুশ' শব্দটির অর্থ এক কথায় বলা যায়- চৈতন্য বা চেতন। যার মাঝে এ দুটোর সমন্বয় নেই সে কখনো কোনভাবেই মানুষ হতে পারে না বা এই নামে নিজেকে পরিচয় দিতে পারে না, অভিহিত হতে পারে না। গরুরও মাথা আছে, সে মাথায় মানুষের মাথার চেয়েও অনেক বেশি বড় মগজও আছে; কিন্তু একটু বড় হতেই সে মাকে গুতো দিতে ছাড়ে না! কারণ সেই মাথায় যে মূল সারবস্তু মান-হুশ নেই। মানহীন হুশহীন জীবন তো কেবলমাত্র পশুরই জীবন! 

আমাদের চতুর্পাশে এমন অসংখ্য মানুষরূপী দো'পায়া পশুর বসবাস। ওদেরকে চিনতে হবে, চিহ্নিত করতে হবে। সর্বোপরি ওদেরকে সমাজ থেকে বয়কট করতে হবে। ওদের জন্য জমা রাখতে হবে শুধুই  ঘৃণা।।    

মুহাম্মদ ওয়ালিউল্যাহ 
৬ জুলাই, ২০২০.